মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
হিলারির চৌকস কূটনীতি
ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর
এই হেমন্তে আবারও আমি যুক্তরাষ্ট্রে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলছে বিশাল বনরাজির পাতাগুলোর হলুদ-লালের সমারোহ। প্রকৃতির এই অপরূপ সমারোহের বিপরীতে পরিচিত রাজনীতির পটে এখন আলোচিত হচ্ছে একটি নাম। হিলারি রডহাম ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক নিশ্চিত প্রতিদ্বন্দ্বী।
২০০৮ সালে বারাক ওবামার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থিতা নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন হিলারি। একই সালের জুন মাসে তিনি তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ডেমোক্র্যাট দল কর্তৃক ওবামাকে সমর্থন, সে দেশে বর্ণবাদকে হারানো সামাজিক বিপ্লবের স্পষ্টতর প্রতিফলন এবং সম্ভবত সেই প্রেক্ষিতে আবারও জন কেনেডির উজ্জীবিত ক্যামেলিয়েটের পক্ষ থেকে এ্যাডওয়ার্ড কেনেডি কর্তৃক ওবামাকে প্রার্থী হিসেবে গ্রহণ কাজ করেছে। ক্যামেলিয়েটের ভাবধারায় সম্পৃক্ত হয়ে ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই হিলারিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে আমন্ত্রণ জানান। রাজনৈতিকভাবে নিযুক্তীয় সহযোগী ও সহকারীদের তিনি পছন্দমতো নিযুক্ত করতে পারবেন এই শর্তে হিলারি ওবামার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রায় ১৪,০০০ বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কূটনীতিবিদ কাজ করেন। এঁরা হলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অংশ ও প্রযুক্তীয় উপকরণ। তাঁদের সহায়তা করেন প্রায় ১১,০০০ ভিন্নতর সার্ভিস থেকে নিয়ে আসা সুশীলসেবক; এর বাইরে বিদেশে প্রায় ২৭০টি দূতাবাস ও কনসুলেটে প্রায় ৫০,০০০ স্থানীয় কর্মচারীবৃন্দ কাজ করেন। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অনুবিভাগ হিসেবে দায়িত্ব সম্পাদন করে থাকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রেসিডেন্টের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বাধীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব ও কার্যাবলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, ন্যায়বিচার, স্বাদেশিক নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ সকল সংগঠনকে সংশ্লিষ্ট করে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের ভিত্তিতে নেয়া হয়। এ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেন, তা নির্ভর করে তাঁর যোগ্যতা ও তাঁর অনুকূলে প্রেসিডেন্টের আস্থার ওপর।
হিলারি প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রথম মেয়াদের চেয়ে কিছু বেশি সময় বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির শপথগ্রহণ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনকালীন তিনি তাঁর নীতি ও কার্যক্রমে দুটি সূত্র অনুসরণ করেন। এক. প্রথাগত প্রত্যয়ের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকে তিনি অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, আইনী ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার সংবলিত করে সার্বিকভাবে সমন্বয়মূলক নীতি ও কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর ভাষায়, এ সব হাতিয়ার চৌকস ক্ষমতার উপকরণ এবং এই চৌকস ক্ষমতাকে ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হওয়া সঙ্গত। দুই. বিদেশে এই চৌকস ক্ষমতার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সে দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুখ্য নির্বাহীর ভূমিকায় থাকবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারির কার্যকাল বিশ্লেষণ করলে এ কথা স্পষ্টতর হয় যে, তিনি তাঁর নীতি ও কার্যক্রমে এই দুটি সূত্র সবসময় প্রতিপালন ও অনুসরণ করে গেছেন।
রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা বিষয়ক পরিবর্তন বা সংস্কার মূলত প্রশাসনিক বা পদ্ধতিমূলক। এই ভূমিকা কার্যকরণ সূত্র অনুযায়ী চৌকস ক্ষমতার প্রেক্ষিতে কূটনীতিকে জোরদার ও ফলপ্রসূ করার প্রশাসনিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচ্য। পক্ষান্তরে চৌকস ক্ষমতার ভিত্তিতে কূটনীতিকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রযুক্তকরণ বিশেষ পর্যালোচনার দাবিদার। বস্তুত সাম্প্রতিককালে হিলারিকে যুক্তরাষ্ট্র তথা অন্যান্য পশ্চিমা দেশের কূটনীতির এই রূপ রূপান্তরণের দিক-নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া যায়।
বিল ক্লিনটন তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা যোশেফ নই (ঘুব) কূটনীতির ক্ষেত্রে চৌকস ক্ষমতা তত্ত্বের প্রবক্তা। ২০০৪ সালে নই লেখেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভিন্নতর দেশকে প্রভাবিত করার জন্য সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সমন্বয়ে গঠিত শক্তি সাধারণভাবে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এর বাইরে কোমল ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমেও অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। তাঁর মতে, এ সব ক্ষেত্রে অনুকূলতম নীতি হওয়া সঙ্গত কঠিন ও কোমল ক্ষমতার মিশ্রণ বা চৌকস শক্তির প্রয়োগ। তাঁর মতে, সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে এই চৌকস ক্ষমতাই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভিন্নতর দেশে প্রভাব স্থাপন ও বিস্তারের সবচেয়ে সফল মাধ্যম। এই প্রেক্ষিতে বাইরের পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তার এবং স্বার্থ রক্ষা ও প্রসারণের জন্য প্রয়োজন হবে বাণিজ্যের প্রভাব, বিনিয়োগের প্রতিপত্তি, দানশীলতায় অংশীদারিত্ব এবং সামরিক সহযোগিতা। এ সবের জন্য প্রয়োজন হবে সরকারের বাইরেও কূটনৈতিক সম্পর্কযুক্ত দেশের সর্বপর্যায়ের সংগঠন ও জনগণের সঙ্গে সংযোগ ও সম্পর্ক রক্ষাকরণ ও প্রসারণ। বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সঙ্গে সহযোগিতা কূটনৈতিকভাবে স্বীকৃত দেশে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক লালিত স্বাধীনতার অনুকূলে ভাবমূর্তি স্থাপন ও প্রসারণে হিলারির মতে সবচেয়ে বেশি কার্যশীল। ২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেয়ার সময়ে হিলারি বলেন, কূটনীতি ও উন্নয়নকে পৃথিবীব্যাপী উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে এনে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা গর্ববোধ করেছেন। তাঁর এক সহযোগীর ভাষায় হিলারি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্কযুক্ত দেশভিত্তিক বহুধা বিভক্ত ও বিচিত্র পৃথিবীর কাছে পরিচিত করেছেন এবং পৃথিবী এ পরিচিতিকে স্বাগত জানিয়েছে।
হিলারির এই দেশভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি সংবেদনশীল চৌকস কূটনীতির কথা বলেছিলাম গত ২৪ সেপ্টেম্বর এ দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজেনাকে। সে দিন এ দেশকে জানার আগ্রহে ৬৪ জেলা সফরের মাঝপথে মজেনা এসেছিলেন আমাদের পৈত্রিকবাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া থানার গুলবাহার গ্রামে। চা-পানের পর বাড়ির পাশে আমার পিতা কর্তৃক স্থাপিত স্কুল ও কলেজের মিলনায়তন ভরে আসা ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন তারা জীবনে কে কি হতে চায়।
(বাকী অংশ আগামীকাল)
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
জেনারেল আইয়ুবের আমলে ১৯৬৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর কাশ্মীরে ‘হযরতের পবিত্র কেশ’ চুরির অজুহাতে ১৯৬৪ সালে রক্তক্ষয়ী রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় দশ হাজার হিন্দু নিহত হয়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ‘বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও’ প্রতিরোধে ‘ত্রিশজন মুসলিম যুবক হিন্দুদের প্রাণরক্ষার জন্য আত্মত্যাগ করেন’ (বৃহত্তর ঢাকা জেলা গেজেটিয়ার, বাংলাদেশ সরকার, ১৯৯৫, পৃঃ ১০২)।
পাকিস্তান সরকার ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধ ও ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত আইয়ুব খান ও লাল বাহাদুরের মধ্যে ‘তাসখান্দ’ চুক্তি প্রেক্ষাপটের ফলশ্রুতিতে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবের ৬ দফাÑ বাঙালীর বাঁচার আন্দোলন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে বাঙালী সম্বিত ফিরে পায়, বাঙালী জাতীয়তাবাদ বেগবান হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯ এবং সর্বোপরি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু নাগরিক ও নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ জাতীয় ১৬৭/১৬৯ ও প্রাদেশিক পরিষদে ২৮৮/৩০০টি আসনে বিরাট বিজয় অর্জন করে। ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের শেষপাদে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যার কারণে ২৫-২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১০ এপ্রিল ১৯৭১ অপরাহ্ণে জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত স্বাধীনতা ঘোষণা মতে, বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী মর্মে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী কারাগারে বন্দী থাকায় উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথগ্রহণ করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত গীত হয়। বঙ্গবন্ধুর একাত্তরে অনুপস্থিতিতে তাঁর বিশ্বস্ত সহচর জাতীয় নেতৃবৃন্দ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলী প্রমুখের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতায় ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়।
পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্বিচার গণহত্যা, এক কোটি বাঙালীকে ভারতে আশ্রয় প্রদান, প্রচারমাধ্যমে বাংলাদেশের পাক-অত্যাচার ও গণহত্যাকে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের অজুহাত প্রতিহত করে বাইরের পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ভারতের বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) প্রতিষ্ঠার সহযোগিতা, শরণার্থীদের আশ্রয়দান, যুবশিবির স্থাপনে সাহায্য ও মুজিব বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত বাহিনী তথা সেক্টর কমান্ডার সেনাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রসদ ও সর্বপ্রকার সাহায্য, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন, বিশ্বব্যাপী গণসংযোগ ও প্রচার, প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের অর্থাৎ মুজিবনগর সরকারকে সব রকম সহযোগিতা প্রদান। একাত্তরে অমুসলিম নাগরিকগণ পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংস অত্যাচার, গণহত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মুখোমুখি হয় এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৯৮,৯৯,৩০৫ জন বাঙালী শরণার্থী হিসেবে ভারতে ৮২৫টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয় এবং মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
ভারতে এক কোটি বাঙালী শরণার্থীদের আশ্রয় গ্রহণ, তাদের আহার, বাসস্থান, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণসহ জাতিসংঘ, পাশ্চাত্যের দেশসহ গণমাধ্যমে বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে ভারতের জনগণ ও সরকারের সার্বিক সমর্থন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ মাত্রা পায়। এছাড়া পাকিস্তান সরকারের শরণার্থী সম্বন্ধে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর শরণার্থীর পরিসংখ্যান, উদ্দেশ্যমূলক উপ-নির্বাচন আয়োজন ও সেপ্টেম্বর মাসে ইয়াহিয়া খানের জনপ্রতিনিধিদের কাছে ২৭ ডিসেম্বর ’৭১ ক্ষমতা হস্তান্তর করার ঘোষণা থেকে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ওপর বাঙালী মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ ত্বরান্বিত করা হয়।
ইন্দিরা গান্ধী ২৭ সেপ্টেম্বর তিন দিনের মধ্যে মস্কো সফরে যান এবং পরিস্থিতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে রাজি করান। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। অন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন করে। জাতিসংঘে পোল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়ে প্রস্তাবও এনেছিল।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ৩ তারিখে কলকাতায় প্যারেড গ্রাউন্ডে শ্রীমতী গান্ধীর জনসভা ছিল। আমরা এ দিন জনসভায় উপস্থিত ছিলাম। মিটিং চলাকালে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় একটা চিরকুট দিলেন। ইন্দিরাজী ভাষণ ক্ষণকাল বন্ধ করে দ্রুত তা শেষ করলেন।
বাংলাদেশের দুর্দিনের বন্ধু
কাজী সেলিম
(৩০ নবেম্বরের পর)

বিগত শতাব্দীর পাকিস্তানী ঘাতক সেনাবাহিনীর পরিচালিত ভয়াবহ গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় এবং প্রতিকূল বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ ফলশ্রুতি ও একটি চরম অসুবিধাজনক ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করে, সম্পূর্ণ শূন্য হাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক পুনর্গঠন করে দেশকে যখন উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ’৭১-এর ঘাপটি মেরে থাকা পরাজিত দুশমন, দালাল, ষড়যন্ত্রকারী পাক-মার্কিন মদদপ্রাপ্ত ঘাতক চক্র, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা, মার্শাল টিটোর বন্ধু ও বিশ্বের নির্যাতিত, শোষিত ও নিপীড়িত জনগণের কণ্ঠস্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট গোটা পরিবারের সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করে।
প্রয়াত এই দুই সংগ্রামী মহান জনপ্রিয় নেতার দেশ পরিচালনা ও দেশাত্মবোধক নেতৃত্বের একটি অভিন্ন ও সফল বাস্তব উদ্দেশ্য ছিল নিজ নিজ দেশের জনগণকে সুখী ও দেশকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তোলা। জোট নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করে বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও আঞ্চলিক সহাবস্থান নীতিকে আরও গভীরতর এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করা মার্শাল টিটো যেমনি তাঁর শক্তিশালী নেতৃত্বের দ্বারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর হতেই যুগোস্লাভ রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী ফেডারেল রাষ্ট্রে পরিণত করে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করেছিলেন, তেমনি স্বাধীন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শূন্যহস্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রভার গ্রহণ করে দেশকে পুনর্গঠন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে ও তার জনগণকে বিশ্বের নিকট পরিচিত করে গেছেন।
১৯৮০ সালের ৪ মে, যুগোসøাভিয়ার এই জাতীয় বীর জনপ্রিয় নেতার অকাল মৃত্যুতে গোটা বলকান অঞ্চলের জনগণ তাঁদের প্রাণপ্রিয় অভিভাবক নেতাকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান এক শোকসাগরে পরিণত হয়েছিলেন। একদা সংঘর্ষে লিপ্ত থাকা সার্ব ও ক্রোয়েশিয়ানদের মধ্যে ওই দিন অনুষ্ঠিত ফুটবল খেলার অংশগ্রহণকারী দুই সম্প্রদায় ও জাতীয় খেলোয়াড়বৃন্দ তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতার অকাল মৃত্যুর সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে খেলা বন্ধ রেখে তাদের বীর রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল টিটোর প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার শপথ গ্রহণ করেছিলেন। মার্শাল টিটো ছিলেন আধুনিক যুগোসøাভিয়ার জনক ও শ্রষ্টা, যে নেতার কথা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, বৈরীভাবাপন্ন জাতীয় বিভিন্ন গ্রুপ ও দলকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি দৃঢ়বদ্ধ স্থায়ী শক্তিশালী দেশের নাগরিক হিসেবে সকলকে একই সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ করেছিলেন। বহির্বিশ্বে সম্মানিত যুগোসøাভ নেতার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সেদিন প্রায় ১২২টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান অথবা তাঁদের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন। মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর যুগোসøাভ রিপাবলিক অধীনস্থ ছয়টি প্রদেশের মধ্যে বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায় ও দল, তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। বিশেষ করে বসনিয়া হার্জেগোবিনিয়া ও কসোভোর আলবেনিয়ান বনাম সার্বিয়ানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত উত্তেজনা দানা বেঁধে ওঠে।
মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর প্রথমে ভ্যাসেলিন ডুরানভিক ক্ষমতা গ্রহণের পর যুগোস্লাভিয়ার অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের কর্মসূচীর অন্যতম মুদ্রার অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করলে ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নীতির অমিল হওয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। যদিও মার্শাল টিটোর জীবদ্দশায় রাষ্ট্রের মানসম্মানের কথা বিবেচনা করে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে টিটো সম্মত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর যুগোস্লাভিয়া অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ায় ‘যুগোস্লাভিয়ার বন্ধু’ নামক একটি মার্কিন সংগঠনের প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুগোসস্লাভিয়ার সম্পর্কের উন্নয়ন হয় ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দেউলিয়াত্বের লাঘব ঘটে। তারপরও যুগোস্লাভিয়ার অর্থনৈতিক দুরবস্থা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ফেডারেল কাঠামো ব্যবস্থা ভেঙ্গে বিভক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বহাল ছিল। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী মার্কোভিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে খোলা ও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে শুরু করলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে ফেডারে যুগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে জাতি ও সম্প্রদায়গত দাবি দাওয়া সংবলিত আন্দোলন শুরু হওয়ায় শাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লে প্রধানমন্ত্রী মার্কোভিকের অর্থনীতি সংস্কার কর্মসূচী অসমাপ্ত থাকে। ইতোমধ্যে বেলগ্রেডে নবনিযুক্ত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট সেøাভদান মিলোসেভিক কঠোর হস্তে কসোভো ও মন্টিনিগ্রোতে চলমান স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে দমন করতে ব্যর্থ হয়, বিশেষ করে মার্শাল টিটোর শাসনামলে প্রদত্ত কসোভোর স্বায়ত্তশাসন অধিকার বাতিল ও ছিনিয়ে নেয়ায় কসোভোতে প্রেসিডেন্ট মিলোসেভিকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। বেলগ্রেডের নব্য শাসক মিলোসেভিকের কিছু হঠকারী গণবিরোধী সিদ্ধান্ত মার্শাল টিটোর ফেডারেল যুগোস্লাভ শাসন ব্যবস্থা ভাঙ্গনের পথকে প্রসারিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিল ক্লিনটন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদ ও সমর্থনে প্রচারিত প্রোপাগান্ডা, কসোভো ও অপর প্রদেশের আন্দোলন, হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং কসোভোর আলবেনিয়ানদের ওপর সার্বিয়ান মিলেসেভিক বাহিনীর নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চরম পর্যায়ে পৌঁছলে পশ্চিম ইউরোপের ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ন্যাটোর বিমান হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিসহ অপর কয়েকটি ইউরোপিয়ান দেশ যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্রকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করার দীর্ঘদিনের বিশেষ পরিকল্পনা ও প্রোপাগান্ডা মিথ্যা প্রচারণায় সরাসরি জড়িত হয়ে তাদের দীর্ঘদিনের ঐকান্তিক মতলবকে চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করে। মার্শাল টিটোর জীবিতাবস্থায়ই বলকান অঞ্চলে ও পূর্ব ইউরোপের কিছু কিছু দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনুপ্রেবশ করে ওই দেশগুলোতে তার সাম্রাজ্যবাদী নীতি আদর্শের কালো থাবাকে প্রসারিত করে ওই সকল অঞ্চল ও দেশে গোপন অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগ বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্রের বিখ-িত করার বিশেষ দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করেছিল। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যুগোসøাভিয়ার অভ্যন্তরে দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে নিরবচ্ছিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করা ছাড়াও কয়েকজন মার্কিন তদানীন্তন উল্লেখযোগ্য কংগ্রেস ও সিনেট সদস্য যেমনÑ জো বাইডেন, রবার্ট ডোল এবং জন মিচেল বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বসনিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়, ক্রোয়াট ও কসোভোর আলবেনিয়ানদের পক্ষে ও যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্র তথা বেলগ্রেডের শাসকদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালিয়ে গোটা যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্রের প্রদেশগুলোর জনসাধারণের মধ্যে এক ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তোলে। মার্কিন তদানীন্তন ওই সকল কংগ্রেস ও পররাষ্ট্র বিভাগের সৃষ্ট ও পরিকল্পিত বিদ্বেষমূলক প্রচারণার দায়িত্ব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেছিল কুখ্যাত কয়েকটি মার্কিন প্রোপাগান্ডা ফার্ম বা কোম্পানি। এর মধ্যে অন্যতম ছিল হিল এ্যান্ড নলঠন। এই প্রোপাগান্ডা ফার্মের বিকৃত ও গণধিকৃত সার্বিয়ান বেলগ্রেডবিরোধী শক্তিশালী প্রচারণা, বসনিয়া ও কসোভোর স্বায়ত্তশাসন দাবির আন্দোলনের বিরুদ্ধে সার্বিয়ার শাসক, মিলোসভিক বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন ও নৃশংসতার ঘটনাবলীর ওপর বিরামহীনভাবে প্রচারণা চালিয়েছিল, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানগণ এবং কূটনীতিকগণ ভালমন্দ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যাচাই-বাছাই না করেই গলদে ধারণ করে নিয়েছিলেন। মার্কিন এই সকল কুখ্যাত প্রচারণা এ্যাজেন্টগুলো ১৯৯১ সালে কুয়েত সরকারের পক্ষ হয়ে ইরাকের লৌহমানব এক নায়ক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে হরেক রকম প্রচারণা চালিয়ে ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু করার পূর্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। যার ফলস্বরূপ কুয়েতে সাদ্দাম হোসেনের রিপাবলিকান গার্ড বাহিনীর দ্বারা কয়েতে নৃশংসতার অনেক ভুয়া ও কাল্পনিক কাহিনী বাস্তব হিসেবে বহির্বিশ্বে সাদ্দামবিরোধী শক্তিশালী প্রচারণার মিশন বাস্তবায়ন করেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ ও কয়েকটি বিশেষ দক্ষ প্রোপাগান্ডা কোম্পানি যৌথভাবে একই কায়দায় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধেও বিরামহীন প্রচারণা চালিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিভক্ত করার কাজটিও অত্যন্ত নিখুঁত ও দক্ষভাবে সম্পন্ন করেছিল। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি ক্ষতিকর, অসৎ সাম্রাজ্য এবং ভুয়া রাষ্ট্র ও অসম্ভব-অবাস্তব দেশ বলে এটাকে ধ্বংস ও বিভক্ত করে এর সংসদকে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। এই বলে সাম্রাজবাদী মার্কিন মতলববাজি বিষাক্ত প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করে যুগোসøাভিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস ও ভেঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মহাদেশ ও রাষ্ট্রে তার অসুভ ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করেছে। কোন প্রকার বাধা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কসোভো ও বসনিয়ায় তার নতুন বাজার প্রভাব ও বিভিন্ন সুযোগের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে দেশ দুটিতে অবাধ্য ও জবাবদিহিহীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরিধিকে আরও সস্প্রসারিত করে সুসংগঠিত আকারে এক দানবীয় রূপ লাভ করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ও মার্কিন ভাড়াটিয়া প্রচারণা সম্পর্কে যুগোসøাভিয়াতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ওয়ারেন জিমারম্যানের স্বীকারোক্তিতে বলেছিল যে, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে যুগোসøাভ রাষ্ট্রের ধ্বংস করে কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। এই কুখ্যাত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জিমারম্যান তাঁর গভীর কূটচাল ও দুরভিসন্ধির মাধ্যমে প্রথমে যুগোসøাভ বসনিয়ান ও কসোভোর আলবেনিয়ানদের বেলগ্রেডের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করে বসনিয়াকে যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্র হতে বিচ্ছিন্ন করে একটি ভিন্ন রাষ্ট্রে পরিণত করে। অবশ্য বসনিয়ায় সার্বিয়ান (বেলগ্রেড) সমর্থিত বাহিনী কর্তৃক কয়েক হাজার বসনিয়ান মুসলিম মানুষ হত্যা ও নারী নির্যাতনের অমার্জনীয় অপরাধ জিমারম্যানের জন্য বেলগ্রেডের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতেও বিশ্ব সমর্থন আদায় করতে সাহায্য করেছিল।’ (চলবে)
‘লিসবন চুক্তি’ নামকখ্যাত একটি শান্তিচুক্তির ফর্মুলা যার মাধ্যমে বসনিয়াকে প্রস্তাবিত তিনটি জাতি বা অঞ্চল হিসেবে বিভক্ত করে একটি ইউনাইটেড বসনিয়ান ফেডারেশনের অধীনে যথা সার্বিয়ান, মুসলিম ও ক্রোয়াট এই তিনটি জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বসনিয়াকে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তাব ও পরিকল্পনাকে অবিষ্কার ও বাস্তবায়ন না করার ক্ষেত্রে বসনিয়ান মুসলিম নেতাদের উক্ত জিমারম্যান প্রভাবিত করে শুধুমাত্র মুসলমানদের সমন্বয়ে বসনিয়া রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের সকল পরিকল্পনা ব্যবস্থার হোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুগোসøাভ রাষ্ট্রকে বিভক্ত করার কাজটি সম্পন্ন করেছিল। মার্কিন ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনায় একটি তথাকথিত রেফারেন্ডামের ফলাফলকে গ্রহণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ স্বীকৃতি প্রদান করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্তভাবে বসনিয়াকে যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। কসোভোর আলবেনিয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষাভাষীদের ওপর বেলগ্রেডের সার্বিয়ান শাসক সেøাভাডেন মিলোসেভিকের বাহিনী দ্বারা সংগঠিত হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে ওই প্রদেশের জনগণের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ কয়েকটি ন্যাটো সদস্যভুক্ত পশ্চিমা রাষ্ট্র। ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে শক্তিশালী সামরিক বিমান হামলা করে ও উপর্যুপরি বিরামহীন আক্রমণ কসোভো হতে সার্বিয়ান বাহিনীকে বিতাড়িত করে মার্কিন কমান্ডের পরিচালিত ন্যাটো বাহিনী সমগ্র কসোভোর দখলদারিত্ব সম্পন্ন করে। যুগোসøাভিয়াকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করার কাজটি তখনকার ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণভাবে জার্মানিসহ ন্যাটোর সদস্যভুক্ত অপর দেশের উচ্চপদস্থ সমরিক কর্মকর্তাদের যৌথ কমান্ডের পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়ন করেছিল।
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চলে ইসরাইল কর্তক যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, অত্যাচার, নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে ন্যাটোর বরকন্দাজ বাহিনীকে একত্রিত করে ইসরাইলের ওপর হামলা করে।
ফিলিস্তিনীদের অত্যাচারিত জনগণকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এ ধরনের কোন পরিকল্পনা কেন গ্রহণ করেন নাই? বসনিয়া ও কসোভোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের প্রতি মার্কিন বিল ক্লিনটন প্রশাসন ও জার্মানিসহ অপর পশ্চিমা ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশের তথাকথিত সহানভূতি প্রকাশ ও সমর্থন ঘোষণা করে। শক্তিশালী বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মার্শাল টিটোর প্রতিষ্ঠিত যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্র থেকে এই দুটি প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের সকল পরিকল্পনাই ছিল বিল ক্লিনটন ও ন্যাটোর যুদ্ধবাজ ও মতলববাজির ভ-ামি ও কূটনৈতিক প্রতারণা ও প্রচারণার নির্লজ্য বহির্প্রকাশ।
কসোভোতে অবস্থানকালীন সে দেশের জনসাধারণ ও যুব সম্প্রাদয়ের সঙ্গে আমার একান্ত আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা বা যুব সম্প্রদায় আমেরিকা ও ক্লিনটনের কসোভোকে সার্বিয়ান শাসন থেকে মুক্ত করায় দারুণ খুশি ও আমেরিকা এবং ক্লিনটনের প্রশংসায় অন্ধ প্রায়। সার্বিয়ান বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নিগৃহীত ও অত্যাচারিত এবং অনেকের প্রিয়জন ও বান্ধব হারানোর বেদনা হতে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে তারা মুক্তিদাতা ও ত্রাণকর্তা হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু এই যুবক ছেলেমেয়েরা ক্লিনটনগংদের অন্তর্নিহিত ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা সম্পর্কে উদাসীন অথবা ধারণাহীন। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে চোখ ধাঁধালো চোরাইপথে অবৈধভাবে আমদানিকৃত বিলাসবহুল গাড়ি, পোশাক পরিচ্ছদ, প্রসাধনসামগ্রী, অস্ত্র এবং ড্রাগ পাচার ও অবৈধ কালোবাজারিদের আয়কৃত অর্থ দ্বারা নির্মিত নব্য আলবেনিয়ান কসোভোর লগ্নিকারীদের নির্মিত বহুতলবিশিষ্ট দালানকোঠা, দেশের হাইওয়ে, শপিংমল ও শহরের অলিগলিতে কফির দোকানে, মোবাইল ফোন ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মার্কিন, ন্যাটোর লাগামহীন প্রচারণা সব কিছু মিলিয়ে কসোভোর শিক্ষিত যুব ও মহিলা সম্প্রদায়, মার্কিন উর্দিপরিহিত সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারলে নিজকে ধন্য মনে করে। বর্তমানে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেকার যুবক। মহিলাদের জন্য কসোভোর সরকারের নেই কোন উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান পরিকল্পনা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিও বা বিভিন্ন সংস্থায় স্বল্পসংখ্যক ছেলেমেয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বা সুযোগ পেয়েছিল। অধিকাংশ শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের মধ্যে হতাশা ও দুঃখ-কষ্টের স্বল্প নমুনার চিহ্ন পাওয়া যায়। অপর দিকে বয়স্ক বা অবসরে পেনশনপ্রাপ্ত মানুষের চেহারার মধ্যে পরিলক্ষিত হয় এক অনিশ্চিত ও শঙ্কায় পরিপূর্ণতা। মার্শাল টিটোর শাসনামলে পেনশনপ্রাপ্ত কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানতে পারি যে, মার্শাল টিটোর শাসনামলে তাদের চাকরি ও জীবনযাপন করা ছিল সুখকর। কারণ তখন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ নিয়মিত তাঁদের পেনশনের ভাতা পেতেন এবং তা ছিল তাদের জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) তরফ ও সরকারের মাধ্যমে যে সামান্য পরিমিত ভাতা গ্রহণ করেন, তার দ্বারা গোটা সংসার এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা তথা আনুষঙ্গিক খরচাপাতি মিটানো এক দুর্বিষহ ব্যাপার। মার্শাল টিটোর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বয়স্ক আলবেনিয়ান কসোভোর লোকজন শ্রদ্ধাভরে মাথানত করে তাঁর প্রতি আজও কৃতজ্ঞতা জানান। একটি শক্তিশালী একত্রিত যুগোসøাভ প্রজাতন্ত্রের সংগ্রামী ও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর অধীনে বসবাস করার সেই অতীত সোনালী অধ্যায়কে তাঁরা চিরকৃতজ্ঞ ও প্রশংসাসহ মনের ভাবাবেগকে প্রকাশ করেন।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের মহান উদ্দেশ্য নীতির অন্যতম ধারকবাহক ও প্রতিষ্ঠাতা মার্শাল টিটো, ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহরু, ইন্দোনেশিয়ার ড. সুয়াকর্নো, মিসরের জামাল আবু নাসের ও ঘানার কোয়ামে নক্রমাসহ বিশ্বের এই সকল প্রয়াত নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার বিশেষ অবদানের ফসল ছিল তৃতীয় বিশ্বের শোষিত ও অনুন্নত জনগণের মধ্যে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও অটুট বন্ধুত্ব সৃষ্টি ও তাকে লালিত পালিত করা। জোটনিরপেক্ষ নীতির মাধ্যমে বিশ্বের রাজনীতি ও কূটনীতিকে একটি নিরপেক্ষ ভারসাম্য অবস্থায় বজায় রাখা। সংগ্রামী জনপ্রিয় যুগোসøাভ নেতা মার্শাল টিটোসহ অপর জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দের অকাল মৃত্যু ও অনুপস্থিতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার অনুসারী মিত্রদের বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া মস্তানি ও সন্ত্রাসী খবরদারি ও মোড়লগিরি করার এক চৎমকার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আজ বিশ্বব্যাপী বুশ, ব্লেয়ারদের মতো মেরুদ-হীন শাসকদ্বয় গণআক্রোশের ভয়ে একরকম জনমানবহীন নির্বাসিত জীবনযাপন করছে। এই দু’জন যুদ্ধাবাজ জঙ্গী তথাকথিত রাষ্ট্রনায়ক বা শাসকদের হঠকারী ও আক্রমণাত্মক চরিত্র ও জঙ্গীবাদী সিদ্ধান্তের দ্বারা ইরাকের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম স্থিতিশীল দেশকে ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে রেখে গেছে। বুশ ব্লেয়ারের চরম মিথ্যাবাদিতা, জালিয়াতি ও ভাওতাবাজি ভেল্কিবাজির প্রচারণায় ২০০৩ সালে ইরাকে যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে হত্যাসহ সমগ্র দেশের একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী অবকাঠামোকে ধ্বংস করে। শুধু তাই নয়, কয়েক লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা, শাসন ব্যবস্থাকে ল-ভ- করে একদা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বন্ধুত্বে বসবাসকারী শিয়া-সুন্নীদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বিভক্তিকরণ ও নৃশংস গৃহযুদ্ধের ব্যবস্থা করে আল কায়দা, ইসলামিক ইরাকী রাষ্ট্র বা আইসিসকে সৃষ্টি করাসহ বহুসংখ্যক জঙ্গী ইসলামিক সংগঠন বা গোষ্ঠীর প্রজননের একটি ভয়াবহ নরক ভূমিতে পরিণত করেছে একদা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ইরাকের মাটিকে।
অপরদিকে সত্তর দশকে আফগানিস্তানের সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের তালেবান সৃষ্টিকারী সাবেক সামরিক জান্তা প্রধান, জেনারেল জিয়াউল হক ও আইএসআইয়ের পরিচালনা ও তত্ত্বাবধায়নে প্রথমে মুজাহিদ বাহিনী ও পরে তালেবান বাহিনী সৃষ্টি করে আফগানিস্তানে নৃশংসতা ও গৃহযুদ্ধের এক অধ্যায় পরিচালনা করে দেশটিতে আজ জঙ্গী তালেবান বাহিনীর পরিচালনায় নিয়মিত মানুষ হত্যার লাইসেন্স প্রদান করে। যার চরম খেসারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রতিনিয়তই দিতে হচ্ছে ও আফগান সাধারণ নিরীহ জনগণকে অকাতরে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।
আজ বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানবগোষ্ঠী মার্শাল টিটো, প-িত জওহরলাল নেহরু, ড. সুয়াকর্নো, জামাল আবদুল নাসের, নক্রমা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, মার্শাল টিটোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও জোট নিরপেক্ষনীতি আদর্শের প্রবক্তা, ধারক ও বাহক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অনুপস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী শান্তি স্থিতিশীলতা, বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক চরম শূন্যতার অভাব অনুভব করছে। কারণ এই সকল প্রয়াত বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, তাঁদের যোগ্য মোহনীয় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতাকে জোট নিরপেক্ষ আদর্শে মহীয়ান, উজ্জীবিত ও বলিয়ান হয়ে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব, মহাদেশ ও আঞ্চলিক শান্তি সৌহার্দ্য, স্থিতিশীলতা ও অটুট বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখার সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন।
মার্শাল টিটোর সমাধিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষে দানিয়ুব নদীর তীরে এসে বসার পর আমার নিকট প্রতীয়মান হচ্ছিল যেনÑ উজান থেকে বেলগ্রেড শহরের উপকণ্ঠ দিয়ে প্রবাহিত দানিয়ুব নদীটি যেন নিথর স্থির ও শান্ত হয়ে আছে। আমার মনে প্রশ্ন উঠেছিল, তা হলে কি মার্শাল টিটোর অনুপস্থিতিই একদা উন্মত্ত ভয়াল বহমান দানিয়ুব নদীর এই শান্ত প্রাণহীন অবস্থার কারণ?
ংধষরসথশ৩@যড়ঃসধরষ.পড়স
সিডনির মেলব্যাগ ॥ অজয় দাশ গুপ্ত
দেশের মায়া ফেলে বিদেশে বসবাসরত প্রবাসীদের দেখে কে বলবে তাঁরা দূরে আছেন? যে যেখানে যে দেশে সেখানেই গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ভুবন। আপনি বরফাবৃত অটোয়ায় থাকুন কিংবা বুশ ফায়ারে উত্তপ্ত সিডনিতে থাকুন- কোন পার্থক্য নেই। একবার বাঙালী ভুবনে এসে পড়লেই হলো। সারাদিন যেভাবে কাটুক সন্ধ্যার পর আপনি থাকবেন মাছে-ভাতে। শুঁটকি ভর্তা, মৌরলা মাছের ঝোল, দেশের চাটনি, আচার এমনকি কাঁচালঙ্কাও বাদ পড়বে না। কোন অনুষ্ঠানে গেলে দেখবেন, দেশের চেয়ে এক শ’ গুণ বেশি আবেগে ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ কিংবা ‘আমি একদিনও না দেখিলাম’ গাইছেন শিল্পীরা। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ কিংবা জয় গোস্বামীকে এতটা আবেগে উচ্চারিত হতেও দেখেননি আপনি। বাংলাদেশের বাঙালীরাই আছেন এসব কর্মকা-ের অগ্রণী ভূমিকায়। সেই কবে মান্না দে এসেছিলেন সিডনি। তাঁকে উপস্থাপনের দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। সে সুবাদে তাঁর কথা শোনা ও অভিজ্ঞতা জানার বিরল সুযোগ মিলেছিল। সমুদ্রসম অভিজ্ঞতার যে বুদবুদ তিনি উগড়ে দিয়েছিলেন তাঁর একটি এখনও মনে গেঁথে আছে। মান্না দের মতে, বাংলা গান, কবিতা শিল্প সাহিত্যের প্রবাসী বা আন্তর্জাতিক ভবিষ্যত মূলত আমাদের হাতে। দুঃখ করে বলেছিলেন, যত দেশে যত শহরে তিনি গান গেয়েছেন বাংলাদেশের বাঙালীরাই তাঁর বাংলা গানের কদর করেছে, এমনভাবে শুনতে চেয়েছে, যা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ব্যক্ত ‘মোরে আরও আরও আরও দাও গানের মতো সর্বভুক।’ বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে বা আলাদা পরিচয় ও রাষ্ট্রসভা নিয়ে দাঁড়াতে না পারলে এই উদ্ভাস কি আদৌ সম্ভব হতো? পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা কিন্তু কোন অংশে পিছিয়ে নেই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তারাই অগ্রগামী। তাদের জীবনযাত্রা ও রাজনীতিতে আমাদের মতো উগ্রতা দেখা যায় না, যে কোন আনন্দ বিনোদনে তাদের চ্যানেল বা অন্য যে কোন মিডিয়া বাংলাদেশে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়ও বটে। বিদেশেও তাদের চ্যানেলের জয়জয়কার। তারপরও বাংলা সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ বা কাজরীর ভূমিকায় বাংলাদেশীরা। যার মূল কারণ আমরাই বাংলার পতাকাবাহী একমাত্র রাষ্ট্র। আমাদের রাষ্ট্র ও জাতির যে ইতিহাস বা অতীত তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা না থাকলে এ দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব। বিস্ময়ের ব্যাপার এই, বাংলাদেশীদের অভাবনীয় পরিশ্রম মেধা ও যোগ্যতায় বিষয়টা আমাদের হাতে আসার পরও রাজনীতি তা হতে দিচ্ছে না। বাংলা বাঙালীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে বাংলাদেশের জনকের বিরুদ্ধে বলতে পারে না কেউ। এই বলাবলি নিয়ে মাথা ঘামানো দেশের মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় হলেও আমাদের পক্ষে তা এড়িয়ে চলা অসম্ভব। প্রবাসে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের শাখা-প্রশাখা বিস্তর বা ব্যাপক হলেও আসল কাজে তাদের দেখা মেলা ভার। তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। অথচ শত্রুপক্ষ বসে নেই।
বলছিলাম প্রবাসীদের বাংলাপ্রেম ও দেশজ সংস্কৃতির প্রতি অপরিসীম ভালবাসা ও আনুগত্যের কথা, জামায়াত বিএনপি এখন যে জায়গায় আঘাত হানতে চাইছে। তারা জানে, সংস্কৃতির শক্তি অপরিসীম। শুধু তাই নয় বাংলা কবিতা, গান, নাটক ছড়া বা থিয়েটার সিনেমার কারণে তারা পেরে ওঠে না। এঁটে উঠতে পারে না। সে জন্য এ জায়গায় আঘাত হানার লক্ষ্যে ধর্মকে হাতিয়ার করে তুলতে চাইছে এরা। ধর্ম বিশ্বাস বা নিজস্ব কারণে কেউ তা করতেই পারে। কিন্তু মুশকিলটা অন্যত্র, দলবদ্ধভাবে উস্কানি ও প্ররোচনা দিয়ে বিদেশে এ জাতীয় অপপ্রক্রিয়া চালু রাখাটা অযৌক্তিক অন্যায়। আমরা নিশ্চয়ই এমন কোন সমাজ বা জাতির প্রত্যাশা করি না, যারা চল্লিশ অবধি আধুনিক থাকবে। উত্তর চল্লিশে মত পাল্টে জাতীয়তাবাদের নামে অন্ধকার গুহায় ঢুকতে ঢুকতে বার্ধক্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বাংলা শিল্প, সংস্কৃতি ও দেশবিরোধী হয়ে পড়বেন। দেশত্যাগের পূর্বে বা গত সতের বছরে যেসব কা- প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য হয়নি আজ তারই আকছার বাস্তবায়ন দেখে হতাশ হয়ে পড়ছি। এমন বাঙালী তো আগে দেখা যেত না। আমাদের দেশের মানুষ কখন ধার্মিক ছিল না? তাঁরা চিরকাল ধর্মপ্রাণ। বরং তখনকার মানুষরাই ছিলেন খাঁটি, তাঁদের জীবনে অসততা, অসুন্দর আর অকল্যাণের জায়গা ছিল না। এখন আমরা কী দেখছি? সন্ত্রাস, ধ্বংস, অসহিষ্ণু মনোভাব আর দলাদলি, নিজের অভিজ্ঞতায় বলছিÑ বিমানে চড়ে খবরের কাগজ মুড়িয়ে বিয়ার পান করা মানুষরা যখন অন্ধত্বের নামে ধর্মীয় রাজনীতির পতাকা ওড়ায়, হতবিম্বল হবার বিকল্প থাকে না। আজ প্রবাসেও এদের উৎপাত আর আহাজারি। আগেই বলেছি, বাংলা সংস্কৃতি ও দেশাত্মবোধে আমরা এগিয়ে। আমাদের নতুন প্রজন্মও সে পথে ধাবমান।