মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন যাঁর সংগ্রাম ছিল আপোসহীন
এনামুল হক
‘রাজপথ দখল’ বিক্ষোভ-আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন ধারণা। এই ধারণার উৎপত্তি ও প্রয়োগ প্রথম হয় স্পেনের মাদ্রিদে ২০১০ সালে। অচিরেই সেই আন্দোলন মাদ্রিদ থেকে সিডনি, জেরুজালেম থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াল স্ট্রিট দখলের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রায় এক হাজার নগরী ও ৮২টি দেশে এমন আন্দোলন গড়ে ওঠে। অনেকেই, এমনকি আন্দোলনকারীদেরও সিংহভাগ হয়ত জানে না যে, রাজপথ দখল আন্দোলনের উৎপত্তির পেছনে প্রেরণা যুগিয়েছিল একটি পুস্তিকা- ‘ইনডিগনেস ভউস’। এর রচয়িতা স্টিফেন হেসেল, যিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাৎসিবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই স্টিফেন হেসেল গত ২৬ এপ্রিল প্যারিসে লোকান্তরিত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ জীবনের অধিকারী ছিলেন হেসেল। জন্ম ১৯১৭ সালে জার্মানির বার্লিনে। ৭ বছর বয়সে প্যারিসে যান। সেখানে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক হন। ১৯৩৭ সালে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পান। চার বছর পর জেনারেল দ্য গলের সঙ্গে যোগ দেন এবং ফরাসী প্রতিরোধ আন্দোলনে নাম লেখান। ১৯৪৪ সালে গেস্টাপোর হাতে ধরা পড়ে ঠাঁই হয় বন্দীশিবিরে। সেখানে যে ৬ ব্যক্তি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান হেসেল ছিলেন তাদের অন্যতম।
যুদ্ধোত্তর ফ্রান্সকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় প্রতিরোধ কাউন্সিলের সদস্য হিসাবে হেসেল জাতিসংঘে পেশাদার কূটনীতিকের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। সেখানে তিনি সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার খসড়া প্রণয়নে অংশ নেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি পিয়ের মেন্দেস ফ্রান্সের পক্ষে কাজ করেন, যিনি আজও ফরাসী বামপন্থীদের কাছে নৈতিক প্রেরণার প্রোজ্বল উৎস। হেসেলকে সায়গনে পাঠানো হয়। তারপর আলজিয়ার্সে। সত্তর ও আশির দশকের পুরো অধ্যায়ে তিনি বেশ ক’জন মন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অনুশীলনের ওপর তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন। তবে ২০১০ সালে তাঁর ‘ইনডিগনেস ভউস’ পুস্তিকাটি ছাপা হলে তার রাজনৈতিক রচনাবলীর প্রতি বিশ্বজুড়ে প্রবল আগ্রহের সঞ্চার হয়। পুস্তিকাটির ইংরেজী অনুবাদের নামটি হলো ‘টাইম ফর আউটরেজ’। ৩৪টি ভাষায় অনূদিত এ বইটির ৪০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। স্পেনে এই বইটি বাজারে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে ‘ইনডিগনাডোস’ নামে এক আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা নগরীর কেন্দ্রস্থলে মাদ্রিদ স্কয়ার দখল করে নেয়। ঐ ছিল শুরু। সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটানোর জন্য হেসেলের আহ্বান শেষ পর্যন্ত বিশ্বজনীন পরিসরে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
২০০৬ সালে ফরাসী পত্রিকা লিবারেশনের সঙ্গে সাক্ষাতকারের এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ‘আপনার শোনা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপদেশটি কি?’ হেসেলের জবাব ছিল : ‘মা একবার আমাকে বলেছিলেন ‘তোমাকে সুখী হওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। এটাই হলো সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ যা তুমি অন্যদের প্রতি করতে পার।’ তাঁকে আরেক প্রশ্ন করা হয়েছিল: ‘আপনি কী হারাচ্ছেন?’ হেসেল জবাব দিয়েছিলেন : ‘আমি সৌভাগ্যবান। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো আমি হারাইনি। যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের সবার চেহারা এবং যত কবিতা পড়েছি সবই মনে আছে। বিভিন্ন ভাষায় এক শ’টি কবিতা আমার কণ্ঠস্থ এবং আমি আপনমনে সেগুলো আবৃত্তি করে শুনি।’
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইউরোপ একজন অসাধারণ ইউরোপীয়কে এবং ফ্রান্স এক অতি প্রিয় সন্তান, কবি এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার এক অকুতোভয় যোদ্ধাকে হারাল।
সূত্র : গার্ডিয়ান
কেনিয়া আজ কোন্ পথে
গত ৪ মার্চ আফ্রিকান রাষ্ট্র কেনিয়ায় নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট, সিনেটর, কাউন্টি গবর্নর এবং ২৯০টি নির্বাচনী এলাকার পার্লামেন্ট সদস্যকে বেছে নেয়া হয়েছে। নয়া সংবিধানের অধীনে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত এটাই প্রথম নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে দেশটি নতুন প্রজন্মের নেতাদের নির্বাচিত করল। সর্বশেষ ভোট গণনা অনুযায়ী উপপ্রধানমন্ত্রী উহুরু কেনিয়াত্তা দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
কেনিয়ায় নতুন ‘প্রজন্মের নেতা’ নির্বাচন কথাটা এ জন্য বলা হলো যে, এই প্রার্থীদের কারোরই উপনিবেশবাদ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতা নেই। এমন নেতৃবৃন্দই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশ চালাবে। তবে এতে কিছু ঝুঁকিও আছে। ঔপনিবেশিক শাসনের জোয়াল কাকে বলে এবং সাম্রাজ্যবাদ সূক্ষ্ম ফাঁদ পেতে কিভাবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে সেই বিষয়গুলো নয়া নেতৃবৃন্দ তেমন আমলে নাও নিতে পারেন এবং সে কারণেই এর পরিণতি হতে পারে বিপর্যয়কর।
বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মওয়াই কিবাকি হচ্ছেন সেই প্রজন্মের শেষ মানুষটি যারা দেশের স্বাধীনতা এনেছিলেন এবং যাদের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রাম নিহায়ত সেøাগান ছিল না, তার চেয়ে বেশি কিছু ছিল। তাঁরা রাজপথে রক্ত ঝরতে দেখেছেন। ব্যাপক হারে গ্রেফতার হতে দেখেছেন, নির্বিচার হত্যাকা- দেখেছেন। ফার্স্টলেডি কিবাকি নিজেও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। নিজেদের যা-ই সীমাবদ্ধতা থাক না কেন এখনও তাঁরা কেনিয়ার সাধারণ মানুষের বীরত্বপূর্ণ কর্মকা- ও আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ করে আছেন। তাঁরা মর্মে মর্মে জানেন যে, জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্যই কেনিয়ার স্বাধীনতা সম্ভব করে তুলেছিল।
নতুন প্রজন্মের নেতারা ঔপনিবেশিক শাসনের দুঃসহ স্মৃতির দ্বারা ভারাক্রান্ত নন। প্রতিরোধ-যুদ্ধের বিজয়ানন্দও তাদের রোমাঞ্চিত করে না। এর ফলে তারা পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিতে পারেন; তবে সেই সঙ্গে ঝুঁকিও কিছুমাত্র কম নয়। কারণ তারা সহজেই পাশ্চাত্যের কর্পোরেট জগতের ফাঁদে পা দিতে পারেন। মনে রাখা দরকার কেনিয়া, এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতে তেল উৎপাদন করার পর্যায়ে এসেছে এবং পাশ্চাত্যের তেল কোম্পানিগুলো এই ব্যবসায়ে ভাগ বসানোর জন্য লাইন ধরে আছে।
সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করলেও কেনিয়ার সমাজে হানাহানি ও সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েছে। এর একটা বড় কারণ হলো, সমস্যা মোকাবিলার বাহন হিসাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকশিত হতে দেয়া হয়নি বা বিকশিত হয়নি। ফলে সমাজে উত্তেজনা বা টানাপোড়েন নিরসন হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। সামাজিক উত্তেজনার প্রকটতম প্রতিফলন হয় নির্বাচনের সময়। তখন সহিংসতায় বহুলোক মারা যায়। দৃষ্টান্ত হিসেবে ২০০৭ সালের নির্বাচনী সহিংসতার কথা বলা যেতে পারে। আজ যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন সেই উহুরু কেনিয়াত্তার নামে হেগের আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে মামলা আছে যে, ২০০৭ সালের নির্বাচনী দাঙ্গায় সহস্রাধিক লোকের মৃত্যুর জন্য তিনিও কম দায়ী নন।
কেনিয়ার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার জন্য রাজনৈতিক শ্রেণীই দায়ী। এখানে সুষ্ঠুভিত্তিক কোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটেনি। যেগুলো আছে সেগুলো সবই কাগুজে রাজনৈতিক দল- দল না বলে এগুলোকে অঞ্চলভিত্তিক মাফিয়া গোষ্ঠীই বলা যেতে পারে, যেগুলো গডফাদারের অধীনে চলে। কেনিয়া এদের কাছে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। পাশ্চাত্যের কর্পোরেট জগতের ঘুষ সংস্কৃতির তারা যে সহজ শিকার হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

চলমান ডেস্ক
সন্ত্রাসের হিংস্রতায় ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তান
এক আত্মঘাতী বিনাশের পথে চলেছে পাকিস্তান। একদিকে তালেবানী সন্ত্রাস, অন্যদিকে শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক হত্যাকা-, গোষ্ঠীগত সহিংসতা, লণ্ড ভণ্ড অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন স্ফীতি, জ্বালানি সঙ্কট- সবকিছু মিলে চারদিক থেকে এক নিকষ কালো অন্ধকার গ্রাস করতে চলেছে দেশটিকে। বোমাবাজি আর রক্তক্ষয়ী হানাহানিতে পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র করাচীর জীবনযাত্রা স্থবির। সর্বশেষ সহিংসতায় সেখানকার শিয়া-অধ্যুষিত এলাকায় গাড়িবোমা বিস্ফোরণে ৪৫ জন নিহত হয়েছে।
পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত সহিংসতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সহিংসতা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে হলেও সুন্নিদের উপশাখা বেরেলভী ও দেওবন্দীদের মধ্যেও বাড়ছে। শিয়া-সুন্নি সংঘাত যেরূপ ঘন ঘন হচ্ছে এবং এর নিষ্ঠুরতা যেভাবে বাড়ছে তাতে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে একটি গবেষণাপত্রে মন্তব্য করা হয়েছে। ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর দেশ পাকিস্তান। এই সংঘাত সৌদি আরব ও ইরানকেও এক বৃহত্তর আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে টেনে আনতে পারে।
বর্তমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নতুন করে বিস্ফোরণের কারণ হচ্ছে ২০০১-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পাকিস্তানী তালেবানদের উত্থান এবং লস্কর-ই-জাঙ্গভির মতো জঙ্গী সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক। এর পরিণতিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে এবং উত্তরোত্তর এর টার্গেট হচ্ছে বেলুচিস্তানের সংখ্যালঘু হাজারা এবং করাচীর শিয়ারা। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে সরকারের নানা ব্যর্থতার কারণে। সরকার জঙ্গী গ্রুপগুলোকে দমন করতে, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হিংসার বিষবাষ্প ছড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে, বিচার ব্যবস্থা উন্নত করে তুলতে এবং মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটেছে যে, পাকিস্তানের নাজুক নিরাপত্তা আরও বেশি বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের রাজনীতিও আজ সাম্প্রদায়িক লাইনে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক বিভাজনটা এমন যে, সহিংসতার যৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। সাম্প্রদায়িক দলগুলো এমন মনগড়াভাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যা হাজির করে যে, একই ধর্মের ভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা সমর্থিত হয়। ইতোমধ্যে তা করাচী, লাহোর, কোয়েটা, গিলগিট, ডেরাইসমাইল খানের রাজপথে ঘোষিত হতে দেখা গেছে।
এদিকে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতীয় এলাকার তালেবানদের দিক থেকে শান্তি আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রদর্শিত হলেও বাস্তবে সে আলোচনা কয়েক বছরের সংঘাত অবসানের কতটুকু সহায়ক হবে সে ব্যাপারে সন্দিহান পর্যবেক্ষক মহল। গত ১২ বছরে ৩০ হাজার বেসামরিক ব্যক্তি ও ৪ হাজার সৈন্য পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। এসব হামলার অধিকাংশই ছিল তালেবানদের। নিহতদের স্বজনরা এবং আহতদের অনেকেই এই শান্তি আলোচনার সম্ভাবনায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তালেবানী বোমা হামলায় একটি পা হারিয়েও প্রাণে বেঁচে যাওয়া ১৪ বছরের কিশোর হযরতউল্লাহ খানকে তাই সক্রোধে বলতে শোনা গেছে, ওদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা উচিত। ওরা আমাদের শরীরের মাংস নিয়ে টুকরে টুকরো করে কাটছে। পেশোয়ার, লাহোর, করাচী, কোয়েটা ও উপজাতীয় এলাকায় তালেবানী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এই শান্তি আলোচনার ব্যাপারে একই রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা গেছে।
ওদিকে জমিয়তে উলেমায়ে ইসলাম (এফ) আহূত সর্বদলীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো পাকিস্তানী তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গ্রান্ড উপজাতীয় জিরগাকে প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারে একমত হয়েছে। তথাপি তালেবানরা সত্যি সত্যি শান্তি চায় কিনা, নাকি তারা নতুন করে সংগঠিত হবার জন্য এভাবে সময় নিচ্ছে সে ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দিহান। তাছাড়া পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এমন আলোচনার সমর্থন করে কিনা সেটাও পরিষ্কার নয়।
চলমান ডেস্ক
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে ওবামা কতদূর যেতে পারেন
পুনর্নির্বাচিত হবার পর থেকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিশাপ মোকাবিলার বিষয়টিকে নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করে আসছেন। অভিষেক অনুষ্ঠানের ভাষণে তিনি বলেছেন যে, দাবানলের খা-বদাহন, সর্বনাশা খরা ও প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের বিধ্বংসী প্রভাবকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। ওবামা তাঁর এই নীতি নির্ধারণী ভাষণে অন্যান্য বিষয়ের ওপর যতটুকু যা বলেছেন, এ প্রসঙ্গে বলেছেন তারচেয়ে বেশি।
মানুষের কর্মকা- জলবায়ুর ওপর কি বিরূপ প্রভাব ফেলছে প্রেসিডেন্ট ওবামা তা সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছেন বলেই গত বছর মোটরগাড়ির জ্বালানির মান নাটকীয়ভাবে কঠোর করে তুলেছেন যাতে কার্বন নিঃসরণ কমে। এটা একটা বড় ধরনের পদক্ষেপ, যার বিরাট সুফল শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে- যদিও তাতে সময় লাগবে। কিন্তু ওবামা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সত্যি কতটা আন্তরিক তা যাচাই করার আরও একটা ক্ষেত্র আছে- তাহলো কয়লাচালিত বিদ্যুতকেন্দ্র। এসব কেন্দ্র যদি তিনি কার্যকর অর্থে চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারেন তাহলেই এ ব্যাপারে তার পূর্ণ আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যাবে। কারণ কার্বন নির্গমনের সবচাইতে বড় উৎসগুলোর একটি হলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র। কিন্তু সেগুলো একেবারে বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি কোন সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন কি না তা এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে ওবামা বলেছিলেন যে, ‘কংগ্রেস যদি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষার ব্যাপারে শীঘ্রই পদক্ষেপ না নেয় আমি নেব এবং সেকথা আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে দিতে চাই।’ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কীস্টোন পাইপলাইন বাতিলের দাবিতে গত মাসে ওয়াশিংটনে হাজার হাজার লোক বিক্ষোভ করে। সংগঠকদের দাবি অনুযায়ী জলবায়ু ইস্যুতে এত বড় বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রে আর হয়নি। কীস্টোন পাইপলাইন দিয়ে কানাডার এলবার্টা থেকে টারস্যান্ড টেক্সাসে তেল আহরণের জন্য আনা হবে। পরিবেশবাদীদের বক্তব্য, টারস্যান্ড থেকে তেল আহরণের প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুম-লে গিয়ে মেশে। সুতরাং এই প্রকল্প বাতিল করতে হবে। এই পাইপলাইন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ওবামার সিদ্ধান্তটা এখনও ঝুলে আছে।
বিজ্ঞানীদের বক্তব্য হলো, শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। কারণ সে সময় থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন হয় তার ৪০ শতাংশ হয় বিদ্যুতকেন্দ্রগুলো থেকে। বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর মধ্যেও আবার অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে কয়লাভিত্তিক স্থাপনাগুলোর কার্বন নিগর্মন সবচেয়ে বেশি। যেমন প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদনে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন হয় কয়লার ক্ষেত্রে হয় দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রাকৃতিক গ্যাস সস্তা বলেই অনেক স্থাপনা গ্যাস ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে। দশ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুতের অর্ধেক আসত কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে; আর এক-পঞ্চমাংশেরও কম আসত গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে। গত বছর ৩৭ শতাংশ বিদ্যুত কয়লা দিয়ে এবং প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস দিয়ে উৎপন্ন হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা ক্রান্তিকালীন পদক্ষেপ চলছে। সেই পদক্ষেপকে ত্বরান্বিত করে কার্বন নির্গমন হ্রাস করার সুযোগ ওবামার রয়েছে। এ ব্যাপারে রিপাবলিকান প্রাধান্যপুষ্ট বৈরী প্রতিনিধি পরিষদের কিংবা ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগুরু নার্ভাস সিনেটকে মোকাবিলা করার প্রয়োজন নেই। ওবামা এ ব্যাপারে কতটুকু কি করেন সেটাই এখন দেখা বাকি।
চলমান ডেস্ক
আরব বসন্ত ॥ বিপ্লব না বিদ্রোহ
মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তল্লাটজুড়ে চলমান আরব বসন্তের শুরু থেকে একটা বিতর্ক চলছে সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে। তা হলো এই সমাজিক আন্দোলনকে কি বিদ্রোহ বলা যাবে, নাকি বিপ্লব। ইতোমধ্যে গণআন্দোলনের উত্তাল জোয়ারে তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়ায় উৎখাত হয়েছে স্বৈরাচারী শাসকরা। সিরিয়ার সঙ্কট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। উপসাগরের ছোট দেশগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা চলছে। এ অবস্থায় চলমান আরব বসন্তকে কি বলে আখ্যায়িত করা যাবে, তা নিয়ে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিপ্লব হলো ছোটখাট পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলন, এর স্থায়িত্বকাল অল্প এবং ফল বয়ে আনে সীমিত। অন্যদিকে বিপ্লব হলো বৃহত্তর পরিসরের সামাজিক গণআন্দোলন। এটা এমন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় যা প্রচলিত সমাজ বাস্তবতায় একটা মৌলিক পরিবর্তন বা সংস্কার নিয়ে আসে। তবে বিদ্রোহ ও বিপ্লব দুটো ক্ষেত্রেই সহিংসতা বা উগ্র বলপ্রয়োগের ব্যাপারটা কমবেশি জড়িত থাকে।
এই আলোকে এখন আরব দেশগুলোর বসন্ত আন্দোলনকে দেখা যাক। বিশেষ করে দৃষ্টিনিক্ষেপ করা যাক তিউনিয়া, মিসর ও লিবিয়ায়- যেখানে কিছু না কিছু হলেও পরিবর্তন এসেছে। যেমন সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে; স্বৈরাচারী শাসনের বিদায় ঘটেছে এবং সে জায়গায় এসেছে বা আসার পথে আছে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিউনিসিয়া ও মিসরে ক্ষমতায় এসেছে ইসলামপন্থী মৌলবাদী দল; যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শরিয়তী সমাজ কায়েম।
তিউনিসিয়ায় ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সবজি বিক্রেতার শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর দু’সপ্তাহ পর মিসর গণবিদ্রোহে প্রকম্পিত হয়। সেখানে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন শুরু হয়েছিল অন্ন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের সেøাগান তুলে। তবে কালক্রমে এর সঙ্গে সব ধরনের ঐতিহাসিক, আদর্শিক ও ধর্মীয় উপাদান এসে যুক্ত হয়েছিল। একই ব্যাপার ঘটে তিউনিসিয়ায়। অচিরেই এই গণবিদ্রোহের জোয়ার গোটা আরব জাহানে ছড়িয়ে পড়ে। লিবিয়ায় গণঅভ্যুত্থানে ন্যাটো সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সিরিয়ায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে শেষের দুটো দেশে তিউনিসিয়া ও লিবিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
অর্থাৎ আরব বসন্ত এসব দেশে অভিন্ন চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারেনি। কেউ এর মধ্যে নব্য সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি খুঁজে পেয়েছেন; কেউ পেয়েছেন প্যান-আরব ও প্যান-ইসলামী ভাবধারার উত্থান। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শিবিরে বিভক্ত হয়েছে আরব বসন্ত। আরব দেশগুলো যে যার পথে অগ্রসর হয়েছে। কেউ বিশেষ এক ধরনের গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। কেউ বেছে নিয়েছে অন্য ধরনের গণতন্ত্রের পথ। আবার অন্যরা সবাই সবার বিরুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যুদ্ধ হিসাবে দেখেছে একে। এমনও হয়েছে যে, আরব বসন্ত আঞ্চলিক ব্যাপারে নাক গলানোর ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপের আরব মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং বিপ্লবের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে আরব বসন্ত পুরনো ব্যবস্থায় নতুন কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। অতীতের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছেদ ঘটাতে পারেনি। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, তিউনিসিয়া ও মিসরে সত্যিকারের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এই দু’দেশে শাসকদের উৎখাত করা হয়েছে বটে। কিন্তু শাসন বা সমাজ ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে আন্দোলনকারীরা যেসব সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল সেগুলো কোথাও চোখে পড়ছে না। সহিংসতা ব্যবহারের ব্যাপারে তিউনিসিয়ায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল কিন্তু মিসরের মতো অত হিংসাশ্রয়ী ছিল না। মিসরের সবকিছু বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত। লিবিয়ার পরিস্থিতি প্রথমদিকে মিসরের মতো ছিল। পরে বদলে যায়। গাদ্দাফি ক্ষমতা ছাড়েননি বরং বিক্ষোভ দমনে হিংসাত্মক পথে দমন অভিযান শুরু করেন এবং দেশে প্রচ- গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। অর্থাৎ লিবিয়ায় সামাজিক আন্দোলন ও সহিংসতা দুটোই ঘটেছে। বাহরাইনেও ব্যাপক বিক্ষোভ-আন্দোলন হয়েছে। সিরিয়ায় তো রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে।
কিন্তু কোথাও শক্তিশালী আদর্শ ও শ্রেণীচেতনা আন্দোলনের চালিকাশক্তি হতে পারেনি। সবখানেই জনগণ শাসকদের বিশেষত স্বৈরাচারী শাসক ও তার সরকারের বিরুদ্ধে লড়েছে- রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সমাজ কাঠামোর বিরুদ্ধে নয়। সব জায়গায় প্রচলিত ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে। এর গায়ে সামান্যতম আঁচড় লাগেনি।
সুতরাং আরব বসন্ত বিপ্লব নয়, কয়েকদফা গণবিদ্রোহ মাত্র। আরব বসন্ত একটা জাগরণের নাম। সেই জাগরণ চেতনার রাজ্যে। এটাই আরব বসন্তের এক মস্ত ইতিবাচক দিক। সেই চেতনা রাজনীতিগতভাবে যত শাণিত হবে এবং সুগঠিত রূপ নেবে ততই তা বিপ্লবের সম্ভাবনায় অগ্নিগর্ভ হবে।