মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৩, ২৮ আষাঢ় ১৪২০
ব্যাঙরা
মূল : মো ইয়ান
অনুবাদ : হারুনুর রশিদ
মো ইয়ানের সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস ফ্রগস। যাতে তিনি চীনের একসন্তান নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। যাতে উঠে এসেছে গর্ভপাতের নিষ্ঠুরতা। যার জন্য সরকারের অবৈধ আইন অনেকটাই দায়ী। এ অন্যায় গর্ভপাতের কারণে প্রতিবছর চীনে লাখ লাখ নবজাতককে হত্যা করা হয়। এ উপন্যাসের সারাংশ জার্মানের স্পাইজেল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর ইংরেজী অনুবাদ করেছেন হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ফুপুর বিয়ের বিরোধী। প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। বাবা, ভাই ও ভাবীরা সবাই ব্যাপারটা জানত। স্বভাবতই বিষয়টা আমাদের মতবিরোধ সৃষ্টি করার মতো। আমরা বয়সে ছোট হলেও ফুপুর বড় খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। ওয়াঙ শিয়াওতের সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক পরিবারের জন্য ছিল এক ধরনের গর্ব। ইয়াং লিন তার পরবর্তী বড়। কিন্তু ওয়াঙ-এর তুলনায় ফুপুর সাথে তাকে মানায়নি। তিনি এক জন চাকুরে। বিবাহে তার চাকরিকে যোগত্যা হিসেবে প্রাধান্য দেয়া হয়। ফুপু কুয়ানকে ও বিয়ে করতে পারত। কিন্তু ফুপু কুয়ানকে অপমান করেছে। কুয়ান হয় তো হাওশের তুলনায় ভালো হতো। এরপর ভাবলাম; তিনি হয় তো কোনো বয়স্ক পুরুষে আলোড়িত হবেন। আর একটা যথার্থ পরিকল্পনা; তৈরি করলাম। এমন কি আলোচনা ও করলাম; শেষ বয়সে কে তার প্রকৃত স্বামী হতে পারে ?
কিন্তু কোন পূর্ব লক্ষণ ছাড়া তিনি হাওদাওশেকে বিয়ে করলেন। লিটল লায়ন ও আমরা তখন বেইজিং-এ ছিলাম। খবরটা শোনার পর নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি। এ অবিশ্বাস্য বাস্তবতায় হতাশ আমরা। কয়েক বছর পর ফুপু ‘মুন চাইল্ড’ নামের একটি টিভি প্রোগামে তারকা হিসেবে আবির্ভূত । প্রোগামটি ছিল হাওদাওশেকে নিয়ে। যদিও ক্যামেরা সার্বক্ষণিক ফুফুর দিকে ছিল। তার কথা বলা, অতিথি সাংবাদিকদের অভ্যর্থনা -কোন কিছুই বাদ যাচ্ছিল না। ফুফু বলছিল, ‘যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়; কেনো আমি হাওদাওশে কে বিয়ে করলাম? তবে আমাকে ব্যাঙের গল্প, তার ভ্রমণের কর্মশালা, তার স্টোর রুম ও তার আক্ষরিক ফলক থেকে শুরু করতে হবে। যখন সে শান্তভাবে তার কাজের বেঞ্চে বসে, চোখে উদাসীনতা প্রকাশ করে, মুখে এক ধরনের শূন্যতা ফুটে উঠে স্বপ্নীল বৃদ্ধ ঘোড়ার ন্যায়। সত্যি কি; সকল মহৎ শিল্পী বৃদ্ধ ঘোড়ায় পরিণত হয়, যখন তারা একবার জনপ্রিয় হয়। আমি আশ্চর্য হই। হাওদাওশের নাম কানে গুনগুন বাজতে থাকে। যদি ও তার সাথে মাত্র কয়েকবার সাক্ষাৎ করেছি। ঐ রাতেই প্রথম আমি তাকে দেখি । আমার আগের ঘরের সন্তান শিয়ান কুয়ান পাইলট হয়ে যোগ দান করার অনুষ্ঠানে তাকে ডিনারের দাওয়াত দিল। বছরের পর বছর চলে গেল, আর তাকে দেখলাম না। আবার একবার দেখা হলো, শুধু টিভিতে। তার দাড়ি ও চুল সাদা । কিন্তু তার মনোভাব তখনও চির তরুণ,স্বচ্ছ ও স্থির। তাকে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি বলা যায়।” এ প্রোগামে দেখেই আমরা জানতে পারলাম ফুপু কেন হাওদাওশেকে বিয়ে করেছে?
ফুপু একটি সিগারেট জ্বালাল। তারপর এক দীর্ঘ টান এবং কথা বলা। তার স্বরে দুঃখ প্রকাশ পাচ্ছিল। ‘বিয়ে আসলে স্বর্গে নির্ধারিত হয়। এ কথা বলে তারুণ্যের আদর্শবাদী চেতনা জাগ্রত করতে চাই না। কেননা আমিও বাস্তববাদী। যেহেতু এটা বিয়ের বিষয় তাই ভাগ্যের উপর নির্ভর তো করতে হয়।’ হাওদাওশের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘তাকে প্রশ্ন করুন? আপনারা কি মনে করেন সে কি কখনো স্বপ্ন দেখেছে আমাকে বিয়ে করার?’
‘১৯৯৭ সালে যখন আমার বয়স ৬০। হাসপাতালের উর্ধতন কর্মকর্তা আমাকে অবসর নিতে বলে । ইতিমধ্যে অবসরের পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়েছে। হাসপাতালের অকৃতজ্ঞ পরিচালক হুয়াং-এর হারামজাদ পুত্র মিলানহুয়াং জুন-এর কথা সবারই জানা। সে হেক্সি গ্রামের অধিবাসী। কিছুদিন মেডিকেল কলেজে অতিবাহিত করেছে। পাশ করে বেরুলো একেবারে মূর্খের মতো। যেমন সে ভর্তি হওয়ার পূর্বে ছিল। সে সিরিঞ্জে ওষুধ খুঁজে পেত না। স্টেটিসকোপের মাধ্যমে হৃদকম্পন ও বুঝতে পারত না। সে কখনো ইঞ্চ, বার, কিউবিট এ শব্দগুলোর নাম শুনেনি । তার হসপিটালে ভর্তি হয়ে কে সুস্থ হবে? রোগি বরংচ যেনো স্কুলে ভর্তি হল। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক চেনকে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। এ জঘন্য জন্তুটার সামন্যতম জ্ঞান ও নেই। মেয়ে মানুষের সাথে খেলা, তাদের উপহার দেয়া, গাধাগুলোকে চুমু দেয়া, আর মহিলাদের বিরক্তি করা; এই কাজেই তো তার দক্ষতা।”
তখন ফুপু তার স্তনে চাপ দিলেন এবং জোরে পা ঝাঁকিয়ে হাঁটলেন। রাগান্বিত হয়ে বলল, ‘আমি কতো বোকা সেই নেকড়েকে আমার দরজায় আসতে দিয়েছি। সে হসপিটালে মেয়েদের সাথে যা তা করার সুযোগ দিলাম। ওয়াং শিয়ামেই ওয়াং গ্রামের সতের বছরের মেয়ে। সে ছিল সুন্দরী, মাথা ভর্তি চুলের খোঁপা, গোলাগাল মুখ ও হাতির দাঁতের ন্যায় কোমল সাদা চামড়ার শুভ্রতার অধিকারিণী। তার হাতগুলো উড়ত প্রজাপতির ডানার মতো, চোখগুলো যেনো কথা বলত। আর যে তাকে দেখবে সে এমনটাই বিশ্বাস করবে। যদি পরিচালক ‘ঝাং ইয়ে মু’ তাকে দেখত, সে আর বেশি আকর্ষণীয় কৌতুক অভিনেতা হতো কং লিয়র ও ঝাং ঝিভির তুলনায়। দুঃখজনকভাবে, সে অসভ্য দুশ্চরিত্র মিলান হুয়াং তাকে প্রথম দেখল। সে ওয়াং গ্রামে ছুটে গেল। মেয়েটির মা-বাবার সাথে কথা বলল। মিষ্টিকথা বলে তাদের বুঝাল। প্রস্তাব দিল; যদি তারা তাদের মেয়েকে হসপিটালে পাঠায়, তবে সে মহিলাদের সমস্যার চিকিৎসা করতে পারবে। সে বলল মেয়েটি আমার ছাত্রী হতে পারবে। অথচ মেয়েটি একদিন ও আমার সাথে কাটায়নি। সে চরিত্রহীন মেয়েটিকে তার নিজের কাছে রাখল। তার প্রতিদিনের সেবক ও রাতের সহগামিনীর মতো। তার নষ্টামির এটাই শেষ ছিল না। সে দিনে ও তাকে নিয়ে বিছানায় যেত। এমনকি মানুষ ও তাদের দেখেছে। একসময় তার তৃপ্তি পুরোটাই মিটে যায়। তার পর ঐ গ্রামে যাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিল। অথচ ওখানে সরকারী খরচে তার খাবার ব্যবস্থা ছিল। অন্য বড় কোন শহরে বদলি হওয়ার আশা তার এ আচরণের মূল কারণ। হয় তো আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না সে দেখতে কেমন? সে একটা লম্বা গাধা, কালো ঠোঁট, রক্তাত দাঁতের মাড়ি বিশিষ্ট এবং বিষাক্ত শ্বাস প্রশ্বাসের অধিকারী।
এরকম চেহারা নিয়েও মনে করত; স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক হওয়ার যোগ্যতা আছে তার। প্রত্যেক সময় সে ওয়াং শিয়ামোকে মদ্যপান করানো ও অফিসারদের খাবার খাওয়ানো ও আনন্দিত করতে একা নিয়ে যেত। তাকে তাদের সামনে উপস্থাপন করত, আনন্দের খোরাক হিসেবে। এটাই ছিল শয়তানের শয়তানি ও নষ্টামি। একদিন সেই ছোট্ট শয়তান আমাকে তার অফিসে ডাকল। অফিসের মহিলা কর্মচারীরা সবাই তাকে ভয় পেত। আমি তাকে মোটেও ভয় পেতাম না। আমি একটা ছোট ছুরি রাখতাম নিজের কাছে। প্রয়োজনের সময় তার উপর এটা চালাতে মোটে ও ইতস্তত করতাম না। সে আমাকে দেখে চা খাওয়া বন্ধ করল, হাসল, এবং বাকি চা টুকু মেঝেতে রাখল।
আমি বলি, ‘পরিচালক হুয়াং আপনি আমার কাছ থেকে কী আশা করেন? আসুন কাজের কথায় আসা যাক।’
সে বিশ্রীভাবে মুচকি হাসল। আর বলল ‘মহৎ ফুপু’। আমি মনে মনে বলি, ‘নিকুচি করি তার মহৎ ফুপু বলাকে’। ‘আপনি আমাকে ঐ জন্ম গ্রহণের দিনটা দান করেছেন। আমাকে বড় হতে দেখেছেন। তবে কেন আমি আপনার ছেলে হতে পারি না?” ব্যাঙের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর ডাক কখনো মনে হয় ঢোলের শব্দের মতো। কিন্তু তার কান্না সেদিন মানুষের মতো মনে হলো। যেন হাজারো নবজাতক শিশু কাঁদছে। আমি বললাম, ‘আমি এতা সম্মানের যোগ্য নই। আপনি হচ্ছেন হাসপাতালের পরিচালক। যেখানে আমি একজন সাধারণ মহিলা ডাক্তার। যদি আপনি আমার সন্তান হতেন, তবে আমি গর্বিত মায়ের মতো মৃত্যুবরণ করতাম। সুতরাং মনে যা কিছু আছে, বলুন।’ সে আরো বেশি হি হি করে হাসলো ডাকার আসল উদ্দেশ্য বলার আগে। বলল, ‘আমি একটা ভুল করেছি, যা প্রত্যেক অফিসাররা আগে বা পরে করে থাকে। আমার নিজের ভুলের কারণে ওয়াং শিয়াওমে গর্ববতী হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘স্বাগতম; এখন শিয়াওমে তোমার ড্রাগনের বীর্য বহন করছে। আর এ হসপিটাল স্থায়ী নেতৃত্বের নিশ্চয়তা পাচ্ছে।’ সে বলল, ‘মহৎ ফুপু আমাকে পরিহাস করো না। আমি গত কয়েকদিন যাবত খুবই চিন্তিত। খেতেও পারছি না ঘুমাতেও পারছি না।’
আপনারা কি মনে করেন এ হারামজাদা ঘুমাতে ও পারছে না খেতে ও পারছে না?
সে আরো বলল, ‘ওয়াং চাচ্ছে আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দেই। যদি স্ত্রীকে তালাক না দেই, সে নাকি দেশের মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করবে।’ আমি বললাম ‘সত্যি’ আমার তো মনে হয় দ্বিতীয় স্ত্রী তো এখনকার কর্মকর্তাদের একটি প্রিয় বিষয়। একটি বাংলো কেনেন। ওকে সেখানেই রাখেন। আপনি তো তা করতে পারেন।’ সে বলল, ‘আপনাকে অনুরোধ; এরূপ রসিকতা করবেন না দয়া করে। আমি জনসম্মুখে যেতে পারব না দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় স্ত্রী নিয়ে। যদি ও আমার আরো বাংলো কেনার ক্ষমতা আছে।’ আমি বললাম, ‘তবে সামনে অগ্রসর হও আর তালাক দাও’ সে তার গাধার মতো চোহারাকে প্রসারিত করলো। আর বলল, ‘আপনি ভালো করে জানেন আমার শ্বশুর একজন শুয়োর কসাই। আমার শালা ভয়ংকর গু-া। আমাকে খুন করা তো ওদের কিছুই না, যদি তারা এ ব্যাপারে জানতে পারে।’ আমি বললাম, ‘কিন্তু আপনি হচ্ছেন এখানকার কর্মকর্তাদের স্যার।’ সে বলল ঠিক আছে এটা যথেষ্ট। আপনার বয়স্ক চোখে হসপিটালের পরিচালক একজন নগণ্য ব্যক্তি। কিন্তু বাইরে শহরের রাস্তায় সে শ্বাস প্রশ্বাস নির্গমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিহাস করার পরিবর্তে কেন এগিয়ে এসে সাহায্য করছেন না?’
আমি বললাম, ‘এ পৃথিবীতে এমন কি আছে যা আপনার জন্য করতে পারি?’
সে বলল, ‘ শিয়াওমে আপনাকে সম্মান করে। সে অনেক বার বলেছে; আপনি হচ্ছেন এমন একজন যার কথা সে শুনে।’
‘তুমি আমাকে কী করতে বলছ?’
মিলান হুয়াং বলল, ‘তাকে গর্ভপাত করতে বলুন।’
আমি দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললাম, ‘আমি নিজ হাতকে আর নষ্ট করব না, এধরনের নিষ্ঠুর কাজ করব না। সারা জীবনে আমি দু হাজারের বেশি মেয়ের গর্ভপাত করার জন্য দায়ী। আর এটা আর কখনো করব না। তুমি তাকে জন্ম হওয়ার সুযোগ দাও। তোমার পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। শিয়াওমে খুবই সুন্দর মেয়ে। সে তোমাকে খুব সুন্দর ছেলে অথবা মেয়ে উপহার দিবে। এতে তোমার খুশি হওয়া উচিত। তুমি তাকে বলো যখন সময় হবে, তখন নবজাতকের জন্মের সময় আমি এখানে থাকব।’ এ বলে আমার জুতা ঠিক করলাম, আর অফিস থেকে বের হয়ে পড়লাম। এ ধরনের উত্তর দিতে পেরে বেশ খুশি হলাম। আমার এ সিদ্ধান্ত রুমে ফিরে এসে এক গ্লাস পানি পান করা পর্যন্ত টিকল। ভাবলাম, মিলন হুয়াং এর উওরাধিকারীর মতো কেউ এত খারাপ হতে পারে না । কী লজ্জার ওয়াং শিয়াওমে তার বাচ্চার মা! আমি অনেক বাচ্চাকে প্রসব করিয়েছে। দেখেছি বাচ্চার স্বভাব ভালো বা খারাপ হয় তার জ্বীনগত বৈশিষ্ট্য ও লালন-পালন করার পরিবেশের কারণে। আপনারা উত্তরাধিকারী আইনগুলোর সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু এই জ্ঞান অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত । এর সমালোচনা চলে না। আপনি মঠে মিলানহুয়াং- এর সন্তানকে রাখতে পারেন। সে একজন কামুক ভিক্ষু হবে। কোন ব্যাপারই না; আমি যতই দুঃখবোধ করি শিয়াওমের জন্য। আমি যতই অনইচ্ছিুক হই, তাকে এ কথা শুনাতে। এ বাচ্চা পৃথিবীতে জন্ম হওয়ার পর সৃষ্ট সমস্যার কোন সমাধান খুঁজে পেলাম না। যদি পৃথিবীর আর কোন কামুক ভিক্ষু থাকে, তবে তা হবে সে। কিন্তু ঠিক তখনই শিয়াওমে নিজে আমার কাছে এলো। পা জড়িয়ে ধরল। তার চোখের পানি আর নাকি কান্নায় আমার ট্রাউজার ময়লা করে ফেলল। সে কাঁদছিল আর বলছিল ‘খালা; সে আমাকে ফাঁদে ফেলেছে, আমাকে মিথ্যা বলেছে। আমি এ হারামজাদাকে বিয়ে করব না। যদিও সে আমার জন্য চারজন কাজের লোক ও গাড়ি পাঠায়। আমাকে সাহায্য করেন। আমি চাই না আমরা গর্ভে তার সন্তান থাকুক। ’
ফুপু আরেকটা সিগারেট জ্বালাল। জোর করে একটান শেষে আদিমভাবে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর আমি তার মুখ দেখলাম। তখন বললেন, ‘আমি তাকে গর্ভপাত করতে সাহায্য করলাম। একসময় যে ফুল ফুটার কথা ছিল, সেই ওয়াং শিয়াওমে এখন ধ্বংস হয়ে গেছে। সে এখন পতিতা।’ ফুপু তার গল্প শেষ করলেন। চোখ মুছলেন। আবার বলতে শুরু করেন, ‘শপথ করেছি, এ ধরনের কাজ আর করব না। এমনকি কোন মেয়ে যদি শিম্পাঞ্জির বাচ্চা ও গর্ভে ধারণ করে তাও না। বাচ্চাটার পান করার আওয়াজ, শূন্য বতলে কোন কিছু চুষে পান করার মতো। তার ভৌতিক হাত যেনো আমার অন্তরকে জোর করে চেপে ধরেছে, যতক্ষণ না আমি বরফের মতো ভেঙে পড়ি। যখন কাজটা শেষ করলাম, তখন যেনো মেঝেতে ভাঁজে ভাঁজে ভেঙে পড়েছি।’
‘আপনারা ঠিকই বলছেন। আমি মৌলিক বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছি।’ এত কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আমি বৃদ্ধা হয়ে গেছি। আর এখনো বলিনি কেন তাকে বিয়ে করেছি? আমার অবসর নেয়ার কথা ঘোষণা করলাম চাঁদের ৭ম মাসের, ১৫ তারিখে। কিন্তু সে অসভ্য মিলান প্রচলিত নিয়মে অবসর নিতে বলল। আর প্যারোলে মাসে ৮০০ ইউয়ানের বিনিময়ে থাকতে বলল।’ তার মুখে থুতু মারলাম। বললাম, ‘আমি তোমার জন্য অনেক খেটেছি। হাসপাতালের মোট আয়ের প্রতি দশ ইউয়ানের মধ্যে আমাকে আট ইউয়ানের জন্য তোমার ধন্যবাদ দেয়া উচিত। মিলন হুয়াং; তুমি কি মনে কর প্রতি মাসে আটশ ইউয়ানে আমার শ্রম কিনতে পারবে? একজন বিদেশী শ্রমিক ও তার চেয়ে বেশি পায়। অর্ধেক জীবন খেটে মরেছি। এখন সময় বিশ্রাম নেয়ার। সময় এসেছে গাওমি শহরের নিজের বাড়িতে ফিরে যাবার।’ সে আমার ব্যবহারে হতাশ। গত দুবছরের অধিকাংশ সময় আমকে ভোগাতে অনেক সময় অতিবাহিত করেছে। আমি হচ্ছি এমন মেয়ে যে ভালভাবে এসব দেখে নিয়েছে। ছোট মানুষ হলেও এসব জাপানি শয়তানগুলোকে ভয় পাই না। ঠিক আছে, ঠিক আছে, আবার বিয়ে করার গল্পটা শুরু করছি।
‘যদি আপনারা জানতে চান কেন হওদাওশে-কে বিয়ে করলাম? তবে আমাকে ব্যাঙের গল্প শুরু করতে হবে। অবসরের রাতে কিছু পুরানো বন্ধুরা খাবারের সময় একসাথে হলো। আমি মদে উল্লাসিত। পুরো বতলের কমই পান করি। কিন্তু এটা ছিল সস্তা মদ। শে শিয়াওছে, রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে একটা অতিরিক্ত নেশাময় বতল আনল। প্রত্যেকে এর নেশায় কাঁপছিল। কোনমতে দাঁড়াতেও পারছিল না। শে শিওায়ছের মুখে ফেনা এসে গেল । তার চোখ ঘুরছিল।’
ফুপু বলল, সে টলতে টলতে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে হসপিটালের ডরমিটরির সম্মুখে গেল। কিন্তু কোন মতে একটি ছোট জলাবদ্ধ স্থানে এসে থামল। এর বাতাস গমনাগমনের দুই দিক উচু ছাউনি দ্বারা পরিবেষ্টিত । চাঁদের আলো তার চারপাশে প্রতিফলিত চকচকে আয়নার ন্যায়। ব্যাঙ-ব্যাঙাচির আওয়াজ প্রথমে একদিক থেকে, পরে অন্যদিক থেকে আসে। সামনে ও পেছন থেকে আসে। যেনো রণসঙ্গীতের সমস্বরে গানের মত আওয়াজ। তারপর ব্যাঙের ডাক সমস্বরে আসতে থাকল চারদিক থেকে। তার ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে যেনো আকাশপূর্ণ। হঠাৎ এর মাঝেই সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে আসল। একসময় নীরবতা ভাঙে পাখির কিচির-মিচিরের মতো আওয়াজে। মেডিকেল কর্মজীবনে দূরের পথে তিনি এখান থেকে সেখানে গিয়েছেন গভীর রাতে। কিন্তু কখনো এমন ভয় পাননি। সে রাতে তিনি ভয়ে প্রকম্পিত হলেন। ব্যাঙের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর ডাক তার কাছে ঢোলের শব্দের মতো বিকট মনে হতে লাগল। সে রাতে ব্যাঙের ডাক মানুষের কান্নার চিৎকারের রূপ কেন নিল তা তিনি বুঝলেন না? প্রায় হাজারো নবজাতক শিশু যেনো একসাথে কাঁদছিল। এ আওয়াজ সবসময় তার প্রিয় বিষয়। তিনি বলেন, ‘একজন শিশু বিশেষজ্ঞের জন্য পৃথিবীর যে কোন আওয়াজ নবজাতকের কান্নার তুলনায় হৃদয়গ্রাহী হতে পারে না।’ সে রাতের মদ তাকে ঠা-া ঘর্মাক্ত দেহের গেঞ্জির মতো করে তুলে। তিনি বলেন, ‘এটা ভেব না আমি মদ্যপ, তাই কল্পনার জগতে ছিলাম। কেননা যখন ঘাম আমার লোমকূপ দিয়ে বের হয় মাথা ব্যথা কমে গেল। মনটা পরিষ্কার হলো।’ ফুপু সেই কর্দমাক্ত পথ দিয়ে নেমে আসল । ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক থেকে পালতে চাইল। কিন্তু কীভাবে? তিনি যত পালাতে চেষ্টা করল, তত দুঃখিত ব্যাঙগুলোর সমস্বরের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙর শব্দ চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরল। দৌড়াতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। আঠালো মাটির এই পথ তার জুতার তলার সাথে লেগে গেছে। জুতা একবার কাদা থেকে ছোটার পর পুনরায় লাগছিল। যেন কাঁদা তার জুতাকে, তামার কাঁটা দিয়ে কামড়ে ধরে আছে পথের মেঝেতে। শব্দগুলো তার নিকট আসল সমুদ্র বাতাসের মতো। তাকে ঘিরে ফেলল তাদের ভয়ানক গর্জনে। মনে হলে, তারা যেনো তাকে ধারাবাহিক ভাবে কামড়াচ্ছে। যেনো বড় বড়ো নখে তারা তাকে আচড়ে দিচ্ছে। যখন সে পিছলে পড়ল, আরো কিছু কাটা যেনো যুক্ত হলো। তিনি জুতা খুলে ফেললেন, যেনো খালি পায়ে হাঁটতে পারে। তা যেনো উল্টো কাদার আকড়ে ধরার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিল। বড় ব্যাঙের মতো তিনি তার হাত-পায়ের ওপর আছড়ে পড়লেন। আর বুকে ভর দিয়ে চলতে থাকলেন। কাদা তখন তার হাঁটুতে, রানে ও পায়ে লেগে গেল। কিন্তু তিনি গুরুত্ব দিলেন না। তিনি বুকে ভর দিয়ে চলতে লাগলেন। সে সময় ঘন ছাউনির আড়াল থেকে অসংখ্য ব্যাঙ দ্রুত বেরিয়ে আসল। কিছু ছিল গাড়ো সবুজ। আর অন্যগুলো সোনালি ও হলুদ। কিছু এত বড় যেনো ইলেকট্রিক স্ত্রি, কতগুলো খেজুরের মতো। কতগুলো সোনালি পি-ের ন্যায়। এর অন্যগুলো ছিল মটরশুটির মতো লাল। তারা তাকে সমুদ্রের ঝড়ের ন্যায় আক্রমণ করে। তাদের গর্জনে তাকে ঘিরে ফেলে। মনে হলো তারা যেনো তাকে ধারাবাহিক ভাবে কামড়াচ্ছে। তাদের যেনো বড় নখে তাকে তারা আচড়ে দিচ্ছে। তারা দ্রুত তার পিঠে, গলায় ও মাথায় উপচে পড়ে। ব্যাঙের ওজন তাকে মাটির ওপর এলো পাথারি করে শুইয়ে দেয়। সে বলল, ‘তার বড় ভয় ব্যাঙের আচড়ানো বা কামড়ানোর কারণে নয়। বরং তাদের বিরক্তিকর. অসহ্যকর, ঠা-া ও তৈলাক্ত চামড়া আর স্পর্শের ভয়াভহ অনুভূতি। ফুপু বলেন, ‘তারা আমাকে আবদ্ধ করে মূত্রে; না মনে হয় তা মূত্র নয় বীর্য।’ তার হঠাৎ মনে হল দাদির বলা একটি যৌনকাৃক্সক্ষী ব্যাঙের গল্প। একজন মেয়ে এক রাতে নদীর তীরে শিতল বাতাস খাচ্ছিল এবং ঘুমিয়ে পড়ল। আর সে স্বপ্নে এক সবুজ পোশাকধারী যুবকের সাথে যৌনমিলন হলো। যখন সে জাগ্রত হলো, তখন সে ছিল গর্ভবতী। আর সে প্রসব করল একগুচ্ছ ব্যাঙাচি। এই ভয়াবহ চিত্রের বর্ণনা একটি ভীতিকর অবস্থা তৈরি করে। সে পায়ে ভর দিয়ে লাফাল। শরীর থেকে ব্যাঙ সরালো কাদা সরানোর মতো। কিন্তু সব সে ছাড়াতে পারল না। কিছু তার কাপড়ে, চুলে আঁকড়ে ধরে। এমনকি দুটো কানের লতিতে কামড়ে ধরে। এরা ছিল একজোড়া ভয়াবহ কানের দুলের মতো। এক সময় তিনি দৌড়ানো বন্ধ করেন। আর কাদা তার আকড়ে ধরার শক্তি হারায়। তারপর তিনি আবার দৌড় শুরু করেন। তার শরীর ঝাঁকান। দুই হাতে তার কাপড় ও চামড়া ঝেড়ে নেন। প্রত্যক বার একটা ব্যাঙই ছুড়ে ফেলত, যা তাকে বার বার আকড়ে ধরত। আর প্রত্যক বার চিৎকার দিতেন। সেই দুটো ব্যাঙ তারে কানে ঝুলে ছিল ছোট বাচ্চার দুধ চোষার ন্যায়। তিনি যখন তাদের ফেলে দিলেন, তার কানের কিছু অংশ তাদের সাথে ছিড়ে গেল। ফুপু চিৎকার দিচ্ছিলেন আর দৌড়াচ্ছিলেন। কিন্তু ব্যাঙের ভিড় ভেঙে মুক্ত হতে পারছিলেন না। দশ হাজারের ও বেশি ব্যাঙ তার পিছনে শক্ত হাত বিনির্মাণ করল। তারা ডাকছিল, দৌড়াচ্ছিল, ধাক্কা খাচ্ছিল ও জড়ো হচ্ছিল। যেনো কোন অন্ধকার ঝড় তাকে ধাওয়া করল। যখন সে রাস্তার দিকে দৌড়াল, ব্যাঙেরা তার পথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অগ্রসর হওয়ার পথেএকটা বাধা তৈরি করল। যেখানে অন্য ব্যাঙগুলো সেই ছাউনি থেকে বেরিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছিল। তার কালো পোশাক তাদের আক্রমণে ছিড়ে গেল। আক্রমণকারী ব্যাঙগুলো কাপড় ছিদ্র করে ফেলে। তারা পূর্ণোদ্যমে উত্তেজনায় তার গলার মাংস কামড়ে নিল মাটিতে পড়ার পূর্বে।
তিনি পুরো নদীর তীরে দৌড়েছিলেন। চাঁদের আলোয় চমকিত একটা ছোট পাথরের ব্রীজ দেখলেন। শরীরে তখন কোন কাপড় ছিল না। তিনি ব্রিজে পৌঁছলেন সম্পুর্ণ দিগম্বর হয়ে। আর দৌড়ে হাওদাওশের নিকট গিয়ে উপস্থিত ।ভদ্রতার কোন বালাই তখন ছিল না। মনে ছিল না যে, তিনি সম্পূর্ণ উলঙ্গ। পাম গাছের অন্তরীপে একজন মানুষ দেখলাম। বাঁশের ছোবড়ার তৈরি টুপি পরে একজন ব্রিজের মাঝে বসে হাতে কি যেন পিষছিল। ‘আমি পরে জানলাম সে একটা মাটির খ- পিষছিল। চাদের সন্তান চাঁদনী রাতে মাটির খ- থেকে তৈরি করা যায়। জানতাম না সে কে? কিন্তু কোন পরোয়া করলাম না। সে যে-ই হোক না কেন? তার দায়িত্ব আমাকে রক্ষা করা। সেই মানুষটার বাহুতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। যখন আমার স্তন তার উষ্ণ বুকের ছোঁয়া পেল, তার পিঠে ব্যাঙের স্যাঁতস্যাঁতে ঠা-া, তৈলাক্ত দুর্গন্ধময় ব্যাঙের ছোঁয়ার পরিবর্তে আমি তাঁর বুকের অন্তরীপে আশ্রয় নিলাম। চিৎকার দিলাম, ‘বড় ভাই আমাক রক্ষা কর।’ তৎক্ষণাত জ্ঞান হারালাম।
ব্যাঙের ভিড়-এর ছবি মনে অঙ্কন করে ফুপু বর্ণনা দীর্ঘায়িত করল। ভয়াবহ গল্প বলে হৃদকম্পনের উত্থান ও পতন বাড়িয়ে দিল। একটু পর ক্যামেরা ফেরানো হলো হাওদাওশের দিকে। সে তখন স্ট্যাচুর মতো বসে। পরবর্তী দৃশ্যে ‘ছোট পাথরের ব্রিজ’ নামের একটি মাটির টুকরা শিল্পকর্মকে দেখানো হলো। তারপর ক্যামেরায় আবার ফুপু দৃষ্টিগোচর হলেন।
ফুপু বলল, ‘ঘুম থেকে জেগে আমাকে হাওদাওশের ইটের বিছানায় পুরুষের পোষাকে খুঁজে পেলাম। দুই হাতে সে আমাকে বাটি ভর্তি সুপ দিল। যার সাধারণ ঘ্রাণ মাথা পরিষ্কার করে দেয়। এক চুমুক দেয়ার পর চিন্তা করলাম, আমি কতটুকু ব্যথা পেয়েছি? শরীর কেমন গরম? সেই ঠা-া ও তৈলাক্ত অনুভূতি এর মধ্যে চলে গেছে। আমার শরীরে ছিল চুলকানি, ব্যথাময় আচড়। ভালো জ্বর অনুভব করলাম। আর কিছুটা বলা যায় জ্বরে দুর্বলও। হাওদাওশের শিমের সুপ খেয়ে কিছুটা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠলাম। যেন আমার চামড়ার একটা স্তর ঝেরে ফেললাম। আর হাড্ডিগুলো যেনো ব্যথা শুরু করল। বহু মানুষের পুনর্জন্ম হওয়ার গল্প শুনেছি। এখন জানলাম আমি ও তাদের মত একজন। যখন সুস্থ হলাম হাওদাওশেকে বললাম, ‘চলো আমরা বিয়ে করি।’
হাওয়ার্ড গোল্ডব্লাট এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনূদিত
হাস্য কৌতুকে রবীন্দ্রনাথ
মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল
রবীন্দ্রনাথকে আমরা জানি একজন সুখী লোক, একজন জমিদারের ছেলে, যাঁর কোন অভাব-অনটন নেই, সম্মানীয় ব্যক্তি, কবি ও একজন নিবিড় প্রেমিকের মাত্রায়।
রবীন্দ্রনাথের রসবোধ ছিল অতি উচ্চ মানের। রবীন্দ্রনাথ হাস্য-কৌতুক খুব ভালবাসতেন। সাহিত্যের একটি বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাস্য- কৌতুক। শুধু সাহিত্যেই বা বলি কেন? ব্যক্তিগত দৈনন্দিন জীবনে আলাপ আলোচনায়ও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন হাস্য রসের নিপুণ কারিগর। এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি হাস্য-কৌতুক তুলে ধরা হলো-
গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় সে আমলে একজন বিখ্যাত নামকরা সঙ্গীত শিল্পী। প্রচুর ভক্ত-শ্রোতা, খুব নামডাক তার। কলকাতার জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেই একবার বসেছে তাঁর বিখ্যাত গানের জলসা। রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন সেই আসরে তার একজন ভক্ত শ্রোতা হিসেবে। গোপেশ্বর বাবু গান শুরু করলেন। এবার শ্রোতারা ধরলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একখানা গান গাইতে হবে। তা না হলে তার নিস্তার নেই। কবি অগত্যা রাজি হলেন, হাসি মুখে বলতে লাগলেন গোপেশ্বরের পর কি এবার দাড়িশ্বরের পালা?
রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তি নিকেতনে অবস্থান করছিলেন। কি ব্যাপারে যেন একটা সভা বসেছে শান্তি নিকেতনে। সভার শুরুতে যে ঘরটিতে সভা বসেছে তার সম্বন্ধে কেউ কেউ আলাপ করছিলেন ঘরটি বেশ জাঁকজমক ও সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ বলে উঠলেন-এ ঘরটিতে একটা বাঁ-দোর আছে। কবির কথা শুনে ঘরসুদ্ধ লোক একেবারে হতবাক। ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ তাদের অবস্থা দেখে মুচকি হেসে ফেললেন। বললেন বাঁদর নয়, আমি বাঁ-দোরের কথা বলছি। দেখছ না ঘরটির ডান দিকে একটি দরজা এবং বাঁ-দিকেও একটি দরজা।
রবীন্দ্রনাথ এক গ্রামে গেছেন বেড়াতে। আপ্যায়নের মহা আয়োজন। খাওয়ার দাওয়াত পড়ল এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বহু আইটেম দিয়ে গৃহস্বামী খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কবি বসলেন খেতে। সঙ্গে আছেন ক্ষিতি মোহন সেন শাস্ত্রী। গৃহস্বামী নিজে পরিবেশন করছেন। শাস্ত্রী মশাই ডিম খেতে গিয়েই বুঝলেন ডিমটা পচা। কী করবেন আড় চোখে দেখছিলেন কবি কী করেন। কবিও ডিম পচা বলে বুঝলেন। বুঝেও তিনি ডিমটা ভাতের সঙ্গে মুখে দিয়ে দিলেন। শাস্ত্রী মহাশয় পড়লেন মহা বিপদে। পচা ডিম তিনি খাবেন কী করে? গুরুর দেখাদেখি অগত্যা ওই পচা ডিমটিই তাকে গিলতে হলো। কিন্তু তার পেটটা তৎক্ষণাৎ প্রমাদ গুনল। সেই পচা ডিমটি এক মুহূর্তও সহ্য করল না, শাস্ত্রী মশাই সঙ্গে সঙ্গেই করলেন বমি। পরবর্তীতে সুযোগ পেয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এই পচা ডিমটি হজম করলেন কী করে? আমি তো খেয়েই বমি। রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন। ‘আমি তো পচা ডিম খাইনি তাই বমিও করিনি।’ শাস্ত্রী মশাই অবাক হয়ে বললেন, সে কী কথা। আমি স্বচক্ষে দেখলুম ডিমটি আপনি মুখে দিলেন। কবি উত্তরে বললেন, আমিও কি সেই ডিম খেয়েছি নাকি? আমি সাদা দাড়ির ভেতর দিয়ে সেই ডিম চাপকানের মধ্যে চালান করে দিয়েছি। এখন মানে মানে বাড়ি ফিরতে পারলেই বাঁচি।
এক সাহিত্য সভায় রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় সাহিত্যিক বনফুল অর্থাৎ বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। সেই সাহিত্য আসরে বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় একটি অসম্ভব ভাল বক্তৃতা দিলেন। সভায় উপস্থিত সবাই তার বক্তৃতার খুব প্রশংসা করতে লাগল। রবীন্দ্রানাথ তখন বললেন, বলাই তো ভাল বক্তৃতা দেবেই কারণ বলাই তো ওর কাজ।
একবার এক বৈজ্ঞানিকের পুত্র কবির সাথে দেখা করতে আসেন। ছেলেটির ছিল মস্তিষ্ক বিকৃতি। কবির কাছে সে বায়না ধরলো কবিকে হাপু গান শোনাবে। কবি ধৈর্য ধরেই ছেলেটির গান শুনলেন। গান গেয়ে ছেলেটি বিদায় নিলে কবি বললেন, গানই বটে! একেবারে মেশিনগান।
রবীন্দ্রনাথ তখন অস্তাচলে, প্রায় শেষ শয্যায়। একদিন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘আমরা আপনার শত বার্ষিকী করব।’ রবীন্দ্রনাথ উত্তরে বললেন, শত বার্ষিকী মানে তা মাত্র পঁচিশ টাকা। ওতে আমার কোনও মোহ নেই। কিন্তু শত বার্ষিকী মানে পঁচিশ টাকা কেন? হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তীর স্টাইলে রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। শত বার্ষিকী মানে শত বার সিকি মানে পঁচিশ টাকা, তাইতো?
রবীন্দ্রনাথ তখন মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কবি নিরামিষ খেতে পছন্দ করতেন। রোজই বিভিন্ন রকমের নিরামিষ রান্না হয়। একদিন হঠাৎ মগজ (ইৎধরহ) আনা হয়েেেছ। কবি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ পদার্থটি কী? মৈত্রেয়ী দেবী উত্তর দিলেন ইৎধরহ। কবির চোখে-মুখে কপট গাম্ভীর্যের রেখা ফুটে উঠল। বললেন, বিশ্ব কবির ‘ব্রেনে’ ঘাটতি পড়েছে। এ কথাটি সোজাসুজি জানালেই হতো। এত কৌশল করা কেন। থাকগে, এ তর্কের চাইতে জরুরী ব্যাপার যখন সামনে তখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা কেন।
শান্তি নিকেতনে অধ্যাপনা করতে এসেছিল ক্ষিতি মোহন সেন। অধ্যাপনায় মন লাগাতে না পেরে ভাবলেন অধ্যাপনা ছেড়ে কবিরাজি করবেন। বৈদ্যের ছেলে, অতএব বাবার ব্যবসাই করবেন। রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপে প্রবাসে। কবির অনুপস্থিতিতে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তিনি কবির আগমনের অপেক্ষায় রইলেন। যথাসময়ে কবি ইউরোপ থেকে ফিরে এলেন। এসেই তিনি শান্তি নিকেতনের অন্য এক অধ্যাপকের কাছে শুনতে পেলেন, ক্ষিতি মোহন বাবু অধ্যাপনা ছেড়ে কবিরাজি করবেন। শুনে তো কবি বিস্ময়ে হতবাক। কবি তৎক্ষণাৎ ক্ষিতি মোহন বাবুকে ডেকে পাঠালেন। কবির মনোভাব বুঝতে পেরে ক্ষিতি মোহন বাবু চিন্তায় পড়লেন। তিনি কবির কাছে এসে উপস্থিত হলেন। কবি তাকে বললেন, আপনি নাকি অধ্যাপনা ছেড়ে কবিরাজী করবেন বলে স্থির করেছেন?
কবির এ কথার উত্তরে ক্ষিতি বাবু এবার হাসতে হাসতে বললেন, কি আর করি, কবি যেখানে রাজি নন। কবিরাজী আর সেখানে কী করে হয়।
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিখ্যাত ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। তিনি শিলাইদহ গেছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা আনতে। রবীন্দ্রনাথ তখন রয়েছেন পদ্মার ওপরে বজরায়। নদীর ঘাট অবধি একটি তক্তার সাঁকো বজরা অবধি পেতে দেয়া আছে। পা টিপে টিপে সেই তক্তা ধরে চারুচন্দ্র নৌকায় উঠে আসছেন। বজরার ছাদ থেকে রবীন্দ্রনাথ সাবধান করলেন চারু, সাবধানে পা ফেলো। এ জোড়াসাঁকো নয়।
সাহিত্যিক বনফুলের ছোট ভাই একবার কবির সঙ্গে দেখা করার জন্য শান্তিনিকেতন আসেন। কবি তখন কানে ভাল শুনতে পান না। কবির সেক্রেটারি অনিল কুমার তাই তাকে বলে দিলেন কবির সাথে একটু জোরে কথা বলতে। কবি এখন কানে ভাল শুনতে পান না। কবিকে বলা হলো, ইনি সাহিত্যিক বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছোট ভাই। কবি তৎক্ষণাৎ ঠাট্টা করে বললেন তুমি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি? ভদ্রলোক কবির সেক্রেটারির পূর্ব নির্দেশ মোতাবেক চেঁচিয়ে বললেন, না আমি অরবিন্দ। কবি একগাল হেসে বললেন, ‘কানাই নয়, এ দেখছি একেবারে সানাই।’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তখন খুবই অসুস্থ। শান্তি নিকেতন থেকে কবিকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। ঠিক সে সময় একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে বায়না ধরে বসল কবিকে তার অটোগ্রাফ দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তার খাতায় কাঁপা হাতে অটোগ্রাফ লিখে দিল। তবু মেয়েটির মন ভরল না। মেয়েটি কেঁদে কেটে বায়না ধরল-কবির অটোগ্রাফের পাশে কবিতা লিখে দিতে হবে। ছোট্ট মেয়েটিকে নিরাশ করলেন না কবি। তিনি তাৎক্ষণিক লিখলেন-
মোর কাছে চাহ তুমি পদ্য
চাহিলেই মিলে কি’তা সদ্য।
তাই আজ শুধু লিখিলাম
নিজের নাম,
এর বেশি কিছু নহে অদ্য।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে রাজপুরুষ ও সাধারণ মানুষ
আশরাফ জামান
॥এক ॥
বাংলাদেশে ইলিয়াসশাহী বাদশাহেরা প্রথম উপলব্ধি করলেন যে, সুশাসন রক্ষার্থে অগণিত হিন্দু প্রজাদের প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ করা উচিত। যার জন্য তাঁরা এদেশীয় সাহিত্য রচনায় উৎসাহ প্রদান ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। বাঙালি কবি চ-ীদাস এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন। হিন্দুদের সাহিত্যকর্ম দেখে বাঙালি মসুলমানের মধ্যেও সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা জন্মে। হিন্দু-মসুলিম উভয়ের মধ্যে সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে মিলনের যাত্রা শুরু হয়। এ সময় হতেই বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সূত্রপাত ঘটে।
চ-ীদাস সম্ভবত: রাজা সিকান্দরের অনুগৃহিত ছিলেন। ১৪১৮ সালে বাংলাদেশের রাজা হন জালালুদ্দীন যদু। তিনি ছিলেন একজন বিদ্যোৎসাহী ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। সম্ভবত তাঁর উৎসাহে ও সহযোগিতায় কৃত্তিবাস বিখ্যাত হিন্দু পুরাণ মহাকাব্য রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করেন। যা মহাকবি বাল্মীকি সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেছিলেন। কবি কৃত্তিবাসের ভাষায় : ‘পঞ্ঝ গৌড় চাপিয়া গৌড়েশ্বর রাজা গৌড়েশ্বর পূজা কৈলে গুণের হয় পূজা।’
শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে কবি যয়নুদ্দীন ‘রসুল বিজয়’ রচনা করেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণ বিজয়ের কবি মালাধর বসুকে গুণরাজ খান উপাধিতে ভূষিত করেন।
আলাউদ্দীন হুসেন শাহ ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান হন। তাঁর রাজত্বকালে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রী চৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সেনাপতি পরাগল খাঁ কবীন্দ্র পরমেশ্বর শ্রীকর নন্দীকে বাংলা মহাভারতের অনুবাদ করতে উৎসাহিত করেন। তাঁর গুণ কীর্তন করে কবি লিখেছেন :
‘নৃপতি হুসেন শাহ হন মহামতি।
পঞ্চম গৌড়েতে যার পরম সুখ্যাতি॥
অস্ত্রশস্ত্রে সুপ-িত মহিমা অপার।
কলিকালে হৈল যেন কৃষ্ণ অবতার॥’
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গৌড়ের সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও বাংলার সীমান্তরেখার পার্শবর্তী রাজা আরাকানের রাজাও রাজদরবারের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করলো। এ সময় বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য সৃষ্টি করলেন মুসলমান কবিরা। তাঁরা আরাকান রাজের সহযোগিতায় পারস্য সাহিত্যের অনুকরণে ইউসুফ জুলেখা, লাইলী মজুন, সয়ফল মুলক বদিউজ্জামাল প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন। কেউবা লোকগাথা অবলম্বনে অথবা কাল্পনিক কাব্যও রচনা করলেন। কিছু কিছু লেখক তাঁদের অনুসরণ করে লৌকিক কাব্য লিখলেন। আলাওল, দৌলত কাজী, দৌলত উজীর বাহরাম খান এ সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি। আলাওলের অমর কাব্য পদ্মাবতী হিন্দী কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পাদুমারৎ’ কাব্যের অনুবাদ। মহাকবি আলাওল ‘পদ্মাবতী কাব্যে পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছন :
‘দেখিয়া বদনচন্দ্র মনে ধন্ধ বাসি।
দিনে দিনে ক্ষীণ হন পূর্ণিমার শশী॥
কনক মকুর, জিনি মুখ জ্যোতি সাজে।
লজ্জা পাই নলিনী প্রবেশ জলমাঝে॥
প্রকৃত পক্ষে রাজপরুষদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাধারণ হিন্দু-মসুলমানগণ মধ্যযুগে সাহিত্য অনুশীলনে আত্মনিয়োগ করেছিলন।
॥ দুই ॥
হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন দেবতা হলেন শিব। শিব কৃষকের দেবতা অষ্টাদশ শতকে রচিত রামেশ্বরের শিবায়ণ বা বিশমঙ্গলে পৌরাণিক দেবতা শিবের ত্রিশূল থেকে কৃষিকার্যের সহায়কস্বরূপ কোদাল-ফাল প্রভৃতি তৈরি করা হয়েছিল।
ক্রমে ব্রাহ্মণ্য চাপে নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরা শিবের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে শক্তি দেবতা প্রতিষ্ঠা করে। এ ভাবে শক্তি নিয়ে মঙ্গলকাব্য লেখা শুরু হয়।
সমাজের নীচু শ্রেণীর পূজ্য দেবতা হলো ধর্মঠাকুর। এছাড়া মঙ্গলচ-ী বা চ-ী, মনসা বা বিষহরী, ষষ্ঠী প্রভৃতি দেবতাও প্রধানত নিম্ন শ্রেণীর মধ্যেই পূজিত হতো। এসব লৌকিক দেবতা বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি। বাঙালির ছড়া, পাঁচালিতে এঁরা যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে। লৌকিক দেবতাদের মধ্যে ধর্মঠাকুর ও দক্ষিণা রায় ছাড়া আর সবাই স্ত্রী দেবতা। বাংলার দেবতারা বিভিন্ন নিমিত্তির সাথে বিজড়িত। যেমন সাপের ভয় দূর করার জন্য মনসা, বাঘের ভয় দূর করার জন্য কালুরায়, বসন্ত-ওলাওঠার জন্য শীতলাবিবি ও ওলাবিবি প্রভৃতি দেবীর পূজা চালু করে। এরা সকলের ব্যাধি নিবারণের দেবতা হিসেবে পূজা পেয়ে আসছে। তুর্কী আগমনের পর জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্মের শেষ চিহ্নটুকুও বিধ্বস্ত হয়। অপরদিকে অভিজাত হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে।
“উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে বাঙালি সাধারণের মধ্যে পারস্পরিক মিলন সংহতির আকাক্সক্ষা হয়ে উঠেছে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর। ফলে একদিকে ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যকে প-িতেরা লোকজীবনের সন্নিকটস্থ করেছেন। অন্যদিকে লোক সংস্কার ও লোকধর্মের আবহমান ধারাকে স্বীকার করে নিয়েছেন নবজাগ্রত স্মার্ত পৌরাণিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে।”
॥ তিন ॥
জয়দেব গোস্বামীর গীতগোবিন্দে হিন্দু উচ্চশ্রেণীর পূজিত বিষ্ণুর সাথে রাধা বল্লভ কৃষ্ণের একাত্মতা বিধানের ফলে ধর্ম-সংস্কৃতিগত এক অপূর্ব ভাব সম্মিলনের সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে মেথিল রাজসভার কবি বিদ্যাপতি ও বাংলার গ্রামীণ কবি বড়ু চ-ীদাস জীবনধর্মের ঐতিহ্যকে রাধাকৃষ্ণের লীলায় প্রমূর্ত করে তুলেছেন। উচ্চ-নীচ সর্বশ্রেণীর মুক্তিদাতা হিসেবে এসেছিলেন শ্রী-চৈতন্যদেব। “চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫০৩) আবির্ভাবের ফলে তাই লাভ করল সুপরিবদ্ধ এক সুষ্ঠু পরিণাম।”
এযুগে বৈষ্ণব পদাবলিই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। কবির ভাষায় :
‘সখি হমারি দুখক (দুঃখের) নাহিওর (সীমা)
ই ভরা বাদর মাহ (মাস) ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।’
রাধার কেবল ভয় কখন না যেন কৃষ্ণের প্রেম টুটে যায়।
কবি লিখেছেন :
এই ভয় উঠে মনে এই ভয় উঠে
না জানি কানুর প্রেম তিলে জানি টুটে।
বৈষ্ণব পদাবলির কবি লিখেছেন :
‘আজু রজনী হম ভাগে গমওল
পেখল পিয়ামুখ চন্দা।
জীবন যৌবন সফরি করি মানল
দশদিশ ভেল নিরদন্দা।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব সাহিত্যকাশে সূর্যরশ্মির মত। চৈতন্যদেবের অলৌকিকতা আরোপন করে বৃন্দাবন দাস, জয়ানন্দ, লোচনদাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ কবিগণ কাব্যরচনা করেছেন।
পদকর্তাদের মধ্যে বড়ু চ-ীদাস, দ্বিজ চ-ীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস, কবিশেখর, শাহ আকবর, নসীর, ফকীর হবীব, সৈয়দ মর্তুযা, সালবেগ, ফকীর লাল, আলাওল, শেখ ভিষন উল্লেখযোগ্য পদকর্তা। মুসলমান কবিগণ বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত না হয়েও বৈষ্ণব পদাবলি রচনা করেছিলেন। আধুনিক যুগে কবি কাজী নজরুল ইসলামও রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে গান রচনা করেছেন।
॥ চার ॥
অনেক মুসলমান কবি এ সময় ইসলামী ভাবধারায়ও কবিতা রচনা করেছেন।
সত্যপীরের মাহাত্ম্যসূচক কাব্য মধ্যযুগের শেষের দিকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় শ্রেণীর কবির হাতেই রচিত হয়েছিল। এ পর্যন্ত ৫২জন কবির রচিত সত্যপীরের পাঁচালি পাওয়া গেছে।
মধ্যযুগের শেষদিকের কবি মুকুন্দরামের ‘চ-ীমঙ্গলে’ সমাজের সাধারণ চিত্র চিত্রিত হয়েছে। কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে নগর জীবনের ছবি পরিস্ফুটিত হয়েছে। কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর অন্নদামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন :
না রবে প্রসাদগুণ না হবে রসাল
অতএব কহি ভাষা যাবনী মেশাল।
প্রাচীন পন্ডিতগণ গিয়াছেন কয়ে
যে হৌক সে হৌক ভাষা কাব্যরস লয়ে॥
মধ্যযুগের সাহিত্য প্রধানত: ধর্মকেন্দ্রিক ছিল। তবে কিছু লেখা ধর্মনিরপেক্ষ এবং কিছু অনুবাদ সাহিত্যও পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারত এ যুগের শ্রেষ্ঠ অনুবাদ সাহিত্য।
মধ্যযুগের সমাজব্যবস্থা ধর্মগত, গোষ্ঠী গত বা সম্প্রদায়গত নয়। সে যুগে হিন্দু-মসুলমান, বৌদ্ধ সবারই নির্দিষ্ট আসন ছিল। ধর্ম নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হতো না। সাহিত্য আস্বাদনের ব্যাপারে গ্রাম ও নগরের মধ্যে মূল্যমান যাচাই করা হতো না। নগরবাসী তার সাহিত্য আস্বাদন করত আর গ্রামবাসীও তার গ্রামীণ অস্তিত্বের গর্ব নিয়ে সাহিত্য অনুশীলন করত। বৈষ্ণব, শাক্ত, অনুবাদ, লৌকিক সাহিত্য প্রভৃতি জাতিধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি সাধারণ হিন্দু-মসুলমান সকলের সমর্থন লাভ করেই তবে রসোত্তীর্ণ হতে পেরেছে।
মধ্যযুগের, বৈষব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ কাব্য, আরবী-ফারসী-বাংলা শব্দের মিশ্ররূপে লেখা রোমান্টিক প্রণয় উপখ্যান সুলতান, নবাবদের প্রশংসা সূচক দরবারি সাহিত্য, পাঁচালি প্রভৃতি বিভিন্ন শাখায় বাংলা কাব্য সমৃদ্ধ হয়। মধ্যযুগে আরবী-ফারসী শব্দের কাব্যিক প্রয়োগে বাংলাভাষা বিশেষ বৈচিত্র্যও লাভ করে।
পিতি পুরুষ
আব্দুল মান্নান সরকার
(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাধুয়ার বিয়েতেও সে শাড়ী পাবে। আর হ্যাঁ, ছেলে হবার সময় পাবে আরও একখানা। মাধী বুড়ির চোখ দুটি চকচক করে। আর সে খুশিতে নাচতে ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু একটা চক্কর দিয়েই সে থেমে যায়। না, বাতের ব্যথাটা যেন বেশি মনে হচ্ছে। রাঁধা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলে, মেলাই বকবক কর গো তুমি। আমার বিয়ে হোবে, বাচ্চা হোবে, সিতো অনেক দিন লাগবে গো! তার আগে তু মরিয়া যাবি না!
হা! আমার কপাল!
বুড়ি কপাল চাপড়ায়। এই রাধুয়াকেই সে কি না আঁতুড় ঘরে রসবার পেট থেকে খালাস করেছিল, আজ সেই কিনা মরণের কথা বলল তাকে, তাও আবার পরবের দিন। ‘হ্যাঁ, মানুষতো মরবেক। কে আর মরবেক লাই! মৃত্যুর কথা মনে করেই, না কি বাপ মায়ের স্মরণে সে কাঁদতে বসে। ধাই মাকে কাঁদতে দেখে অনুতপ্ত হয় রাধা। না, আজকের দিনে এভাবে বলা ঠিক হয়নি। রাধা কি আর ভাল মেয়ে? না, তার মা রসবাই ভাল! দেখ কেমন অকৃতজ্ঞ রসবা। এখন হলে সে না কি হাসপাতালে যেতো। কেন, সন্তান খালাসের ব্যাপারে তার হাতযশ কম না কি! ধাঙড়দের কোন বউ ঝি একথা বলবে যে, সে তাদের আঁতুড় ঘরে খালাস করায় নাই। তারপরেও গল্প করার মত কথা আছে তার।
তার তিন কি সাড়ে তিন কুড়ি বছর বয়সে কম করে হলেও দুই কুড়ি পোয়াতিকে খালাস করেছে সে, তার মধ্যে কয়টা বাচ্চা মরেছে? আঙুল গুণে হিসেব করে বুড়ি, লছমনের এক মেয়ে, হাসুয়ার ছেলে এবং দুর্গার ছেলে না মেয়ে তা ঠিক করে উঠতে পারে না। আর কার যেন যমজ দুটো শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। সাকুল্যে কয়টা হল? মোটে পাঁচটা তো! একি আর খুব বেশি না কি গো! সবাইকে ডেকে সে কথা বলতে ইচ্ছে করে বুড়ির। কিন্তু সে মরায় তার আর দোষ কি! অশুভ আত্মারা তো কচি বাচ্চাদের রক্তই চায়! তার ওপর আছে কুপিত বায়ু। ধাইয়ের কাজে এক সময় তার খুব নামডাক হয়েছিল। মিলগুলো ছাড়াও দূর দূর থেকে ডাক আসতো। তবে হ্যাঁ, এখন তার হাত কাঁপে, সে তো ঐ বয়সের দোষ! কিন্তু সুঁচের ছিদ্রে এখনো সে সুতো পরাতে পারে। জওহরীলালের বাপের মৃত্যুর কথা সব কিছুই মনে আছে। সে ছিল তাগড়া জোয়ান। ডেরেন না কি একটা পরিষ্কার করতে গিয়েছিল, আর নেমে পড়েছিল গর্তের মধ্যে। সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে মারা যায় সে। গর্তের ভেতরেই মরে পড়েছিল। সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল দেড়শ’ টাকা, ধাঙড়ের জীবনের মূল্য! স্বামীর সে করুণ মৃত্যু ভুলতেই বেশি বেশি মদ গিলতে শুরু করেছিল। জওহরীলাল সবে তখন তার পেটে এসেছে। তারপর সে ভূমিষ্ঠ হলো। একা একা ছেলে মানুষ করতে কত কষ্ট হয়েছিল তার। মায়ের সে কষ্ট ছেলে আর কতটা বোঝে!
হা কপাল!
জওহরীলালের বউ পেট চেপে বসে পড়েছে। মেয়েগুলো নেচেই চলেছে। তবে বউ থামল কেন? হাসপাতালে গিয়ে পেট কাটিয়েছে বউ, কাটা জায়গায় ব্যথা হচ্ছে নিশ্চয়। বুড়ি আপন মনে বলে, যা গরমেন্টের হাসপাতালে যা না কেনে। গরমেন্টের হাসপাতালে সিখানে বড় পাশের ডাকতর বাবুরা আছে। কত বড়াই করেছিল জওহরীলাল। এখন দুকথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় ছেলেকে। খুবতো পেট কেটে বাচ্চা বের করলি, বউতো তুর বুড়ি হয়ে গেল আধেক বয়সেই।
বকুল গাছের নিচে জুয়োর ফর পেতেছে বুনিয়া। আসর বেশ জমে উঠেছে, দান শেষে উল্লাস করছে পুরুষগুলো। বুনিয়াকে বাধা দিবে কে? সে ইউনিয়ন লিডার রওশনের লোক। ধাঙড়দের পয়সা হাতিয়ে নেবার বুদ্ধি সেই হয়তো বুনিয়াকে দিয়েছে। মেনেজারকে এসব বলে লাভ নেই, রওশনকে পেয়ার করে সে। ভূতোর শুয়োর নিয়ে হল্লা করছে ছোট ছোট বাচ্চারা, তাদের হয়তো তর সইছে না, ওটাকে কখন কাটা হবে।
জওহরীলালের বাপকে এবার যেন স্বপ্নে দেখল না। এবার সে মিঠাই খেতে চায়নি তার কাছে। কথাটা মনে হলে মাধী বুড়ির দুটো চোখ জলে ভরে ওঠে। কেন, বউ ব্যাটার সংসার দেখার ইচ্ছেও কি হয় না!
অপঘাতে যে মারা যায় তার আত্মা তো অতৃপ্তই থাকে। সে অতৃপ্তি নিয়েই তো ঘুরে ঘুরে আসে আপনজনের কাছে। কে জানে, আজও হয়তো সে এসেছে, সেই শুধু দেখতে পাচ্ছে না। মাধী বুড়ি এদিক ওদিক তাকায়, একবার ভাবে বনমালীকে কথাটা বলে। সে ছাড়া কে আর বুঝবে তার দুঃখ। পরবের মিঠাই কেনার পয়সা মেনেজোর বাবুর দেওয়ার কথা। জওহরীলালকে সাথে নিয়ে জমাদার গেছে মেনেজারের বাংলোয়। বনমালীকে কথাটা জানানো দরকার। বনমালীকে আসতে দেখে খুশি হয় বুড়ি।
বনমালীকে আরও একটা কথা জিগ্যেস করতে হবে, সে পিতি পুরুষের কথা। এ বিষয়ে তার চাইতে কে আর ভাল জানে। আর একটা কথা ভেবে লজ্জা হয় তার। প্রতিবছর সবার আগে সেইতো বনমালীকে হোলির আবির মেখে দেয়, এবার দেয়নি কেন? তবে হ্যাঁ, আজকাল অনেক কিছু আর মনে থাকে না। মেনেজোর বাবু মিঠাই খাওয়াবে মিলের পয়সায় সে কথা শুনে হাসে বনমালী।
তু হাসছিস কেনে? মিঠাই দিবেক লাই মেনেজার বাবু?
তুর কথা ঠিক আছে, একদম ঠিক। কিন্তুক সে পয়সা তো কেটে লিবে, হ্যাঁ।
কেটে লিবে! কেনে?
লিবে, হ্যাঁ।
বনমালী নিজের কথার নিশ্চয়তা বোঝাতে মাথা দোলায়। বাবুদের চিনতে কি আর বাকি আছে তার!
তুর যে কথা বুনো, পরবের দিনে মিঠাই খাওয়াবে, পুণ্যি হোবে না!
বনমালীর কথা বুঝি বিশ্বাস হতে চায় না বুড়ির। পাপ পুণ্যের ধারণা যে সবার এক নয় এ কথা বনমালী তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে, সে আরও জানে এই শিক্ষিত বাবুদের মানসিক জটিলতা আরও বেশি, তাদের মত সরল, সহজভাবে কোন কিছু গ্রহণ করতে জানে না। বাবুদের ধরম বিশ্বাস সেও খুব জটিল। কথাগুলো বলে না বনমালী, মাধু এ সবের কি বুঝবে!
কুলো থেকে কিছুটা আবির নিয়ে বনমালীর মুখে মেখে দেয় বুড়ি। তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। জওহরীলালের বাপ সেই কবে মরেছে, কিন্তু মাধুর অন্তরের ক্ষত আর শুকালো কই। বনমালী মুঠো মুঠো আবির মাধী বুড়ির মাথায় ছড়িয়ে দিলে কৈশোরিক চপলতায় হেসে ওঠে দুজন।
তুর মনে লাই, সি চা বাগানে!
বাক্যটা মাধু শেষ করতে পারে না, তার আগেই কি এক লজ্জা ঘিরে ধরে তাকে। ঘাড় নাড়ে বনমালী,
হ্যাঁ, সব তার মনে আছে। আসামের কোন এক চা বাগানে জন্ম হয়েছিল তাদের। শৈশবকাল সেখানেই কেটেছিল। বাপ-মায়েরা সৈয়দপুর রেল কলনিতে চাকরি নিলে একদিন সমস্ত লটবহর নিয়ে ট্রেনে গাদাগাদি করে চলে এসেছিল। তারপর মানুষ বাড়ে, আয় রোজগার কমে, আবার নতুন করে কর্মের খোঁজে শুরু হয়। টঙ্গীতে তখন নতুন নতুন মিল কারখানা হচ্ছে। এ সবই পাকিস্তানের প্রথম দিকের কথা। মিলগুলোতে বাধা মাইনে, বাসের জন্য পাকা ঘর, রেশনে চাল, ডাল, নুন চিনি দিবে, আর কি চাই; দলে দলে ছুটে এসেছিল ধাঙড়েরা। ঠিকানা বদল ধাঙড়দের জীবনে এ কি আর নতুন কিছু! দাদা, পর দাদারা উন্মুল, উদ্বাস্তু হয়ে কবে কোনকালে নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করেছিল? না, বনমালী তার সব কিছু জানে না। চোখ বুজলেই বনমালী শুধু দেখতে পায় এক দল উদ্বাস্তু মানুষ চলেছে নতুন করে বাঁচার আশায়, নতুন ঠিকানার সন্ধানে, কিন্তু কোথাও তাদের আর শেকড় গাড়া হয়নি! টঙ্গীর মিলগুলোতে বিহারীরা সংখ্যায় ছিল অনেক, পঁয়ষট্টির ভারত-পাক যুদ্ধের সময় তারা রায়ট করেছিল।
সে সময় বনমালীরাও পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারিরা এদেশের মানুষের সাথে বেইমানি করেছিল। না, ধাঙড়েরা কেউ এমন কাজ করেনি, বরং জীবনবাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু এত কিছু করেও তাদের জন্য একটুখানি মাটির ব্যবস্থা করেনি কেউ। দেশের মানুষ বলে কেউ কি আর তাদের ডেকে কাছে বসায়! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বনমালী কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
অ-বুনো, কথা কহিছিস না কেনে?
বনমালী কিছু বলে না। কৃষ্ণচূড়ার ডাল ভরে লাল লাল ফুল ফুটেছে। সে দিকে তন্ময় চোখে তাকিয়ে থাকে বনমালী। মনে হয় গাছে বুঝি কেউ হোলির আবির ছিটিয়ে দিয়েছে। ডালগুলো দুলছে না! বনমালীর মনে হয় পিতি পুরুষদের আত্মা নাচ জুড়ে দিয়েছে।
চমকে ওঠে বনমালী। মাধী বুড়ির কানে ফিসফিস করে বলে, মাধুয়ারে দেখ না কেনে পিতি পুরুষÑ
বাক্য শেষ করতে পারে না বনমালী।
পিতি পুরুষ! কুথা!
বাকরুদ্ধ হয়ে আসে মাধী বুড়ির।
পিতি পুরুষ, হ্যাঁ!
বনমালী মাথা নাড়ে।
কুথাকে! বোল না কেনে?
সহসা বনমালীর মুখেও আর কোন উত্তর যোগায় না। স্বর্গে, পাতালে, না কি উন্মূল, উদ্বাস্তু হয়ে একদল মানুষের সেই ক্রমাগত ছোটাছুটি, ঠিকানা বদল! বনমালীর চোখে কেবলই ভাসতে থাকে সেই এক দৃশ্য! পোটলা-পুটলি নিয়ে একদল মানুষের বিরামহীনভাবে চলা।
২য় অধ্যায় :
বনমালী বুড়ো দিন-রাত দাওয়ায় বসে থাকে আর নিজের মন্দ কপাল নিয়ে আক্ষেপ করে। ব্যাটা-ব্যাটার বউয়ের ঘাড়ে বসে সে আর কতকাল খাবে? সমবয়সী আর কেউ বেঁচে নেই, তারা যেন নিজেদের আড়াল করে ফেলেছে সংসারের এই জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, এমনটাই মনে হয় বনমালীর। বুড়ো বয়সের কষ্ট বড় কম নয়, নানা ব্যামো লেগেই আছে; এই দাঁত ব্যথা হলো তো পরদিনই পা ফুলে ঢোল। মুখে রুচি নেই, পেটে বায়ু জমে; আর বায়ুর প্রকোপে সারারাত কষ্ট পেতে হয়। আলু আর মসুরের ডাল খেলে পেটে বায়ু জমে বলে ডাক্তার ও-দুটো বাদ দিতে বলেছে, করলার ঝোল খেতে বলেছে; কিন্তু নিত্য তাকে কে আর করলার ঝোল খাওয়াবে। করলার দাম বেশি বলে সুখেন তা কেনে না। ছেলেকে বলতে গেলে উল্টো দু’ কথা শুনতে হবে, বনমালীকে তাই নীরবে কষ্ট সহ্য করতে হয়। একেক সময় আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয় তার। কেন সে বেঁচে আছে, আর কী করতে? মাঝে মধ্যে ভগবানকেও গালমন্দ করে সে, তার তো আর বুড়ো হওয়া নাই, বুড়ো বয়সের কষ্টও নাই ভগবানের! তবে সে কেন মানুষকে বুড়ো বানিয়ে এত কষ্ট দেয়Ñএ কথা কিছুতেই বুঝে আসে না বনমালীর। ব্যাটার বউ শুনলে আরে ছিঃ ছিঃ রাম! রাম! বলে আর্তনাদ করে ওঠে। সুখেন বলে, ‘কেনে তুই ভগমানের সাথে ঝগড়া করিস, আমরা কি তুকে ভাত কাপড় দেই না?’
আবার ভয়ও হয়, তার এই কথায় ভগবান আবার অসন্তুষ্ট হয় কিনা! মন ভাল থাকলে উল্টোটাও ভাবে, সঙ্গী, সাথীরা মরে গেল, সে তো এখনো বেঁচে আছে ভগবানের কৃপায়। তখন আবার দু’ হাত কপালে ঠেকিয়ে দশবার ক্ষমা ভিক্ষা চায়।
ব্যাটার বউ তার খারাপ নয়, বউয়ের মনটা বড় ভাল বনমালী মনে মনে তা স্বীকার করে। বনমালীর বউ মারা যাবার পর থেকে ব্যাটার বউটাই তো তার দেখাশোনা করছে। কত সময় সবিতার মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেছে বনমালী, ব্যাটার বউয়ের মাঝে মায়ের ছায়া দেখতে পেয়ে।
এখন আবার কি এক ব্যামোতে ধরেছে, রাতে হাত পায়ের পাতা জ্বালা করে, বারবার পেচ্ছাব হয়। সুখেনের বউ এ-পাড়া, ও-পাড়া ঘুরে জগডুমুর আর তেলাকুচার পাতা এনে রস করে খাওয়ায়। (চলবে)
আগস্ট মাসে চলবে মাউন্টেন ইকোস সাহিত্য উৎসব
আগামী মাস থেকে শুরু হতে যাচ্ছে মাউন্টেন ইকোস সাহিত্য উৎসব। ইন্ডিয়া-ভুটান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে এ উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী ৯-১১ আগস্ট তিন দিনব্যাপী এ উৎসব চলবে বলে আয়োজকরা জানান। এ বছর চতুর্থবারের মতো উৎসবটির আয়োজন করা হচ্ছে। মাউন্টেন ইকোস সাহিত্য উৎসবে সাহিত্য আলোচনাসহ নাটক মঞ্চায়ন ও বিভিন্ন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া এ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে একটি চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে বলে আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানায়।

টেলিগ্রাফ বাথ ফেস্টিভ্যাল অব চিলড্রেনস্ লিটারেচার-২০১৩
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হতে যাচ্ছে টেলিগ্রাফ বাথ ফেস্টিভ্যাল অব চিলড্রেনস লিটারেচার। সপ্তমবারের মতো আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি শুরু হবে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে আর তা চলবে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত। টেলিগ্রাফ বাথ ফেস্টিভ্যাল যুক্তরাজ্যে আয়োজিত সবচেয়ে বড় শিশু সাহিত্য উৎসব। এবারের উৎসবে শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। উৎসবে স্কুল পর্যায়ের শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিতর্ক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়াও শিশু সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা, বিভিন্ন দেশের শিশু সাহিত্যের অনুবাদ বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাও থাকবে এবারের আয়োজনে।

চলে গেলেন ব্রিটিশ নাট্যকার আমেরিকান কবি ও অনুবাদক
চলে গেলেন ব্রিটিশ নাট্যকার স্নু উইলসন। ৬৪ বছর বয়সে হার্ট এটাকে মারা যান উইলসন। তাঁর স্ত্রী এ্যান মেকফেরান সংবাদ মাধ্যমকে এ কথা জানান। স্নু উইলসন নাটক ছাড়াও চিত্রনাট্য, উপন্যাস ও গান লিখেছেন। তবে তিনি নাট্যকার হিসেবে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
গত ২৮ জুন চলে গেলেন আমেরিকার আরেক বিখ্যাত কবি ও অনুবাদক এফডি রিভ। চুরাশি বছর বয়সে ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগে মারা যান রিভ। কবি রিভ ছিলেন অভিনেতা ক্রিস্টোফার বিভের বাবা। কবিতা ছাড়াও তিনি কিছু উপন্যাস এবং কিছু রাশিয়ান সাহিত্যের অনুবাদ করেন। এজন্য তিনি ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেন।
ইন্টারনেট অবলম্বনে, সাবিনা ইয়াসমিন
কবিতা
চশমার দোকানে

জাহিদ হায়দার

আমার চোখের ভেতর প্রতীক্ষা,
কাঁচের ছাদের নিচে
ফরসা আলোয় চশমার ফ্রেমের অপেক্ষা,
এসো গ্রহণের চোখ,
এসো ভোর দেখা চোখ।

গোলাকার ফ্রেমের গহ্বরে শাদা শূন্যতা
আয়তকারে কালো শূন্যতা,
চারকোনায় নীল শূন্যতা
নিঃশব্দে বসে আছে;

সারাক্ষণ খোঁজে চোখ,
চোখের ভেতরে প্রেম;

স্বপনে নয়ন ভেসে যাক।


শাহবাগে প্রত্নভালোবাসা

নূহ-উল-আলম লেনিন

শেকড় সন্ধানী মানুষ খুঁজে ফিরি প্রতœ-ভালোবাসা
নেফারতিতির মমির শরীরে, হরপ্পার সালঙ্করা তরুণীর
নাভিমূলে, গঙ্গা-ঋদ্ধি, উয়ারি-বটেশ্বরে এবং
সমতট-বিক্রমপুরের মাটির গভীরে....।
লুপ্ত প্রায় বসতির চিহ্ন অবশেষ, স্থাপত্য,
ভাস্কর্য, শিলালিপি, প্রাচীন মুদ্রা, অলঙ্কার এবং বিবিধ
হাতিয়ার-সভ্যতার উপাদান আমাদের বিস্মিত
করে, স্বস্তি দেয়; কিন্তু শান্তি দেয় না।

ইতিহাস সমাকীর্ণ হিংসায়, যুদ্ধে, রক্ত¯œাত পাশব উল্লাশে,
ধর্মে-ধর্মে, রাজায় রাজায়, জাতি গোত্র বর্ণ নানা জনপদে;
দখলের, দাসত্বের, শ্রেষ্ঠত্বের এবং সীমাহীন ভোগের আগুনে,
ব্যভিচারে, লুণ্ঠনে, গণহত্যায়, ধ্বংসযজ্ঞে।

সত্যসন্ধ মানুষ খুঁজে ফেরে মানুষের সত্য পরিচয়। মানুষের
আদলে মানুষ নাকি অন্য কিছু, অন্য কোনো জন্ম-প্রবণতা
অন্য স্বরূপ।
চৈতন্যে মানুষের মুক্তির সাধনা, শান্তির অন্বেষা, সখ্য ও
ভালোবাসার চিরবসন্ত।

সম্প্রতি শাহবাগে এত আলো, এত গান, অনিঃশেষ ভালোবাসা-
মানব বন্দনা, ইতিহাসের অমল ‘নতুন পাঠ’ বাঙালির সত্য পরিচয়
আমাদের মুগ্ধ করে, ঋদ্ধ করে, চৈতন্যে প্রবল বন্যা ধুয়ে মুছে নিয়ে
যায় ক্লিষ্ট আবিলতা।

পুনর্বার খুঁজে পাই একাত্তর, আমাদের প্রতœ-ভালোবাসা
আমাদের ভবিষ্যত, অবারিত শান্তির স্বপ্নিল আকাশ।


টান

ফারুক মাহমুদ

অন্ধ যদি, চোখের আলো ফোটে
উড়িয়ে দেব, পুড়িয়ে দেব দাহ
পায়ের পাতা পাতার মতো কাঁপে
স্তব্ধ ছায়া, সুর ফুটেছে ঠোঁটে

কাজের তাড়া ‘শিকায় তুলে’ রাখি
সময়, তুমি সময় করে এসো
বাগান-পথে সবুজ হাওয়া দোলে
কোথায় যেন গান জুড়েছে পাখি

লাল পিঁপড়ে, কলো পিঁপড়ে আছে
ট্রাফিক ভেঙে যাব প্রেমের কাছে


পৃথিবীর কার্নিশে ঝুলে আছে আফ্রিকার প্রাণ
মানজুর মুহাম্মদ

(“ঞযব মৎবধঃবংঃ মষড়ৎু রহ ষরারহম
ষরবং হড়ঃ হবাবৎ ভধষষরহম,
নঁঃ রহ ৎরংরহম বাবৎু ঃরসব বি ভধষষ.”
-ঘবষংড়হ গধহফবষধ)

নিথর নিস্তরঙ্গে নৈশব্দও নেই।
ঢেউয়ের নীরব শীলা-কান্নায় থিতু বনষ্পতির দুল
প্রজাপতি-কাল, কৃষ্ণালোর থোকা থোকা ফুল
আমাজানের শংকিত দুই কূল।
জোহান্সবার্গ আকণ্ঠ পান করে সটান শুয়ে পড়েছে
সুনশান তপ্ত পীচে। কোথাও সাড়া নেই, তাড়া নেই আর
রোদের ঠোঁটে লেপ্টে আছে সংজ্ঞাহীন সুনীল-গান
পৃথিবীর কার্নিশে বড় মায়ায় ঝুলে আছে আফ্রিকার প্রাণ।

ভেঙে দেই মানুষকণ্ঠী আহ্বানে

যুবক অনার্য

এই যে শুয়ে আছো শুয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছো তুমি
যে-তুমি বুঝতে সমর্থ নও স্বাধীনতা কাকে বলে
স্বাধীনতা প্রয়োজন যে-শিশু জন্ম নিয়েছে আর
যে-শিশু জন্ম নেবে না কোনো কোলেÑজোছনা ঝরাবে বলে
চাঁদেরও সকাশে। বুঝতে সমর্থ নও বিপ্লব কোন পথে
ডান-বাম ছেড়ে এক বিপন্ন গোলাপের পথে। বুঝতে
সমর্থ নও ধর্মই শেষ কথা নাকি কেউ এই নামে
নিজস্ব অভিযানে দ্বিতীয় বাসনার দিকে হেঁটে চলে!
হয়তো আলোকবর্ষ পর হতে পারে যে-তুমি ঘুমিয়ে
তলিয়ে গ্যাছো সহস্র শতকের পর এই ঘুম ভেঙে যাবে
ভাঙবেই। এসোই না ঘুম ভাঙি ভেঙে দেই রাজপথে
চরাচলে মিছিলের মানুষকণ্ঠী আহ্বানে।

বাতাসের রেলগাড়ি

মিজানুর রহমান বেলাল
বাতাসের রেলগাড়িতে দূরবীন স্মৃতির কোলাহল উড়ে যায়।

ধূলিঝড় বুকের পাটাতনে সবুজ ধানপাতার পিছুটান ভুলে
নৈঃশব্দের বোবা নদীতীরে-জলের ঠোঁটে চুম্বন এঁকে দেয়;
চুম্বনের ভাষা তো বোঝে না-চঞ্চলা উদাসী বৈশাখী পিঞ্জিরা।

কলাপাতার অবুঝ শব্দ হৃদয়ের মন্দিরজুড়ে উড়ুউড়ু হাতছানি
বাতাসের রেলগাড়ি নিঃশর্ত জীবনের সরুপথে ধূলি উড়ায়।

বৈশাখী যুবতীর কালো মেঘের আঁচলে ঝরা পাতার কারুকাজ
জোছনার উঠোনে দুধেধোয়া নবজাতক শাদা আলো হতে চায়।

বাতাসের রেলগাড়ি শন্শন্ ঢুকে যায়Ñফুসফুসের স্টেশনে
কখনো কখনো উর্বর নিশ্বাসের চিকচিক পাতাল রেলপথে
মাতাল হয়ে অবিরাম চলছে; চলছে লাল নীল ঘুমের মহাশূন্যে।

অনার্য সভাব
মাসুদ পথিক

এই যে অনার্য সভাব, কিভাবে তোমাকে পেলাম বাস্তু-নগরে
কোল-বার্তা যৌনতাবোধে জারি থাকে ভূ-মধ্য কুঠারে

কে তবে শ্রমপূর্ব ইতিহাস বুনেছো মাঠের কিনারে কিনারে
ওরে, এইমতো শ্রমিকের শস্য-হাব ভিতরে বাহিরে ভেতরে

আর বুনেছি ঘর-দৌড়; কন্যা তোর, মাঠের কোলে কোলে
যে প্রকারে সময় বড় হয় হাড়ে গোপন গহিন ঘাম-ইশকুলে


মৃত্যুর কাছাকাছি

সেঁজুতি শুভ আহ্মেদ

এখান থেকেও শুরু করতে পারি
অধোগত কীটদের মতো
আগুনে আত্মাহুতি না দিয়ে
এখান থেকেও শুরু করতে পারি।

জীবনের যদি একরতিও অবশিষ্ট থাকে
তাতে আকাশের বিদ্যুৎ সংযোজন করবো
যাবতীয় মঙ্গলবোধ এখনও লোপ পায়নি
হারিয়ে যায়নি কিঞ্চিৎ প্রাপ্তির আশা

সন্ধিক্ষণে এক প্রকার জটিল রসায়ন
ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত করে চলার গতি

একটা অদৃশ্য বাতিঘর অভিমুখে
নিরন্তর ছুটে চলা ছুটে চলা

সময়গুলো যেন কষ্টের দড়ি দিয়ে তৈরি
ফাঁস- ধাবিত করে মৃত্যুর কাছাকাছি।


বেলা-অবেলার খেলা

শাহ জামিউর রহমান

সকাল দুপুর সন্ধেবেলা
খেলে যাই নিজের সঙ্গে একই খেলা
একলা খেলি আপন মনে
আকাশ এবং সবুজ বনে....

কেউবা বলে : কেমন খেলা বাধা না মানা?
আমি বলি : খেলার মর্ম নেইতো জানা।
ওরা চায়, একই খেলায় পাল্লা দিতে
আমি খেলে যাই উদাসীনের আহ্লাদিতে।

সব থেমে যায় ধীরে ধীরে একে একে
চিরকালের খেলায় যদি কেউবা টেকে
ভাবে উল্লাসে, করে দিলাম কেমন জব্দ
কিছু পরে দেখি সবার খেলাই হঠাৎ স্তব্ধ।

কেউ থাকে না তবু খেলে যাই
পুরনো নিজেকে ফিরে ফিরে পাই।
সেই কবে থেকে প্রকৃতির খেলা
খেলে চলেছি বেলা-অবলো।