মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
০ সড়ক মহাসড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ 0 বেপরোয়া ড্রাইভার ॥ এ মৃত্যু রুখবে কে
০ বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫৫ নিরীহ যাত্রী-পথচারী প্রাণ হারাচ্ছে ॥ তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
০ বেশিরভাগ তথ্যপূরণ ছাড়াই মেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স
০ অধিকাংশই ওস্তাদের কাছে শিখে গাড়ি চালাচ্ছে
০ যাত্রী পথচারী কারও জীবনের নিরাপত্তা নেই
রাজন ভট্টাচার্য ॥ জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় কিংবা ফুটপাথ দিয়ে চলার পথে গায়ের ওপর উঠছে বাস! গাড়ি থামানোর জন্য ট্রাফিক সিগন্যালের পরও বেপরোয়া চালক। পুলিশের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি- এমন নজিরও আছে। পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ও নেই জীবনের নিরাপত্তা। মহাসড়ক যেন মরণ ফাঁদ। যে কোন সময় ঘটছে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই ঝরে যাচ্ছে তাজাপ্রাণ। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন একটিই, নামধারী এই চালকদের অন্তরালে ঘাতকদের রুখবে কে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারিগরিসহ যথাযথভাবে সকল পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেয়ার সামর্থ্য নেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে। বেশিরভাগ শর্ত পূরণ ছাড়াই এ পর্যন্ত ১৪ লাখের বেশি লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। ৬৪ জেলায় চোখের দেখায় লাইসেন্স সনদ পাচ্ছেন চালকরা। অনেকক্ষেত্রে প্রশিক্ষক ও ডাক্তারের সার্টিফিকেট নকল করে মিলছে বৈধ চালকের সনদ। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ওস্তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে এমন চালকের সংখ্যাই বেশি। অনুমোদিত শতাধিক ড্রাইভিং স্কুলের কোন তদারকি নেই। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের বিরুদ্ধে নেই কঠোর আইন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ৬১ ভাগ চালক কোন রকম পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স পাচ্ছেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ৯১ ভাগ চলক।
গত সোমবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ভাড়ায় চালিত একটি বাসের চাপায় টিটু নামে বায়োটেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্র নিহত হয়েছেন। একই দিন রাজধানীর মৌচাকে বাস চাপায় নিহত হন একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল কাঞ্চন। শনিবার রাতে কারওয়ানবাজারে বাস চাপায় মারা গেছেন খ্যাতিমান সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জগ্লুল আহমেদ চৌধূরী।
পরবর্তীতে ঘাতক চালকদের হাতে কার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে কেউ জানে না। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় কম মায়ের বুক খালি হয়েছে এর কোন হিসেব নেই। কতজন স্বজন হারিয়েছেন, কত বাবা নিভৃতে চোখের পানি ফেলছেন কে জানে। হাতের মেহেদি না মুছতেই অসংখ্য স্ত্রী স্বামীহারা হয়েছেন শুধু বেপরোয়া চালকদের কারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে তিন ধরনের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সকল শর্ত পূরণ করতে হবে। সঠিক পদ্ধতি মেনে লাইসেন্স দেয়া হলে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বাড়াতে হবে শাস্তি। শিক্ষিতদের আনতে হবে চালকের পেশায়। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তাঁরা। চালকদের মধ্যে একটি বড় অংশই নেশাগ্রস্ত। মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে গাড়ি চালানো ও নেশা করার কারণে রাজপথে চালকরা অনেক সময় বেপরোয়া।
১৯৯০-২০১১ সাল পর্যন্ত শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার পেশাদার চালককে লাইসেন্স দেয়া হয় যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই। সারাদেশে লাইসেন্স আছে ১৪ লাখ ৩১ হাজার। এর মধ্যে পেশাদার লাইসেন্স প্রায় ৭ লাখ। এই পেশাদার ৭ লাখের মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ভারি যানবাহন, অর্থাৎ বাস, ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানের চালক। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে। এরপরই নেপালসহ আফ্রিকার দেশগুলোয়। মামলায় সাজার দিক থেকে শতকরা ৮৩ ভাগ আসামিই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না বেশিরভাগ মামলা। বিচার শুরুর আগেই আপোসরফা হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার মামলার ফৌজদারি আইনে সর্বোচ্চ দ- তিন বছর। অপরাধ জামিনযোগ্য! এমনকি আপোসযোগ্যও। দুর্ঘটনার পর একটি গাড়ি আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে। মোটরযান অধ্যাদেশ আইনে সর্বোচ্চ কারাদ- চার মাসসহ জরিমানা ৫শ’ টাকা। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত পরিবহনের সংখ্যা আট লাখ ৩৫ হাজার ৮১২। চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত মোট পরিবহনের সংখ্যা ২১ লাখ পাঁচ হাজার ১৪০। দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি! সরকারী তালিকাভুক্ত যানের সংখ্যা ২১ লাখের কিছু বেশি। ১৯ লাখ অবৈধ। এর মধ্যে ফিটনেস ছাড়াই চলছে তিন লক্ষাধিক যানবাহন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৩ লাখ। সরকারী হিসাব অনুযায়ী সাত লাখ অবৈধ চালক রেজিস্ট্রেশনভুক্ত যান চালাচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেশে অবৈধ চালকের সংখ্যা ৩৩ লাখেরও বেশি। অর্থাৎ অবৈধ চালক আর পরিবহনের দখলে দেশের ৩৬১ রুট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৫ নিরীহ যাত্রী প্রাণ হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ পরিষদের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ লাখ নসিমন, করিমন, ভটভটি বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। যার একটিও সরকারীভাবে অনুমোদিত নয়। ৩ লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক মহাসড়কে চলতে দিয়ে কোন অবস্থাতেই নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন সক্ষম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৬টি যানবাহন প্রতিবছর মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ছে। এই পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৬৯ জন। এ দেশের ২ শতাংশ জিডিপি ক্ষতি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে।
গোড়ায় গলদ ॥ চালকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সচিব মুহাম্মদ শওকত আলী জনকণ্ঠ’কে বলেন, ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি চালকদের লাইসেন্স দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে চালকদের লিখিত, মৌখিকসহ ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য পাঁচ কিলোমিটার মাঠ, রাস্তা, যান সঙ্কটসহ মেকানিক্যাল কোন ব্যবস্থা নেই। নিজস্ব যান না থাকায় চালকের দক্ষতা নিরূপণের ব্যবস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায়। তিনি বলেন, প্রতিটি কমিটিতে একজন ডাক্তার থাকেন চালকের চক্ষুসহ ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য। চালক রং, ট্রাফিক সাইন, রাতে চালাতে পারে কিনা এসব বিষয় দেখভাল করেন। বাস্তবে এমন মনিটরিং খুব একটা হয় না। এছাড়াও একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর চালকের সিগন্যাল টেস্ট পরীক্ষা নেন। তা যথাযথ হয় না। তিনি বলেন, চালকরা সকল নিয়ম-কানুন বা শর্ত পূরণ করে লাইসেন্স পেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সকল শর্ত পূরণ করে চালকদের লাইসেন্স দিতে ব্যর্থ হচ্ছি।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন চালককে ওয়ার্নিং সাইন, ইনফরমেশন সাইন, রুট সাইন, রুট মার্কিং, সাপ্লিমেন্টারি প্লেটস, ট্রাফিক সাইন, বাধ্যতামূলক সাইন চেনা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে চালকদের অনেকেই আছেন এর কোন কিছুই জানেন না। চোখের দেখা ও আন্দাজের ওপর গাড়ি চালান।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জনকণ্ঠ’কে বলেন, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান ও ওস্তাদের কাছ থেকে ড্রাইভিং শিখে বেশিরভাগ চালক লাইসেন্সের জন্য আবেদন করছেন। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রাইভিং শেখার পর বিআরটিএ থেকে চালকদের লাইসেন্স পাওয়ার নজির খুবই কম। তিনি বলেন, ওস্তাদের কাছ থেকে ড্রাইভিং শেখার পর সেই চালক কোনভাবেই গাড়ি চালানোর প্রকৃত নিয়ম-কানুন আয়ত্ত করতে পারবেন না। এটাই স্বাভাবিক। সেই সঙ্গে তাদের আচরণও শেখানো হয় না। নিসচার পক্ষ থেকে দেশের ৬৪ জেলায় আধুনিক চালক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করতে অর্থমন্ত্রীর কাছে টাকা চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি।
তিনি বলেন, অশিক্ষিত ওস্তাদ বেশিরভাগ সাগরেদকে ড্রাইভিং শেখাচ্ছেন। এরপর তারা দিব্যি গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামছেন। পৃথিবীর কোথাও এমন চিত্র নেই। ওস্তাদের পাশে বসে অবৈজ্ঞানিকভাবে শেখার কারণে চালকদের বাঁকা হয়ে বসতে হয়। পরবর্তীতে একজন চালক জীবনভর বাঁকা হয়ে বসে গাড়ি চালান। এটাও দুর্ঘটনার কারণ। তিনি বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন চালকরা জমা পদ্ধতিতে গাড়ি চালান। অর্থাৎ দিনে একটি নির্দিষ্ট টাকা মালিকদের দিতে হবে এমন চুক্তিতে চলছে যানবাহন। জ্যামে বসে থাকার পর রাস্তা স্বাভাবিক হলে বেপরোয়া গাড়ি টানেন চালকরা। ফলে দুর্ঘটনা বেশি হয়। বেশি বেতনে শিক্ষিত লোকদের চালকের পেশায় আনতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে শিক্ষিত ও বেকার তরুণদের চালকের পেশায় আনতে সড়ক অনেকটাই নিরাপদ হবে বলে মনে করেন তিনি।

লাইসেন্স পাওয়ার নিয়ম
শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স ॥ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির পূর্বশর্ত হলো শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স। বয়সের প্রমাণপত্র, স্কুল সার্টিফিকেট/পাসপোর্ট/জন্ম নিবন্ধন সনদ/জাতীয় পরিচয়পত্র সত্যায়িত অনুলিপি (আবেদনের তারিখে প্রার্থীর বয়স পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর এবং অপেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে)। এছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র/ পাসপোর্ট/সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদের সার্টিফিকেটের সত্যায়িত অনুলিপি।
ঠিকানার যাচাইপত্র হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র/পাসপোর্ট/ পানি/ গ্যাস/ বিদ্যুত/টেলিফোন বিলের সত্যায়িত অনুলিপি। রেজিস্টার্ড ডাক্তার কর্তৃক আবেদনকারীর এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ নির্ধারিত ফরমে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। তিন কপি স্ট্যাম্প সাইজের রঙিন ছবি, নির্ধারিত ফি : এক. ক্যাটাগরি-৩৪৫/- টাকা ও দুই. ক্যাটাগরি-৫১৮/-টাকা জমা দেয়া, আবেদনপত্র, ফি জমা রসিদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাইসেন্সিং অথরিটি বরাবর দাখিলের পর প্রার্থীকে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট অফিস হতে তিন মাাসের জন্য শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এই লাইসেন্সে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার মান, তারিখ ও সময় উল্লেখ থাকে।
ব্র্যাকের চালক প্রশিক্ষক মোঃ নুরুন্নবী শিমু জনকণ্ঠ’কে বলেন, চালকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে নিয়ম-কানুন যা আছে তা পর্যাপ্ত। কিন্তু এর বাস্তবায়ন না হচ্ছে না। একজন দক্ষ চালক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারী সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, ১৮ বছর বয়স হলেও যে কেউ শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। নিয়মানুযায়ী ডাক্তারী পরীক্ষার পর তার লাইসেন্স পাওয়ার কথা। বাস্তবে যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া ডাক্তারী সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট দেয়া হয়। তিনি বলেন, শিক্ষানবিস চালকরা দুইমাস পর পেশাদার চালকের জন্য আবেদন করতে পারেন। এরপর লার্নার দেয়ার দুইমাস পর চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন একজন চালক। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির তেমন একটা বালাই নেই। সঠিক নিয়মে লাইসেন্স দেয়া হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স ॥ প্রার্থীকে শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্সে উল্লিখিত তারিখ ও সময়ে নির্ধারিত পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর কৃতকার্য হলে মৌখিক পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। কৃতকার্য প্রার্থীকে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স (যেখানে পরীক্ষা পাসের রেকর্ড রয়েছে)। পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানার পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন। উপরোক্ত কাগজপত্র ও প্রযোজ্য ফিসহ সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং অথরিটি বরাবর আবেদন দাখিলের পর আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক্স (ডিজিটাল ছবি, ডিজিটাল স্বাক্ষর ও আঙ্গুলের ছাপ) গ্রহণ করে প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ প্রদান করা হয়।
পুলিশ সার্জেন্ট ও চালক প্রশিক্ষক নূরুল মোমেন জনকণ্ঠ’কে বলেন, কোন চালককে শেখানোর সময় প্রশিক্ষকের নাম ঠিকানাসহ ফরম পূরণ করতে হয়। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষকের স্বাক্ষরসহ কাগজপত্র দাখিল করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু যারা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন তাদের ফরমে প্রকৃত প্রশিক্ষকদের নাম ঠিকানা ও স্বাক্ষর থাকে না। তাদের পক্ষে কারা সই করেন কেউ জানে না। এই প্রেক্ষাপটে একজন চালক কোনভাবেই বৈধ লাইসেন্স পেতে পারে না। তিনি বলেন, বৈধ প্রশিক্ষকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে গেলে বিআরটিএ লাইসেন্স দিতে গড়িমসি করে এমন অভিযোগও আছে চালকদের। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে সঠিকভাবে লাইসেন্স দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্ঘটনায় দোষীদের সাজা ৭ বছর ॥ সামরিক শাসক এরশাদের আমলে দ-বিধি সংশোধন করে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সাজা কমানোর সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। চলতি বছরের ২০ অক্টোবরের রায়ে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় দোষ প্রমাণিত হলে আগের মতোই সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদ-ের বিধান বহাল হবে। রায়ে বলা হয়, এই সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৮৫ সালে তখনকার এরশাদ সরকার দ-বিধির ৩০৪ (বি) ধারা সংশোধন করে সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর কারাদ- থেকে কমিয়ে তিন বছর করে। শুনানিতে মনজিল মোরশেদ বলেন, সাজার মেয়াদ কমানোর কারণে সড়কে নাগরিকদের জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংশোধনী সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে দুর্ঘটনায় চালকের দায় প্রমাণিত হলে ১০ বছরের বেশি কারাদ-ের বিধান রয়েছে জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, এর ফলে সেখানে দুর্ঘটনা কম হয়। আমেরিকায় বিভিন্ন প্রদেশে দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ ৯৯ বছর পর্যন্ত দ-ের বিধান আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সাজার পরিমাণ কম হওয়ায় সড়ক নিরাপদ নয়। সাজার মেয়াদ বাড়ানো দরকার।
ইবি ক্যাম্পাস রণক্ষেত্র ২৫ বাসে আগুন ॥ ভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা
পুলিশের গুলি, ৩০ শিক্ষার্থী আহত ॥ বাস চাপায় ছাত্র নিহতের জের
নিজস্ব সংবাদদাতা, কুষ্টিয়া ও ইবি সংবাদদাতা ॥ বাসচাপায় কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিহতের জের ধরে রবিবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ইবি ক্যাম্পাস। নিহত ছাত্রের নাম তৌহিদুর রহমান টিটু। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। রবিবার দুপুর ১২টার দিকে চতুর্থ শিফটের বাসগুলো ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় প্রধান ফটকের সামনে বাসচাপায় মারা যায় টিটু। তার মৃত্যুর খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়া মাত্র জ্বলে ওঠে সহপাঠীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ গাড়িতে আগুন ও ৫ গাড়ি ভাংচুর করে তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়। আহতদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহতদের ইবি চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ইবি প্রক্টরের নির্লিপ্ততার কারণে পুলিশ গুলি চালিয়েছে বলে দাবি সাধারণের। এ জন্য প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেছে বিক্ষুব্ধরা।
এদিকে অনাকক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে সিন্ডিকেটের জরুরী সভায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ছাত্রদের রবিবার সন্ধ্যা ৬টা এবং ছাত্রীদের সোমবার সকাল দশটার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিকেলে পরিসংখ্যান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, ক্লাস শেষ করে রবিবার ইবির বায়ে টেকনোলজি এ্যান্ড জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদুর রহমার টিটু চতুর্থ শিফটের ১২টার বাস ধরতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে যান। এমন সময় পেছন দিকে থেকে আসা ঝিনাইদহগামী রাজ মটরস নামে একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়। গাড়ির ধাক্কায় সে মাটিতে পড়ে গেলে সাগর পরিবহন নামে আর একটি গাড়ি তার গলার ওপর দিয়ে চলে যায়। আর এতে ঘটনাস্থলেই টিটুর মৃত্যু হয়। টিটুর বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহিষপুর নামক স্থানে। এ ঘটনায় ভাংচুরে আর আগুনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন, অনুষদ ভবন, বিজ্ঞান ভবন, টিএসসিসিতে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের ওপর ১৫০ রাউন্ড গুলি চালায়। এতে ২০ এদিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ত ম লোকমান হাকিমের নির্দেশে ৩ ঘণ্টা পড়ে থাকা লাশের কোন ব্যবস্থা না করে উল্টো আমাদের ওপর গুলি করা হয়েছে। ঘটনার সময় থেকে শেষ পর্যন্ত প্রক্টরকে মাঠে দেখা যায়নি। এদিকে প্রক্টরের এমন নির্দেশের কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফায় ব্যাপক ধাওয়া পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের লাখ করে পুলিশ গুলি চালালে তারা দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। এক পর্যায়ে কুষ্টিয়া থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আসে এবং শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকায় তাড়িয়ে দিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এর কিছুক্ষণ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তাব্যক্তিরা জরুরী এক সিন্ডিকেট সভায় বসেন। ঘণ্টাব্যাপী মিটিংয়ের পরে পরবর্তী অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এদিকে সংশ্লিষ্ট বাসচালককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির নির্দেশদাতা প্রক্টরের অপসারণের দাবিতে শিক্ষার্থীরা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তারা এই বিচার না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশের পরও হল ছাড়তে নারাজ।
এ বিষয়ে বায়োটেকনোলজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, আমাদের আজকের দাবি কোন রাজনৈতিক দাবি নয়। আমরা আমাদের এক সহপাঠীকে হারিয়েছি। এর বেদনা আমরাই বুঝি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমাদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে গুলি করতে। আমরা ঘাতক বাসচালক ও প্রক্টরের বিচার চাই।
এ বিষয়ে ইবি থানার ওসি মহিবুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার টিম নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাই। তবে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীরা অনেক গাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল। এ বিষয়ে বায়োটেকনোলজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম স্বপন বলেন, টিটু একজন মেধাবী ছাত্র ছিল। আমি তাদের রেজাল্টের কাজ করছিলাম। এমন সময় শুনতে পেলাম তার এই অশুভ সংবাদ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার বাড়িতে পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ত ম লোকমান হাকিম বলেন, আমি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাই। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং পাটকাঠি দেখিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দেয়। পরবর্তীতে আমি সেখান থেকে চলে আসি এবং পুলিশের শরণাপন্ন হই। যতদূর পেরেছি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সরকার বলেন, মৃত্যুর ঘটনাটি সত্যিই বেদনাদায়ক। আর সহপাঠীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো সম্পদ নষ্ট করা সমীচীন নয়। তবে এর চেয়ে আরও বড় কোন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে আমরা এক জরুরী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কিছুদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছি।
ঝিনাইদহ থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যানবাহনে আগুন ও ভাংচুরের প্রতিবাদে রবিবার বিকেল থেকে ঝিনাইদহের সকল রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় ঝিনাইদহ জেলা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। ঝিনাইদহ জেলা বাস-মিনিবাস ও ট্রাক মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হবু জানান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যানবাহন অক্ষত রেখে আমাদের যানবাহনে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত সকল রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, পৌরসভা মেয়র হাজী সাইদুল করিম মিন্টু জানান, প্রশাসনের সঙ্গে মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ নেতৃবৃন্দের আলোচনার পর নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
না’গঞ্জে আ’লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী নিহত
গুলিবিদ্ধ ১৫ ॥ বাড়িঘর ভাংচুর আগুন সড়ক অবরোধ
স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ ॥ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আমজাদ হোসেন (৪৫) নামে এক যুবলীগ কর্মী নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও কমপক্ষে ১৫ জন। তাদের গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই দফা প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ লোকজন কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের লোকজন বিএনপি সমর্থক দুই কর্মীর ৫টি বসতঘরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। ঘটনার পর পরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে আটক করেছে। রবিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অতিরিক্ত র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহত যুবলীগ কর্মী আমজাদ উপজেলার দুপ্তারা ইউনিয়নের পাঁচরুখী এলাকার মৃত ইদ্রিস মোল্লার ছেলে। আহতরা সকলেই যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, বিলবোর্ড উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে উপজেলার পাঁচরুখী এলাকায় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ সমর্থিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপি নজরুল ইসলাম বাবু সমর্থিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। রবিবার সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর ছবি সংবলিত ফেস্টুন ভাংচুর করে বিএনপির লোকজন। এ নিয়ে সাতগ্রাম ইউনিয়নের পাঁচরুখী এলাকাতে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এমপি নজরুল ইসলাম বাবু সমর্থিত যুবলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুবদলের নজরুল ইসলাম আজাদ সমর্থক সজীব, দ্বীন ইসলাম, মনির ও তার সহযোগীদের মধ্যে বাগবিত-ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে সকাল পৌঁনে ১১টার দিকে আমজাদ হোসেনকে যুবদল কর্মী সজীব, ইকবাল, ফারুকসহ তাদের সহযোগীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। পরে আমজাদের পায়ে সজীব গুলি করে এবং তার লাইসেন্স করা পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। আশপাশের লোকজন আমজাদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে উভয় গ্রুপের লোকজন ধারালো অস্ত্র, বল্লম, টেঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় ব্যাপক সংঘর্ষ। এতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ দীন ইসলাম, ডাঃ মনিরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। আইউব, বাবু, সাইফুল, তাওহীদ, সোলায়মানসহ বাকিদের রূপগঞ্জের ভুলতা ও পার্শ্ববর্তী নরসিংদীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। সংঘর্ষের সময়ে উভয় পক্ষের ব্যাপক গোলাগুলিতে এলাকাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বন্ধ হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যান চলাচল। তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এক ঘণ্টা অবরোধ থাকার বেলা সাড়ে ১২টায় পুলিশ এসে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমজাদের মৃত্যু হয়। এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ ও আমজাদের এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পরে বেলা ১টায় ফের সড়ক অবরোধ করে নেতাকর্মীরা। প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর এবং ফটিক ও ইকবালের ৫টি বসতঘরে আগুর জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা।
আগুনে পুড়িয়ে দেয়া ঘরের মালিক বিএনপি সমর্থক আব্দুর কাদিরের পুত্রবধূ খোদেজা বেগম সাংবাদিকদের জানান, সকালে আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল লোক পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুর চালায়। এক পর্যায়ে তারা পেট্রোল ঢেলে তাদের ৫টি বসতঘর আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। তারা পাকা ভবনের একটি ঘরে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
ঘটনাস্থলে থাকা আড়াইহাজার উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওই এলাকার মোঃ বাকির ভূইয়া সাংবাদিকদের জানান, ব্যবসায়িক কারণে আমজাদ হোসেন মোল্লা নারায়ণগঞ্জের জামতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে। মাঝে মধ্যে তার পৈত্রিক বাড়ি পাঁচরুখী এলাকা এসে এলাকার লোকজনের বিভিন্ন সমস্যায় সহযোগিতা করে। রবিবারও সকাল সাড়ে ৯টায় সে পাঁচরুখী বাজার থেকে মহাসড়কে উঠার সময় নজরুল ইসলাম আজাদের সমর্থক ইকবাল, রুহুল আমিন, চাক্কু মামুনসহ ১০-১২ জন তাকে দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পড়ে খুনের মামলার আসামি সজীব তার পায়ে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে পালিয়ে যায়। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নেয়া হলে সেখানেই আমজাদ হোসেন মারা যায়। নিহত আমজাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জুয়েল আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজন বিএনপির বিলবোর্ড ছিঁড়ে ফেলার কারণেই এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।
এদিকে খবর পেয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। তাকে দেখে আমজাদের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু সাংবাদিকদের বলেন, গোটা উপজেলায় মানুষ যেখানে শান্তিতে বসবাস করছে, সেখানে খুনী চক্র সে শান্তি বিনষ্ট করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। সর্বশেষ নিরীহ ও শান্ত মানুষ ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করল। তার সঙ্গে দ্বীন ইসলাম, মনিরসহ আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের অতর্কিত গুলি ও দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করেছে। নিহত যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বলে তিনি জানান।
ঘটনার পর পরই নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন, ইউএনও মোহাম্মদ সামছুল হক, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ শরিফুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ফাঁড়ি পুলিশের পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানান, রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক আমজাদকে মৃত ঘোষণা করেন। তার গায়ে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন রয়েছে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে ১০ জনকে। দোষীদের গ্রেফতার অভিযান চলছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় আরও দু’জনের প্রাণ গেল ঢাকাতেই
০ গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুতে স্বামী আটক
০ ছাদ থেকে পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু
০ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সিএনজি খোয়া
স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী রহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। মুগদায় একটি চারতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে আরেক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। আবারও নগরীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীসহ দু’জন নিহত হয়েছে। মিরপুরে একটি খাবার হোটেলে বিদ্যুতস্পৃষ্ট হয়ে এক হোটেল কর্মচারীর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে মুগদায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে এক সিএনজি চালক তার সিএনজি অটোরিকশা খুঁইয়েছেন। রবিবার পুলিশ ও মেডিক্যাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রবিবার মোহাম্মদপুর থানাধীন বশিলার কাটাসুরে এক বাড়িতে ফেরদৌসী আক্তার মেরি (২৮) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ দুপুরে তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদুর রহমান জানান, মৃত মেরির গলায় লালচে দাগ পাওয়া গেছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী রহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। নিহত মেরির বাবার নাম মৃত ইউসুফ আলী। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানার উত্তর রামচন্দ্রপুর গ্রামে। নিহত মেরি স্বামী আব্দুর রহিম ও দুই ছেলেকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বশিলা রোডের কাটাসুর এলাকার ৮/২ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন।
মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক মাসুদুর রহমান জানান, নিহতের স্বামী আব্দুর রহিম স্টিলের ফার্নিচার ব্যবসায়ী। পারিবারিক বিষয় নিয়ে মেরির সঙ্গে তার স্বামী রহিমের প্রায়ই ঝগড়াবিবাদ লেগে থাকত। এরই জের ধরে মেরিকে নির্মম নির্যাতন করত তার স্বামী রহিম। শনিবার রাতেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। এরপর তারা রাতে আলাদা ঘরে শুয়ে পড়ে। পরেরদিন রবিবার সকালে স্বামী তার স্ত্রীকে ডেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। দুপুর ১২টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। এদিন সকালে দক্ষিণ মুগদাপাড়ার এলজি বাটারফ্লাই শোরুমের পেছনে ৮৬/৭ নম্বর ভবনের চারতলার ছাদ থেকে পড়ে শাহিনুর আক্তার (৩৬) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। নিহতের স্বামীর নাম সাজ্জাদ কাদের। নিহতের ভাই সালাউদ্দিন জানান, তার বাসার পাশাপাশি শাহিনুরের বাসা। তিনি জানান, প্রতিদিনের ন্যায় রবিবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে বোন শাহিনুর ছাদে ফুলগাছে পানি দিচ্ছিলেন। পানি দিয়ে ওই ছাদ থেকে তার (সালাউদ্দিনের) বাসার ছাদে যাচ্ছিলেন শাহিনুর আক্তার। তখন শাহিনুর পা পিছলে নিচে পড়ে যায়। পরে শাহিনুরকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে আনলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২ ॥ রাজধানীর কাওরানবাজারে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও কলামিস্ট প্রবীণ সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদের চৌধূরীর মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও বেপরোয়া বাস চালকের চাপায় রবিবার এক শিক্ষার্থীসহ দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিন সকালে মালিবাগের মৌচাকে দুটি বাসের মাঝে চাপা পড়ে মোজাম্মেল হোসেন কাঞ্চন (২২) নামে এক বিবিএ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। তিনি ধানমণ্ডির ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করে বাড্ডা শাখার উত্তরা ব্যাংকে ইন্টার্নশিপ করছিলেন। নিহতের বাবার নাম মোঃ কাশেম মাস্টার। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ থানার মহিষদী গ্রামে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রবিবার সকাল ৯টার দিকে মালিবাগের মৌচাক এপেক্স শো-রুমের সামনে রাস্তা পার হচ্ছিলেন মোজাম্মেল হোসেন কাঞ্চন। এ সময় কাঞ্চন ডানদিকে ফালগুন ও বামদিকের দিবানিশি বাসের মাঝখানে পড়ে মারাত্মক আহত হন। পরে ফালগুন বাসের যাত্রী রাজি কাঞ্চনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে সকাল ১০টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জরুরী বিভাগে আনলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত কাঞ্চনের দুলাভাই আলমগীর হোসেন জানান, কাঞ্চন বনশ্রীর ৫ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাসায় থাকতেন। এ বিষয়ে শাহজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এসকে ক্ষুদে নেওয়াজ জানান, খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে তার মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে পাঠানো হয়।
একইদিন সকালে মিরপুর থানাধীন কল্যাণপুরে বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে বাসের চাপায় হৃদয় খান (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ সেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার করে ঢামেক মর্গে পাঠায়। মিরপুর থানার উপপরিদর্শক মোঃ মোক্তারুজ্জামান জানান, রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কল্যাণপুর বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে রাস্তা পার হচ্ছিল ওই যুবক। এ সময় বাস চাপায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে তার লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে পাঠানো হয়। পরে দুপুরে তার চাচা আবুল কালাম মর্গে এসে লাশ শনাক্ত করেন। নিহতের বাবার নাম মোঃ হোসেন আলী খান। গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার লেবুতলি গ্রামে। সে ঘটনাস্থলের কাছে দুই নম্বর গলিতে বসবাস করত।
অন্যদিকে রবিবার ভোরেরদিকে মিরপুর মাজার রোডের রাজীব হোটেলে স্যুইস অন করতে গিয়ে মোঃ মোমিন (১০) নামে এক হোটেল বয়ের মৃত্যু হয়েছে। মৃত মোমিনের সহকর্মী ইখলাক ও এনামুল জানান, ১৫ দিন আগে মোমিন রাজীব হোটেলে বয় হিসেবে কাজে যোগ দেয়। শনিবার রাত ২টার দিকে হোটেলের পেছনে স্টাফ রুমে ঘুমাতে যায় সে। ওই সময় বিদ্যুতের স্যুইস অন করতে বৈদ্যুতিক ছেঁড়া তারে স্পৃষ্ট হয় মোমিন। মোমিনকে গুরুতর আহত অবস্থায় রাত সাড়ে ৩টার ঢামেক হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আনলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে সিএনজি চালক ॥ আবারও রবিবার দুপুরে মুগদার মানিকনগর পুকুরপার এলাকায় অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে মোঃ মাসুদ (৩২) নামে এক সিএনজি চালককে অচেতন করে তার সিএনজিটি নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করেন। এর আগেরদিন শনিবার ভোরেরদিকে জুরাইন রেলগেট এলাকায় ছিনতাইকারীরা আব্দুর রাজ্জাক (৩৫) নামের চালককে কুপিয়ে কার সিএনজি অটোরিকশা ছিনিয়ে যায়। তাকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন। অজ্ঞানপার্টির শিকার মাসুদ নারায়ণগঞ্জ চাষাড়ার একটি গ্যারেজে থাকেন। আহত মোঃ মাসুদ জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে দুই যাত্রী নিয়ে তিনি গে-ারিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন। পথে তারা তাকে কিছু খেতে দেয়। এর পর তারা সিএনজি নিয়ে চলে যায়।
উনি তো পাকি সেনাদের কাছে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের কী বুঝবেন
খালেদা জিয়ার বক্তব্য নিয়ে সংসদে ক্ষোভ
সংসদ রিপোর্টার ॥ কুমিল্লায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বক্তব্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্যরা। ‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের দল নয়’ খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তাঁরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তো খালেদা জিয়া পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে ছিলেন। তাই উনি (খালেদা জিয়া) মুক্তিযুদ্ধের কী বুঝবেন? আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস না করলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না।
রবিবার বিকেলে দশম জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনের শুরুতেই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিএনপি প্রধানের বক্তব্যের সমালোচনায় মুখর হন আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও সংসদ সদস্য ড. হাছান মাহমুদ।
আলোচনার সূত্রপাত করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে তখন তিনি (খালেদা জিয়া) পাকিস্তানী
সেনাবাহিনীর কাছে ছিলেন। সারাবিশ্ব জানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। এর পরেও যখন পাকিস্তানী হানাদাররা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি তখন বঙ্গবন্ধু কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ হবে, কিভাবে এ যুদ্ধ পরিচালিত হবেÑএসব বিষয়ে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। উনি (খালেদা) বলে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ নাকি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না! আওয়ামী লীগ যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস না-ই করত তাহলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হতো না।
তিনি বলেন, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও একটি দলের চেয়ারপার্সনের স্মরণশক্তি কি এতই কম? আসলে ওনার (খালেদার) স্মরণশক্তি কমে গেছে, যার কারণে ইতিহাস মনে রাখতে পারছেন না। এ সময় খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, যদি আপনারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে আগামীতে যে নির্বাচন হবে তার জন্য জনগণের কাছে যান। তারা যদি ভোট দেয় তাহলে আপনি বিজয়ী হবেন।
এরপর খালেদার বক্তব্য তীব্র সমালোচনা করে সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুনে মনে হলো যুবদল ও ছাত্রদলের কোন ক্যাডারের বক্তব্য। তাঁর (খালেদা) বক্তব্যে কোন সঠিক তথ্য ছিল না। তিনি (খালেদা) বলেছেন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের দল নয়। এটি হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত সরকারের একজন বেতনভুক্ত কর্মচারী ছিলেন জিয়াউর রহমান। অথচ তাঁর স্ত্রী (খালেদা জিয়া) এখন বলছেন আওয়ামী লীগ নাকি মুক্তিযুদ্ধের দল নয়। ক’দিন পরে উনি (খালেদা) হয়ত বলবেন জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের দল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ৯ মাস পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আতিথেয়তায় ছিলেন, তাই তিনি রাজাকার-আলবদরদের মুক্তিযোদ্ধা মনে করতেই পারেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া বলেছেন গত ৫ বছরে দেশে নাকি কোন উন্নয়ন হয়নি। দেশে যদি উন্নয়ন না হয় তাহলে গত ৬ বছরে যে ফ্লাইওভার ও ব্রিজ হয়েছে সেগুলো দিয়ে আপনি যাবেন না। আপনি জনসভাগুলো করতে যান এই ব্রিজের ওপর দিয়ে। ব্রিজের ওপর দিয়ে যাবেন না। নিচ দিয়ে নৌকা দিয়ে যাবেন।
ফেসবুক বন্ধ না করে ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দিন ॥ ফেসবুক বন্ধ না করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যাদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ফেসবুক ব্যবহারকারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যাদের কাছে প্রশ্নপত্র থাকে, তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন ফাঁস করে। তাদের শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেন, পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে পারছে না। সর্বশেষ প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এর আগে জেএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এটা বন্ধ করতে না পেরে ‘শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষার সময় ফেসবুক বন্ধ করে দেবেন!
শিক্ষামন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ফেসবুক যারা ব্যবহার করে, তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে না। ফাঁস হওয়ার পর ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যাদের কাছে প্রশ্নপত্র থাকে তাদের কিছু লোকজন এ কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের না ধরে, শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, ফেসবুক বন্ধ করে দেবেন। ফেসবুকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র না পাওয়া গেলে এ প্রশ্ন পরে অনেক দামে গ্রাম-গঞ্জে বিক্রি হবে। ফাঁস রোধ করতে হবে। তাই ফেসবুক বন্ধ নয়, শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব নিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর অর্জনকে কয়েক লুটেরা, চোর ধ্বংস করতে পারে না।
মুলতবি নোটিস নাকচ ॥ সংসদ সদস্যের বিশেষ অধিকার সংক্রান্ত দুটি নোটিস এবং দুটি মুলতবি প্রস্তাব নাকচ করেছেন স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। রবিবার অধিবেশনের শুরুতে তিনি এসংক্রান্ত নোটিসগুলোর প্রাপ্তির কথা জানান এবং তা নকচ করেন।
স্পীকার জানান, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডাঃ রুস্তম আলী ফরাজীর আনা বিশেষ অধিকারসংক্রান্ত দুটি নোটিস বিধিসম্মত হয়নি। তাই সংসদের কার্যপ্রাণালী বিধির ১৬৬/৩ ধারা অনুযায়ী না হওয়ায় তা গ্রহণ করা গেল না। তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র সদস্য হাজী মোঃ সেলিম দুটি মুলতবি প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। কিন্তু ওই প্রস্তাব দুটি অন্য বিধিতে নিষ্পত্তিযোগ্য। তাই প্রস্তাব দুটি নাকচ করা হলো।
লতিফ সিদ্দিকী গ্রেফতার ॥ দল ও মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতারের বিষয়টি সংসদে অবহিত করেছেন স্পীকার। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পাঠানো নোটিসের কথা তিনি সংসদকে অবহিত করেন। গত ২৫ নবেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
খালেদা জিয়া মিথ্যা কথা বলেন ॥ তোফায়েল
নিজস্ব সংবাদদাতা, ভোলা,৩০ নবেম্বর ॥ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছে, খালেদা জিয়া মিথ্যা কথা বলেন। তার ছেলে দুর্নীতি করেছে। তিনি জনতার উদ্দেশ্যে তুলনা করার জন্য বলেন, আজ কোথায় খালেদা জিয়ার ছেলে আর কোথায় সজীব ওয়াজেদ জয়। খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে আরও বলেন, তার ছেলের হাওয়া ভবন থেকেই সংগঠিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করতে চেয়েছিল সেটা কি খালেদা জিয়া জানেন না? জানেন। রবিবার বিকেলে ভোলার দৌলতখান উপজেলার আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এসব কথা বলেন।
দীর্ঘ ১০ বছর পর ব্যাপক উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে রবিবার ভোলার দৌলতখান উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সম্মেলনকে মেঘনা তীরের এ উপজেলায় রং বেরংয়ের ফেস্টুন, তোরণ, ব্যানারে পুরো এলাকা ছেয়ে যায়। প্রায় অর্ধশত তোরণ নির্মান করা হয়। সকাল থেকে দলে দলে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ঢলে সম্মেলনের প্যান্ডেল ছাড়িয়ে দৌলতখানের বিশাল বাজারে কানায় কানায় পূর্ণ হয়।
তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসেননি তারা ভুল করেছে। আওয়ামী লীগ ৫ বছরই ক্ষমতায় থাকবে। ৫ বছর পূর্ণ হলে তখন সংলাপ হবে। তখন আলোচনা হতে পারে। ওই সময় না আসলে আমাদের কিছু করার নেই। তিনি আরও বলেন, দেশ খুব ভালভাবে চলে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। ভোলা হবে বাংলাদেশের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জেলা। এখানে আমাদের প্রচুর গ্যাস আছে। বিভিন্ন শিল্পকলকারখানা হবে। দৌলতখানে সি পোর্ট করা হবে। ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভোলা-বরিশাল ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।
দৌলতখান বাজারে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মমিন টুলু। দৌলতখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির আহমেদ খানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, উপ-দফতর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, ভোলা-২ আসনের সাংসদ আলী আজম মুকুল, অধ্যাপক হাবিবে মিল্লাত এমপি, আনোয়ারুল আবেদীন খান এমপি, ফাহিম গোলন্দাজ বাবেল এমপি, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি এ্যাডভোকেট মমতাজ বেগম, শিবলী সাদিক, শরিফ আহমেদসহ প্রায় একডজন এমপি, দৌলতখান উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুর আহমেদ খান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোর্শেদ কিরণসহ স্থানীয় নেৃতবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
দীর্ঘদিন পর উপজেলা আ’লীগের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে। সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে নাছির আহমেদ খানকে পুনরায় সভাপতি ও আনোয়ার হোসেন জাহাঙ্গীরকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
দেশে-বিদেশে একের পর এক বিরাট সাফল্য সত্ত্বেও ॥ অস্বস্তিতে শাসক দল দলীয় কোন্দল আর বেফাঁস মন্তব্যে
জটিলতা পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সরকারের সাফল্য বা অর্জনের কমতি নেই; একের পর এক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয়, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, দেশীয় অর্থনীতি মজবুত, উপচেপড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পাল্টে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিও। রাজপথেও নেই সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সংঘাত-সাংঘর্ষিক রাজনীতি। রাজনৈতিক প্রধান প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক অস্তিত্ব সঙ্কটের ফেলার কৃতিত্বও সরকারের ঝুলিতে।
এত সাফল্য অর্জনে স্বস্তিতেই থাকার কথা শাসকদল আওয়ামী লীগের। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো। খুব একটা সুখে-স্বস্তিতে নেই শাসক দলটি। জটিলতা যেন পিছু ছাড়ছে না আওয়ামী লীগের। শুধু দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল-সংঘাত আর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা জ্যেষ্ঠ নেতাদের লাগামহীন বেফাঁস মন্তব্যের কারণে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার এক বছর পূর্তি না হতেই স্বস্তির বদলে অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ। দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামাল না দিতে পারার ব্যর্থতায় সরকারের বিপুল অর্জনই যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে খোদ দলের ভেতর থেকেই।
আর মাত্র ৪০ দিন পরই টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের এক বছর পূর্তি হবে। এর মাধ্যমে কার্যত ৬ বছর ধরেই ক্ষমতায় রয়েছে দলটি। আর এ ছয় বছরে ক্ষমতাসীন সরকার একের পর এক অর্জন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সমর্থন আদায় করতে পারলেও কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত দল গোছানোর কাজে ততটাই ব্যর্থ হয়েছে শাসক দলটি। যার কারণে এই ছয়টি বছরেই বিরোধী দলের পরিবর্তে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার কারণে বহুবার জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এমপি বলেন, বিভিন্ন দল থেকে সুযোগসন্ধানীরা দলে অনুপ্রবেশ করেছে। বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগই দলে অনুপ্রবেশকারী আদর্শহীন সন্ত্রাসী। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কিংবা অন্য কোন কারণে কেউ সংঘাতে জড়িত হলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। একইসঙ্গে এসব অপকর্মে জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত হলে তিনি যত বড় নেতাই হন না কেন কোন ছাড় দেয়া হবে না।
শত ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বন্ধুর পথ পেরিয়ে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বারে মতো ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বিএনপি বা তাদের জোট বর্জন করলেও নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেও তা মাত্র কিছুদিনের মধ্যে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকার। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মাত্র কিছুদিনের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায়েও সক্ষম হন। সিপিএ ও আইপিইউ’র মতো আন্তর্জাতিক দুটি শীর্ষ সংস্থায় বাংলাদেশের দুই প্রার্থীকে বিজয়ী করার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে সরকারের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি প্রমাণ করতেও সক্ষম হন তিনি।
এত কিছুর পরও নিজ দলের মধ্যে সৃষ্ট কোন্দল-দ্বন্দ্ব আর সিনিয়র নেতাদের লাগামহীন মন্তব্যে শুধু অস্বস্তিই নয়, প্রায়শই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে। দেশে সরকারবিরোধী বিএনপি-জামায়াত জোটের জোরালো কোন আন্দোলন নেই, নেই রাজপথে রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ। তা সত্ত্বেও সরকারী দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মকা- আর মন্ত্রী-এমপিদের একের পর এক লাগামহীন বেফাঁস মন্তব্যে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে সরকারকে। একটি সঙ্কট কাটতে না কাটতেই মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্য আর নিজ দলের মধ্যে বিবদমান গ্রুপের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ জন্ম দিচ্ছে সরকারের জন্য নতুন সঙ্কটের। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে দলের ভেতর থেকেই। এসব কারণে সরকারের ফাঁড়া আর জটিলতা যেন কাটছেই না।
শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দলই নয়, দলের মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের বেফাঁস মন্তব্যেও সরকারকে চরম বেকায়দায় পড়তে হয়। নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যেই জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে শুধু জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনই নন, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনকি বিজেপি ক্ষমতায় আসায় বেশ উল্লসিত ছিল বিএনপি। কিন্তু নিউইয়র্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করার পর বিএনপির নেতাদের মুখ বন্ধ করে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নরেন্দ্র মোদি বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান- ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন, আর শেখ হাসিনা দেশকে বাঁচিয়েছেন।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এত অর্জন নিয়ে দেশে না ফিরতেই প্রচ- ধাক্কা আসে নিজ দল থেকেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসে নিজ দলেরই মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ধর্ম নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে পুরো সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা, সভাপতিম-লীর পদ থেকে সরানোর পর আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও বহিষ্কার করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় পরিস্থিতি কিছু শান্ত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীরই রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে প্রদত্ত একটি বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। তবে এইচটি ইমাম সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁর বক্তব্যকে খ-িত ও বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও এ ইস্যু নিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করতে দেখা গেছে বিএনপি-জামায়াতকে।
অন্যদিকে বিভিন্ন পর্যায়ে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলে কাউন্সিলের মাধ্যমে দ্রুত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নির্দেশের পর মাঠে নামেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দল ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করতে গত ২০ অক্টোবর জেলা নেতাদের কাছে চিঠি দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এর আগে গত গত ২০ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সারা দেশে জেলা সম্মেলন করার জন্য সাত বিভাগের ১০টি টিম করা হয়। ইতোমধ্যে এসব টিম বিভিন্ন জেলার সম্মেলন করেছে এবং বিভিন্ন জেলার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেছে।
কিন্তু তৃণমূলে কাউন্সিল করতে গিয়ে প্রায়শই হোঁচট খেতে হচ্ছে তাঁদের। পদ না থাকলে ক্ষমতা থাকবে না। এ কারণেই এক যুগেরও বেশি সময় নেতৃত্বে থাকা ব্যর্থ নেতারাই প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হচ্ছেন প্রায় সবখানেই। আর এ তৃণমূল কাউন্সিলকে ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় দলটিতে। আর আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কাউন্সিলকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতার জের ধরে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত সংঘাত-সংঘর্ষ পর্যন্ত রূপ নেয়। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণও গেছে বেশ ক’জনের।
নতুন কমিটিতে স্থান পেতে মরিয়া দলের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে মহানগর নেতাকর্মীরাও। যোগ হয়েছে নানা গ্রুপিং, লবিং ও বিভক্তি। কমিটি গঠনসহ নানা ইস্যুতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই বাধছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। অনেকস্থানে অস্ত্রের মহড়াও দেখা গেছে। বেপরোয়া নেতাকর্মী কেউ কারও নির্দেশ মানছেন না। এমনকি নিজ দলের নেতাকর্মীর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় কয়েকটিস্থানে সম্মেলন স্থগিতের ঘটনা ঘটলেও থামানো যাচ্ছে না কোন্দল-দ্বন্দ্ব। কাক্সিক্ষত পদ পেতে আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যবহার করছেন সহযোগী ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠনকে। ব্যক্তিস্বার্থে সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে ব্যবহার করার কারণে তারাও জড়িয়ে পড়ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্বে। সর্বশেষ দেশের কয়েকটিস্থানে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের প্রাণঘাতী সংঘর্ষে দু’জন কর্মীর প্রাণহানির ঘটনায় চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় দলের হাইকমান্ডকে।
সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ দলটির বাঘা বাঘা কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করে ঢাকা ফিরে না আসতেই সেখানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘোষিত কমিটিকে চ্যালেঞ্জ করে ঘোষণা করা হয় পাল্টা কমিটি। এ নিয়ে দু’পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। স্পষ্টত বিভক্ত জেলা কমিটি। শুধু কুষ্টিয়াতেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই এখন এই অবস্থা বিরাজ করছে। অনেক জায়গায় মন্ত্রী-এমপি প্রভাব খাটিয়ে নিজেরা বড় বড় পদে বসতেও কুষ্ঠাবোধ করছেন না।
গত শুক্রবার অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও দলের অভ্যন্তরীণ এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই অভিযোগ করেন, অনেক জায়গায় এমপিরা প্রভাব খাটিয়ে নিজেরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে জোর করে বসছেন। অনেক মন্ত্রীও এতে সায় দিচ্ছেন। এতে ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত হচ্ছে, তৃণমূল নেতাদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। সব শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তৃণমূল নেতাদের মতামতকে উপেক্ষা করে কোন মন্ত্রী-এমপি পদ বাগানোর চেষ্টা করলে তা বরদাস্ত করা হবে না। তার বিরুদ্ধে চরম সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে সভাপতিম-লীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যা চলছে তা অব্যাহত থাকলে আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রয়োজন পড়বে না। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের পতন ঘটাবে। অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্ব নিরসন করতে না পারলে সরকারের জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তাই প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শক্তহাতে দলের নেতা-মন্ত্রীদের মুখের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আগামীতেও আওয়ামী লীগ ও সরকারকে বড় মাসুল দিতে হতে পারে।
ফসল আবাদে নতুন পথের দিশা ॥ কৃষি কল সেন্টার
০ বিনা পয়সায় তাৎক্ষণিক সমাধান
০ তবে অর্থসঙ্কটে ভবিষ্যত অনিশ্চিত
কাওসার রহমান ॥ ফসল আবাদে কৃষককে নতুন পথের দিশা দিয়েছে কৃষি কল সেন্টার। দিন দিন কল সেন্টারের প্রতি কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। নানান ধরনের ফসল আবাদে কৃষকের তথ্য জানার আগ্রহের শেষ নেই। প্রতিদিন দেড় থেকে ২শ’ কল আসছে কৃষি কল সেন্টারে। আলু ও সবজি আবাদের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানতে চায় কৃষকরা। এছাড়া ধান, পাট, গম, মাছ চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ে নিয়মিত কল আসে কৃষি কল সেন্টারে। আর বিনা পয়সায় এ তথ্য জানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। বিনা পয়সায় তৎক্ষণাৎ সমস্যার সমাধান পেয়ে কৃষকরাও খুব খুশি। তবে অর্থ সঙ্কটে এই কল সেন্টারের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে এগিয়ে না এলে আগামী ডিসেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের কৃষক সমাজের মাঝে সাড়া জাগানো এ কৃষি কল সেন্টারটি।
কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন সেবা দিতে সরকার চলতি বছর চালু করে এ কৃষি কল সেন্টার, যা দেশের কৃষি উন্নয়নে এক নতুন সংযোজন। সরকারীভাবে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম জায়গা করে নিয়েছে। এই কল সেন্টারের নম্বর হচ্ছে ১৬১২৩, যা থেকে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন কৃষি তথ্য সার্ভিস ও প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার ফার্মগেটের খামারবাড়ির কৃষি তথ্য সার্ভিসে চালু করা হয়েছে এটি। চলতি বছরের মাঝামাঝি ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে কৃষি কল সেন্টারের নতুন আলোকিত পথের যাত্রা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন এ কল সেন্টারের। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে বরাদ্দ পায় বিনা পয়সায় কৃষি তথ্য সেবা প্রযুক্তি জেনে নেয়ার নির্দিষ্ট ডিজিট ১৬১২৩।
যে কেউ তার মোবাইল বা টেলিফোন নম্বর থেকে ১৬১২৩ নম্বরে ফোন দিলেই কল সেন্টার থেকে জানতে চাওয়া হবে কৃষি, মৎস্য বা প্রাণী কোন বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট তথ্যের জন্য নির্দিষ্ট নম্বরে প্লেস করতে হবে। এরপর কৃষকের কাছ থেকে সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা দেয়া হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
কৃষি কল সেন্টারের ৫ অপারেটরের মধ্যে ৩ জন স্নাতক কৃষি, পশুচিকিৎসক এবং মৎস্যবিদ; বাকি ২ জন মাঠপর্যায়ের কৃষিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ। এছাড়াও যুক্ত রয়েছেন ৬ এক্সাটার্নাল বিশেষজ্ঞ, যাদের সঙ্গে প্রয়োজনে কল সেন্টার গ্রাহককে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে কৃষি তথ্য সার্ভিসের উপ-পরিচালক (গণযোগাযোগ) কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কল সেন্টারটি স্থাপনে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটির দেয়া গাইডলাইন অনুসরণ করা হচ্ছে। কল সেন্টারে দুটি স্ট্যান্ডবাই সার্ভার, ফোনকল পরিচালনার জন্য আইভিআর এবং কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এ্যান্ড ক্ল্যায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ একটি অত্যাধুনিক সফটওয়্যার রয়েছে। বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকলেও অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে বিদ্যুতের ব্যাকআপ রয়েছে। কলসার্ভারটি একসঙ্গে ত্রিশটি কল রিসিভ করে সেবা দিতে পারে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ভারতে কিষাণ কল সেন্টারে গ্রাহক সংখ্যা ৩ লাখের বেশি, যারা বিনা পয়সায় কল সেবার সুযোগ পাচ্ছেন। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং কেনিয়াতেও সাফল্যজনকভাবে এগিয়ে চলছে কৃষি কল সেন্টারের কার্যক্রম।
কৃষি তথ্য সার্ভিস ও প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশের ২০১১ সালের জুন মাসে কল সেন্টার বিষয়ে একটি প্রাথমিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি মোতাবেক এই কল সেন্টারটি স্থাপন করা হয়। ২০১২ সালের জুনে পরীক্ষামূলকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ইতোমধ্যে এ কল সেন্টার ৪৪ হাজারের বেশি ফোন কল রিসিভ করেছে। ১৫ হাজার কলারকে কৃষি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ কৃষির বিভিন্ন বিষয়ের অনুসন্ধানের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া হয়েছে এবং বাকি অনুসন্ধানগুলোর উত্তর বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে পরে কলারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মোট কলারদের মধ্য থেকে ১০ হাজারের ফলোআপে জানা গেছে, তাদের দেয়া তথ্য সন্তোষজনকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ‘কৃষি বিষয়ে তথ্য জানার জন্য কৃষকের আগ্রহ খুব। প্রতিদিন অব্যাহতভাবে কৃষকের কল আসতে থাকে। জবাব দিয়ে শেষ করা যায় না। কর্মরতদের কেউ ছুটিতে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়। তখন লোকজন ধরে এনে কল সেন্টার চালাতে হয়।’
তবে কৃষকের মাঝে সাড়া জাগানো এই কল সেন্টারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতদিন এটি চলেছে প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশের আর্থিক সাহয়তা। কিন্তু এ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটি বলেছে তারা আর বিশেষজ্ঞদের সম্মানী দিতে পারবে না। ফলে ডিসেম্বর মাস থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে কৃষকের মাঝে জনপ্রিয়তা সৃষ্টিকারী এ কল সেন্টারটি।
স্থায়ীভাবে এ কল সেন্টারটি পরিচালনার জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিস তিন বছর মেয়াদী একটি কর্মসূচী প্রণয়ন করে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ওই কর্মসূচী অনুমোদন করতে চাচ্ছে না। অন্য কোন এনজিও এ কল সেন্টার পরিচালনায় স্থায়ীভাবে অর্থয়ন করতে রাজি হচ্ছে না। যারা করতে চায় তারা স্বল্প সময়ের জন্য করতে চায়। কিন্তু কেউ স্থায়ীভাবে এগিয়ে আসছে না। এ কারণে দেশে প্রথম স্থাপিত কৃষি কল সেন্টারটির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এই কর্মসূচী অনুমোদন না করলে শেষ পর্যন্ত বন্ধই হয়ে যেতে পারে এই কল সেন্টার।
তবে শেষ ভরসা হচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয় নিজেই। কৃষি মন্ত্রণালয় যদি তার থোক বরাদ্দ থেকে এ কল সেন্টার পরিচালনায় এগিয়ে আসে তাহলেই একমাত্র টিকে যেতে পারে কৃষি কল সেন্টার। অন্যথায় এই ভাল উদ্যোগটি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
উল্লেখ্য, কৃষি তথ্য সার্ভিস কল সেন্টারের মাধ্যমে কৃষি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৩ বছরের জন্য ৪ কোটি টাকার একটি কর্মসূচী প্রণয়ন করেছে। কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরের হেল্পলাইনে একযোগে দশটি ফোনের সঙ্গে অপারেটরের মাধ্যমে বিনা পয়সায় গ্রাহকসেবা দেয়া হবে। ১০ জন এক্সটার্নাল বিশেষজ্ঞসহ ১০ অপারেটর প্রতি দিন ৮ ঘণ্টা করে সেবা দেবেন।
৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি ॥ জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর দাফন আজ
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক প্রধান সম্পাদক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা হবে আজ সোমবার। সকাল ১১টায় বনানী জামে মসজিদে প্রথম জানাজা এবং জোহরের নামাজের পর জাতীয় প্রেসক্লাবে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তার মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে তাকে। রবিবার জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর পরিবারের পক্ষ থেকে এমনটাই জানানো হয়েছে। এর আগে শনিবার রাতে রাজধানীর কাওরান বাজারে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি।
এদিকে জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। বিআরটিএ পরিচালক (প্রশাসন) মশিউর রহমানকে প্রধান করে গঠিক এই কমিটিকে তিন কর্ম দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
প্রখ্যাত এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে রবিবার শোক প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরন। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), বিজিএমইএ, গণবিশ্ববিদ্যালয়, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি), জাকের পার্টি, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। এই প্রখ্যাত সাংবাদিকের মৃত্যুতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচী পালন করেছে রবিবার। এর আগে শনিবার রাতেই প্রবীণ সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোঃ নাসিম প্রমুখ। এছাড়া জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) শনিবার রাতেই শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে।
জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর জানাজা ও দাফনের বিষয়ে তার বড়বোনের ছেলে মারিফ মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, ওনার বড় মেয়ে অন্তরা চৌধুরী আমেরিকা থেকে সোমবার ভোর সকাল ৬টায় দেশে ফিরবেন। এরপর সকাল ১১টায় বনানী জামে মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। ২য় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে জোহরের নামাজের পরে জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে। জানাজা শেষে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে তার মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হবে বলে তিনি জানান।
তদন্ত কমিটি ॥ জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। বিআরটিএ পরিচালক (প্রশাসন) মশিউর রহমানকে প্রধান করে গঠিক এই কমিটিকে তিন কর্ম দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। রবিবার মানিক মিয়া এভিনিউয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও ট্রাফিক আইন নিয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের (পশ্চিম) উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ নাহমাদুল হাসান এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা খন্দকার মাহবুবুর রহমান।
শনিবার রাতে বেসরকারী টেলিভিশন এটিএন বাংলার একটি টক শো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাওয়ার পথে রাজধানীর কাওরান বাজারে বাসের ধাক্কায় নিহত হন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কলামিস্ট জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইমরুল কায়েস সাংবাদিকদের বলেন, রাত পৌনে আটটার দিকে কাওরান বাজার সার্ক ফোয়ারার পশ্চিম পাশে ফার্মগেটগামী একটি বাস থেকে নামার সময় পড়ে গেলে ওই বাসেরই ধাক্কায় মাথায় আঘাত পেয়ে রাস্তায় পড়ে যান। পড়ে গিয়ে তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকলে কয়েক পথচারী তাকে নিয়ে প্রথমে নিকটস্থ মোহনা ক্লিনিকে যান। সেখানে জরুরী বিভাগে ডাক্তার না থাকায় তাঁকে গ্রীনরোডের কমফোর্ট হাসপাতালে নেয়া হয়। রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে কমফোর্টের কর্তব্যরত ডাক্তার ইমরান হোসেন তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে তার পরিবারের লোকজন এসে তাঁর মরদেহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের হিমঘরে রাখার ব্যবস্থা করেন।
জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী ঢাকার বনানীতে বাস করতেন। তার একমাত্র মেয়ে অন্তরা চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এবং একমাত্র ছেলে নাবিদ আহমেদ চৌধুরী ঢাকায় গ্রামীণফোনে কর্মরত। জগলুল আহমেদের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার পিয়াম গ্রামে। বাবা নাসিরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের আইনমন্ত্রী। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জগলুল আহমেদ চৌধুরী সর্বশেষ ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির স্থায়ী সদস্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জগ্লুল আহ্মেদ। ১৯৮৮-৮৯ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব ছিলেন তিনি।
আজ জিম্বাবুইয়েকে বাংলাওয়াশের দিন?
মিথুন আশরাফ ॥ ঘটনা ২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বরের। প্রসপার উতসেয়াকে ক্লিন বোল্ড করে দিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। শেষ হয়ে গেল জিম্বাবুইয়ের ইনিংস। চামু চিভাভার বলে কাভার দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকালেন মুশফিকুর রহীম। শেষ হয়ে গেল খেলা। বাংলাদেশ জিতে গেল! শুধু কী জয় মিলল, প্রথমবারের মতো জিম্বাবুইয়েকে ৫-০ ব্যবধানে হারানোর সঙ্গে হোয়াইটওয়াশও করল বাংলাদেশ। সে কী আনন্দ! আটবছর পর আবার বাংলাদেশের সামনে আজ ডিসেম্বরের প্রথম দিনে জিম্বাবুইয়েকে হোয়াইটওয়াশ করার আরেকটি সুযোগ ধরা দিয়েছে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে দুপুর সাড়ে বারোটায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচে আজও কী এমন কিছুরই দেখা মিলবে। এখন শুধু অপেক্ষা, জিম্বাবুইয়েকে বাংলাওয়াশ করে উৎসব করার।
সেই সময় হাবিবুল বাশার সুমনের হাতে শোভা পেয়েছে সিরিজ জয়ের শিরোপা। আজ নিশ্চিতভাবেই মাশরাফি বিন মর্তুজার হাতে এবারের সিরিজ জয়ের শিরোপা ধরা দেবে। কিন্তু হাবিবুলের দলের মতো মাশরাফির দলও কী ৫-০ করে এই শিরোপা হাতে নিয়ে উৎসব করতে পারবে? আজই তা বোঝা যাবে।
তবে বাংলাদেশ-জিম্বাবুইয়ের মধ্যকার আজ শেষ হওয়া সিরিজে বাংলাদেশই ফেবারিট। দুই দলই রবিবার শেষদিনের অনুশীলন করে নিয়েছে। কিন্তু জিম্বাবুইয়ে ক্রিকেটারদের দেখে মনেই হচ্ছে তারা সিরিজ শেষ হলেই যেন বাঁচেন। এখন খেলার চেয়ে বেশি তারা আনন্দ-ফুর্তি করেই কাটাতে পছন্দ করছেন। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে একাডেমি মাঠে অনুশীলন করতে গিয়ে যেমন চিগুম্বুরা-মাসাকাদজা একজন আরেকজনের সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হাসতে হাসতে যেন শেষ হয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া অবশ্য তাদের করণীয় আর কিই বা আছে। খেলতে নামলেই যে হারেন। নিয়তিও যেন মেনে নিচ্ছেন। এখন কতক্ষণে সিরিজ শেষ হবে, সেই অপেক্ষাতেই যেন আছেন জিম্বাবুইয়ে ক্রিকেটাররা।
অনুশীলনে যে রকম অবস্থাতেই থাকুক জিম্বাবুইয়ানরা, সংবাদ সম্মেলনে কিন্তু ঠিকই সিরিয়াস। এমনই সিরিয়াস যে, ‘খেলতে নামলে জয়ের জন্যই নামব’ তা বলতেও ভুলে যান না হ্যামিল্টন মাসাকাদজা। একের পর এক ম্যাচ হেরেই চলেছে জিম্বাবুইয়ে। এরপরও, ‘জয়ের চেষ্টা করব’ না বলে যেন পারেনই না। তবে একটি জিনিস বলেছেন মাসাকাদজা। বাংলায় বলেছেন, ‘শেষ।’ এই শেষের অপেক্ষাতেই এখন জিম্বাবুইয়ে। সেই শেষটি জয় দিয়ে করতে চান।
বাংলাদেশ কী তা করতে দেবে? হাতে পাওয়া এমন সুযোগ কী আর হাতছাড়া করবে বাংলাদেশ। দুপুরে অনুশীলন শুরু করার আগে মাশরাফির কথাতেই পরিষ্কার, এবারও জিম্বাবুইয়েকে কোন ছাড় নয়, ‘চারটা ম্যাচ জেতার পরে অবশ্যই সব খেলোয়াড়রাই আত্মবিশ্বাসী। ক্রিকেটে এটা হতেই পারে। কিন্তু আমাদের জেতার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে হবে। আজকের ম্যাচটা জেতার জন্য যত দূর ভাল খেলা সম্ভব সেটা খেলতে হবে। ৫-০ এখন আমার ভেতর ফিল হচ্ছে। এখন আমাদের আরেকটা ম্যাচ আছে। জিততে পারলে ৫-০ হবে। এটা খুব ভাল হবে। ভাল লাগবে, বছরটা যে গিয়েছে ভাল গিয়েছে তা নয় এই বছরটা অনেক জেতা ম্যাচ আমরা হেরে গিয়েছি। এগুলো না হলে হয়ত এত সমস্যা আমাদের তৈরি হতো না। যে চাপগুলো আমাদের মাঝখান দিয়ে গিয়েছে এগুলো হত না। ৫-০ যদি ইনশাল্লাহ এখন করতে পারি ছেলেদের কিছুটা ক্রেডিট পাওয়া উচিত।’
জিম্বাবুইয়েকে বাংলাওয়াশ করতে পারলে শুধু ক্রিকেটাররা ক্রেডিটই পাবেন না, পুরস্কারেও নিশ্চয়ই ভূষিত হবেন। আর আনন্দেরত সীমা থাকবেই না। বিশ্বকাপের আগে এমন অর্জন যে কোন দলকেই চাঙ্গা করে তোলে। বাংলাদেশকেও, দলের ক্রিকেটারদেরও আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। সেই সঙ্গে বছরের শেষটা যেমন জয় দিয়ে হয়েছে, শুরুটাও হবে জয় দিয়েই।
জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৫৭ ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ ৩৪ টিতে জিতেছে। আজ জিতলে ৩৫টিতে জয় হবে। এর আগে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৬ বার ৫ ম্যাচের সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। চারবার জিতেছে বাংলাদেশ। দুইবার হেরেছে। দেশের মাটিতে এর আগে তিনবার ৫ ম্যাচের সিরিজ খেলেছে। তিনবারই বাংলাদেশ জিতেছে। ২০০৬ সালে একবার হোয়াইটওয়াশও করেছে। এবার নিয়ে সপ্তমবারের মধ্যে চারবার দুই দলের মধ্যকার বাংলাদেশের মাটিতে ৫ ম্যাচের সিরিজ খেলা হচ্ছে। এবারের সিরিজও বাংলাদেশ জিতে নিয়েছে। এখন অপেক্ষা বাংলাওয়াশের। আজই সেই দিন।
চারটি চুক্তি সই হচ্ছে ॥ প্রধানমন্ত্রী কাল মালয়েশিয়া যাচ্ছেন
তৌহিদুর রহমান ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল মঙ্গলবার তিনদিনের সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে সে দেশের সঙ্গে চারটি চুক্তি সই হবে। এসব চুক্তির মধ্যে রয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক চুক্তি, ভিসা অব্যাহতিবিষয়ক চুক্তি, সংস্কৃতি সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি ও পর্যটন সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি। শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক চুক্তির ফলে মালয়েশিয়ার সারওয়াক প্রদেশে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। গত বছর ১৭ নবেম্বর নাজিব রাজাক ঢাকা সফর করেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তিনি মালয়েশিয়া সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকালে দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জনশক্তি রফতানি, ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়গুলোকে জোর দেয়া হবে। এছাড়া দু’দেশের মধ্যে চারটি চুক্তি করার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছে। দেশটি বাংলাদেশ থেকে আরও জনশক্তি নিতে চায়। মালয়েশিয়ার সারওয়াক প্রদেশে এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখানে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১২ হাজার কর্মী নিতে চায় দেশটি। সে লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হবে।
শ্রম কর্মসংস্থান চুক্তি ॥ মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সই হওয়া শ্রম কর্মসংস্থানবিষয়ক সমঝোতা চুক্তি সংশোধন করা হচ্ছে। এই চুক্তি সংশোধনের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার মূল ভূখ-ের পাশাপাশি সারওয়াক প্রদেশে কাজ করার সুযোগ পাবে বাংলাদেশী শ্রমিকরা। শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের জি-টু-জি যে চুক্তি রয়েছে তার সংশোধন চুক্তি সই হবে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে বিদ্যমান যে চুক্তি তা মূল ভূখ-ের জন্য প্রযোজ্য, এ প্রটোকল সই হলে দেশটির সারওয়াক প্রদেশে কাজ করারও সুযোগ পাবে। আগের যে চুক্তি রয়েছে তা একই থাকবে, শুধু সারওয়াক প্রদেশ এর সঙ্গে যুক্ত হবে।
ভিসা অব্যাহতি চুক্তি ॥ মালয়েশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক ও অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীদের ভিসা অব্যাহতি চুক্তি সই হবে। এ চুক্তি হলে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীরা ভিসা অব্যাহতি পাবেন। ৯০ দিনের জন্য তারা এ সুবিধা পাবেন এবং ট্রানজিট সুবিধাও পাবেন। এর চেয়ে বেশি থাকতে চাইলে নিজ নিজ দেশের নিয়মানুযায়ী তাঁরা নবায়ন করতে পারবেন। কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের স্ত্রী ও ২১ বছরের নিচে অবিবাহিত সন্তানরাও এ সুবিধা পাবেন। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে বারোটি দেশের ভিসা অব্যাহতি চুক্তি রয়েছে এবং আরও ১৮ দেশের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। যেসব দেশের সঙ্গে এ চুক্তি রয়েছে সেসব দেশে ভিসা ছাড়াই কূটনৈতিক ও অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীরা যেতে পারেন।
পর্যটন সহযোগিতা চুক্তি ॥ পর্যটন খাত উন্নয়নের লক্ষ্যে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ একযোগে কাজ করবে। সেজন্য এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এই সমঝোতা চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, মার্কেটিং প্রমোশন কার্যক্রমে সহযোগিতার করবে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এছাড়া এ চুক্তির আওতায় প্যাকেজ ট্যুর পরিচালনা, পর্যটন মেলা, প্রচার সামগ্রী বিনিময়, পর্যটনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার কাজও করবে দুই দেশ। পর্যটনসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ হবে ৫ বছর। তবে কেউ আপত্তি না তুললে মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়বে।
সংস্কৃতি সহযোগিতা চুক্তি ॥ বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি, শিল্প সাহিত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এ সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ও মালয়শিয়া শিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করবে। এছাড়া দু’দেশের মিউজিয়াম, আর্কাইভ, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে। আর্ট এ্যান্ড কালচারের ক্ষেত্রে দু’দেশের উত্তম চর্চা বিনিময়, গবেষণা ও প্রকাশনা বিনিময়, কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সফর ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হবে এ চুক্তির মাধ্যমে। সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই চুক্তির মেয়াদ তিন বছর বাড়বে। তবে ছয় মাসের সময় দিয়ে যে কোন পক্ষ চুক্তি প্রত্যাহার করতে পারবে। পর্যটন ও সংস্কৃতিবিষয়ক দুটি সমঝোতা চুক্তির অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে দু’পক্ষের তৃতীয় পক্ষ যুক্ত করা বিধান রয়েছে। দুইপক্ষের মধ্যে কোন বিরোধ হলে পারস্পারিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে হবে বলেও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সাক্ষাত হয়। ওই সাক্ষাতের সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসার জন্য নাজিব রাজাককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে সময় আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নাজিব রাজাক গত বছর নবেম্বরে ঢাকা সফর করেন। এর প্রায় এক বছরের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন।
এতিমের টাকা আত্মসাত ॥ খালেদার তৃতীয় লিভ টু আপীলও খারিজ
স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার করা লিভ টু আপীল (আপীল অনুমতি) আবেদন খারিজই করেছেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। রবিবার প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার এ আবেদনের আদেশের জন্য নির্ধারিত দিন ছিল। সূত্র মতে ওই দিন পাঁচ সদস্যের এই বেঞ্চের প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য বিচারপতিদের মধ্যে আদেশ নিয়ে জোরালো মতানৈক্য দেখা দেয়। এ কারণে ওই দিন প্রধান বিচারপতি এ মামলার যাবতীয় নথিপত্র তলব করে আদেশের জন্য রবিবার দিন ঠিক করেন। সুপ্রীমকোর্টের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, রবিবারও আদেশের বিষয়ে বিচারপতিদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৪৮ মিনিট পরে এজলাসে ওঠেন বিচারপতিরা।
এর আগে গত ২৫ নবেম্বর এ আদালতই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা নিয়ে খালেদা জিয়ার করা দুটি লিভ টু আপীল আবেদন খারিজ করে দেন। আর রবিবার জিয়ার চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও খালেদার লিভ টু আপীল আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির অভিযোগে করা দুটি মামলায় নিম্ন আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিচার চলতে আইনগত আর কোন বাধা রইল না।
আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে শুনানি করেন এ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান।
আদেশের পর খালেদার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, জিয়া পরিবারকে ‘রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ মামলা দুটি করা হয়েছে। কোন ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও সরকার মামলাগুলো দায়ের করে। আইন অনুসারে যেভাবে করার কথা ছিল সেভাবে এই দুই মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি। আমরা মনে করেছিলাম, নিম্ন আদালত স্বাধীনভাবে বিচার করতে না পারলেও উচ্চ আদালত পারবে। তিনি বলেন, আমরা হাইকোর্টে এসেছিলাম। হাইকোর্ট আমাদের আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর আমরা আপীল বিভাগে যাই। আপীল বিভাগ দুই মামলার আবেদন আলদাভাবে শুনানি করে। তাই আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু আদালত আমাদের সেই আবেদনও খারিজ করে দেন। আমরা সর্বোচ্চ আদালতেও বিচার পেলাম না।
হাইকোর্টে আইনজীবীর সঙ্গে এরশাদের বৈঠক নিয়ে গুঞ্জন
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হঠাৎ করেই হাইকোর্টে এসে আইনজীবীর সঙ্গে ঘণ্টাখানেক বৈঠক করে গেলেন। রবিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূতকে তাঁর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের চেম্বারে দেখা যায়। এ নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে গুঞ্জন চললেও এরশাদের হাইকোর্টে আগমনের কারণ স্পষ্ট করেননি তার আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি উনার প্রিন্সিপাল ল’ইয়ার ঠিক আছি। তবে মামলার কোন বিষয়ে তিনি আমার কাছে আসেননি। তাহলে কেন এসেছিলেন- এ প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল ইসলাম বলেন, কোন কাজেই নিশ্চয় এসেছিলেন। তবে আমার কাছে কোন মামলার বিষয়ে আসেননি। এমনিতেই দেখা করতে এসেছিলেন। বেলা ১টার দিকে এই আইনজীবীর কক্ষে এসে ২টার দিকে বের হন এরশাদ। এরপর দ্রুত সুপ্রীমকোর্ট চত্বর ত্যাগ করেন তিনি।
১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় তিন ডজন মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় তাঁর সাজার আদেশ হয় এবং একটিতে তিনি সাজা খাটা শেষ করেন। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এরশাদ নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা দেন, তাতে এখনো আটটি মামলা থাকার কথা বলা হয়। বাকি মামলাগুলো থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন, অথবা মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে জানান। এই আট মামলার মধ্যে চারটির কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। মঞ্জুর হত্যাসহ তিনটি মামলা বর্তমানে চালু। আর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাওয়া উপহার সামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগে এক মামলা বর্তমানে হাইকোর্টে রয়েছে।
১৯৯১ সালের ৮ জানুয়ারি সেনানিবাস থানায় দায়ের করা এ মামলায় এরশাদের বিরুদ্ধে এক কোটি ৯০ লাখ ৮১ হাজার ৫৬৫ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। ১৯৯২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ওই মামলার রায়ে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এরশাদকে তিন বছরের কারাদ- দেন। রায়ের বিরুদ্ধে এরশাদ ওই বছরই হাইকোর্টে আপীল করেন। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনও এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয়।
বিজয়ের মাস
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে/ জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে, নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক/ এই বাংলায়/ তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।’ দেশের শ্রেষ্ঠ কবি প্রয়াত শামসুর রাহমানের এই কবিতা একাত্তর সালের এ মাসেই সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছিল বাঙালীর জাতীয় জীবনে। বছর ঘুরে আবার ফিরে এসেছে বিজয়ের মাস। আজ ১ ডিসেম্বর। আজকের দিনটিতেই সূচনা ঘটতে যাচ্ছে বাঙালীর কাক্সিক্ষত মুক্তি সংগ্রামের বিজয় অর্জনের মাস ডিসেম্বরের। পূর্তি হলো স্বাধীনতার ৪৩ বছর।
এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসেছে বিজয়ের মাস। ইতোমধ্যে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। একাত্তরের গণহত্যাকারী ও রাজাকার শিরোমনিরা এখন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। কসাইখ্যাত ঘৃণ্য হন্তারক কাদের মোল্লার ফাঁসিও কার্যকর হয়েছে। অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতচক্র ও তাদের দোসর বিএনপির রাজনৈতিক অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে। স্বাধীনতা বিরোধীদের অপতৎপরতা প্রতিরোধে একাত্তরের মতোই যেন জেগে উঠেছে স্বাধীনতার পক্ষের বীর বাঙালী জাতি। বহু কাক্সিক্ষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করার মাধ্যমে গত ৪৩ বছরের লজ্জা ঘোচানোর সম্ভাবনায় তাই সারা জাতি এখন উদ্বেলিত।
ডিসেম্বর মাসটি রাষ্ট্র পাওয়ার মাস, কষ্ট পাওয়ার মাস। বাঙালী জাতির একটি নিজস্ব রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাস ডিসেম্বর। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার এ দেশীয় দোসরদের পরাস্ত করার মাস। আবার ৩০ লাখ মানুষ হারানোর দুঃসহ কষ্টের মাস। একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াকু বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ এ মাসে বিজয়ের সুমহান মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিখরা সেসব দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যুগিয়েছিল মুক্তির লড়াইয়ের অনিঃশেষ প্রেরণা। সে সময়ের গানে গানে বিধৃত আছে লাঞ্ছিত-নিপীড়িত, মুক্তিপাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর প্রাণের উচ্ছ্বাস, ত্যাগ, লড়াই ও মুক্তির মন্ত্র। উনিশ শ’ একাত্তরে দীর্ঘ ন’টি মাস পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালীর মৃত্যুপণ জনযুদ্ধ শেষে অর্জিত হয়েছিল প্রত্যাশিত বিজয়। লাখো শহীদের আত্মদান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী অবদান, ত্যাগ এবং অসংখ্য মা-বোনের মহামূল্যবান সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ নিজের স্থায়ী আসন অর্জন করে নেয় বিশ্ব মানচিত্রে। তাই কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতি এই ডিসেম্বর মাসজুড়ে স্মরণ করবে লাখো শহীদানকে। তাঁদের অপূর্ণ স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা বাস্তবায়নের শপথে নতুন করে উজ্জীবিত হবে।
জীবনের গভীরতম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ৪৩ বছর পার করা এ দেশের মানুষের কাছে এবারের ডিসেম্বর শুধু বছর-পরিক্রমায় আরও একটি মাস নয়; এবারের ডিসেম্বর নতুন ভাবনা ও চেতনা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যে দলটি নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশটিকে স্বাধীন করেছিল, সেই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। সর্বত্রই এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে দীপ্ত পথ চলা। তাই এবার নতুন ভাবনা স্বপ্ন আর বাস্তবতাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়ার শপথ নিয়েই বাঙালী জাতি মাসব্যাপী উদযাপন করবে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর।
স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালী জাতি আজ নতুন আশায় বুক বেঁধেছে, ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতাকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে দীর্ঘ পথচলায় দুর্নীতি-অপশাসন ও স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির মতো হাজারো জঞ্জালে ভরে যাওয়া স্বপ্নের জাল ঝেড়ে পরিষ্কর করার সময় এসেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকরের মধ্যে দিয়ে জাতি অভিশাপমুক্ত হয়েছে। একাত্তরের ক্ষতগুলোকে সারিয়ে ফেলা বা রোধ করার এখনই সময়। অচিরেই যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন হবে, বাঙালী জাতি আরও একটি কলঙ্কের হাত থেকে মুক্তি পাবে, দেখতেই এখন অধির অপেক্ষা দেশের কোটি কোটি মানুষের।
মহান বিজয়ের মাস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নিয়েছে মাসব্যাপী নানা কর্মসূচী। বিজয় দিবস উদযাপনে গঠিত জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ডিসেম্বরে সারাদেশে মাসব্যাপী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। জাতীয় কমিটি পহেলা ডিসেম্বরকে ‘মুক্তিযোদ্ধা দিবস’ হিসাবে পালন করবে। জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে আজ সকাল ৭-৩০ মিনিটে মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা করবস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন, সকাল ৯-৩০ মিনিটে শাহাবাগ প্রজন্ম চত্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের জমায়েত এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিখা চিরন্তন অভিমুখে বিজয় শোভাযাত্রা। জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা দিবস পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই চলে গেলেন কাইয়ুম চৌধুরী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ বরেণ্য চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর নেই, বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে গেলে তাঁকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আর ফিরলেন না।
রবিবার রাতে সেখানে নেয়ার পর চিকিৎসকরা এই শিল্পীকে মৃত ঘোষণা করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)।
রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরুর আগে রবিবার সাড়ে আটটার দিকে মঞ্চে বক্তৃতা দেয়ার পর হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি মাথায় আঘাত পান। তবে তাঁর পাল্স ও রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক ছিল। তাঁকে দ্রুত এ্যাম্বুলেন্সে করে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্বাধীনতা পদক জয়ী ৮০ বছর বয়সী এই শিল্পীকে সঙ্গে সঙ্গে কাছের ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়ার কথা অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে জানানো হয়। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, পড়ে গিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী মাথায় আঘাত পেয়েছেন। মঞ্চে উঠে প্রথমে কাইয়ুম চৌধুরী বক্তৃতা দিয়ে নেমে যান। তারপর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালে তিনি আবার ফিরে এসে বলেন- ‘আমার একটি কথা বলার রয়েছে।’
নিজের কথা বলার আগেই মঞ্চে পড়ে যান কাইয়ুম চৌধুরী। সবাই তখন ধরাধরি করে তাঁকে উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান।
১৯৩৪ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে জন্ম নেয়া কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৫৪ সালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে ডিগ্রী নেন।
কার মদদে আপনি নির্বাচনে আসেননি?
সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে খালেদার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী
সংসদ রিপোর্টার ॥ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, কার মদদে আপনি নির্বাচনে আসেননি? থাইল্যান্ডে নির্বাচন না হওয়ায় মার্শাল ল এসেছে। আপনি কি চেয়েছিলেন নির্বাচন বানচাল করে বাংলাদেশে থাইল্যান্ডের মতো অবস্থা সৃষ্টি করতে? আপনার নির্বাচনে না আসার ভুলের মাসুল কেন জনগণকে দিতে হবে? শত চেষ্টা করেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করতে পারেননি। নির্বাচন ঠেকানোর নামে শত শত মানুষকে হত্যার পর এখন আবার কোন্ মুখে মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষার কথা বলছেন? শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেই গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছে, দেশের এত বিজয় এসেছে। নির্বাচনে না এসে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এখন না ঘরকা, না ঘাটকা। সংসদেও নেই, আছেন বাইরে- তাই এত অন্তর জ্বালায় ভুগছেন তিনি। তবে যে যতই চেষ্টা করুক দেশ এগিয়ে, এগিয়ে যাবেই।
রবিবার রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে রাখতে গিয়ে কুমিল্লায় জনসভায় খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনে না এসে বিএনপি নেত্রী বানচালের নামে সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন। শত শত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছেন। তিনিসহ অনেকেই ভেবেছিলেন নির্বাচন হবে না, নির্বাচন হলেও সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) হবে। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে শক্ত হাতে হাল ধরেছিলাম বলেই দেশের মানুষ আজ স্বস্তিতে রয়েছে, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনি’- খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ না করলে কে করেছে? একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করে যে দেশকে পরাজিত করেছি, সেই পরাজিত শক্তি পাকিস্তানও এমন কথা বলেন না, যে কথা বলে যাচ্ছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তো বিএনপির জন্মই হয়নি। হয়ত একদিন খালেদা জিয়া বলবেন গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদরা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, আলবদর-আলশামস-যুদ্ধাপরাধীরাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে! বিএনপি নেত্রীর এমন বক্তব্যের বিচার দেশের জনগণই করবে। তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, কার স্বার্থে আপনি এমন অসত্য কথা বলেন দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন?
এ প্রসঙ্গে পাকি জেনারেল আসলাম বেগের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেনারেলের বেগের চিঠিতেই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ ছিল। ওই চিঠিতে জেনারেল বেগ জিয়াউর রহমানকে তার ভূমিকার জন্য শাবাশ দেয়া হয়েছিল এবং ওই সময় জিয়া পরিবার যে তাঁদের কাছে সুরক্ষিত রয়েছে তাও উল্লেখ ছিল। আর ক্ষমতায় থাকতে জেনারেল জানজুয়ার মৃত্যুতে শোকবার্তা খালেদা জিয়া পাঠিয়েছিলেন কোন ব্যথা থেকে তা আমি জানি না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিকামী বাঙালী অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল। আর যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
‘দেশে একদলীয় শাসন চলছে’- বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার এমন অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রীর বর্তমান অবস্থা আমরা বুঝি। নির্বাচন না করে উনি যে ভুল করেছেন, তা থেকেই তিনি এসব মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশে যদি এক ব্যক্তিরই শাসন চলে তবে সরকারের ক্যাবিনেট কী করছে? সার্বভৌম সংসদই বা কী করছে? একদলীয় শাসন চললে উনি (খালেদা জিয়া) কীভাবে জনসভা করে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন? তিনি বলেন, জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বিএনপির জন্ম দিয়েছিল। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর হাতে জন্ম নেয়া দলও অবৈধই হয়। অবৈধ দলের নেত্রীর মুখে এসব কথা মানায় না।
স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাপনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ। মাত্র ১০ কার্যদিবস চলার পর স্পীকার রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ শুনিয়ে চতুর্থ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসভায় বিএনপি নেত্রী বলেছেন ওনার আন্দোলন নাকি মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষার জন্য। যিনি নির্বাচন ঠেকানো ও জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে শত শত মানুষকে হত্যা করেছেন, উনি কেমন করে এখন জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার কথা বলেন? আর যিনি এতিমের টাকা পর্যন্ত মেরে খান তিনি কীভাবে দেশের মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলেন? তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি নেত্রী এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন। এখন এ নিয়ে দায়েরকৃত মামলায় আদালতে হাজিরা দিতেও ভয় পান। উনি যদি অপরাধীই না হবেন তবে মামলা মোকাবেলা করতে এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আসলে বিএনপির নেত্রীর অবস্থা হচ্ছেÑ চোরের মন পুলিশ পুলিশ।
‘দেশের কোনই উন্নয়ন হচ্ছে না’- বিএনপি নেত্রীর এমন বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি বলেছেন দেশের উন্নয়ন হচ্ছে না, অর্থনীতি নাকি খুবই খারাপ! জবাবে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি খারাপ, নাকি ওনার (খালেদা জিয়া) অর্থনীতি খারাপ? ক্ষমতায় থাকতে উনি অনেক টাকা বানিয়েছেন। জিয়াউর রহমান নাকি ভাঙ্গা স্যুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি রেখে গিয়েছিলেন। তবে এত সম্পদের মালিক হলেন কীভাবে? তবে কী ভাঙ্গা স্যুটকেস জাদুর বাক্স হয়ে গিয়েছিল? তিনি বলেন, আসলে ঘটনা তো না নয়। ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতি করেছেন, লুটপাট করেছেন। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকতে দেশের উন্নয়ন নয়, নিজেদের উন্নতি করেছেন। কী করে ১৪-১৫টি ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক হলেন, কীভাবে টিভি-ব্যাংকের মালিক হয়েছেন উনি এবং ওনার ছেলেরা?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া বলেছেন ক্ষমতায় থাকতে নাকি উনি উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন! কিন্তু তাঁর উন্নয়নের জোয়ার যে ভাটার টানে চলে গেছে, সেটা আর ফিরে দেখেননি। র‌্যাব বিলুপ্তি প্রসঙ্গে বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, এখন র‌্যাব বিলুপ্তি চান, কিন্তু এই র‌্যাব সৃষ্টি করে আপনি কত মানুষকে হত্যা করিয়েছেন? ২০০৪ সালের ১৪ অক্টোবর আপনিই বলেছিলেন- ‘পুলিশ ও র‌্যাব কী সুন্দর কাজ করছে।’ তবে কেন এখন র‌্যাবের বিরুদ্ধে কথা বলছেন? উনি ক্ষমতায় থাকলেই র‌্যাব ভাল, আর না থাকলেই খারাপ- এটা কেমন কথা?
দেশের বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়- খালেদা জিয়ার এমন অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসেই ১ হাজার ১৮১ মিলিয়ন ডলারের বিদেশে বিনিয়োগ এসেছে। বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, অনেকেই দেশের উন্নয়ন চোখে দেখেন না, কানেও শোনেন না। দেখেও দেখেন না। ক্ষমতায় থাকতে উনি ও নিজের পরিবারের উন্নয়ন করেছেন, আর দেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা ক্ষমতায় এসে মাত্র ৫ বছরেই সেই অবস্থা থেকে দেশকে তুলে এনেছি।
বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ ॥ সংসদের সমাপনী বক্তব্যে অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে কর্মসংস্থান ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান হলে যুব সমাজ বিপথে যাবে না। কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিদেশী বিনিয়োগ সঙ্কুচিত হচ্ছে। এসব জটিলতা দূর করতে হবে। রাজধানী ঢাকাকে রক্ষা করতে হবে, ঢাকা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ না করলে ঢাকার বাইরে কেউ যেতে চাইবে না। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি শুধু বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা নয়, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কথা বলি।
পদ্মা সেতু উন্নয়নের মাইলফলক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পদ্মা সেতু নির্মিত হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। অনেক আগেই সেতুটি নির্মিত হতো, কিন্তু কিছু মানুষের কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে। ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদক পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। আজ সবকিছুতেই ভেজাল মিশ্রিত করা হচ্ছে। যারা খাদ্য ভেজাল দিচ্ছে তারাও জানে না এসব খাদ্য খেয়ে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু আইন দিয়ে নয়, মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণকে মোটিভেশন করতে হবে।
শেখ হাসিনা-মোদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা করবেন ॥ সেমিনারে আশাবাদ
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবেন। আর শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সরকার আগের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সফলতার নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। বাংলাদেশ ও ভারত নিরাপত্তা সংলাপে এমন আশা করেছেন বক্তারা। রবিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সংলাপ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সহায়তায় বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) এবং ইন্ডিয়া অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এছাড়াও বিইআইয়ের চেয়ারম্যান ফারুক সোবহান, ব্যারিস্টার হারুন-উর-রশীদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির, বিআইআইএসএস চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, ঢাকায় ভারতীয় সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ইন্ডিয়া অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সম্মানিত ফেলো সি রাজা মোহন, ঢাকায় ভারতীয় উপ-হাইকমিশনার সন্দ্বীপ চক্রবর্তীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপে প্রধান অতিথি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, বাংলাদেশ সব সময় প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তায় সচেষ্ট। আমরা সব সময় বলে আসছি, বাংলাদেশের ভূখ- প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেয়া হবে না। এই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। বর্ধমান বোমা বিস্ফোরণের পর সন্ত্রাসী চিহ্নিত করতে বাংলাদেশ-ভারত একে অপরকে সহযোগিতা করছে বলেও তিনি জানান।
নিরাপত্তা সংলাপে ইন্ডিয়া অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সš§ানিত ফেলো সি রাজা মোহন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এখনও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। ভারতের বর্তমান সরকার নরেন্দ মোদির নেতৃত্বে দক্ষিণ এশিয়ার স্বার্থে প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেন তিনি। তিনি বলেন, এ উপমহাদেশের দেশগুলোর প্রতিবন্ধকতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এগিয়ে যাবেন।