মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২১ অক্টোবর ২০১১, ৬ কার্তিক ১৪১৮
১৯৭১ ॥ ভারতে এক কোটি বাঙালী শরণার্থী ও অতঃপর
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
১৯৫০-এর সামপ্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে ৮ এপ্রিল ১৯৫০-এ নেহরু-লিয়াকত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারত-পাকিস্তানের সংখ্যালঘু নাগরিকদের অধিকারের প্রশ্নে এ চুক্তি ঐতিহাসিক নজির হয়ে আছে, কিন্তু পাকিস্তানে চুক্তিবাস্তবায়ন হতে পারেনি আমলাচক্রের জন্য। নেহরু চুক্তি বাস্তবায়নের আগ্রহের কারণে পূর্ববঙ্গে ভারত থেকে আগত মুসলিম ভারতীয় নাগরিক দেশে ফিরে গিয়ে তাদের সম্পত্তি ফিরে পায়। কিন্তু পূর্ববঙ্গের ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু-ভারত থেকে আসা পাকিস্তানীরা তাদের সম্পত্তি ফিরে পায়নি। অফিস আদালতের দুয়ারে দুয়ারে ফিরে অতিষ্ঠ হয়ে নিরাশ হয়ে ভারতে ফিরে গিয়ে উদ্বাস্তুর খাতায় নাম লেখায়, সেখানের ভোটার হয় কংগ্রেস-কমু্যনিস্ট দলের হাতিয়ার। পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে এই নেহরু-লিয়াকত চুক্তি কখনই বাস্তবায়ন হয়নি বরং নাগরিক ও সম্পত্তি আইনে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে হিন্দুদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে লাখ লাখ হিন্দু বিভিন্ন সময়ে বাস্তুহারা হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা হ্রাস পায়, জনবিন্যাস চিত্র পর্যালোচনা করলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এই উচ্চ ও মধ্যম শ্রেণীর প্রভাবশালী হিন্দুদের দেশত্যাগ তাদের ভূ-সম্পত্তির মালিকানা হওয়ার সুযোগে নব্য মুসলিম মধ্যবিত্ত সৃষ্টির কারণে সামপ্রদায়িকতার আর্থ-সামাজিক ভিত্তিটি প্রায় আমূলভাবে পরিবর্তিত হয়। পাকিস্তান আইন সভা কিংবা পূর্ব বাংলা আইন সভায় হিন্দু নেতৃবৃন্দ যেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন, পাঁচ দশক পরও হিন্দুদের সেসব সামাজিক ও আর্থ-ধর্মীয় সমস্যার কোন ইতর বিশেষ পরিবর্তন হয়নি ।
১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ফলাফল জনগণের মধ্যে সামপ্রদায়িকতার প্রভাব খর্ব ও বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পদচিহ্ন। তারপর ১৯৫৬ সালে গণপরিষদে পাকিস্তানে শাসনতন্ত্র হলো, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধি এগিয়ে চললেন। ১৯৫৯ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের কথা ছিল কিন্তু নির্বাচন হলো না । ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে সব উল্টে দিলেন। মুসলিম লীগের পতন, ষাটের দশকে মৌলিক গণতন্ত্র ও শেষে পাক-সামরিকচক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি মঞ্চে আবির্ভাব হলো ।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন_ হিন্দুদের কপাল পুড়ল, গণতন্ত্রচর্চা উবে গেল। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা বিনা কারণে তুচ্ছ অজুহাত তুলে জনগণের প্রতিনিধি প্রণীত শাসনতন্ত্র, মন্ত্রিসভা বাতিল করে সামরিক আইন জারি করলেন। সকল রাজনৈতিক দল ও নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। শেখ মুজিব কারারম্নদ্ধ হন। ১৯৬২ সালের জুন মাসে সামরিক সরকার নতুন শাসনতন্ত্র জারি করে। ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি সময় আবদুল মোনায়েম খান পূর্ব পাকিসত্মানের গভর্নর হয়ে আসেন, তিনি ড. ওসমান গনিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত করেন এবং আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য 'জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন' বা 'এনএসএফ' নামে ছাত্র নামধারী এক গু-াবাহিনী গঠন করান। এই গু-াবাহিনী '৬৩ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
আইয়ুব বিরোধী গণবিক্ষোভ ভিন্ন পথে পরিচালনার জন্যে সরকার '৬৪ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ঢাকা এবং পাশর্্ববর্তী অঞ্চলসমূহে পেশাদার অবাঙালী গু-াদের সাহায্যে এক ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়। সামরিক শাসকের দোসর মোল্লানীতিবাহকরা ১৯৬৪ সালে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা বাধাল। লাখ লাখ সংখ্যালঘু দেশ ত্যাগ করল। হাজার হাজার মানুষ নিহত হলো। বাঙালী মুসলিম অবাঙালী বিহারী মুসলিমদের প্রতিরোধ করল_অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম বাঙালীরা হিন্দুদের রক্ষা করতে প্রাণ দিলেন। ঐ দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বাঙালী হিন্দু-মুসলমানের যে ঐক্য গড়ে ওঠে তা মুক্তিযুদ্ধে রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে আজও তার অবস্থিতি রয়েছে। এই দাঙ্গা ১০ জানুয়ারিতে প্রচ- আকার ধারণ করে এবং তার পরে বাঙালী অবাঙালী দাঙ্গায় রূপানত্মরিত হয়। বাঙালীরা এই দাঙ্গা প্রতিরোধে রম্নখে দাঁড়ায়। এই দাঙ্গার সময়েই '৬৪ সালের ১৫ জানুয়ারি হিন্দুদের বাঁচাতে গিয়ে নবাবপুর রেলক্রসিংয়ের নিকটে আনত্মর্জাতিক নজরম্নল ফোরামের চেয়ারম্যান কবি আমির হোসেন চৌধুরী আর ১৬ জানুয়ারিতে নটর ডেম কলেজের অধ্যাপক ফাদার নোভাক অবাঙালীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। শেখ মুজিব বাঙালীকে রম্নখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, দৈনিক পাকিসত্মান অবজারভার প্রতিবাদী সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর ঢাকা (১৯৯৩) সংখ্যায় লিখেছে : কাশ্মীরের 'হযরত বাল' দর্গায় রক্ষিত হযরত মোহাম্মদের (দঃ) পবিত্র চুল চুরির ঘটনা এবং সেখানে মুসলিম জনগণের ওপর অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ঢাকা নগরীসহ ঢাকা জেলায় ব্যাপক সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়। এতে কিছুসংখ্যক হিন্দু নাগরিকের মৃতু্য হলেও দাঙ্গা ঠেকাতে গিয়ে এবং হিন্দু নাগরিকদের রক্ষা করতে গিয়ে ত্রিশজন মুসলমান যুবক আত্মাহুতি দেন। (ঢাকা গেজেট, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, ১৯৯৩, পৃঃ ১০২)
এই ১৯৬৪ দাঙ্গায় বাঙালী হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে ওঠে, বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধে তা প্রমাণিতই শুধু হয়নি বাংলাদেশের সংবিধানে বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপক্ষতা দৃঢ়মূল হয়।
পাকিসত্মান সরকার ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধ ও ১৯৬৬ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যনত্ম আইয়ুব খান ও লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে 'তাসখন্দ' চুক্তি প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কঠিন বাসত্মবতার মুখোমুখি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে জারিকৃত জরম্নরী আইনের আওতায় শত্রম্ন সম্পত্তি আইন জারি করা হয়। ১৯৬৬ সালের ১৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা শেষে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বললেন, আমরা তাসখন্দ ঘোষণা নিয়ে চিনত্মিত নই। আমরা আমাদের কথা ভাবছি। আমরা চাই 'পূর্ব পাকিসত্মানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও যুদ্ধোত্তর পাকিসত্মানের জটিল পরিস্থিতিতে লাহোরে নেজামে ইসলাম প্রধান চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে ৫ ফেব্রম্নয়ারি ১৯৬৬ তারিখে নিখিল পাকিসত্মানের বিরোধী দলের সমাবেশ হয়। সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফা উত্থাপন করেন। শেখ মুজিবুরের এই ছয় দফা বাংলাদেশের মানুষের কাছে অভিনন্দিত হলো ম্যাগনা কার্টা বা মুক্তি সনদরূপে। ছয় দফা প্রকাশিত হলে আইয়ুব খান গৃহযুদ্ধের এবং অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগের হুমকি প্রদান করেন। তারপর শুরম্ন হয় আওয়ামী লীগের ওপর দমন নীতি।
শেখ মুজিব ১৯৬৬ মার্চ-এপ্রিল মাসের ৩৩ দিনে সমগ্র পূর্বাঞ্চলের সকল জেলাগুলোতে তার ৬-দফার ওপর আলোচনা করেন, জনসভায় লাখ লাখ জনতার সামনে বাঙালীর বাঁচার দাবি ৬-দফা গণজাগরণ সৃষ্টি করে, ফলশ্রম্নতিতে ৭ মে রাতে শেখ সাহেবকে 'ডিফেন্স অব পাকিসত্মান রম্নলের' ৩২ ধারায় গ্রেফতার করা হয়। আইয়ুবের ইঙ্গিতে তার পুতুল গবর্নর মোনেম খাঁ অসংখ্য মামলায় ঝোলায় শেখ মুজিবকে। শেষ পর্যনত্ম রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে তাঁকে কারাদ- দেয়া হলো। তাঁর সহযোগীদের আটক করা হয়। তাঁর ওপর নিরাপত্তা আইন ও প্রতিরক্ষা আইন প্রয়োগ করা হয়।
১৯৬৮-৬৯ সালে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের যৌথ নেতৃত্বে যে বলিষ্ঠ ১১ দফা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, তা রাজনীতিক ও শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ফলে এক জঙ্গীরূপ ধারণ করে এবং এতে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। আইয়ুব সরকার বিপদ বুঝলেন। গোপনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উদ্ভাবন করা হলো। সেই মামলায় প্রধান আসামি করা হলো শেখ মুজিবকে। ততদিনে সামরিক জানত্মাতেও ভাঙ্গন ধরেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেড এ ভুট্টো বিদায় হয়েছেন আইয়ুবের মন্ত্রিসভা থেকে। তিনি সামরিক চক্রের একাংশের সহায়তায় আইয়ুবের বিরম্নদ্ধে আন্দোলনে নামলেন। এদিকে বাংলাদেশে শুরম্ন হয়েছে প্রবল গণআন্দোলন। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রম্নয়ারি মাসে আন্দোলন রূপানত্মরিত হলো গণঅভু্যত্থানে। সশস্ত্র জনতা কারফিউ ভেঙ্গে এগিয়ে গেল মশাল হাতে কুর্মিটোলা সামরিক ছাউনির দিকে। ক্যান্টনমেন্টে তখন চলছিল আগরতলা মামলার তথাকথিত বিচার। গণঅভু্যত্থানের আগুনে অচল হয়ে গেল আইয়ুবের প্রশাসন। আইয়ুব মামলা তুলে নিলেন এবং বিনাশর্তে মুক্তি দিলেন সকল অভিযুক্তকে। বাংলাদেশের জনগণ ২২ ফেব্রম্নয়ারি '৬৯ রমনা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে এক বিশাল সংবধর্নায় 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৬৯ সালের পঁচিশে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হসত্মানত্মর করে জেনারেল আইয়ুব সরে দাঁড়ালেন।
১৯৭০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সারা বাংলাদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করল আওয়ামী লীগ। ১৩ ফেব্রম্নয়ারি '৭১ জেনারেল ইয়াহিয়া ঘোষণা করলেন, শেখ মুজিব পাকিসত্মানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা দিলেন ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক বসবে। এরপরই শুরম্ন হলো ইয়াহিয়ার সঙ্গে ভুট্টোর একাধিক গোপন বৈঠক ও ভোজ। ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন। প্রতিবাদে বাংলাদেশ গর্জে উঠল। এবার স্বাধিকার নয়, সমঝোতা নয়, স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঢাকার রাজপথে উন্মত্ত জনতার ঢল নামল। ২ মার্চ স্বাধীন ছাত্রনেতাদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা উড্ডীন হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৩ মার্চ ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ পল্টনে স্বাধীনতার ইসত্মেহার পাঠ করল। ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্সে ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার আহ্বান জানালেন : 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' তিনি শর্ত দিলেন : সামরিক আইন তুলে নিতে হবে, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে এনে গণহত্যার উপযুক্ত তদনত্ম করতে হবে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে এবং একমাত্র এই শর্ত পূরণ হলে তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের যাবেন কিনা বিবেচনা করে দেখবেন।
১৫ মার্চ জেনারেলসহ ইয়াহিয়া ঢাকা আসেন শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার জন্যে। এই আলোচনার পশ্চিম পাকিসত্মানী নেতারা যোগ দেন এবং শেষ দিকে ভুট্টোও এসে ঢাকা পেঁৗছান। ২৫ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং মধ্যরাত থেকে শুরম্ন হয় নির্মম গণহত্যা অভিযান। ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নান। চট্টগ্রাম বেতার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আস্থা স্থাপন করে তাঁর নির্দেশে বাঙালী সৈন্য ও জনগণের অস্ত্র ধারণের কথা ঘোষণা করা হয়।
১০ এপ্রিল ১৯৭১ অপরাহ্নে জনপ্রতিনিধি দ্বারা প্রণীত 'স্বাধীনতার ঘোষণা' মতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই 'স্বাধীনতার ঘোষণা' পত্রটিই বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। বঙ্গবন্ধু পাকিসত্মানী কারাগারে বন্দী থাকায় সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল ( ৩ বৈশাখ, শনিবার, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ). মুক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার বৈদ্যনাথতলার (মুজিবনগর) আমবাগানের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি দ্বারা প্রণীত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ এবং মুজিব নগরকে অস্থায়ী রাজধানী করে সৈয়দ নজরম্নল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেন। উনিশ শতকের ত্রিশ দশকে মাস্টার দা সূর্য সেন ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। চলিস্নশ বছর পরে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলাবেতার কেন্দ্র থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা ও সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন। বাংলাদেশের জলে-স্থলে শুরম্ন হয় স্বাধীনতা অর্জনের মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকায় ২৫ মার্চের বর্বরোচিত গণহত্যা শুরম্ন হবার পর থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রাণভয়ে দৌড়ে, হেঁটে, ছুটে সীমানত্ম অতিক্রম করে ভারতের মাটিতে প্রবেশ করতে থাকে। এরাই বাঙালী উদ্বাস্তু। এরা এবার স্বতন্ত্র পরিচয়ে শরণার্থী নামে ভারতে প্রবেশ করেছে- এরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হতে এসেছে। (ক্রমশ)
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও গবেষক
ওয়ালস্ট্রিট ॥ রাজনীতি থেকে লোকনীতি
নিউইয়র্ক, শিকাগো, সানফ্রান্সিস্কো, রোম, মাদ্রিদ, লন্ডন, বার্লিন ... ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে।

'ওয়ালস্ট্রিট দখল কর', বলছেন মানুষ। এ এক নতুন আন্দোলন। নতুন ভাবনার এক সুযোগ
রংগন চক্রবর্তী

ওয়ালস্ট্রিট দখল কর' আন্দোলন নিয়ে দুনিয়া নড়েচড়ে উঠেছে। আমেরিকা থেকে এই আন্দোলন আস্তে আস্তে দুনিয়ার নানান প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। গত কয়েক দিনে রোম, মাদ্রিদ, লন্ডন, বার্লিনসহ শত শত শহরে 'অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট' আন্দোলনের দাবির সমর্থনে যথেষ্ট বড় মাপের প্রতিবাদ সমাবেশ সংগঠিত হয়েছে। এই আন্দোলনের সূচনা হয় কয়েক মাস আগে। বছরের মাঝামাঝি কানাডার 'এ্যাডবাস্টার মিডিয়া ফাউন্ডেশন' নামে একটি সংস্থা দাবি তোলে, প্রেসিডেন্ট ওবামাকে প্রেসিডেনশিয়াল কমিশন চালু করে ওয়াশিংটনের জনপ্রতিনিধিদের ওপর কর্পোরেট টাকার প্রভাব রুখতে হবে। এই প্রস্তাবটি টুইটার, ফেসবুক ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ডাক ওঠে '(আমেরিকার অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক) ওয়ালস্ট্রিট দখল কর'। বলা হয়, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এই দুই দলই যেহেতু ওয়ালস্ট্রিট বা বাণিজ্যের টাকার ওপর নির্ভর করে দল চালায়, ওয়ালস্ট্রিটই হল দুর্নীতির উৎস। তাই বদল আনতে হলে তাকেই আক্রমণ করতে হবে। তবে এই আন্দোলন করতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে। আন্দোলনকারীরা গিয়ে ওয়ালস্ট্রিটের কাছে জুকোটি পার্কে অবস্থান শুরু করে। এই পার্কটি সরকারী নয় বলে পুলিশ ওদের তুলে দিতে পারে না।
নেতাহীন আন্দোলন

১৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই অবস্থান ধর্মঘট শুরু হয়। প্রথম দিকে বেশিরভাগ আন্দোলনকারীই ছিল অল্পবয়সী। আসত্মে আসত্মে নানান বয়সের মানুষ যোগ দিতে থাকেন। অনেক পরিবার তাদের বাচ্চাদের নিয়ে আসার ফলে এখন ওই পার্কে অনেক বাচ্চাও দেখা যাচ্ছে, কারও হাতে পোস্টার : 'তোমরা আমার সঙ্গে আছ বলে, আমিও তোমাদের সঙ্গে আছি।' বেশ কিছু ট্রেড ইউনিয়নও এখন এই আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে, যদিও তারা এই আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা নিতে চায় না। তাদের বক্তব্য হলো : কর্পোরেট লোভবিরোধী আন্দোলনে তারা পাশে থাকবে।
ছড়িয়ে পড়া আগুন। ফিলাডেলফিয়ার রাসত্মায় 'অকুপাই ওয়ালস্ট্র্রিট' আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল।
'অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট' আন্দোলনকে নেতাহীন আন্দোলন বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। আন্দোলনের মানুষেরা ও সংবাদমাধ্যম এই আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্রের ওপর খুব জোর দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগঠন বা ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার মতো উদ্দেশ্যে নয়, মানুষ কতগুলো আদর্শের ভিত্তিতে, সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে পথে নেমেছে।
আদর্শ আছে, রাজনীতি নেই

আন্দোলনের সমর্থকরা এই আন্দোলনের সঙ্গে মিসরে পালাবদল ঘটানো তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের তুলনা করছেন। এঁরা নিজেদের জনগণের ৯৯% বলে বর্ণনা করে বলছেন, সমাজের ১% লোভীরা 'আমেরিকান ড্রিম' খুন করেছে, সেই খুনীদের ধরতে এবং শায়েসত্মা করতে হবে। কর্পোরেট লোভই হল খুনের মোটিভ। আন্দোলনে খ্রিস্টীয় সংগঠনদেরও দেখা যাচ্ছে, তাদের হাতে পোস্টার : 'যীশু ৯৯%-র সঙ্গে আছেন।' রিপাবলিকান দলের নেতা এরিক ক্যান্টর এই আন্দোলনকারীদের রায়ট বাধানো জনতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিপাবলিকান সমর্থনে জেতা নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল বস্নমবার্গ বলেছেন, এই আন্দোলন অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে। আবার ডেমোক্র্যাটরা নানান কায়দায় এই ক্ষোভের ফসল তুলতে নেমে পড়েছেন। ওবামা বলেছেন, এই আন্দোলন সঙ্গত, এ হলো অর্থনৈতিক অব্যবস্থার বিরম্নদ্ধে গভীর ক্ষোভের প্রকাশ। তাতে অবশ্য আন্দোলনকারীরা খুব গলেননি, তাঁদের বক্তব্য : তিনি তো বলছেন অনেক, করছেন না কিছুই।
নেতাবিহীন বলা হলেও তো একেবারে অগোছাল হয়ে কোন আন্দোলন চালানো যায় না। তাই আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই কিছু সংগঠন তৈরি হচ্ছে। এত মানুষের চিকিৎসা, খাবার, মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ, পুলিশ সামলানো এই সব নানা দিক দেখার জন্য স্বেচ্ছাসেবক সমিতি তৈরি হচ্ছে। আন্দোলনের মানুষরা দিনে দু'বার জেনারেল এ্যাসেম্বলি করে নানান সিদ্ধানত্ম নিচ্ছেন।
মানব মাইক ও অন্যান্য গল্প

ইরাকে বা আফগানিসত্মানে পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে সিভিলিয়ানদের অমস্নানবদনে মারতে পারে, নিজেদের দেশে তা পারে না। তবু 'অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট' আন্দোলন একটা পিকনিক, এ রকম মনে করার কোন কারণ নেই। ইতোমধ্যেই ৮০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। জেলে তাঁদের কুৎসিতভাবে রাখা হচ্ছে। নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁদের আইনী সহায়তা দেওয়ার জন্য সংগঠিত হয়েছেন। লঙ্কা গ্যাস ছেটানো হচ্ছে, উচ্ছেদের নানা চেষ্টা চলছে। পুলিশ মাইক ব্যবহার করতে দিচ্ছে না বলে আন্দোলনকারীরা 'মানব মাইক' ব্যবহার করছেন। ব্যাপারটা এক অর্থে আমাদের কীর্তনের আসরের মতো। বক্তা কিছু বলে থামছেন। সামনের লোকেরা সবাই মিলে চিৎকার করে সেটা রিপিট করছেন, যাতে পেছনের লোকে শুনতে পায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, প্রক্রিয়াটা বেশ কাজ করছে, আর মনোবল বাড়াচ্ছে। 'পুলিশ কেমন জব্দ হলি', এ রকম একটা ভাব। পাশাপাশি নানান সমালোচনাও চলছে। অনেকে বলছেন, সিস্নপিং ব্যাগের ভেতরে যৌনতা চলছে, মেয়েরা নিজেদের নগ্ন শরীরকে পোস্টার হিসেবে ব্যবহার করছে। এক জনের ছবি বেরিয়েছে, সে পুলিশের গাড়িকে গ্রাহ্য না করে তার ওপরেই বাহ্যে করছে। আবার বাজারও পিছিয়ে নেই, আমাদের দেশে যেমন অন্না টি-শার্ট বেরিয়ে গিয়েছিল, ওখানে নানান রকম কা- চলছে। 'অকুপাই' বলে নাকি একটা পাই-জাতীয় খাবার পিৎজার দোকানে বেরিয়ে গেছে। ওই নামে কম্পিউটার গেম তৈরি হচ্ছে, বাজারে এল বলে।
পার্টি নেই, আন্দোলন আছে

অনেক সময় অন্য সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ঘটা কোন কিছুকে বিচার করতে গিয়ে আমরা তার কয়েকটা অস্বসত্মিকর দিকের ওপর জোর দিয়ে তার দাবিগুলোর গুরম্নত্বকে বুঝতে ব্যর্থ হই। এতে যে ব্যবস্থাটা টিকে আছে, তারই সুবিধে হয়। ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন হচ্ছে সাদা দেশে, যাদের সুবিধাভোগী বলে ভাবার একটা অভ্যেস আমাদের আছে। সিস্নপিং ব্যাগ আর সাদা লোকজন দেখলেই আমরা কী রকম হলিউড ছবি আর বিদেশ থেকে আত্মীয়দের পাঠানো সুখের ভিডিয়োর গলে ঢুকে যাই।
তা কিন্তু ঘটনা নয়। দুনিয়া জোড়া অর্থনীতিতে যে টালমাটাল চলছে তাতে আমেরিকার সাধারণ মানুষ আর আমাদের চেয়ে কম বিপন্ন নয়। আমাদের দেশে যে বাজার মডেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্রমশই মধ্যবিত্তেরও হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, সে ঘটনা তাদের দেশে বহুদিন ধরে সুপরিকল্পিতভাবেই ঘটে চলেছে। এখন মার্কিন অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় হওয়ায় লোকের নাভিশ্বাস উঠেছে। প্রতিবাদ তাই বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত এটা হয়ত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আরও বেশি দীর্ঘদিন একটা বাম আন্দোলনের আবহাওয়ার মধ্যে থাকার ফলে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনীতির প্রতি একটা অবজ্ঞা আছে। আমাদের ধারণা, একটা পার্টর্ি না থাকলে কোন আন্দোলন হয় না। ঘটনা কিন্তু একেবারেই তা নয়। বিশ্বজোড়া নারীবাদী আন্দোলনের কোন বিশাল পার্টি ছিল না। সমকামী আন্দোলনেরও না। পরিবেশ আন্দোলনের একটি গ্রিন পার্টি থাকলেও, সে আন্দোলন পার্টিবাহিত রাজনীতি দিয়ে ছড়ায়নি। এই শতকের গোড়ায় ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম বলে যে আন্দোলন দেখেছিলাম, তা-ও কোন রাজনৈতিক দলবাহিত না হয়েও কর্পোরেট লোভ আর ধ্বংসের দিকে আমাদের নজর টেনেছিল। এই আন্দোলনগুলো নানাভাবে আমাদের ধারণা বদলায়, সমাজ বদলায়। নারীবাদী আন্দোলন, সমকামী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন যে আমাদের বোধ, অভ্যাস, বিশ্বাসে বেশ কিছু বদল এনেছে, সমাজের পরিবেশ বদলেছে, এটা নিশ্চয় আমরা অস্বীকার করব না।
ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন মানুষের বাঁচার স্বপ্নের খুনী হিসেবে সমাজের ১% মানুষের লোভের কথা বলেছে। কথা হলো, সমাজের বাকি ৯৯%-এর মধ্যে ওই লোভের ভাগ ছড়াতে না পারলে তো তাদের ঠকিয়ে ওই ১% লাভটাকে নিজের ঘরে তুলতে পারে না। ধনতন্ত্রের গায়ের জোরের ব্যবহার অবশ্যই আছে, কিন্তু ধনতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় মানুষের সমর্থন না থাকলে সে ব্যবস্থা কি বাড়তে পারত? তাই বিপদটাকে কেবল বাইরের শত্রম্ন বলে না চিনে নিজেদের মধ্যেও চিহ্নিত করতে না পারলে, বদল আসবে কি? আমাদের আন্না-আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখেছি। সরকার তো করাপ্ট বটেই, কিন্তু কোম্পানিগুলো তো সমান লোভী। আর 'পবিত্র আন্দোলনকারী' বলে কিছু হয় কি? আমাদের চার পাশে পঞ্চায়েত আন্দোলন তো সব দুর্নীতিগ্রসত্ম মানুষ নিয়ে শুরম্ন হয়নি, তবে এই রকম হয়ে গেল কেন? ক্ষমতার লোভ যে জলের মতো গড়িয়ে ঢুকে সব আদর্শকে কাদা করে দেয়, সেটা না মানলে বিকল কাঠামো কল্পনা করা কঠিন।
এই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে খ্যাতনামা দার্শনিক সস্নাভোজ জিজেক বলেছেন : 'আমার শুধু এটা নিয়েই ভয় যে এক দিন আমরা সবাই বাড়ি ফিরে যাব। আর তার পর আমরা বছরে একদিন দেখা করব। বিয়ার খেতে খেতে ভাবব, এই [আন্দোলনের] দিনগুলো কী দারম্নণ ছিল। আসুন আমরা নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞা করি, সেটা হতে দেব না। জানেন তো, মানুষ অনেক সময় কিছু কামনা করে কিন্তু সেটা ঠিক চায় না, যা কামনা করেন সেটা সত্যি সত্যি চাইতে ভয় পাবেন না। (পুরো বক্তৃতার জন্য দেখুন : যঃঃঢ়://িি.িষধপধহ.পড়স/ঃযবংুসঢ়ঃড়স/?ঢ়ধমবথরফ=১৪৭৬)
জিজেক খুব সহজ করে একটা খুব সত্যি কথা বলেছেন। কামনা করাটা সহজ, সেটা একটু অলসভাবে, নিজেকে না বদলেও, করা যায়। তার মধ্যে যেন একটা না পাওয়ার সানত্ম্বনা বিল্ট-ইন থাকে। সেটাকে একটা সুউচ্চ আইডোলজি বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। 'চেয়েছিলাম, পেলাম না' বলে দুঃখবিলাস করা যায়। কিন্তু চাওয়াটা দৃঢ় একটা রাজনীতি দাবি করে, যার জন্য নিজেদের বদলাতে হয়, অত সহজে ঘরে ফেরা যায় না। এই আন্দোলনটা কঠিন। কারণ, সাধারণ মানুষ এই কাজটা করবে কী করে? আমাদের তো নিজেদের জীবনটা চালাতে হয়। তখনই পেশাদার রাজনীতিবিদরা আসেন, আসে ক্ষমতা, লোভের গল। ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন আমাদের এই সব জরম্নরী বিষয় নিয়ে 'ভাবা প্র্যাকটিস' করতে বলে।
কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে
সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী
স্মরণ
রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ছিন্ন করে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে যে ক'জন নারী ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে সিলেট জেলায় মহিলাদের পৰে পূর্ববঙ্গের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছিল তার অন্যতম উদ্যোক্তা ও স্বাক্ষরদাতা ছিলেন শাহার বানু চৌধুরী। গণভোট, ভাষা আন্দোলনসহ সিলেটের সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। সৈয়দা শাহার বানুর জন্ম সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুরে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে। পিতা সৈয়দ আবুল বাশার চৌধুরী। মরমী কবি সৈয়দ আশহর আলী তাঁর দাদা। এই বংশের দেওয়ান সৈয়দ ওয়াছিল আলী চৌধুরী নবাবী আমলে সদরআলা ও দেওয়ান ছিলেন। প্রপিতা দেওয়ান সৈয়দ আজমল আলী চৌধুরী ছিলেন জমিদার।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিয়ে হয় এ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের সঙ্গে। গৃহশিৰক এবং স্বামীর কাছে লেখাপড়া শেখেন। সংগ্রামী নারী রাজনীতিবিদ বেগম জোবেদা খানম চৌধুরী এবং স্বামী আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ আব্দুল হাফিজের সঙ্গে রাজনৈতিক কাজে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বামীর সব কাজের সহযোগী এবং সিলেটের নেতৃস্থানীয় সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কর্মী। তিনি সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের প্রথম দিকের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং ১৯৪৫-৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটের গণভোটের সময় ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি মুসলমান মহিলাদের সংগঠিত করেন। কংগ্রেসের সহযোগী সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্ররোচনা মোকাবেলার জন্য তখন মৌলনা সহুল আহমদ উসমানীর ফতোয়া মাথায় রেখে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। একজন নারী হয়ে তৎকালীন রৰণশীল সমাজের শত প্রতিকূলতাকে উপেৰা করে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক ৰেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাৰরে লেখা থাকবে। সিলেটের নারী শিৰা প্রসারে তাঁর অবদান উলেস্নখযোগ্য। তিনি সিলেটে মহিলা কলেজের শুরু থেকেই এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে যখন কলেজটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় তখন এর অসত্মিত্ব রৰায় তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কলেজের ছাত্র সংগ্রহে তিনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ান এবং মেট্রিক পাস মুসলমান মেয়েদের কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। চালি বন্দর বালিকা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দীর্ঘকাল জড়িত ছিলেন। মৃতু্যর আগ পর্যন্ত তিনি এ স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি সিলেট মহিলা সমিতিরও সভাপতি ছিলেন।
রত্নগর্ভা সৈয়দা শাহার বানু তেরো সন্তানের গর্বিত জননী। সাত ছেলে ও ছয় মেয়ের সবাই উচ্চশিৰিত এবং দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। ডক্টর আবু আহমদ আব্দুল মুহসি (সাবেক অধ্যাপক ও ডিন, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), আবুল মাল আবদুল মুহিত সিএসপি (বর্তমানে অর্থমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার), ডক্টর একে আবদুল মুবিন (সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সচিব), ডক্টর একে আবদুল মোমেন (জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও সৌদি আরব সরকারের সাবেক অর্থনীতি উপদেষ্টা, ডা. শাহলা খাতুন (জাতীয় অধ্যাপক), তাঁর সনত্মানদের মধ্যে বহুল পরিচিত। সৈয়দা শাহার বানু ১৯৮৩ সালের ২১ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।
এম.আর. মাহবুব