মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৮ জুন ২০১৪, ১৪ আষাঢ় ১৪২১
বিশ কিমি পথ কমাতে পারে একটি ব্রিজ
কংস নদীর ওপর ব্রিজ না থাকায় হাজারও মানুষের দুর্ভোগ
বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে ॥ হালুয়াঘাটে কংস নদীর ওপর একটি পাকা ব্রিজের অভাবে হাজারো মানুষ নিত্যদিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ব্রিজ না থাকায় সাখুয়াই বাজার সংলগ্ন কংস নদী পাড়ি দিতে হালুয়াঘাটসহ ধোবাউড়ার গোয়াতলা, পূর্বধলা, তারাকান্দা ও ফুলপুর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের ভরসা নৌকা। বর্ষায় নৌকায় পারপারের সময় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। ব্রিজ না থাকায় স্থানীয় কৃষক ও রোগীর স্বজনরাও চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। অথচ ব্রিজটি নির্মাণ করা হলে এসব এলাকা থেকে ময়মনসিংহ জেলা সদরের ২০ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে বলে দাবি ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর। ব্রিজটি নির্মাণে নির্বাচনের সময় অনেকে আশ্বাস দিলেও পরে আর সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে হতাশ এলাকাবাসী।
সাখুয়াই গ্রামের ষাটোর্ধ সম্পন্ন কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, হালুয়াঘাটের সাখুয়াই ইউনিয়নের এই কংস নদীর ওপর ভর করে একসময় গড়ে উঠেছিল প্রসিদ্ধ বাজার সাখুয়াই। খরস্রোতা কংস কেবল সুস্বাদু মাছের জন্যই বিখ্যাত ছিল না। কংস নদী হয়ে বড় বড় নৌকা পাট ও ধান বোঝাই করে পাড়ি দিত কলকাতা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশ-বিদেশের নানাস্থানে। এলাকার কৃষিপণ্যনির্ভর সেই অর্থনীতি ছিল অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু পাঁচ-ছয় দশকে বদলে গেছে সেই চিত্র। বর্ষা ছাড়া এখন আর কংস দুকূল ছাপিয়ে চলে না। শুকনায় মরা গাং। তারপরও পাহাড়ি ঢলে যে কোন সময় উত্তাল হয়ে ওঠে কংস। এটিই কংসের চরিত্র, জানালেন বড়ইকান্দি গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ কৃষক মারফত আলী। একই গ্রামের খলিলুর রহমান জানান- হালুয়াঘাট উপজেলার সাখুয়াই, বিলডোরা, মুন্সিরহাট; ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলা, বাঘবেড়; ফুলপুর উপজেলার বালিয়া, বওলা, ঢাকুয়া, রুপসীসহ তারাকান্দা ও পূর্বধলা উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ ময়মনসিংহ সদরে যেতে এই কংস পার হতে হয়। ব্রিজ না থাকায় এসব এলাকার মানুষকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে ময়মনসিংহ জেলা সদরে।
হালুয়াঘাটের মুন্সিরহাট থেকে ময়মনসিংহ জেলা সদরে যাতায়াতে কেবল দূরত্বই নয় সময়ও কমবে অন্তত একঘণ্টা। ব্রিজটি হলে একই সঙ্গে হালুয়াঘাট থেকে তারাকান্দা ও তালদীঘি হয়ে ময়মনসিংহ জেলা সদরে যাতায়াতে দুই ঘণ্টার স্থলে সময় লাগবে মাত্র এক ঘণ্টা। এছাড়া সাখুয়াই ও বালিয়া বাজারের মধ্যে কৃষিপণ্য পরিবহনে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেটিও দূর হয়ে যাবে । ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, কংসের ওপর পাকা ব্রিজ না থাকায় তাদের কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। ন্যায্য মূল্যও পাচ্ছে না তারা। কারণ ব্রিজটি নির্মাণ করা হলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ দেশের নানাস্থান থেকে পাইকার এসে কৃষিপণ্য নিয়ে যেত। কিন্তু এখন প্রয়োজনীয় পাইকার না থাকায় স্থানীয় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী পাইকারদের কাছে অনেক সময় বাধ্য হয়ে পানির দরে তাদের কৃষিপণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। যোগাযোগ ও পরিবহন সমস্যার কারণে চাইলেও অনেক কৃষক সরাসরি তাদের কৃষিপণ্য ঢাকা কিংবা ময়মনসিংহ সদরে নিয়ে বিক্রি করতে পারছে না। এতে স্থানীয় কৃষকরা বছরের পর বছর লোকসানের মুখে পড়ে আসছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন জরুরী ও জটিল রোগীর স্বজনরা। সাহিদা আক্তার এমনই এক ভুক্তভোগী। জানালেন, জরুরী প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নিতে ফুলপুর কিংবা হালুয়াঘাট যাতায়াতে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। বিশেষ করে রাত ১০ টার পর কোন নৌকা ঘাটে না থাকায় রোগী ও স্বজনদের আল্লার ওপর ভরসা করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। আর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে চাইলে ন্যূনতম ২০ কিলোমিটার ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। সাহিদার দাবি অচিরেই যেন কংসের ওপর পাকা ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। কংস নদীর দুপারেই রয়েছে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই কংস পার হতে হচ্ছে। বর্ষায় এসব শিক্ষার্থীর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কংস পারাপারে উদ্বিগ্ন থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কারণ প্রতি বর্ষায় খরস্রোতা কংস নদীতে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। নৌকা দিয়ে নদী পারাপারে বিলম্বের কারণে অনেক সময় ক্লাস ও পরীক্ষা মিস করছে শিক্ষার্থীরা। এলাকাবাসীর এই সমস্যা সমাধানে প্রতি নির্বাচনেই প্রার্থীরা কংস নদীতে পাকা ব্রিজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর কেউই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেননি। ফলে এলাকাবাসীর সেই স্বপ্নের ব্রিজ স্বপ্নেই থেকে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে পাকা ব্রিজ নিয়ে হতাশ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন। সাখুয়াই ইউনিয়ন পরিষদে পর পর একাধিকবার নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধি আক্ষেপ করে জানালেন, কংস নদীতে পাকা ব্রিজ নির্মাণে বহুবার ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভাতে রেজুলেশন করা হয়েছে। সেই রেজুলেশন পাসও হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আবেদনও করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পাকা ব্রিজ নির্মাণে কার্যকর কোন পদক্ষেপের খবর জানেন না বলে জানালেন এই ইউপি চেয়ারম্যান। তার দাবি ব্রিজটি হলে এলাকার হাটবাজারসহ কৃষি অর্থনীতির বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন হতো। ইউপি চেয়ারম্যান আরও জানালেন, প্রতিদিন গড়ে কংস পার হয়ে নানা গন্তব্যে যায় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ। আর স্থানীয় হাটবারে পাঁচ-ছয় হাজার মানুষকে কংস পার হতে হচ্ছে। অথচ ব্রিজটি নির্মাণে সরকার ও প্রশাসন কারও কোন গরজ নেই। তবে এ নিয়ে কিছুটা আশার কথা শুনালেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল এলজিইডি, ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম ইসমত কিবরিয়া। জনকণ্ঠকে তিনি জানান, কংস নদীতে পাকা ব্রিজ নির্মাণে প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ চলছে। এরই মধ্যে পাকা ব্রিজ নির্মাণে এটিকে এলজিইডির একটি প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চরম দারিদ্র্য থমকে দিচ্ছে রাখাইনদের শিক্ষাজীবন
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েও হতাশা নেমে এসেছে রাখাইন শিক্ষার্থী নীলার জীবনে। তার বড় বোন চান্দাও এএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কিন্তু আর্থিক চরম দৈন্যের কাছে ভাল কোন কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সে এখন কলাপাড়ার মোজাহারউদ্দিন বিশ্বাস কলেজের ডিগ্রীর ছাত্রী। দরিদ্র বাবা বাঁচো মং তালুকদারের উপার্জন বলতে কবিরাজি। দৈনিক সর্বোচ্চ ৪০ টাকা। মা নেয়সে বাড়িতে তাঁতের দু একটা কাপড় বুননের কাজ করছেন। এ দিয়ে সংসারে দু’বেলা খাবার জোটে না। তার উপরে লেখা-পড়ার খরচ তো মেটানোর সুযোগ নেই। এ কারণে নীলার ভাল কোন কলেজে ভর্তি হওয়া ঝুলে আছে চরম অনিশ্চয়তায়।
ধুলাসার ইউনিয়নের বৌলতলী রাখাইনপাড়ায় বাড়ি নীলাদের। অনেক কষ্টে নিজে টিউশনির টাকায় কোনমতে এসএসসি পার হয়েছে। ডালবুগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ বছর নীলা জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাড়ি থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে হেঁটে রোদ-বৃষ্টির ধকল পেরিয়ে এ ধাপ পার করলেও এখন কী হবে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না ।
রাখাইন হতদরিদ্র এ পরিবারের দুঃখের যেন শেষ নেই। নীলার বড়বোন চান্দা অদম্য মেধাবী থাকলেও আর্থিক দৈন্যে দিশাহারা হয়ে তার বাবা তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন। এমনকি হতাশ হয়ে নীলাকেও বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন অসহায় এ মানুষটি। তারপরও থমকে যায়নি এ দুবোনের শিক্ষার অগ্রযাত্রা। ইস্পাতকঠিন দৃঢ় মনোবল নিয়ে শিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করার স্বপ্নে ছিল এরা বিভোর। কিন্তু তেল সলতে না থাকা হারিকেনে যেমন আলো জ্বালানো যায় না। আবার জ্বললেও ধপ করে নিভে যায়- এমনই দশা নীলাদের। নীলা জানায়, প্রতিদিন সকালেই ছুটতে হয়েছে স্কুলে। কখনও খালি পেটে কখনও আধাপেট, তাও নুনে-পান্তা। আর দুপুর তো নিত্য উপোস। সেই শেষ বিকালে বাড়ি ফিরে হয়ত জুটত কিছু খাবার। এর পরেই টিউশনি। তাও তাদের রাখাইনপাড়ার ৪/৫টি শিশু। এ দিয়ে আয় বলতে মাসে চার-পাঁচ শ’ টাকা। এরপরে গভীর রাত অবধি নিজের বইয়ে চোখ মেলানো। এটুকু যোগান দিয়ে কোনমতে পার হয়েছে নীলার এসএসসি মিশন। নীলাদের বসত ঘরটিরও দশা চরম বেহাল। টংঘরটি যেন জীর্ণদশার মডেল হয়ে আছে। জং ধরা টিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে। ফুটো হয়ে আছে অসংখ্য। বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায়। আবার এখন ক্ষয়ে যাওয়া চালে টিনের ছিদ্র দিয়ে রোদের আলোর ঝলকানিও পড়ছে ঘরের মধ্যে। দুরবস্থা দেখে যেন প্রকৃতিও হাসছে। এ অবস্থা ঠেকাতে পলিথিন দিয়েছেন নীলার বাবা। ঘরটির বেড়া এমনিতেই ধসে পড়ছে। অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী নীলার ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন নিয়ে এখন চরম শঙ্কায় পড়েছেন বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা। অসহায়ত্ত ফুটে উঠছে তাদের চেহারায়ও। বোঝা যায় কথাবার্তায়। ছোট মেয়ের ভাল ফলাফলে বৃদ্ধ মানুষ দু’টির যখন হাসিখুশি থাকার কথা। উল্টো তারা হতাশায় পড়েছেন মেয়ের লেখাপড়ার ভবিষ্যত অনিশ্চয়তা নিয়ে।
নীলার বাবা বাঁচো মং জানালেন, এখন তার বয়স ৬৪ বছর। ডায়াবেটিসের রোগী। নিজের কোন উপার্জন নেই। সরকার থেকে মাত্র ৩০০ টাকা ফি-মাসে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। যেন অসহায়ত্তের সব ধকল এ পরিবারটির ওপর চেপে বসেছে। চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। আমরা ক’জন সংবাদকর্মী যখন কথা বলে ফিরব তখন অসহায় মানুষটি তার ভাষায় বললেন, ‘মাইয়াতো পড়াইতে চায়, কিন্তু ক্যামনে পড়াইবে?’ এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আমরাও হোন্ডায় চেপে ফেরত গন্তব্যের দিকে।
-মেজবাহউদ্দিন মাননু,
কলাপাড়া থেকে
দুলাল রাজা ও থানা বিবির দীঘির কাহিনী
আলমগীর তালুকদার, কচুয়া থেকে ॥ চাঁদপুর জেলাধীন কচুয়া উপজেলার পালগিরি একটি বহুল আলোচিত প্রাচীন জনপদ। উপজেলা সদর হতে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ও গুরুত্বপূর্ণ কালিয়াপাড়া সড়ক সংলগ্ন উত্তর পাশে পালগিরী গ্রামে দুলাল রাজা ও থানা বিবির দীঘি রয়েছে। দেশের বহু প্রাচীন জনপদকে ঘিরে রয়েছে কিংবদন্তি মূলক গল্প কাহিনী। এসব গল্প কাহিনী শোনার জন্য মানুষ চরম কৌতূহল বোধ করে থাকে।
বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের লোকজনরা আজও চরম আগ্রহ ভরে পৌরাণিক কাহিনী শুনে থাকে। এটি কিংবদন্তি ঘেরা দেশের এক উল্লেখযোগ্য জনপদ রূপে মানুষের নিকট পরিচিত। দুই বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পালগিরী গ্রামে প্রায় ৬ হাজার লোকবাস করে। উচুঁ ভূমি ও প্রায় সমতল বিশিষ্ট এ গ্রামে পথ ঘাট বেশ উন্নত। হরেক রকম প্রাচীন বৃক্ষ-লতা দিয়ে ঘেরা ছায়া সুনিবিড় এ গ্রামে সৌন্দর্যবোধ সকলেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, পালরাজাদের আমলে নদী পথে এ প্রশস্ত স্থান (পালগিরি গ্রাম অংশ) ব্যবসায়ীদের একটি আড়তে পরিণত হবার কারণেও এ গ্রামের নাম করণ পালগিরি হয়ে থাকতে পারে।
প্রাচীন বাংলার প্রথানুযায়ী কথিত এ নদীর পাড়েই একটি ছোট জনবসতি এলাকা (পালগিরি গ্রাম) কান্দিরপাড় নামে লোকজনের নিকট পরিচিত। পালগিরি গ্রামকে ঘিরে যেমনি রয়েছে অনেক অনেক কিংবদন্তি, তেমনি সে সব কাহিনীর প্রেক্ষাপটে কিছু প্রতীকী সাক্ষীরের অস্তিত্ব আজও বিদ্যমান রয়েছে পালগিরি গ্রামে। ফলে কিংবদন্তির কাহিনীগুলো আজও পরম সমাদরে লোক মুখে আলোচিত হচ্ছে। এ গ্রামের বিভিন্ন স্মৃতি চিহ্ন আবিষ্কার থেকে ধারণা করা হচ্ছে ৭৬এর মনন্তরে (বাংলা ১১৭৬ সন) কিংবা সমসাময়িক কালে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভৌগোলিক এবং সামাজিক প্রকৃতি পরিবেশ পাল্টে যায়।
এ গ্রামের বর্তমানে অধিবাসীদের পূর্ব পুরুষরা অন্যত্র থেকে এ গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। এ থেকে এক সময়ে এক পালগিরি গ্রাম এলাকা যে জনশূন্য হয়ে পড়েছিল এ ধারণা বোধই সৃষ্টি করছে। এ গ্রামে রয়েছে কয়েকটি প্রাচীন দীঘি, একটি প্রাচীন মসজিদ, স্থানে স্থানে ইটের ডিবি, পুরনো ইমারতের ভগ্নাবশেষ প্রাচীন আমলের তৈরি মাটির বাসন কোসন। তাছাড়া বিভিন্ন সময় এ এলাকায় মাটি ও পুকুর খনন করে পাওয়া গেছে ঘড়া (ঘটকি) ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা, স্বর্ণালঙ্কার, নৌকার বৈঠা, দীর্ঘদেহী মানুষের কংকাল, শিবের দশভুজা মূর্তি (কুমিল্লা জাদুঘরে রক্ষিত), গভীর নলকূপ বসাতে গিয়ে পাওয়া যায় ২৪০ ফুট নিচে হলদে বর্ণের গাছের টুকরা। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, এককালে দুলাল রাজা নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। লোক মুখে তিনি রাজা হিসাবেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
দুলাল রাজা তাঁর অনিন্দ্যসুন্দরী ভাগ্নে বধূ থানা বিবির রূপের মোহে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করার অভিলাষ ব্যক্ত করেন। এতে বুদ্ধিমতী রূপের রানী থানা বিবির শর্ত আরোপ করেন যে, থানা বিবি ও দুলাল রাজা একই রাতে পৃথক-পৃথক দু’টি দীঘি খননের কাজ সম্পন্ন করবে। দুলাল রাজার দীঘিটি হবে থানা বিবির দীঘির তুলনায় বড় এবং থানা বিবির দীঘি খননের পূর্বেই দুলাল রাজার দীঘি খননের কাজ সমাপ্ত করতে হবে। এ পরীক্ষায় দুলাল রাজা জয়ী হলে তিনি থানা বিবিকে বিয়ে করতে পারবেন। তবে ব্যর্থ হলে দুলাল রাজাকে সূর্যোদয়ের পূর্বেই দেশ ত্যাগ করতে হবে। শর্তানুযায়ী দু’জন একই রাতে একই সময়ে দীঘি খননের কাজে লেগে যান। থানা বিবির দীঘি খননের কাজ রাতের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু দুলাল রাজার দীঘির তিনপাড় বাঁধা শেষে উত্তর পাড় বাঁধা শুরু করলে থানা বিবির চাতুরিতে তারই পোষা মোরগ রাত শেষ হওয়ার ডাক ডেকে ওঠে। ফলে উত্তর পাড় আর বাঁধা হয়নি।
দুলাল রাজার দীঘি খননের কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। পরাজিত দুলাল রাজা সূর্যোদয়ের পূর্বেই দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অনেক খুঁজাখুঁজির পরও দুলাল রাজার সন্ধান মিলেনি। কেউ বলেন- তিনি আত্মহত্যা করেছে। ৩ একর আয়তন বিশিষ্ট থানা বিবির দীঘিটি এখনও গ্রামের দক্ষিণাংশে এবং ২০ একর আয়তন বিশিষ্ট দুলাল রাজার দীঘির উত্তর-পূর্বাংশে। দুই দীঘির দূরত্ব প্রায় ৫শ’ মিটার। লোকমুখে শোনা যায় আগের দিনের লোকজন বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে (বিয়ে, মেসবানী ইত্যাদি) তাদের দরকার মতো থালা বাসন চাইলে থানা বিবির দীঘিতে নৌকায় ভেসে উঠত পিতলের থালা-বাসন। ৭০/৭৫ বছর পূর্বে কেউ একজন নাকি কিছু থালাবাসন চুরি করে রেখে দিয়েছিল আর সেই থেকেই থালা-বাসন ওঠা বন্ধ হয়ে যায়। তবে আজও অনেকেই বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে থানা বিবির দীঘিতে দুধ, কলা ভোগ দেয়াসহ দীঘির পানি পান করেন। এতে কেউ কেউ উপকার পাওয়ার কথা দাবি করছেন।
স্থানীয় লোকজনরা দুলাল রাজার দীঘির বিভিন্ন অংশ বন্দোবস্ত নিয়ে তাদের ইচ্ছানুযায়ী ফসলাদি ফলানোসহ মাছ চাষ করে থাকে। এ দীঘির সংস্কার কাজ করে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করলে বছরে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মাছ উৎপাদন সম্ভব।
রেকর্ড গড়ল ঋষি সম্প্রদায়ের তিন ছাত্রী
বাল্যবিবাহ যেখানে হয় হরহামেশা, মেয়েদের বিবাহ দেয়া হয় যেখানে ১০ বছর বয়সে, কুসংস্কার যাদের নিয়মে পরিণত, দারিদ্র্যতা যাদের নিত্যসঙ্গী; সেই জায়গার মেয়েদের এসএসসি পাস কল্পনার অতীত। এই সব কিছু অতিক্রম করে এবার যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ঋষিপাড়ার ৩ মেয়ে এসএসসি পাস করেছে। অথচ বয়স ১০ বছর হয়ে যাওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাবার কথা তাদের। ব্যতিক্রম ওই তিন মেয়ে। তারা এবার যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছাতিয়ানতলা-চুড়ামনকাটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে। দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছরেও এ পাড়া থেকে কোন মেয়ে এসএসসি পাস করতে পারেনি। সেই ঋষিপাড়ার ৩ মেয়ে এবার এক সঙ্গে এসএসসি পাস করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে এ পাড়ায় চলছে অনেকটা উৎসবের আমেজ।
যশোর শহরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত চুড়ামনকাটি গ্রাম। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে মাত্র ৭ কিলোমিটার উত্তরে এ পাড়ার অবস্থান। স্থানীয় বয়জ্যেষ্ঠদের মতে, আনুমানিক সাড়ে তিন শ’ বছর পূর্ব থেকেই এ গ্রামে ঋষি সম্প্রদায়ের বসবাস। বর্তমানে এদের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। এদের মধ্যে ভোটার প্রায় ৯শ‘। তবে নানা কুসংস্কারের কারণে বরাবর পিছিয়েই ছিল তারা। লেখাপড়া করা তো দূরের কথা, সমাজে চলাফেরা করতে পারত না তারা। মেয়েদের ছিল আরও দৈন্যদশা। বয়স ১০ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যেত তাদের। তারপর অল্প বয়সে সন্তানের মা হওয়াসহ সংসার সামলাতে সামলাতে আক্রান্ত হতো রোগব্যাধিতে। এভাবেই একদিন সাঙ্গ হতো তাদের জীবনের গতি। তবে সময়ের ব্যবধানে আস্তে আস্তে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় চুড়ামনকাটি ঋষিপাড়ার ৩ মেয়ে শিক্ষার্থী এবার ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএস সি পাস করেছে।
চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য আবু বকর সিদ্দিকী জানান, ঋষিপাড়ার মানুষের দৈন্যদশা দেখে এলাকার কয়েক সমাজ হিতৈষী মানুষ এগিয়ে আসেন। তারা বাল্য বিবাহ রোধ ও মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করেন। এ ছাড়া যে সমস্ত কারণে সমাজের মানুষ তাদের গ্রহণ করত না সেসব কাজ করা থেকে তাদের নিবৃত্ত করতে উৎসাহিত করেন। এর ফলে এক পর্যায়ে সমাজে উঠতে পারাসহ তাদের ছেলেসন্তানরা স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। তবে বাল্য বিবাহ আর অর্থকষ্টের কারণে সে সুযোগ পাচ্ছিল না এ পাড়ার মেয়েরা। তিনি বলেন, শুধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নয়, এ অবস্থা চলে আসছিল সাড়ে ৩শ’ বছর ধরে। এবার তার অবসান ঘটেছে। এ পাড়া থেকে বিপুল দাশের মেয়ে দিপ্তী রানী দাশ, মহাদেব দাশের মেয়ে ভাবনা রানী দাশ, রবিন্দ্রনাথ দাশের মেয়ে অর্পনা দাশ এবার ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ ও বি গ্রেডে এসএসসি পাস করেছে। পাড়ার মাতব্বর অতুল চন্দ্র দাস জানান, ৩ মেয়ে যা করেছে তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তাদের হাত ধরে এখন অন্যরাও এগিয়ে যেতে পারবে।
যাদের মাধ্যমে এই ইতিহাস রচিত হয়েছে সেই ৩ শিক্ষার্থীও বেজায় খুশি। তারা বলছে-তারা আলোর পথ দেখিয়ে দিল। এজন্য তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার পরও তারা খুশি এজন্য যে আর কেউ বলতে পারবে না ঋষিপাড়ার মেয়েরা লেখাপড়া করে না। আমরা ৪৪ বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে ঋষিপাড়ায় আলোর প্রদীপ জ্বালতে সক্ষম হয়েছি।
-সাজেদ রহমান, যশোর থেকে
সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর হারিয়ে যাচ্ছে
রিয়াজউদ্দিন জামি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ॥ সরকারী সাহায্য সহযোগিতা নেই। নেই দেখভাল করার কেউ। তাই অনেকটা বিলুপ্তির পথে গ্রে-হাউন্ড কুকুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের এ কুকুর খুবই বিখ্যাত। পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থের অভাবে বর্তমানে বিরল প্রজাতির গ্রে-হাউন্ড কুকুর। বর্তমানে কায়ক্লেশে হাতে গোনা কয়েকজন কুকুর পালন করছে।
সরাইলের বিরল প্রজাতির গ্রে-হাউন্ড কুকুরের পরিচিতি উপমহাদেশ জুড়ে। দেশ বিদেশের শৌখিন লোকজন প্রতিবছরই এখানে আসেন কুকুর নিতে। কিন্তু বর্তমানে আগের মতো এখানে এই কুকুর মিলছে না। আগে উপজেলার বিভিন্ন বাড়িতে কুকুর পালন করত। কেউ শখের বশবর্তী হয়ে আবার কেউ আভিজাত্যের জন্য পালন করত বিখ্যাত এই কুকুর। কিন্তু কালের আবর্তে আজ সবই অতীত।
সরাইলের গ্রে-হাউন্ড কুকুর দেখতে অন্যান্য কুকুরের চেয়ে কিছুটা আলাদা। মুখটা অনেকটা শেয়ালের মতো, কান লম্বা। দুধ ভাত আর মাছ-মাংস খাইয়ে বড় করা হয় এদের। সাদা, কালো, লালসহ বিভিন্ন রঙের এসব কুকুর ব্যবহার করা হতো শিকারের কাজে। শিয়াল, বন বিড়াল, বাঘদাস শিকারে পারদর্শী। চোর- ডাকাতরা এই কুকুরের নাম শুনলেই আঁৎকে ওঠে। তাই সরাইলের এসব গ্রে-হাউন্ড কুকুরের দামটাও বেশি। বাচ্চা কুকুর ২০/২৫ হাজার আর বড় কুকুর ৬০/৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
আগে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে কুকুর পালন করত। এখন তেমনটি নেই। তারপরও উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে এই কুকুর পালন করা হয়। সরাইলের বিখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুরের উৎপত্তি সম্পর্কে এলাকায় রয়েছে নানা জনশ্রুতি। বিভিন্নজন বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন।
কিভাবে এই কুকুর সরাইলে আসে তার সঠিক ইতিহাস কেউ বলতে পারে না। কুকুরের উৎপত্তি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে যতটুকু জানা যায়, বহুকাল আগে সরাইলের এক দেওয়ান তাঁর হাতি নিয়ে সরাইল পরগনা থেকে ভারতের কলকাতা যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক বাড়িতে একটি কুকুর দেখতে পান তিনি। অনেক বলার পরও কুকুরের মালিক দেওয়ানকে কুকুরটি দিতে রাজি হয়নি। পরে তিনি হাতির বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে কুকুরটি নিয়ে আসেন। সে কুকুর এক সময় কয়েক হাত বদল হয়ে তার দাদা গঙ্গাচরণ রবিদাসের কাছে চলে আসে। আর শিয়ালের সঙ্গে মিলনের ফলে সৃষ্টি বর্তমান এই জাতের কুকুরের সৃষ্টি। জনশ্রুতি আছে, সরাইলের এক দেওয়ান একবার হাতি নিয়ে শিকারের জন্য বনে যান। সঙ্গে ছিল তার প্রিয় মাদী কুকুর।
এক সময় হারিয়ে যায় কুকুরটি। পরে বনে অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখতে পান এটি একটি বাঘের সঙ্গে মিলন করছে। বাঘের সঙ্গে মিলনের ফলেই শিকারি প্রকৃতির এই গ্রে-হাউন্ড কুকুরের উৎপত্তি। টাইগার, মধু, পপি, কালী, লালী, টমি, কালাসহ বিভিন্ন নাম আছে এই কুকুরের। জন্মের পর তাদের আচরণ অনুযায়ী নাম রাখা হয়। ৫টি ছোট বাচ্চার জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন ২ লিটার দুধ। মাংসসহ উন্নতমানের খাবারও দিতে হয়। কুকুর নিতে চোর ডাকাত হানা দেয় তার বাড়িতে।
প্রত্যাশিত সাহায্য না মিললে এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে বিশ্বখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুর। স্থানীয়রা বলছে, সরাইলের ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে বিখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুরকে বাদ দেয়া যাবে না। দেশ বিদেশে এই কুকুর সরাইলের পরিচিতি বহন করে।
সরাইলের সাংবাদিক মোহাম্মদ মাসুদ জানান, রবিদাসের বাড়িতে এখনও বাণিজ্যিকভাবে কুকুর পালন করা হয়। ৫০ বছর ধরে তারা কুকুর পালন করে আসছে।
এদিকে, সরাইল প্রাণিসম্পদ বিভাগ সম্প্রতি কুকুর প্রজনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র দিয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোন সারা নেই। সরাইলে এই কুকুরের প্রজনন কেন্দ্র করা প্রয়োজন বলে সকলে মনে করেন।


মরিচ চাষে ভাগ্য বদল ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকের

মরিচ চাষ করে ভাগ্য বদলে গেছে ঠাকুরগাঁও জেলার অনেক কৃষকের। মসলা জাতীয় অন্য যেকোন ফসলের চেয়ে অল্প খরচে মরিচ চাষ করে কৃষক বেশি মুনাফা পাওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ের চাষিরা বেশ খুশি। চলতি মৌসুমে মরিচের বাম্পার ফলন হওয়ায় আরো বেশি মরিচ চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এ অঞ্চলের কৃষক। ফলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঠাকুরগাঁওয়ের মরিচ বাজারজাত করে বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জনে আশাবাদী কৃষকরা। উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মরিচের হাট ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভাউলার হাট। সপ্তাহে দুইদিন ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এই হাটে মরিচ কেনা-বেচার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই মরিচ নিয়ে যাওয়া হয়।
মরিচ ব্যবসায়ী আক্কাছ আলী জানান, এ জেলার মরিচ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এই মরিচের গুণগত মান খুবই ভাল। কৃষকরা দামও ভাল পাচ্ছে। মরিচ আবাদ করে এই এলাকার অনেক কৃষকের ভাগ্য বদলে গেছে।
জেলার প্রায় সব এলাকায় কমবেশি মসলাজাতীয় ফসল চাষ হলেও সদর উপজেলার রায়পুর, নারগুন, জামালপুরে মরিচসহ যাবতীয় তরিতরকারি খুব ভাল জন্মে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় উন্নতজাতের বীজ, সার, কীটনাশক এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ। মরিচ চাষি সাইফুল আহমেদ জানান, কয়েক বছর আগে যে জমিতে অন্যান্য ফসল আবাদ করে ১০ হাজার টাকা আয় করা যেত না, সে জমিতে বর্তমানে মরিচসহ মসলাজাতীয় ফসল চাষ করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে। পরিশ্রমও অনেক কম।
কৃষক আশরাফ আহম্মেদ জানান, মরিচ বীজ রোপণের ৪৫ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে মরিচ তোলা যায়। প্রতি একর মরিচ আবাদে খরচ হয় ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতিবিঘা জমিতে মোট খরচ বাদে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। এতে ঝুঁকিও কম। চাষি মজনু মিয়া জানান, কৃষি বিভাগ থেকে যথাসময়ে চাষাবাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা হলে কৃষকরা আরও লাভবান হতে পারবেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কমল কুমার সরকার জানান, এবার ১ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হচ্ছে। এখানকার কৃষক কাঁচামরিচের সঙ্গে সঙ্গে পাকা মরিচ তুলে শুকিয়ে বাজারজাত করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই এলাকার মরিচ যায়। জমিগুলো উঁচু এবং বেলে-দোআঁশ হওয়ায় মরিচ চাষ খুব ভাল হয় এবং কৃষক লাভবান হয়। কৃষি বিভাগের পরামর্শে আগামীতে আরও ভাল ফলন হবে বলে তিনি আশাবাদী।
-এস এম জসিম উদ্দিন
ঠাকুরগাঁও থেকে
হাঁসের খামারে ভাগ্য বদল এক দিনমজুরের
হাঁসের খামারে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন দিনমজুর শামছুল হক (৪৫)। শামছুল হক শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার বাগেরভিটা গ্রামের আমের আলীর ছেলে। এক ছেলে ও তিন মেয়েসহ ৬ সদস্যের পরিবার শামছুল হকের। দিনমজুরী করে চলত তার সংসার। একদিন কাজে না গেলে সেদিন তার ঘরে চুলা জ্বলত না। অনাহারে থাকতে হতো পরিবারের সদস্যদের। হাঁসের খামারে শামছুল হক এখন কেবল স্বাবলম্বীই নয়, এলাকায় স্বাবলম্বীর অনুকরণীয় এক খামারী।
সংসারের দৈন্যদশা আর পরিবারের সদস্যদের জীর্ণদশায় দিনমজুর শামছুল হক তার ভাগ্য পরিবর্তনে বেছে নেয় হাঁস পালন কর্মসূচী। বহু কষ্টে সঞ্চিত টাকায় কয়েক বছর পূর্বে সে ৩০টি হাঁস কিনে লালন-পালন শুরু“ করে। হাঁস পালনের জন্য নিজের বসতভিটাতেই গড়ে তুলতে হয় কাঁচাঘর। কেনা শুকনা খাদ্যের পরও পালিত হাঁসের পুষ্টিসাধনে শামছুল হক পাশের বালিয়া বিল থেকে সংগ্রহ করতে থাকে শামুক ও ঝিনুক। সেই থেকেই শুরু“ হয় শামছুলের হাঁসের খামারের যাত্রা। দু’এক বছরের মধ্যেই তার খামারের হাঁসের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে হাঁস ও ডিম বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয়। হাঁস পালন ও পরিচর্যা করতে গিয়ে খামারেই চলে যেতে থাকে দিনের পুরোটা সময়। ফলে শামছুল হক তার দিনমজুরীর পেশা চুকিয়ে হাঁসের খামারী হিসেবেই পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা পেতে থাকেন। এখন তার খামারে খ-কালীন সময় দেয় পরিবারের সদস্যরাও। এতে শামছুল হকের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরাও খুশি। কারণ হাঁস পালনেই তাদের সংসারে ফিরে এসেছে স্বাচ্ছন্দ্য। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখন শামছুলের খামারে রয়েছে ৪শ’ হাঁস। সে জানায়, ওই ৪শ’ হাঁসের মধ্যে প্রতিদিন ১শ হাঁস ডিম দেয়। ক’দিন আগে প্রতিদিন প্রায় ২শ’ ডিম পাওয়া যেত।
কিন্তু খামারে রোগ দেখা দেয়ায় এবং সময়মতো ভ্যাকসিন দিতে না পারায় ডিমের সংখ্যা ১শ’তে নেমে এসেছে। তবুও ডিম বিক্রির টাকায় ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ ও ভরণপোষণ জুগিয়ে সুখেই দিন কাটছে তার। শামছুল হকের মতো হাঁসের খামারে ভাগ্য বদল হয়েছে একই গ্রামের ধলু মিয়া, আকবর আলী ও আকাব্বর আলীর।

-রফিকুল ইসলাম আধার
শেরপুর থেকে



স্বাধীনতার ৪৩ বছরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা

নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে অবহেলিত এক মুক্তিযোদ্ধা লালা হরিজন। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকাল হতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। লালা হরিজন দলিত সম্প্রদায়ের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে তিনি এতদিন অবহেলিত ছিলেন। জানা গেছে, লালা হরিজন ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে ভারতের বাগমারা নামক স্থানে উপস্থিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে বর্তমান সরকারের ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, তারাকান্দা ও শম্ভুগঞ্জে পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিজ প্রাণ বিপন্ন করে ময়মনসিংহকে শত্রুমুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা লালা হরিজন স্ত্রী, এক ছেলে, দুই বিধবা মেয়ে ও নাতি-নাতনি নিয়ে এতদিন অভাবের সংসার চালিয়ে আসছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা লালা হরিজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমাগো থাকার কোন জায়গাজমি নাই। অহন ভাতার টেকা দিয়া ঘর বাইন্দা থাকবার লাইগ্যা একটু জায়গাজমি কিনুম। -আবুল কাসেম আজাদ, মোহনগঞ্জ থেকে