মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০১৪, ২২ চৈত্র ১৪২০
রক্ষাগোলা আদিবাসীদের রক্ষাকবজ
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ২৬টি গ্রামের আদিবাসীর ‘রক্ষাগোলা’ নিশ্চিত করেছে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা। প্রতিটি পরিবার প্রতিবেলায় রান্নার সময় একমুষ্টি চাল জমা করে গড়ে তুলেছে বিশাল রক্ষাগোলা। ২০০৩ সালে গড়ে তোলা এ রক্ষাগোলার বর্তমান তহবিল দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৮১ টাকা। ৫টি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠার পর ১০ বছরে এখন ২৬ গ্রাম এ তহবিলের আওতায় এসেছে।
পরিবারপ্রতি একমুষ্টি সংগৃহীত চাল এখন আদিবাসীদের রক্ষাকবজে পরিণত হয়েছে। এখন কোন আদিবাসী পরিবার খাদ্য সঙ্কটে পড়লে বা আপৎকালীন সঞ্চয়কৃত চাল ওই পরিবারকে সহায়তা হিসেবে দেয়া হয়। পরবর্তীতে সহায়তাকৃত চাল ওই পরিবার পরিশোধ করে। ফলে রক্ষাগোলার সঞ্চয়কৃত চালের মজুদের স্থিতি বাড়তে থাকে। এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে রক্ষাগোলা। বর্তমানে এর আওতা বাড়ছে। বাড়ছে সদস্য সংখ্যাও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে উপজেলার ২৬টি গ্রামে রক্ষাগোলা গ্রামভিত্তিক স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের সমাজ কমিটিতে ১১০৫ পরিবার সম্পৃক্ত। নারী, পুরুষ ও শিশু মিলে মোট সদস্য সংখ্যা ৫ হাজার ৬৬৫। আর একমুষ্টি চাল সংগ্রহ করে এখন রক্ষাগোলা কমিটিগুলোর তহবিল রয়েছে ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৮১ টাকা।
জানা যায়, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়ার কারণে আদিবাসী সম্প্রদায় যখন খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য সংগ্রামরত, ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। সেন্টার ফর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব ভলান্টারি অর্গানাইজেশন নামের এ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাটি প্রায় একযুগ ধরে আদিবাসীদের মৌলিক ইস্যুতে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রক্ষাগোলা বা খাদ্যব্যাংকের উৎপত্তি।
২০০৩ সাল থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর, শাহানাপাড়া, ঈদলপুর-কান্তপাশা, নিমকুড়ি ও পাথরঘাটা গ্রামে প্রথম ‘গ্রামভিত্তিক সমন্বিত সামাজিক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি’র আলোকে জনগণের স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর আওা ১৬টি গ্রামে ‘রক্ষাগোলা গ্রামভিত্তিক স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচী’ শুরু হয়। বর্তমানে উপজেলার ২৬টি গ্রামে এ কার্যক্রম চলছে। সংযুক্ত অন্য গ্রামগুলোÑবেলডাঙ্গা, গোলাই, জিওলমারী, মুলকিডাইং, ডাইংপাড়া, নিমঘটু, গণকের ডাইং, ফারসাপাড়া, নরসিংহগড়, ঈদলপুর, কমলাপুর বিলপাড়া, গড়ডাইং, বাগানপাড়া, গুনিগ্রাম, দাদৌড়, আগোলপুর, উদপুর, সাকুড়া, গোগ্রাম, শ্রীরামপুর ও মুরারীপুর।
সম্প্রতি এ রক্ষাগোলার বার্ষিক সাধারণসভা অনুষ্ঠিত হয় উপজেলার রাজাবাড়ি হাইস্কুল মাঠে। সেখানে জমায়েত হয়েছিল ২৬টি গ্রামের নারীপুরুষ ও শিশুরা। সেখানে নিজ নিজ গ্রামের প্রধানরা তাঁদের বার্ষিক রিপোর্ট তুলে ধরেন।
রিপোর্টে জানানো হয়, ২৬টি গ্রামে বর্তমানে ১১০৫ পরিবারের ১৬৩০ নারী, ১৬২৪ পুরুষ, ১২০৩ মেয়েশিশু ও ১২০৮ ছেলেশিশু; সর্বমোট ৫৬৬৫ জন সংগঠিত হয়েছেন। গ্রামগুলিতে উঁরাও, সান্তাল, রাজুয়াড়, রায়, পাহাড়িয়া, শিং, হাজরা নৃজাতিগোষ্ঠীর বসবাস। গ্রামগুলোতে এ পর্যন্ত সর্বমোট সঞ্চিত চালের পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৫ দশমিক ৫ কেজি এবং ধান ৬৪ হাজার, ১৬৯ কেজি। ২৬টি গ্রামের প্রায় সকল পরিবারকে সংগঠনসমূহের মাধ্যমে আপৎকালীন খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পারিবারিক অন্যান্য প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে ১১ লাখ ৩৭ হাজার ২০৯ টাকা।
গ্রামভিত্তিক রক্ষাগোলা খাদ্য নিরাপত্তা কার্যক্রমের ব্যাপারে রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের প্রধান সন্তোষ এক্কা জানান, গ্রামভিত্তিক রক্ষাগোলা মূলত গ্রামবাসীরাই পরিচালনা করে। প্রত্যেকটি রক্ষাগোলা গ্রাম সংগঠনের একটি করে পরিচালনা কমিটিসহ রক্ষাগোলা নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কমিটি রয়েছে। এ সম্প্রদায়ের লোকজন একত্র হয়ে রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠন তৈরি করে। প্রতিটি পরিবারই এ সংগঠনের সদস্য।
প্রতিটি পরিবারেরই রয়েছে পৃথক পৃথক পরিচিতি নম্বর। রক্ষাগোলায় খাদ্য সঞ্চয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবার প্রতিবেলায় রান্নার সময় একমুষ্টি চাল পৃথক করে রাখে। সপ্তাহ শেষে এ চাল রক্ষাগোলায় জমা করা হয়। নিমকুড়ি রক্ষাগোলা সংগঠনের পরিচালনা কমিটির নেতা সিমা টপ্প্য বলেন, শুধু চাল নয়, প্রতিবছরের দুটি মৌসুমে ধানও সঞ্চয় করা হয় সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে। প্রতিটি সদস্য পরিবার ৫ থেকে ১০ কেজি ধান রক্ষাগোলায় জমা দেয়। চালের মতো ধানও আপৎকালীন সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করেন সদস্যরা।
শাহানাপাড়া গ্রামের রক্ষাগোলা সংগঠনের প্রধান পরেশ কুজুর বলেন, সংগঠনের সব সদস্যের সিদ্ধান্তে উদ্বৃত্ত চাল বা ধান বিক্রির পর ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ব্যাংকের হিসাব বা এ্যাকাউন্ট সংশ্লিষ্ট রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ কমিটির নামে থাকে। এ হিসেবে এ টাকার মালিক সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্যরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৬টি সংগঠনের সকল পরিবারই বছরে কমপক্ষে দুইবার খাদ্য সহায়তা নিয়েছে। এর পরিমাণ ২ লাখ ১৯ হাজার ০৪৭ কেজি চাল এবং ২০ হাজার ৮৫৮ দশমিক ৫ কেজি ধান । এছাড়া আর্থিক সহায়তা নেয়ার পরিমাণ ১১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সদস্যরা গ্রহণকৃত খাদ্যশস্য এবং টাকা ফেরত দিয়েছেন। রক্ষাগোলা কমিটির সদস্যরা উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে জমি লিজ নিয়ে সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ শুরু করেছেন।
আদিবাসীরা জানান, মুষ্টিচাল উত্তোলনের পর তাদের সমিতির কোষাধ্যক্ষের কাছে জমা করা হয়। কোন পরিবার অভাব-অনটনে পড়লে সহায়তা হিসেবে রক্ষাগোলা থেকে চাল নেন। ৫ কেজি চাল নিলে সুদ হিসেবে অতিরিক্ত ৫০০ গ্রাম চালসহ রক্ষাগোলায় ফেরত দিতে হয়।
পাকড়ী ইউনিয়নের লহড়াপাড়ার অচিন্ত প্রামাণিকের স্ত্রী রিপা রানী বলেন, তার পরিবারে ৩ মেয়ে ও ১ ছেলেসহ ৬ সদস্য। স্বামী-স্ত্রী কৃষি জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে যে পরিমাণ আয় হতো তা দিয়ে তিনবেলা খাবার জোটানো কষ্টকর হয়ে পড়ত। রক্ষাগোলা থেকে অল্প সুদের বিনিময়ে টাকা ঋণ নিয়ে জমি লিজ নেয়া হয়। এরপর জমিতে ধান ও সবজি চাষ করে পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
উপকারভোগী আদিবাসীরা জানান, আদিবাসী পরিবারগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মুষ্টিচাল উত্তোলনের মাধ্যমে রক্ষাগোলা গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। শুরুতেই আদিবাসী পরিবারগুলো চাল দিতে রাজি না হলেও কিছুদিন পরেই আদিবাসী নারীরা এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গে পুরুষরাও এগিয়ে আসেন। ভবিষ্যতে উপজেলার অন্য ইউনিয়নগুলোতে আদিবাসীদের মধ্যে এ ধরনের সমিতি গড়ে তোলার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের বিষয়টি তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
গত ২৮ মার্চ আদিবাসীদের রক্ষাগোলার বার্ষিক সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অন্যদের মধ্যে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এইচকেএস আরেফিন। আদিবাসীদের এ অনন্য উদ্যোগে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্য দূর করে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। কারণ খাদ্যের অভাব মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যত নষ্ট করে দেয় এবং দারিদ্র্যচক্র মানুষের জীবন শেষ করে দেয়। এই অবহেলিত জনগণ নিজেদের প্রচেষ্টায় খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলে তাদের জীবন রক্ষা করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। এটি তাদের রক্ষকবজ বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

Ñমামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী
সিলেটের জালালী কবুতর হারিয়ে যাচ্ছে
সালাম মশরুর, সিলেট ॥ হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের জালালী কবুতর। সিলেটের আকাশে এক সময় দিনভর উড়ে বেড়াত জালালী কবুতর। ঝাঁকে ঝাঁকে জালালী কবুতর উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য ছিল চোখ জুড়ানো। ইতিহাসের সাক্ষী এই জালালী কবুতর নিয়ে গান-গল্পের শেষ নেই। উপমহাদেশের বিখ্যাত দরবেশ হযরত শাহজালাল (র)-এর সফরসঙ্গী এই কবুতর নিয়েও ইতিহাস রয়েছে। হযরত শাহজালাল (র) এর সঙ্গী হিসেবে দিল্লী থেকে এই অঞ্চলে আসার কারণে এই কবুতরগুলো জালালী কবুতর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আরবের ইয়েমেন থেকে হযরত শাহজালাল (র) এই অঞ্চলে আসার উদ্দেশে পাড়ি জমালে দিল্লীতে এসে যাত্রা বিরতি করেন। দিল্লীর বাদশাহ নাসির উদ্দিন সে সময় শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ হযরত শাহজালাল (র) কে তার পক্ষ থেকে এক জোড়া কবুতর উপহার দেন। হযরত শাহজালাল (র) এর সঙ্গীয় এই কবুতর বংশপরম্পরায় বিস্তৃতি লাভ করে। বহুকাল হযরত শাহজালাল (র) এর মাজার এলাকার অন্যতম আর্কষণ ছিল এই কবুতর। মাজারের আশপাশে অবস্থান করে অগণিত কবুতর ঝাঁকে ঝাঁকে আসা-যাওয়া করত। মাজার এলাকা ছাড়াও রাতে নগরীর কীনব্রিজে হাজারও কবুতর আশ্রয় নিত। শ্রদ্ধা ভক্তি করে আগেকার সময় মানুষ জালালী কবুতর ধরা ও খাওয়া থেকে বিরত থাকত।
‘ঝাঁকে উড়ে আকাশ জুড়ে’ ‘দেখতে কি সুন্দর, জালালের জালালী কবুতর।’ প্রাণ জুড়ানো এই গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে চোখে ভাসে সিলেটের আকাশে জালালী কবুতর ওড়ার দৃশ্য। মনোহর শান্তির প্রতীক এই কবুতরগুলো একসময় সিলেটের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। যেমন বিখ্যাত গানের কথামালায় তেমন বাস্তবেও। এই রঙ বা এই গোত্রীয় কবুতর বিশ্বের অন্যান্য দেশেও আছে। কিন্তু জালালী কবুতরের ঠোঁট ও পা এবং আকৃতিতে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। এই কবুতরগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হযরত শাহজালাল ও নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার স্মৃতি। উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই দুই দরবেশের স্মৃতিবিজড়িত কবুতরগুলো এখন হারিয়ে যাচ্ছে। পনের-কুড়ি বছর আগেও সিলেটের আকাশে যখন তখন ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা যেত জালালী কবুতর।
অগ্রহায়ণে শহরতলীর ধানী মাঠে এগুলো চোখে পড়ত। বিভিন্ন স্থানে ঘরের ছাদে কার্ণিশে বাসা বাঁধত কবুতরগুলো। বাকবাকুম শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠত চারদিক। অনেকে কলস বা কাঠের বাক্স উপরে ঝুলিয়ে রাখতেন যাতে ওরা সহজে বাসা বাঁধতে পারে। কীনব্রিজের উপরে সন্ধ্যায় এসে জড়ো হতো হাজার হাজার কবুতর। এখন মূল্যবোধ বদলে গেছে। তাই রুচি ও সচেতনা বিসর্জন দিয়ে এক শ্রেণীর লোক মানুষঘেঁষা ঐ কবুতরগুলোকে নানাভাবে শিকার ও ভক্ষণ করতে শুরু করে। দুষ্ট প্রকৃতির লোক এয়ারগান দিয়েও কবুতর শিকার করে। রাতের বেলা হাত দিয়েও ধরা হয়ে থাকে। এক শ্রেণীর লোভী মানুষ কবুতর নিধনের ফলে এদের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। গত বিশ/পঁচিশ বছরে জালালী কবুতরের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে আসে। শাহজালাল (র) এর মাজার এলাকায়ও কবুতর গুলোর নিরাপত্তা বিঘিœত হতে থাকে। যে কারণে দীর্ঘ সময় মাজার এলাকায় কবুতরের উপস্থিতি ছিল যৎসামান্য। এখানে প্রতিদিন লোকজন কবুতরের খাদ্য হিসেবে ধান চাল ছিটিয়ে দেন। এতে অল্প পরিমাণে হলেও কবুতরের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর কিছুটা হলেও মাজারে আগত ভক্তরা জালালী কবুতরের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। জালালী কবুতর নিধন বন্ধু ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে প্রকৃতির সুন্দর এই কবুতরের বংশ বৃদ্ধি পাবে। তাই এ ব্যাপারে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় খেতাব পেতে চান যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা
মুক্তিযোদ্ধা শামছুল হক (৬২)। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লেও জীবিকার তাগিদে এখনো তিনি কায়িম পরিশ্রম করে চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর ডাকে শত্রুদের মোকাবেলায় সম্মুখযুদ্ধে যিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে এদেশকে হানাদারমুক্ত করেছিলেন সেই রণাঙ্গনের দেশপ্রেমিক আজ জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিক। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের পুমদী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুমদী গ্রামের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা পরবর্তীতে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেও কোন চাকরি না পেয়ে দরিদ্রতার কশাঘাতে তিনি আজ জর্জরিত। সহায় সম্বল বলতে ভিটেবাড়ি ছাড়া তাঁর কিছুই নেই। স্ত্রী শামছুন্নাহার গৃহিণী, ৪ ছেলে ও ২ মেয়েকে নিয়ে তিনি ছেলেদের হোটেলের শ্রম বিক্রির আয় আর তাঁর প্রতিমাসে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার টাকা দিয়ে কোনরকমে সংসার চালাচ্ছেন। যুদ্ধজয়ের কথা স্মরণে এনে তিনি আবেগাপ্লত হয়ে বলেন, ‘৭২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিলাম, বহু হানাদার খতম করেছি। মাথার ওপর দিয়ে কয়েকবার গুলি চলে, অল্পের জন্য বেঁচে যাই। অথচ স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও আমি রাষ্ট্রীয় খেতাব পায়নি’।
তিনি জানান, ১১নং সেক্টরের তুরা নামকস্থানে যুদ্ধের প্রাথমিক ট্রেনিংয়ের পর মিত্রবাহিনীর ৬নং বিহার রেজিমেন্টের এটম কোম্পানির ৯৯ এপিওর অধীনে উচ্চ ট্রেনিং গ্রহণ করি। দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় কোম্পানি কমান্ডার জিকে রাও এবং গ্রুপ কমান্ডার পিএল রাও আমাকে প্লাটুন কমান্ডার করে হালুয়াঘাট থানা আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন। প্রায় ৯ মাস আহার নিদ্রা ত্যাগ করে তিনদিক দিয়ে হালুয়াঘাট থানা আমার গেরিলাদল আক্রমণ করে নবেম্বর মাসের শেষের দিকে মুক্ত করে। পরে কংশ নদীর পূর্বপাড়ে দুর্গাপুর, ময়মনসিংহ শহর ও মুক্তাগাছা মুক্ত করি। ময়মনসিংহ এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি ক্যাম্প থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ভালুকা থানা, মধুপুরগড় হয়ে জয়দেবপুর পৌঁছি। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ১৬ ডিসেম্বর সকালে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মিলিত হয়ে চূড়ান্ত বিজয়ে অংশ নেই।
Ñমাজহার মান্না, কিশোরগঞ্জ থেকে
বরগুনার গণহত্যা ॥ শহীদ স্বজনদের যন্ত্রণা
শংকরলাল দাশ, গলাচিপা ॥ মুক্তিযুদ্ধের ভয়ঙ্কর সেই দিনগুলো নিয়ে পুষ্প রানী দেবনাথ এখন আর সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চান না। তাদের ওপর প্রচ- অনুযোগ। প্রশাসন এবং রাজনীতিকদের ওপরেও তাঁর তীব্র অভিমান। বলেন, ‘কি হবে আমার দুঃখের কথা বলে। বছরে মাত্র দু’বার আমাদের কাছে আসেন। স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে ডেকে নিয়ে যান ডিসির (জেলা প্রশাসক) কাছে। হাজারও মানুষের সামনে আমরা আমাদের যন্ত্রণার কথা বলি। চোখের জল ফেলি। আপনারা সে সব শোনেন। হাতে একটা গেলাস কিংবা প্লেট ধরিয়ে বিদায় করেন। এরপরে আর সারা বছর কোন খোঁজ নেন না। আমরা কী করে বেঁচে আছি কেউ তা জানতেও চায় না। তাই আর কারও সঙ্গে বলতে চাই না।’
এ ক্ষোভ শহীদ জায়া পুষ্প রানী দেবনাথের একার নয়। বরগুনা জেলার প্রায় সব শহীদ পরিবারের। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৩ বছরেও শহীদ পরিবারগুলো পায়নি যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। পায়নি ন্যূনতম সরকারী-বেসরকারী সুযোগ-সুবিধা। এমনকি শহীদদের সম্পূর্ণ নামের তালিকাও করা হয়নি। এমন হাজারও অভিযোগ শহীদ পরিবারের। এরপরেও তাঁরা কথা বলেন। জানান সে সব দুঃসহ দিনের স্মৃতির কথা। কারণ ওই দিনগুলো যে তাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে আছে। শুধু স্বজন হারিয়েছেন, তাই নয়। এর পাশাপাশি ভয়াবহ সে দিনগুলোতে তারা হারিয়েছেন বেঁচে থাকার অবলম্বনও। তাইতো সে সব দিনের স্মৃতি তারা কিছুতেই ভুলতে পারেন না।
বরগুনা শহরের নাথ পাড়ার বাসিন্দা পুষ্প রানী দেবনাথ একাত্তরে ছিলেন পঁচিশ বছর বয়সের গৃহবধূ। কোলে তাঁর তিন মেয়ে। সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র ৮-৯ মাস। বড় মেয়ের বয়স পাঁচ এবং মেজ মেয়েটির বয়স তিন বছর। স্বামী কানাই লাল দেবনাথের ছিল বেশ বড় কাপড়ের দোকান। দোকানে ছিল ৫/৬ কর্মচারী। স্বামী, সন্তান আর সংসার নিয়ে কেটে যেত দিন। কিন্তু একাত্তরের হানাদার বাহিনীর তা-বে তার সুখের দিনগুলো ভেঙ্গে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। যা আর কোনদিনই ফেরত পাননি।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করে প্রায় ৭০ বছর বয়সী পুষ্প রানী দেবনাথ জানান, দিনটি ছিল বুধবার। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কয়েকজন বাঙালী সহযোগী সকালে তাঁর বাসায় হানা দেয়। কোলের শিশু সন্তানসহ স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে পাকিস্তানী সেনাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর স্বামীকে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাকে জেলখানার মহিলা ওয়ার্ডে এবং স্বামীকে পুরুষ ওয়ার্ডে ঢোকানো হয়। পুরো তিনদিন তাঁকে জেলখানায় রাখা হয়। পরে শুক্রবার বিকেলে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়।
জেলখানার স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, জেলখানায় প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে আতঙ্কে। যখন তখন পাকিস্তানী সেনারা এসে মহিলা ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ত। বিশেষ করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামলেই সেনাদের আনাগোনা বেড়ে যেত। জেলখানার ওয়ার্ডে তাঁর মতো আরও এক-দেড়শ’ নারী বন্দী ছিল। পাকিস্তানী সেনাদের লক্ষ্য ছিল যুবতীদের ওপর সবচেয়ে বেশি। যাকে পছন্দ হতো তাকেই তুলে নিয়ে যেত। কেউ না যেতে চাইলে বুট দিয়ে লাথি মারত। রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেঠাত। দু’ একজনকে গুলি করেও মেরে ফেলত। সারারাত পাশের একটি খালি ওয়ার্ডে মেয়েদের ওপর চলত পাকিস্তানী সেনাদের পাশবিক নির্যাতন। অসহায় মেয়েদের চিৎকার আজও যেন তাঁর কানে ভেসে আসে। সকালে যখন মেয়েদের আবার আগের ওয়ার্ডে ঢোকানো হতো তখন মনে হতো তার পুরো শরীর রক্তে রাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। বহু নারীকে আবার লাল কাপড় পরিয়ে দেয়া হতো। যাতে রক্ত না দেখা যায়।
পুষ্প রানী দেবনাথ জানান, শুক্রবার রাত পর্যন্ত তাঁর স্বামী জীবিত ছিলেন। শনিবার সকালে বাসায় বসেই তিনি জেলখানার অভ্যন্তর থেকে আসা গুলির শব্দ শুনতে পান। এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে বুক। দৌড়ে ছুটে যান জেলখানার দিকে। কিন্তু কিছু লোকের বাধার কারণে জেলখানা পর্যন্ত যেতে পারেননি। হানাদাররা স্বামীর লাশও তাকে ফেরত দেয়নি। জেলখানার অভ্যন্তরেই কানাইলাল দেবনাথের লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়। হানাদার ও তাদের সহযোগীরা কানাইলাল দেবনাথকে গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি। দোকানপাট থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির সবকিছু লুটপাট করে নেয়। স্বাধীনতা তাঁকে করেছে সর্বস্বহারা।
স্বাধীনতার পরে পেটের তাগিদে পুষ্প রানী দেবনাথ ঘুরে বেরিয়েছেন বনে জঙ্গলে। কুড়িয়েছেন শাকসবজি। মানুষের বাসায় দিনমজুরি করেছেন। দিন কেটেছে না খেয়ে। এভাবে বড় করে তুলেছেন তিন মেয়েকে। তাদের বিয়েও দিয়েছেন দান খয়রাত করে।
এ যন্ত্রণা শুধু পুষ্প রানীর একার নয়। একই পাড়ার যোগমায়া দেবনাথ (৮৩) হারিয়েছেন স্বামী ব্রজবল্লভ নাথ ও দেবর গৌরাঙ্গ নাথকে। আট সন্তানের জননী যোগমায়া দেবনাথকে স্বামী, দেবর ও দেবরের স্ত্রীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার বাহিনীর দোসর এক বিহারীসহ কয়েক বাঙালী সহযোগী। জেলখানার অভ্যন্তরে তিনিও দেখেছেন একই দৃশ্য। নারীদের সম্ভ্রম হারানোর কান্না আজও তাঁকে কাঁদায়। প্রায় প্রতিদিন রাতে শুনতেন গুলির শব্দ। সে শব্দ শুনে অনুমান করে নিতেন নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। স্বামী এবং দেবরকে হত্যা করার পর তাকে পাকিস্তানী সেনারা ছেড়ে দেয়। সেই থেকে বইছেন দুঃসহ কষ্টের বোঝা।
তৎকালীন বরগুনা মহকুমা শহর হানাদার বাহিনী কবলিত হওয়ার পরে অঞ্জলি দেবনাথ তাঁর আট সন্তান নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সঙ্গে স্বামী গৌরাঙ্গ দেবনাথও ছিলেন। পাকবাহিনীর দোসরদের আশ্বাসে গৌরাঙ্গ দেবনাথ বরগুনা শহরে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু পাকজান্তার দোসররা তাদের দেয়া আশ্বাস রক্ষা করেনি। গৌরাঙ্গ দেবনাথকে জেলখানার অভ্যন্তরে গুলি করে হত্যা করা হয়। অঞ্জলি দেবনাথ তাঁর স্বামীর লাশটি শেষবারের মতো একবার চোখের দেখাও দেখতে পাননি। লাশটির ঠাঁই হয়েছিল জেলখানার অভ্যন্তরের গণকবরে।
এ হত্যাকা-ের তিন-চারদিন আগে পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগীরা বরগুনা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় অভিযান চালায়। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আমতলা পাড়া, কর্মকারপট্টি ও নাথপট্টিসহ হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলো। হানাদাররা যাকে যেখানে পেয়েছে, সেখানেই তাকে আটক করেছে। কোমরে রশি পরিয়ে গরু-ছাগলের মতো বেঁধে তাদের জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনার আরও কয়েকদিন আগে পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী শান্তি কমিটির নেতারাসহ অন্যরা এ মর্মে শহরে খবর ছড়িয়ে দেয় যে, হিন্দুরা অনায়াসে শহরে চলে আসতে পারে। তাদের কাউকে কিছু বলা হবে না। বিশেষ করে বর্ণহিন্দু ছাড়া কাউকে হত্যা করা হবে না। শান্তি কমিটিসহ দালালদের আশ্বাসে বহু হিন্দু শহরে নিজ নিজ বাসাবাড়িতে চলে আসে। কেউ কেউ দোকানপাট খুলে বসে। কিন্তু ২৭ মে সকাল থেকে শুরু হয় পাকিস্তানী সেনা ও দালালদের বাঙালী আটক অভিযান। এদিন সকাল থেকে শহরে ছিল প্রচ- বৃষ্টি। অধিকাংশ মানুষ বাড়িঘরে অবস্থান করছিল। বাইরে বের হওয়ার উপায় ছিল না। যে কারণে আটক অভিযানের খবর অধিকাংশ মানুষ জানতে পারেনি। বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগীরা নেমে পড়ে বাঙালী নারী-পুরুষ আটক অভিযানে।
বিকেলের মধ্যে পাকিস্তানী সেনা ও দোসররা শহর থেকে ৫-৬ শ’ নারী-পুরুষকে আটক করে জেলখানায় নিয়ে যায়। আগে থেকে জেলখানায় আরও বেশ কিছু নারী-পুরুষ আটক ছিল। এদিনের আটক অভিযানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ক্যাপ্টেন শাফায়াতসহ চারজন খান সেনা এবং স্থানীয় শীর্ষস্থানীয় কয়েক দালাল নেতৃত্ব দেয়।
এদিন রাতে ৩৬ জন ও পরের রাতে ৪৪ জনকে হত্যার প্রমাণ মিললেও আরও বহু হত্যার কোন প্রমাণ মেলেনি। পরবর্তীতে জেলখানার অভ্যন্তরে আরও অনেক মানুষ হত্যা করা হয়।
জীবনযুদ্ধে লড়াকু সৈনিক আছিয়া
১৬ বছর সংসার করেও স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পদ-টাকাকড়ি থেকে বঞ্চিত আছিয়া বেঁচে থাকার তাগিদে নিরন্তর লড়াই করে আজ স্বাবলম্বী। এখন তিনি ১১ কাঠা জমি, একটি দোকান, চারটি গরু, ইটের দেয়াল দেয়া বাড়ির মালিক। দোকানে বসে খদ্দের সামলানোর পাশাপাশি অবসরে মোবাইলে তুলে রাখা গান শোনেন।
নাটোর শহরের অদূরে ঘোড়াগাছা আমহাটি গ্রামের ১৬ বছরের কিশোরী আছিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছিল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর গ্রামে। স্বামী শফিকুল ইসলাম ছিলেন সেনাসদস্য। স্বামীর সঙ্গে সংসার করেছেন মাত্র ১৬ বছর। ১৯৮৯ সালে আছিয়া বাবার বাড়ি নাটোরে বেড়াতে এসে কপাল পুড়িয়েছেন। একই সময় স্বামী অসুস্থ হয়ে গাজীপুরে নিজ বাড়িতে ফিরে দু’দিনের মাথায় মারা যান। এ দুঃসংবাদটি শ্বশুরবাড়ির লোকজন আছিয়াকে জানায়নি। স্বামীর মৃত্যুর মাসখানেক পর সে খবর তাঁর কানে আসে। খবর পেয়ে পাগলপারা হয়ে ছুটে যান তিনি গাজীপুর। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ফিরে আসেন বাবার বাড়ি নাটোরে। বাবার সম্পত্তির অংশীদার হয়ে পেয়েছেন পাঁচ কাঠা জমি। তাতেই মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। চাকরি সুবাদে স্বামীর পাওনা টাকাকড়ি থেকেও তাঁকে কৌশলে বঞ্চিত করা হয়েছে। নাটোর ফিরে এসে শুরু হয় আছিয়ার বেঁচে থাকার লড়াই। ফের সংসার পেতে নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন আছিয়া। কিন্তু মতলববাজ পুরুষটিকে চিনতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি। ধরা পড়ে বিদায় হয় সে পুরুষটি। এরপর আর সংসারমুখো হননি আছিয়া। জীবনযুদ্ধের শুরুতে নেমেছিলেন শাড়ি-কাপড়ের ব্যবসায়। তাতে দিনভর টো টো করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর কষ্ট পোষায় না। পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে মৌমাছি প্রতিপালন করে মধু বেচে আর কাঁথা সেলাই করে রোজগারের চাকা সচল রেখেছেন। তা থেকে পয়সা জমিয়ে কিনেছেন গাভী। দুধ বিক্রির পয়সায় বাবার দেয়া জমির লাগোয়া আরও ছয় কাঠা জমি কিনে আছিয়া এখন ১১ কাঠার মালিক। শহরের চায়ের স্টলে দুধ বিক্রির অভিজ্ঞতা থেকে বছর সাতেক আগে নিজেই বাড়ির সামনে চালা তুলে চায়ের কেটলি হাতে নেন। গ্রামের চায়ের স্টল। শুধু চা বিক্রি হয় না দেখে পরে বিস্কুট, চানাচুর, চিড়ে-মুড়ির মোয়া, কলা সবই রেখেছেন। নিঃসস্তান আছিয়ার বয়স এখন ৫৭। গরু আর দোকান নিয়ে তাঁর সংসার। গরুর দুধ বেচে আর দোকানের আয় যোগ হয়ে অভাব-অনটন অনেক আগেই তাঁর থেকে দূরে পালিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে তিনি দু’দফায় মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন। তবে বিজয়ের মালা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। তাতে কি? লোকে তো এখন তাঁকে মেম্বার নামেই ডাকে। স্থানীয়রা আছিয়ার নাম ভুলতে বসেছে। বলে মেম্বারের দোকান।

Ñজিএম ইকবাল হাসান,
নাটোর থেকে


মুক্তিযোদ্ধা ক্যাডেট আনোয়ারের কবর স্থানান্তর

৪৩ বছর পর অবশেষে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের দেহাবশেষ নিয়ে আসা হয়েছে শরণখোলা উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেন ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর লাশ দাফন করা হয় উপজেলার উত্তর সাউথখালীর গ্রামের বাড়িতে। কালের পরিবর্তনে বলেশ্বর নদীর করাল গ্রাসে কবরটি বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে কবরটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার শহীদ বীর এ মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ উত্তোলন করে যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকেল ৫টায় উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে দাফন করা হয়।
সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার অবঃ আঃ আজিজ, ফুলমিয়া, ইউসুফ আলী শিকদার, শেখ সামসুর রহমান ও আবু জাফর জব্বার জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট অফিসার হিসেবে চাকরিরত আনোয়ার হোসেন মাতৃভূমির টানে ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি তাঁর নেতৃত্বে একটি মুক্তিবাহিনী দল গঠন করে সুন্দরবনে ক্যাম্প স্থাপন করেন। ১২ জুন বাগেরহাটের শরণখোলায় প্রথম রাজাকার বাহিনী এসে উপজেলা সদর রায়েন্দার থানা ভবনে ক্যাম্প স্থাপন করে এলাকায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীরা রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেন। ১৯৭১ সালের ১১ জুলাই আঞ্চলিক কমান্ডার ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৪৭ জনের একটি মুক্তিবাহিনীর দল রায়েন্দার রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করেন। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে শহীদ হন ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেন, বিমানবাহিনীর সদস্য ইসমাইল হোসেন ও আসমত আলী নামের তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরে সহযোদ্ধারা শুধুমাত্র আনোয়ার হোসেনের লাশ উদ্ধার করতে পেরে রাতের অন্ধকারে তার গ্রামের বাড়ি উত্তর সাউথখালীতে দাফন করেন। কালের বিবর্তনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরটি বলেশ্বর নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম হলে তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন একটি লিখিত আবেদন জানালে স্থানীয় প্রসাশন কবরটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি শহীদের দেহাবশেষ উত্তোলন করে উপজেলা সদর রায়েন্দা পাইলট হাই স্কুল মাঠে রাখা হলে শতশত মুক্তিযোদ্ধা, এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। সেখানেই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে এম মামুন উজ্জামান জানান, লিখিত আবেদন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের দেহাবশেষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরের অন্যান্য শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। এমন এক বীর সন্তানের কবরটি রক্ষা করতে পেরে তিনি নিজেকে গর্বিত মনে করছেন।
Ñবাবুল সরদার, বাগেরহাট