মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৮ জুলাই ২০১১, ২৪ আষাঢ় ১৪১৮
আধুনিক ইস্তাম্বুল
সাজেদ রহমান
৭ মে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় এমিরেটসের বিমানটি ইস্তাম্বুলে কামাল আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁয়ে নিচে নামে। উপর থেকে দেখা মেলে উঁচু-নিচু পাহাড়। পাশে মার্মার সাগরের নীল জল। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রীবর্গ আগে বিমান থেকে নামলেন। তাঁদের জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা করেছিল তুরস্ক সরকার। আমরা বিমান থেকে নেমে বড় বাসে করে রানওয়ে থেকে ভিআইপি লাউঞ্জে গেলাম। সেখান থেকে মাইক্রোবাসে আমরা রওনা হলাম আমাদের হোটেলে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে মাইক্রোবাসে উঠার সময় উত্তরে হিমেল হাওয়া পুরো শরীর ঠাণ্ডা করে দিল। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আমাদের বলা হয়েছিল, এই সময় তাপমাত্রা থাকবে ১৭-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু উত্তরে হাওয়ার কারণে মনে হচ্ছে তাপমাত্রা এখন ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গেছে।
বিমানে বসে মনে হয়েছিল বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টার সময় ইসত্মাম্বুল বিমানবন্দরে নামলে অন্ধকারে কিছু দেখা যাবে না। এ জন্য মনে হচ্ছিল কেন আরও আগে বিমানটি দুবাই বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করল না। কিন্তু নেমে ভুল ভেঙ্গে গেল। ইসত্মাম্বুলের সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য প্রায় ৩ ঘণ্টা। তাই বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় বিমান ইসত্মাম্বুল বিমানবন্দরে নামলেও সেখানে বিকেল মনে হলো। যাই হোক, আমাদের মাইক্রোবাস রওনা হলো তাকসিমের উদ্দেশে। সেখানে হোটেল পয়েন্টে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন তাকসিমের সিলন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। প্রায় পাশাপাশি হোটেল। মার্মার সাগরের পাশ দিয়ে আমাদের মাইক্রোবাস দ্রম্নত গতিতে এগিয়ে চলল। ডান হাতে মর্মর সাগরে শত শত পণ্যবাহী জাহাজ এবং কার্গো চোখে পড়ল। সড়কের বাম পাশে পাহাড় ঘেঁষা সুন্দর সাজানো গোছানো শহর ইসত্মাম্বুল। অধিকাংশ বাড়িঘর একই আকৃতির। অর্থাৎ এক এক এলাকায় বাড়ির বৈশিষ্ট্য একই রকমের। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় রয়েছে ফুলে বাগান। লাল, নীল বেগুনী ফুলে ভরা বড় বড় ফুল গাছ। এক সময় মর্মর সাগর পার হয়ে বসফরাস প্রণালী ডানে রেখে আমরা ইসত্মাম্বুল শহরের তাকসিমে পেঁৗছলাম। এখানে মাইক্রোবাস থেকে নামার পর আর এক দফা হোঁচট খেতে হলো। কারণ প্রচ- বাতাস এবং ঠা-া। যেন মুখের চোয়ালে কেউ বরফখ- ঠেসে ধরে রেখেছে। হোটেলের লবিতে পেঁৗছানোর পর আমাদের জানানো হলো ৪০৫ নম্বর রম্নম আমাদের বরাদ্দ। একই রম্নমে থাকব আমি আর বাসসের বিশেষ প্রতিনিধি ওমর ফারম্নক। লিফটে উঠে ৪ তলায় নামার পর অন্ধকার। মনে হলো বিদু্যত চলে গেছে। কিন্তু আসলে তা নয়, ফ্লোরে পা দিতেই বাতি জ্বলে উঠল। পরে জানলাম, বিদু্যত সাশ্রয়ের জন্য এখানকার প্রতিটি হোটেলে এবং বাসাবাড়িতে লাইট এবং ফ্যানের সঙ্গে সেন্সর লাগানো আছে। তাই হোটেলের ফ্লোরে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইট জ্বলে উঠল। একইভাবে দূরে চলে যাবার পর আবার লাইটগুলো এমনিভাবেই নিভে গেল।
হাটেলে রম্নমে পেঁৗছে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম আধা ঘণ্টার মধ্যে ডলার পরিবর্তনের জন্য। এক লেন পরেই রয়েছে ডলার পরিবর্তনের জন্য একটি হাউস। এক মার্কিন ডলার সমান তুরস্কের দেড় লিরা। তখনই বুঝলাম তুরস্কের অর্থনীতি অনেক মজবুত। না হলে মুদ্রার মান এত শক্তিশালী হয় না। ইন্টারনেটে যদিও আগে তা দেখে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিষয়টি মনে ছিল না। লিরা হাতে পাবার পর খুঁজতে লাগলাম কোথায় বাঙালী খাবার পাওয়া যায়। এ রেসত্মোরাঁ ও রেসত্মোরাঁ ঘুরতে ঘুরতে ক্লানত্ম। কোথাও বাঙালী খাবার দূরের কথা রাসত্মাঘাটে বাংলা ভাষার কোন মানুষ খুঁজে পেলাম না। মনে মনে ভাবলাম-নতুন তো তাই, ঠিকই কাল পাওয়া যাবে। বাঙালী নেই পৃথিবীর এমন শহর কম আছে। বাঙালী রেসত্মোরাঁ না পেয়ে শেষমেশ তাকসিম স্কয়ারের পাশে ম্যাগডোনাল নামের এক রেসত্মোরাঁ ঢুকে পড়লাম। সঙ্গে ওমর ফারম্নক, বাংলাদেশ বেতারের আব্দুস রাজ্জাক ভাইসহ অন্যরা। দেখলাম ইউরোপসহ বিভিন্ন মহাদেশের অনেক মানুষ সেখানে খাবার কিনছে। বার্গারসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি রম্নটি পাওয়া যায় এখানে। নামও হরেক রকম। এগুলো বাঙালীর খাবার নয়, তারপরও পেট মানছে না। আমি এবং বাসসের বিশেষ প্রতিনিধি ওমর ফারম্নক ভাই বসে গেলাম। একটি রম্নটি, কিছু সবজি এবং ১ লিটার ড্রিংকিং ওয়াটার কিনলাম। দাম ১২ লিরা। খাওয়া-দাওয়ার পর বের হলাম সেখান থেকে। পাশে তাকসিম স্কয়ার। সেখানে আলো ঝলমলে পরিবেশ। বহু মানুষ। আধুনিক ইসত্মাম্বুল ইউরোপের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। পরিবেশ, মানুষের চলাফেরা, স্থাপত্য সব কিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া।
তুরস্ক (তুর্কি ভাষায় তুর্কিয়ে), সরকারী নাম প্রজাতন্ত্রী তুরস্ক। পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। তুরস্কের প্রায় পুরোটাই এশীয় অংশে, পর্বতময় আনাতোলিয়া বা এশিয়া মাইনর উপদ্বীপে পড়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা আনাতোলিয়াতেই অবস্থিত। তুরস্কের বাকি অংশের নাম পূর্ব বা তুর্কীয় থ্রাস এবং এটি ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় অবস্থিত। এই অঞ্চলটি উর্বর উঁচু নিচু টিলাপাহাড় নিয়ে গঠিত। এখানে তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইসত্মাম্বুল অবস্থিত। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ তিনটি জলপথ এশীয় ও ইউরোপীয় তুস্ককে পৃথক করেছে। মার্মারা সাগর এবং বসফরাস ও দার্দানেল প্রণালী। এই তিনটি জলপথ একত্রে কৃষ্ণ সাগর থেকে এজীয় সাগরে যাবার একমাত্র পথ তৈরি করেছে। তুরস্ক মোটামুটি চতুর্ভুজাকৃতির। এর পশ্চিমে এজীয় সাগর ও গ্রিস, উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও স্বায়ত্তশাসিত আজারবাইজানি প্রজাতন্ত্র নাখচিভান, পূর্বে ইরান, দক্ষিণে ইরাক, সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর। তুরস্কের রয়েছে বিসত্মৃত উপকূল, যা দেশটির সীমানত্মের তিন-চতুর্থাংশ গঠন করেছে। তুরস্কের ভূমিরূপ বিচিত্র। দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমে আছে উর্বর সমভূমি। পশ্চিমে আছে উঁচু, অনুর্বর মালভূমি। পূর্বে আছে সুউচ্চ পর্বতমালা। দেশের অভ্যনত্মরের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন হলেও ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু মৃদু। ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গমস্থলে অবস্থিত বলে তুরস্কের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিবর্তনে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়েছে। গোটা মানবসভ্যতার ইতিহাসজুড়েই তুরস্ক এশিয়া ও ইউরোপের মানুষদের চলাচলের সেতু হিসেবে কাজ করেছে। নানা বিচিত্র প্রভাবের থেকে তুরস্কের একটি নিজস্ব পরিচয়ের সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে এখানকার স্থাপত্য, চারম্নকলা, সঙ্গীত ও সাহিত্যে। গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও অনেক অতীত ঐতিহ্য ও রীতিনীতি ধরে রাখা হয়েছে। তবে তুরস্ক বর্তমানে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানকার অধিকাংশ লোকের ধর্ম ইসলাম এবং মুখের ভাষা তুর্কি।
বহু শতাব্দী ধরে তুরস্ক ছিল মূলত কৃষিপ্রধান একটি দেশ। বর্তমানে কৃষিখামার তুরস্কের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এবং দেশের শ্রমশক্তির ৩৪% এই কাজে নিয়োজিত। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তুরস্কে শিল্প ও সেবাখাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, বিশেষত অর্থসংস্থান, পরিবহন এবং পেশাদারী ও সরকারী সেবায়। অন্যদিকে কৃষির ভূমিকা হ্রাস পেয়েছে। টেঙ্টাইল ও বস্ত্র শিল্প দেশের রফতানির প্রধান উৎস। অর্থনৈতিক রূপানত্মরের সঙ্গে সঙ্গে নগরায়নের হারও অনেক বেড়েছে। বর্তমানে তুরস্কের ৭৫% জনগণ শহরে বাস করে। ১৯৫০ সালেও মাত্র ২১% শহরে বাস করত। জনসংখ্যার ৯০% তুরস্কের এশীয় অংশে বাস করে। বাকি ১০% ইউরোপীয় অংশে বাস করে।
তুরস্কের ইতিহাস দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। প্রাচীনকাল থেকে বহু বিচিত্র জাতি ও সংস্কৃতির লোক এলাকাটি দখল করেছে। ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এখানে হিটাইটদের বাস ছিল। তাদের সময়েই এখানে প্রথম বড় শহর গড়ে ওঠে। এরপর এখানে ফ্রিজীয়, গ্রিক, পারসিক, রোমান এবং আরবদের আগমন ঘটে। মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কি জাতির লোকেরা ১১শ' শতকে দেশটি দখল করে এবং এখানে সেলজুক রাজবংশের পত্তন করে। তাদের শাসনের মাধ্যমেই এই অঞ্চলের জনগণ তুর্কি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়। ১৩শ' শতকে মোঙ্গলদের আক্রমণে সেলজুক রাজবংশের পতন ঘটে। ১৩ শতকের শেষ দিকে এখানে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। এরা পরবর্তী ৬০০ বছর তুরস্ক শাসন করে এবং আনাতোলিয়া ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার এক বিশাল এলাকাজুড়ে বিসত্মৃতি লাভ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যটির পতন ঘটে।
১৯২৩ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের তুর্কিভাষী এলাকা আনাতোলিয়া ও পূর্ব থ্রাস নিয়ে মুসত্মাফা কেমালের (পরবর্তীতে কামাল আতাতুর্ক) নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৩৮ সালে মৃতু্যর আগ পর্যনত্ম আতাতুর্ক তুরস্কের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তিনি একটি শক্তিশালী, আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্কের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সরকারের মূলনীতিগুলো কেমালবাদ নামে পরিচিত এবং এগুলো পরবর্তী সমসত্ম তুরস্ক সরকারের জন্য নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করেছে। আতাতুর্কের একটি মূলনীতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। তাঁর কট্টর অনুসারীরা মনে করেন ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে ধর্মের স্থান নেই এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মীয় ইসু্য এড়িয়ে চলা উচিত।
১৯৫০-এর দশক থেকে রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকা তুরস্কের একটি বিতর্কিত ইসু্য। তুরস্কের সামরিক বাহিনী নিজেদের কেমালবাদের রক্ষী বলে মনে করে এবং তারা ১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮০ এবং ১৯৯৭ সালে মোট চারবার তুরস্কের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে হসত্মক্ষেপ করেছে।
ইসত্মাম্বুল তুরস্কের অন্যতম প্রধান শহর। এর পুরোনো নাম কনস্টান্টিনোপল। এছাড়া এটি বাইজান্টিয়াম নামে পরিচিত ছিল। এটি পূর্বে উস্ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। ১৪৫৩ সালে এটি তৎকালীন উস্ সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়। তুরস্কের সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির কেন্দ্রস্থলও এটি। ১৯২৩ সাল পর্যনত্ম এখানেই ছিল তুরস্কের রাজধানী। এটি তুরস্কের বৃহত্তম শহর যার জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ।
এত সমৃদ্ধ যে দেশের ইতিহাস, সেই দেশের প্রধান শহর ইসত্মাম্বুলে এসে ঘুরবো না তা কি হয়। প্রথম দিনেই (৭ মে) সন্ধ্যায় রেসত্মোরাঁয় খাবার খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম তাকসিম স্কয়ারে। স্কয়ারের চারপাশে রাসত্মা। ট্রামও চলে। দোকানপাট, হোটেল এবং মার্কেট এই এলাকায় বেশি। ১৯২৮ সালে নির্মিত স্কয়ারের মাঝে রয়েছে ভাস্কর্য। সন্ধ্যার দিকে ছেলেমেয়েরা এই স্কয়ারে বেড়াতে আসে। পাশেই রয়েছে এক ্বড় বাস। বাস মানে মোবাইল দোকান। সন্ধ্যার সময় বাসটি এসে থামে এখানে। নানা ধরনের জিনিস পাওয়া যায় এই মোবাইল দোকানে। শুধু আমরা বাংলাদেশীরা নই, বিদেশীরাও তাকসিম স্কয়ারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। সবার ইচ্ছা থাকেন স্কয়ারের ভাস্কর্যসহ ছবি। আমরাও ছবি তুললাম। ছবি তোলার সময় এক টার্কিস তরম্নণ এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আর ইউ ইন্ডিয়ান? বললাম, নো আই এম বাংলাদেশী। সেই তরম্নণ মুসলিম ব্রাদার্স বলে জড়িয়ে ধরলেন। হুসায়েন আলী নামের ওই তরম্নণ আরও জানতে চাইলেন এই শহরে প্রথম এসেছি কিনা? শহর কেমন লাগছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝলাম এই শহরের মানুষ ইন্ডিয়াকে ভালভাবে চেনেন এবং জানেন। কারণ কয়েক দিন ইসত্মাম্বুলে থাকার সময় দেখেছি, রাসত্মায় অনেকে জিজ্ঞাসা করেছেন আমরা ইন্ডিয়ান কিনা? এ ছাড়া ভারতীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্যিক কারণে ইসত্মাম্বুলে যান। তাকসিম স্কয়ারের পাশে ইসতিকলাল। এই রোডে ইসত্মাম্বুলের বড় বড় দোকান। ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি হয়। আছে খাবারের দোকান, মিষ্টির দোকান। আর সেই পুরনো আমলের ট্রাম। তাকসিম স্কয়ারে ঘুরে ঘুরে রাতে হোটেলে ফিরলাম। রাত তখন ইসত্মাম্বুলের সময় ৯টা। রম্নমে দেখলাম ইসত্মাম্বুলের একটি ম্যাপ রয়েছে। হোটেল কতর্ৃপক্ষ তা দিয়ে গেছে। সেখানে ইসত্মাম্বুুলের দর্শনীয় স্থানের তালিকা এবং তাকসিম থেকে কতদূর তা লেখা রয়েছে।
পরদিন ৮ মে। রবিবার স্থানীয় সময় সাড়ে ৯টার দিকে গেলাম টপকাপি মিউজিয়ামে। সাধারণত এই মিউজিয়াম রমজান মাসে খোলা রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসত্মাম্বুল যাওয়ায় তাঁর সম্মানে ওই মিউজিয়াম খুলে দেয়া হয়। যদিও মিউজিয়ামের অন্য অংশ সারা বছর খোলা থাকে এবং বিশ্বের হাজার হাজার পর্যটক প্রতি বছর ইসত্মাম্বুল গেলে এই মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহরের সঙ্গেই আমরা সেখানে গেলাম। আমাদের স্বাগত জানালেন মিউজিয়ামের পরিচালক প্রফসর ড. ইলবার অটার্লি। এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর ব্যবহৃত পোশাক, চুল, দাড়ি, পায়ের ছাপসহ অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র। কয়েক একর জমির ওপর মিউজিয়ামটি অবস্থিত। ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে এটাকে বিশ্বের গুরম্নত্বপূর্ণ ঐতিহ্য বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। মিউজিয়ামের সঙ্গেই রয়েছে কনএ্যালি রেস্টুরেন্ট। এই রেস্টুরেন্টের একটি অংশ খোলা। পাশেই মার্মার সাগর, নদী এবং ইসত্মাম্বুলের এশিয়া অংশ দেখা যায়। এত বড় মিউজিয়াম মানুষ ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গেলে, কিছু দূর দূর বসার সুন্দর ব্যবস্থা আছে। পুরো একদিন না ঘুরলে সব কিছু দেখা সম্ভব নয়। মিউজিয়ামের ভেতরে রয়েছে নানা ধরনের ফুল। এরমধ্যে টিউলিপ ফুল নজর কাড়ে। কয়েক রঙের টিউলিপ ফুল উপরের দিকে চোখ মেলে যেন তাকিয়ে আছে। রবিবার থাকায় ওই দিন বহু স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে এসেছে মিউজিয়াম দেখতে। তারা ফুল বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। অনেকের সঙ্গে এসেছেন বাবা-মা। (চলবে)
ক্রুজ শিপে গ্রিক দ্বীপপুঞ্জে এক সপ্তাহ
নূরজাহান বোস
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আশ্চর্য_সেদিন খুব সকালে আমাদের জাহাজ নিউইয়র্কে নোঙ্গর করেছিল। সেদিন সব ঝড়, বৃষ্টি থেমে গিয়ে অপূর্ব এক সুর্যোজ্জ্বল দিন বেরিয়ে এলো। আমাদের মন ও সূর্যের আলোর মতোই ঝকঝক করে উঠল। যাক সে পুরনো কথা। এখনি আমাদের ডিনারে যাবার কথা। যাবার আগে স্নান সেরে একটু সেজে-গুজে, আমাদের নির্দিষ্ট টেবিলে গিয়ে বসলাম। টেবিলের অন্য অতিথিদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করলাম, কারণ ইচ্ছা করলে প্রতিদিন ডিনারে আমরা এখানেই খেতে পারি। আসলে এটাই ওদের পছন্দ। আমরা ইচ্ছা করলে অন্য টেবিলেও বসতে পারি যদি জায়গা থাকে। কি অর্ডার দিলাম এখন আর মনে নেই তবে আমরা দু'জনেই 'বেশি ভাজা' তৈলাক্ত খাবারের দিকে গেলাম না।
সারা দিনের ক্লানত্মিতে বিছানায় শোওয়া মাত্র ঘুম। সাতাশ তারিখ ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় গিয়ে চারদিকে তাকাতেই মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। আজ দুপুর বারোটার মধ্যে আমরা আমাদের প্রথম গ্রীক দ্বীপ আমাদের জাহাজ নোঙ্গর করবে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আবার যাত্রা। অঃযবহং ধহফ অপৎড়ঢ়ড়ঃরং-এর জন্য আমরা একটা ৪ ঘণ্টার টু্যর নিলাম। ঊনসত্তর ডলার করে জনপ্রতি। আমাদের টু্যর বাসে করে সিনাগগ এ্যাভিনিউ ধরে ড্রাইভ করে গ্রীসের সবচেয়ে বিখ্যাত অলিম্পিয়ান টেম্পল অব জুস, এই কারনথিয়ান স্টাইলের মন্দিরটি তৈরি করতে সাত শ' বছর লেগেছিল বলে কথিত আছে। পথে পথে দেখলাম ন্যাশনাল গার্ডেনস, ন্যাশনাল লাইব্রেরী, পার্লিয়ামেন্ট ভবন। এক সময় এটা রাজ প্রাসাদ ছিল। তারপর আরও দেখলাম ১৮৯৫ সালের তৈরি প্যানাথিনিয়ান স্টেডিয়াম (চধহধঃযবহরধহ ংঃধফরঁস) যেখানে ১৮৯৬ সালে সর্বপ্রথম আধুনিক অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে আমাদের নামতে দিয়েছিল। এরপর গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ পারথেনন ট্যাম্পল, যা দেবী এথেনাকে উৎসর্গ করেছিল। চারদিকে ভাঙ্গা পাহাড় ও পাথরের ওপর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হচ্ছে। শত শত টু্যরিস্ট এর মধ্যেই উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। অসম্ভব গরম। আমি কয়েক শ' ফুট উঠে ক্লানত্ম হয়ে একটা পাথরে বসে পড়লাম। নেলী আর একটু ওপরে উঠতে চেষ্টা করল। পরে সেও ক্লানত্ম হয়ে আমার কাছেই এলো। এই সময় আমরা আমাদের গ্রম্নপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। বেশ কিছুৰণ বসে অপেৰা করে নিচে নেমে আসি। আমরা কোন প্রকারেই আমাদের বাস মিস করতে চাই না। চারদিকে অসংখ্য টু্যরিস্টদের মধ্যে আমাদের গ্রম্নপকে চিনতে পারছিলাম না। একেবারে নিচে নেমে আসতেই দেখি অনেক বাংলা দেশী ছেলেরা ছাতা ও পানির বোতল বিক্রি করছে। আমাদের দেখে সকলে ছুটে এলো। পানির বোতল কিনলাম। পয়সা নেবে না ওরা ও বিশ্বাস করতে চায় না যে আমরা বাংলাদেশী। নেলীর একটা ক্যামেরা ছিল। ওদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলাম_ লজ্জায় রাজি হলো না। সারাৰণই চারদিকে তাকাচ্ছে পুলিশের ভয়ে। মনে পড়ল মামাত বোন মেরীর ছেলেটাও তো এই রকম কোন এক গ্রীক দ্বীপে পড়ে আছে। মামার ছেলে আছে রোমে। কে জানে ওরা কেমন আছে। ওরা এখানে বসে থাকতে থাকতেই আমাদের দলের সবাইকে পেলাম। সকলেই আইসক্রিম খেলাম। এখানে শপিং-এর জন্য কিছু সময় দিল। দুয়েকটা দোকানে ঘুরে হতাশ হলাম। সবই টু্যরিস্টদের জন্য নানা ধরনের সু্যভেনির। যার প্রায় বেশিরভাগ চীন অথবা ভারতের তৈরি। আমি তখন ভয়ানক ক্লানত্ম। বাসে এসে বসলাম।
ফিরতে পথে ড্রাইভার অনর্গল পথের নানা বিখ্যাত জিনিসের বর্ণনা দিচ্ছিল। আমি প্রাণভরে দেখছিলাম জলপাই গাছের অপূর্ব সুন্দর দেহ বলস্নবী। জলপাইয়ের ভারে ডালগুলো নুয়ে পড়েছে। বাতাসে কেমন এক মাদকতা ভরা সুগন্ধ। এ আমার মনের কল্পনাও হতে পারে। অদূরে আমাদের ঝঢ়ষধহফবৎ ড়ভ ঃযব ংবধ দেখা যাচ্ছে। আনন্দে মন-প্রাণ ভরে গেল। সারা রাত নিশ্ছিদ্র বিশ্রাম ও তৃপ্তিভরে খাওয়া। বাস আর কি চাই এই বয়সে। আগামীকাল আমাদের নিয়ে যাবে মিকোনোস দ্বীপে (সুড়শড়হড়ং) । সকাল সাতটায় শাওয়ার নিয়ে কাপড় পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি আমাদের জাহাজ মিকোনোসে নোঙ্গর করে আছে। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে সারাদিনের জন্য তৈরি হয়ে ছোট বোটে আধঘণ্টায় তীরে নেমে এলাম। মিকোনোস মাত্র তেত্রিশ স্কোয়ার ফিট আয়তন, তার মানে গ্রীক দ্বীপপুঞ্জগুলোর মধ্যে সকলের চেয়ে ছোট। লোকসংখ্যা পাঁচ হাজার, কিন্তু প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ ভ্রমণকারী এই দ্বীপটিতে পদার্পণ করে। এর নাইট ক্লাব অসম্ভব সুন্দর সমুদ্র সৈকত, চমৎকার রেস্টুরেন্ট এবং এর ছোট ছোট অলিগলিতে নানারকম হাতের কাজের কাপড় চোপড় ও সু্যভেনির জাতীয় জিনিসপত্র প্রতিদিন এত ভ্রমণকারী দেশ-বিদেশ থেকে এখানে টেনে আনে।
আমরা দুজন নিজেরাই ঘুরেফিরে শহরটি দেখলাম। হোয়াইট ওয়াশ (সাদা রং করা চার্চ, সাবানের বাঙ্রে মতো বাড়িগুলো ও উইন্ডমিলগুলো সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে। একটু লৰ্য না করলে সহজে এই শহরের অলিগলিতে হারিয়ে যাওয়া সহজ। জলদসু্যদের হাত থেকে রৰার জন্যই এ ধরনের রাসত্মা-ঘাট। ভূমধ্যসাগরীয় প্রায় সব দ্বীপ বা শহরগুলোই এ ধরনের রাসত্মাঘাট। হারাবার ভয় নেই। কারণ ঘুরে ফিরে সুমদ্র পেয়ে যাবেই । আমরা পায়ে হেঁটে শহরের মাঝখানে এসে স্থানীয় বাসে চেপে একটি বীচে চলে এলাম। ঐ বাসে আমাদের জাহাজের অনেক তরম্নণ-তরম্নণী বীচে এলো। নেলী ও আমি বীচে গিয়ে একটু হাঁটলাম। তারপর একটি গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে বিসত্মৃত নীল জলরাশি দেখলাম। আরও দেখলাম_উদ্যাম তারম্নণ্যের প্রাণ মাতানো উলস্নাস। কম বয়সী ছেলেমেয়েরা ঝাঁপিয়ে পড়লো সমুদ্রে। যতোটুকু পারা যায় ভোগ করবে ওরা। মন পড়ছিল আমার ও ঐ বয়সের কথা। বঙ্গোপসাগর পারের মেয়ে। সমুদ্র দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। একদিকে আনন্দ আর একদিকে মনে পড়তো আমার ছোট বেলার কথা, কোথায় হাড়িয়ে গেল। মাঝে মাঝে বিষণ্নতায় মন ছেয়ে যেত। স্বদেশ সমুদ্র, জল ভালবাসা তো না, তবে বাধা দিত না। আমার পছন্দ মতোই প্রতিবছর কোন না কোন বীচে আমরা বেড়াতে যেতাম। বড় মেয়ে মিনি আমারই মতো সমুদ্র ও জল প্রেমিক। অনিদের বাবার মতো বীচে হেঁটে বা জলের দিকে তাকায়, বসে থাকতে ভালবাসতো। পিছনের অনেক কথাই মনে পড়ছে। পড়াই তো স্বাভাবিক। কয়েক ঘণ্টা পরে আমরা বাসে করে শহরে ফিরে এলাম। তখন বিকেল। চারদিকে ডিনার ও চায়ের ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টগুলোর সম্মুখে বাইরে সারি সারি টেবিল-চেয়ার, ন্যাপকিন ও কাঁটা চামক সাজাচ্ছে ওয়েটাররা। আমরা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে সেই ছোট নৌকায় আমাদের জন্য অপেৰা করা ংঢ়ষবহফড়ঁৎ ড়ভ ঃযব ংবধং-এ এসে স্নান করে চা খেয়ে নিজেদের ঘরে বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে নিলাম। এরপরে ডিনার ও নানা রকম আনন্দের আয়োজনে যোগ দিতে হবে। আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় দিন শেষ হলো।
পরের দিন আমাদের ভ্রমণ তালিকায় আছে সেই বিখ্যাত "ক্যাটাকোলোন" বা অলিম্পিয়া। যেখানে প্রাচীনকাল থেকে গ্রীকবাসী প্রতি চার বছর অনত্মর গ্রীক দেবতা জিউস (তবঁং) এর উদ্দেশ্যে খেলা ধরার অংশ নিত। পুরো এলাকাটা এখন ধ্বংশসত্মূ্তুপে পরিণত হয়েছে। তবে এর বিশালত্ব এখনও বিস্ময়কর। এই অলিম্পিয়া থেকেই বর্তমানের অলিম্পিক এর সৃষ্টি।
আমরা দু'জন জাহাজ থেকে নেমে ট্রেন স্টেশনে এসে অপেৰা করছিলাম পরবতর্ী ট্রেনের জন্য কিন্তু বিধি বাম। ট্রেনের চিহ্নও দেখলাম না। অনেকেই হতাশ হয়ে ট্যাঙ্ িভাড়া করে চলে যাচ্ছে। আমরা দু'জন মহিলা সাহস করছিলাম না এইভাবে অচেনা পরিবেশে ট্যাঙ্ িভাড়া করতে চারদিকে নজর করলাম। হঠাৎ দেখলাম দৰিণ আমেরিকা থেকে আগত একটি কমবয়সী দম্পতি ও আমাদের মতো ভাবছিল এই গনত্মব্যে যাবার জন্য। ওদের সঙ্গে কথা বলে আমরা চারজনে একটা ট্যাঙ্ িভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম তামিম পিয়ার উদ্দেশ্যে। চারজনে যাওয়াটা অনেক সসত্মায় ও নিরাপদ। প্রায় দুপুর। পর্যনত্ম রোদ। চারদিক আলোয় আলোয় ভরা। আমরা ঐ তরম্নণ দম্পতির সঙ্গে গল্প করতে করতে অলিম্পিয়াতে চলে এলাম। শত শত ভ্রমণকারী ট্যাঙ্,ি বাস ভাড়াতে এসে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরাও তাই করলাম। আরকোলজিস্টর মতে, খ্রীস্ট জন্মের সাত শ' ছিয়াত্তর বছর আগে এখানে প্রথম এই খেলা শুরম্ন হয়। পাঁচ দিনব্যাপী এই খেলাধুলার সারা গ্রীসের খেলোয়াড়রা এখানে এসে নানারকম প্রতিযোগিতায় যোগ দিত। প্রথম দিকে শুধু গ্রীসের পুরম্নষরা এতে যোগ দিতে পারে। পরে রোমানদেরও অংশ নিতে দিত। এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে দৌড়ানো, কুসত্মি, ঘোরদৌড়, লাফ দেয়া। ডিসকাস নিৰেপ এবং আরও নানারকম খেলা এর অংশ ছিল। (চলবে)
গুড মর্নিং অস্ট্রেলিয়া গুড মর্নিং পার্থ
মাহফুজুর রহমান
(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাতে অফিসিয়াল ডিনার। আমাদের অন্য কোথাও একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া হবে। সন্ধ্যা সাতটায় হোটেলের লবিতে থাকতে হবে আমাদের। আমরা ঠিক সাতটায় পৌঁছে দেখি, কেউ নেই। অর্থাৎ পুরো দল আমাদের রেখে চলে গেছে। এরও পাঁচ মিনিট পর মিয়ানমার থেকে আসা দু'জন লবিতে এলেন। তাঁরা কাউকে না দেখে হতাশ। এ ব্যাপারে রব উদ্যোগী ভূমিকা নিল। সে আবারও রম্নমে গিয়ে অফিসিয়াল ডিনারের দাওয়াতপত্রটি এনে দেখাল হোটেলের হেল্প ডেস্কের লোকজনকে। তারা আঙুল উঁচিয়ে মাঠের ওপাশের একটি রেস্টুরেন্ট দেখিয়ে দিল। মিনিট পাঁচেক হেঁটে আমরা পেঁৗছে গেলাম সেখানে। আয়েজকরা আমাদের আসতে দেখে একটু লজ্জা পেলেন এবং অনেকটা সময় আমাদের ঘিরে হৈচৈ করলেন যাতে আমাদের ফেলে আসার দুঃখটুকু আমরা ভুলে যাই।
ডিনারে নরম-গরম পানীয়ের পাশাপাশি নানা রকম খাবার নিয়ে ঘুর ঘুর করছিলেন ভদ্র মহিলারা। গরম্নর গোশতের সমুচা এলো প্রথমেই। অস্ট্রেলিয়ার সর্বত্রই এটি জনপ্রিয় খাবার এবং সমুচা নামেই পরিচিত বলে জানাল কাইলী। শূকরের মাংস, ক্যাঙ্গারম্নর মাংস, নানারকম সামুদ্রিক মাছ, ডেম_ ইত্যাদি দিয়ে বানানো চমৎকারসব খাবার পরিবেশিত হলো। ক্যাঙ্গারম্ন খাবার খুব শখ হয়েছিল আমার। পরিবেশনকারী ভদ্র মহিলার কাছে জানতে চাইলাম, ক্যাঙ্গারম্ন হালাল নাকি হারাম ? তিনি হাসতে হাসতে জানালেন যে সম্ভবত ক্যাঙ্গারম্ন হারাম। কারণ, মুসলমান কাউকে তিনি খেতে দেখেননি। অগত্যা আমার আর ক্যাঙ্গারম্ন খাওয়া হলো না।
একদিন বিকেলে পার্থ সিটি ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। আমরা দলবেঁধে দুটো বিলাসবহুল মিনিবাসে যাচ্ছি পার্থ। আমার পাশের সিটে আছে ব্রম্ননাই থেকে আসা লাবাও। আর সামনের সিটে আছে ফিলিপিন্সের সদা হাস্যোজ্জ্বল উইনী।
জম্পেস আড্ডা দিতে দিতে আমরা যাচ্ছি। আমাদের বাসে ড্রাইভার ছাড়া আর সবাই অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে আগত। আমি ইতোমধ্যে কিছুটা ঘোরাঘুরি করেছি বলে শহরের বেশ কিছু স্থাপনা চিনে ফেলেছি। বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি গাইডের দায়িত্ব পালন শুরম্ন করে দিলাম। লেডিস এ্যান্ড জেন্টেলম্যান, গুড আফটারনুন। ওয়েলকাম টু আওয়ার টু্যর টুয়ার্ডস পার্থ সিটি। ইটস এ বিউটিফুল সিটি এ্যান্ড ইউ লাইক ইট।
আমার গাইডগিরি দেখে সবাই হাসছে। প্রথমেই বর্ণনা দিলাম আমাদের ছেড়ে আসা হোটেল এসপস্নানেডের। রম্নমে রেখে দেয়া হোটেল বিষয়ক মুদ্রিত পুসত্মিকা থেকে অর্জিত জ্ঞান অবলীলায় আওড়ে গেলাম। এরমধ্যে ফ্রিম্যান্টাল প্রিজন এসে গেল। এবার শুরম্ন করলাম ঐতিহাসিক এ জেলখানা সম্পর্কে বক্তব্য। একদম তথ্য বহুল, ঝরঝরে। এটি পার হবার পর আর কিছু চিনি না এতে আর কী এসে যায়। রাসত্মার পাশের সাইনবোর্ড দেখে অনুমানে এসবের বর্ণনা দিয়ে গেলাম। সবাই আমার দুষ্টুিম বুঝতে পারলেও তারা তা এনজয় করল।
পার্থ শহরের বিভিন্ন স্থাপনা, সোয়ান নদীর সৌন্দর্য এবং সারি সারি উঁচু দালানের শহর প্রদর্শনের পর একটি মাঠের পাশে আমাদের গাড়ি থামল। উল্টোদিকের রাসত্মা দেখিয়ে ওরা বলল, এখানে অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা যেন পছন্দমতো খাবার খেয়ে সাড়ে ৯টার মধ্যে বাসের কাছে আসি।
আমরা দলবেঁধে খাদ্যের খোঁজে হাঁটছি, পছন্দমতো খাবার পাচ্ছি না। অনেকটা রাসত্মা যাওয়ার পর একটা ফুড কোর্টের দেখা মিলল। এখানে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের খাবার দিয়ে পসরা সাজিয়েছে দোকানিরা। ফুড কোর্টের শেষ প্রানত্মে একটি ভারতীয় খাদ্যের দোকান। আমি খুশি হয়ে ভাবলাম, এবার হয়ত কিছুটা পরিচিত খাবার পাওয়া যাবে। কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম, এর সেলস গার্লও ভারতীয়। আমি অত্যনত্ম খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আর ইউ ইন্ডিয়ান ? মেয়েটি সুন্দর করে হেসে জবাব দিল, নো স্যার। আই অ্যাম বাংলাদেশী।
খুশিতে আমরা আত্মহারা। আমি রীতিমতো লম্ফঝম্প শুরম্ন করে দিলাম। বললাম, ধুর মেয়ে, চার-পাঁচদিন ধরে পেট ভরে খেতে পাচ্ছি না, আর তুমি দোকান খুলে বসছ এতদূরে। মেয়েটিও অবাক। ওর নাম কার্জিন। পার্থ শহরে মোট ১৫৫ বাংলাদেশী থাকে, ও তাদের একজন। বাড়ি ঠাকুরগাঁও শহরে। কার্টিন ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ করছে মেয়েটি। আর পার্ট টাইম করছে এখানে। (চলবে)