মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
দেশজুড়ে নাশকতার চেষ্টা ॥ জামায়াতী তাণ্ডব
০ সারাদেশে নিহত ৫
০ সাতক্ষীরায় আওয়ামী ও যুবলীগ নেতাদের কুপিয়ে ও শ্বাসনালী কেটে হত্যা
০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের দোকানপাট বাড়িঘর ভাংচুর, আগুন লুটপাট
০ কাদের মোল্লার ফাঁসির পর মরিয়া জামায়াত-শিবির
জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ ‘মিরপুরের কসাই’ কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাত থেকেই সারাদেশে জামায়াত-শিবির ব্যাপক তা-ব চালায়। মেতে ওঠে নাশকতায়। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে তারা সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। অবশ্য যশোরে ট্রাকে আগুন দিতে গিয়ে নিহত হয়েছে এক জামায়াত কর্মী। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে সড়ক অবরোধের সময় র‌্যাবের গুলিতে খোরশেদ আলম নামে একজন নিহত হয়েছে। পিরোজপুরের জিয়ানগরে একজনসহ মোট ৫ জন নিহত হয়েছে। গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনে দুটি ট্রেনে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় এবং যাত্রীদের এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং প্ল্যাটফর্মে ককটেল ও পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, সংখ্যালঘুদের দোকানপাট, ঘরবাড়িতে নির্বিচারে হামলা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব ঘটনায় অনেক স্থানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের।
আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতা নিহত ॥ স্টাফ রিপোর্টার সাতক্ষীরা থেকে জানান, সাতক্ষীরায় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা তা-ব চালিয়ে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে ও এক যুবলীগ নেতাকে জবাই করে হত্যা করেছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে জেলার কলারোয়া উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামে পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান আজুকে (৫৩) পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবার জানিয়েছে, ২০ থেকে ২৫ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে এবং ব্যাপক ভাংচুর চালায়। একই সময় পাশের বাড়ির আওয়ামী লীগ নেতা রোস্তম আলীর বাড়িতে ভাংচুর লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে রাত দেড়টার দিকে ২৫ থেকে ৩০ সন্ত্রাসী একই উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান জজ মিয়ার বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর চালায় এবং তাঁকে তুলে নিয়ে কুপিয়ে ও শ্বাসনালী কেটে হত্যা করে। নিহতের ভাই আব্দুর রহমান জানিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এ হত্যাকা- চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সাতক্ষীরার বুধহাটা, আগরদাঁড়ী, ঝাউডাঙ্গা ও দেবহাটার পারুলিয়া বাজারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের দোকানপাট লুট করে পেট্রোল দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সদর উপজেলার আগরদাঁড়ী গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা বাহাউদ্দিন ও আবাদেহাট এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা তাপস আচার্য্য, শ্যামল ঘোষাল, গোপাল ঘোষালসহ সংখ্যালঘুদের ১০ বাড়ি ভাংচুর করে পেট্রোল দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা। আশাশুনির বুধহাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আক্তারুজ্জামানের বুধহাটা বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ওই বাজারের আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৭টি সংখ্যালঘু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। একই সঙ্গে কুল্যা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসসহ কুল্যা এলাকার আরও ৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাংচুর ও লুটপাট করে। সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা বাজারে আওয়ামী লীগ নেতা সাজ্জাতের সাথী ক্লথ স্টোরসহ কিছু সংখ্যালঘুর দোকানপাট লুট করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়।
দেবহাটা উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফার বাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি দেবহাটার পারুলিয়া বাজারের আওয়ামী লীগ নেতার কাপড়ের দোকান জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া আরও সংখ্যালঘু পরিবারের ১০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর করা হয়। ওই রাতে কালীগঞ্জের বিষ্ণপুর চৌমুহুনী বাজারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বাপ্পী, আনারুল, মোসলেমের বাড়ি ও দোকানে লুটপাট এবং আগুন জ্বালিয়ে তা-ব চালায় জামায়াত-শিবির। শুক্রবার সকাল থেকেও জেলার বিভিন্ন স্থানে এই হামলা ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী জানান, সহিংসতার খবর পেয়ে রাতেই পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব তা-ব নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে।
আগুন দিতে গিয়ে জামায়াতকর্মী নিহত ॥ যশোর অফিস জানায়, যশোরের বাঘারপাড়ায় ট্রাকে আগুন দিতে গিয়ে ট্রাক চাপায় নিহত হয়েছে আশরাফুল নামে এক জামায়াতকর্মী। জানা গেছে, শুক্রবার ভোরে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বাঘারপাড়া-চাড়াভিটা সড়কের বোলতেঘাটা মোড়ে জামায়াতকর্মীরা সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে একটি ট্রাকে আগুন দেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ট্রাক চাপায় ঘটনাস্থলে মারা যায় জামায়াতকর্মী আশরাফুল। এ ঘটনার পর জামায়াতকর্মীরা ওই ট্রাকটিসহ আরও দুটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিহত আশরাফুল বাঘারপাড়া উপজেলার মহিরন গ্রামের মকবুল দর্জির ছেলে। শুক্রবার ভোরে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের প্রায় ৫ কিলোমিটার সড়কের শতাধিক গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। মহাসড়কের মালঞ্চী থেকে নতুনহাট পর্যন্ত এসব গাছ কাটা হয়। সকালে খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব গাছ সরিয়ে সড়কের অবরোধ তুলে ফেলে।
র‌্যাবের গুলিতে নিহত ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা নোয়াখালী থেকে জানান, জামায়াত-শিবিরকর্মীরা জেলার বিভিন্ন বাজারে অগ্নিসংযোগ, আওয়ামী লীগ নেতাকে কুপিয়ে জখম ও সড়ক অবরোধ করেছে। রাত ১২টার দিকে সড়ক অবরোধের সময় বেগমগঞ্জে র‌্যাবের গুলিতে খোরশেদ আলম নামের একজন নিহত ও ইমাম উদ্দিন নামের অপর একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই সময় বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর বাজারে আগুন ধরিয়ে দিলে ২৬ দোকান পুড়ে যায়। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা সেনবাগ বাজারে কাদরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ডা. আব্দুল হাইকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। এতে তাঁর এক হাত এবং এক পা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম। এ সময় তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও পুড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া সেনবাগ উপজেলার সেবারহাট বাজারে অন্তত ২০ দোকানে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হকের বাড়িতে হামলার চেষ্টা এবং বাড়ির সামনে দুটি দোকান ভাংচুর করে আগুন দেয়। একই সময়ে ইয়ারপুর গ্রামের বটতলা এলাকায় আওয়ামী লীগকর্মী মাইন উদ্দিনের দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। জামায়াতকর্মীরা নবীপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়েও হামলা চালায়। বৃহস্পতিবার রাতে সোনাইমুড়ি উপজেলার পদিপাড়া বাজারে আমিশাপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি পারভেজের দোকানে ভাংচুর করা হয়। শুক্রবার সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কের মজুমদার হাট থেকে আপানিয়া পর্যন্ত সড়কে গাছ কেটে এবং গাছে গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করছে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা।
সংঘর্ষে নিহত ১ ॥ পিরোজপুর থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, জিয়ানগর উপজেলার ঘোষেরহাট বাজারে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে জামায়াত ও বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে ১ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছে। নিহতের নাম শুক্কুর আলী হাওলাদার। তিনি ঘোষেরহাটের সিদ্দিক হাওলাদারের ছেলে এবং বিএনপিকর্মী বলে স্থানীয়রা দাবি করলেও তার পরিবারের সদস্যরা জানান শুক্কুর জামায়াতেরকর্মী। এ ঘটনার পর ঘোষেরহাট বাজারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে। এতে শুক্কুর আলী গুরুতর আহত হলে ভা-ারিয়া হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়। জিয়ানগর থানার ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার জানান, এ ধরনের ঘটনা তাদের কেউ জানায়নি। পিরোজপুর ও ভা-ারিয়ার বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ব্যাপক তা-ব চালিয়ে। পিরোজপুর-নাজিরপুর সড়কে ভৈরমপুরে স্টিল ব্রিজের প্লেট তুলে, গাছ কেটে ও রাস্তা খুঁড়ে এবং পিরোজপুর-শ্রীরামকাঠী সড়কে তেজদাসকাঠী ও বাবলায় গাছ কেটে এবং আগুন দিয়ে সড়ক অবরোধ করেছে জামায়াত-বিএনপিকর্মীরা। এছাড়া তেজদাসকাঠীতে আওয়ামী লীগ অফিসে ভাংচুর করেছে। শিয়ালকাঠী-ভা-ারিয়া সড়কের বেলতলা স্টিল ব্রিজের পাটাতন খুলে ফেলেছে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা।
শিবিরকর্মী নিহত, আহত ২০ ॥ লাকসাম, কুমিল্লা থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের বিপুলাসার বাজারে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে আনোয়ার হোসেন নামে এক শিবিরকর্মী নিহত হয়েছে। জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে লাকসাম-নোয়াখালী সড়কের বিপুলাসার বাজারে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে ফেলার চেষ্টা করে ও বাজারে দোকানপাট ভাংচুরসহ কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পুলিশের ওপর ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ওই সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি সদস্যরা প্রায় ২ শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। শিবিরকর্মীরা নাথেরপেটুয়া এলাকায় একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে কার গুলিতে শিবিরকর্মী নিহত হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন মনোহরগঞ্জ থানার ওসি হারুন অর রশিদ। এছাড়া রাতে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা লাকসামে দফায় দফায় হামলা চালিয়ে কয়েকটি দোকানপাট ভাংচুর করেছে। তারা উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পৌর কাউন্সিলর মোশারফ হোসেনের একটি ফার্নিচার শো রুমে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে পুলিশ ও এলাকাবাসী ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়।
যুবদল নেতার মায়ের হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যু, আহত ৫৫ ॥ হবিগঞ্জ থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, ফাঁসি কার্যকর নিয়ে জামায়াত নেতার সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতার বাগ্বিত-াকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে বাহুবল উপজেলার মিরপুর এলাকায় জামায়াত-শিবিরসহ ১৮ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় যুবদল নেতা নান্নুর মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরে তার মা আজিজুন্নেছা (৬৫) হার্টএ্যাটাকে মারা যান। ওই সংঘর্ষে আহত হয়েছে অন্তত ৫৫ জন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরবর্তীতে অন্তত ২০ রাউন্ড শটগানের গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
দুই পুলিশ সদস্য আহত ॥ নারায়ণগঞ্জ থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, সদর উপজেলার ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকায় শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় সড়কে যানজট সৃষ্টি হলে ট্রাফিক পুলিশের হাবিলদার জাকির হোসেন ও কনস্টেবল রফিক এগিয়ে গেলে মিছিলে অংশ নেয়া কর্মীরা তাদের পিটিয়ে আহত করে। গুরুতর অবস্থায় জাকির হোসেনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ সময় তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পাগলা সড়কে ১০ থেকে ১২টি গাড়ি ভাংচুর করে এবং পেট্রোল দিয়ে তিনটি ট্রাক ও একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়।
নগরীজুড়ে ককটেল আতঙ্ক ॥ রাজশাহী থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী এমপির বাড়িতে বোমা হামলা চালিয়েছে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে রাত ১১টা থেকে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে থেমে থেমে ককটেল ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। এছাড়া নগরীর সিটি বাইপাস এলাকায় গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করা হয়। তবে বিভিন্নস্থানে নাশকতার চেষ্টা চালালেও পুলিশ কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
৪২ দোকানে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ ॥ বাঁশখালী থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত বাঁশখালীর বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির দফায় দফায় তা-ব চালিয়েছে। পুঁইছড়ি, নাপোড়া ও চাম্বল এলাকার তিনটি বেইলি ব্রিজের পাঠাতন উঠিয়ে এবং রাস্তা কেটে এলাকাবাসীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। বাঁশখালীজুড়ে থম থমে অবস্থা বিরাজ করছে। প্রধান সড়কের পুকুরিয়া থেকে টইটং পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার রাস্তার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক গাছ কেটে এবং গুঁড়ি ফেলে পুরো সড়ক অবরুদ্ধ করে রেখেছে। কালীপুর সদর আমিন হাট ও সাব রেজিস্ট্রার অফিসের পাশে, বৈলছড়ি বাজার, বাহারছড়া বশিরুল্লাহ মিয়াজি বাজার, নাপোড়া বাজার এলাকায় ৪২ দোকান, একটি মুরগির খামারে অগ্নিসংযোগ, নির্বিচারে ভাংচুর লুুটপাট চালিয়েছে। কালীপুরে ১২টির মতো দোকান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন না থাকায় সর্বত্র থম থমে অবস্থা বিরাজ করছে। বাঁশখালীজুড়ে গ্রামে গ্রামে পাহারা বসানো হয়েছে। হাটবাজারগুলোতে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।
এ্যাম্বুলেন্সসহ অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাংচুর ॥ বাগেরহাট থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, জেলার ফকিরহাট, রামপাল, সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির তা-ব চালিয়েছে। ফকিরহাটে মহাসড়কে সরকারী গাছ কেটে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সসহ অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাংচুর করেছে। এ সময় জিলানি শেখ (৩৮) নামে এক ট্রাক ড্রাইভার গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রামপালে ট্রাকে আগুন, যানবাহন ভাংচুর করেছে। ফকিরহাট উপজেলার কাকাডাঙ্গা মোড় হতে টাউন নওয়াপাড়া মোড় পর্যন্ত প্রায় ২০টি গাড়ি এবং তেলির পুকুর নামক স্থানে প্রজেন্টা সি ফুডের একটি মাছভর্তি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগ ও লখপুরের আমতলায় পিকেটারদের ধাওয়ায় কাঁচামালভর্তি ট্রাক সড়কে ফেলে রাখা গাছের ধাক্কায় উল্টে যায়। এ সময় অবরোধকারীরা পেট্রোল পাম্পে রাখা দুইটি বাস ভাংচুরসহ মহাসড়কের পাশে রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির সরকারী গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। খুলনা মোংলা মহাসড়কের শুকদাড়া, শ্যামবাগাত ও কুদির বটতলা, মোল্লারহাট সড়কের কাকাডাঙ্গা, সোনাখালী মোড়, বিশ্বরোড, তেলিরপুকুর পাড়, কলমের দোকান ও সাধুর বটতলা এবং বাগেরহাট সড়কের কাঁঠালতলা সড়কে রাতে যানবাহনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে গাড়ির চালক হেলপারকে মারপিট করাসহ যানবাহনের গ্লাস ভাংচুর করা হয়।
যানবাহন ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ॥ সিরাজগঞ্জ থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে দশটা থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত জেলা সদর, উল্লাপাড়া ও বেলকুচিতে অন্তত অর্ধশত বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াতÑশিবিরকর্মীরা। বেলকুচি উপজেলা সদরে একটি সিনেমা হলসহ ১৪টি বাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও অর্ধশতাধিক বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। শেরনগর কামারপাড়ায় আওয়ামী লীগ নেতা হাজী রিয়াজুল ইসলামের তাঁত ফ্যাক্টরিতে হামলার পর একটি প্রাইভেটকার ও একটি মোটরসাইকেল ভস্মীভূত করা হয়েছে। এ ছাড়াও উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়া, মধুপুর, সগুনা, কান্দাপাড়া, চালাসহ বিভিন্ন গ্রামে অর্ধশতাধিক বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাটিকুমরুল-পাবনা মহাসড়কের উল্লাপাড়া উপজেলার শ্রীখোলা মোড়ে জামায়াতÑশিবিরকর্মীরা অবস্থান নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে। সেখান তেলের মিলে থাকা তিনটি ট্রাক, সরিষা, তিল ও তেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। একই সময় তারা আওয়ামী লীগ অফিসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় ও অফিসের সামনে একটি চায়ের স্টলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে তারা শ্যামলীপাড়া বাসস্ট্যান্ডে ১০টি দোকানে অগ্নিসংযোগ করে উল্লাপাড়া মডেল থানা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এ ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়। সদর উপজেলার চ-িদাসগাতী গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দুলাল হোসেন ও যুবলীগ নেতা আব্দুল ওয়াহাবের বাড়িসহ আওয়ামী লীগসমর্থিত কয়েক নেতাকর্মীর বাড়িতে হামলা করে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। পরে তারা সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক সড়কের সদর উপজেলার চ-িদাসগাতী বেইলি ব্রিজ ও রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা বেইলি ব্রিজের পাটাতন তুলে ফেলে। সদর উপজেলার মুলীবাড়িতে উত্তরবঙ্গগামী রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।
রেলস্টেশনে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর ॥ গাজীপুর থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার সকালে চাদর গায়ে দেয়া জামায়াত-শিবিরের ২০-৩০ জনের একটি দল লাঠিসোটা নিয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনে প্রবেশ করে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়। একটি গ্রুপ স্টেশনের ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম ও কর্তব্যরত স্টেশনমাস্টারের অফিস রুমের সামনে এবং অপর গ্রুপ টিকেট বুকিং কাউন্টারের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় স্টেশনে চিত্রা এক্সপ্রেস ও পদ্মা এক্সপ্রেস নামে দুটি ট্রেনে সন্ত্রাসীরা একসঙ্গে ঝটিকা হামলা চালিয়ে স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ লোকদের এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে এবং প্ল্যাটফরমে কয়েকটি ককটেল ও পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তারা স্টেশনমাস্টার সরদার মাস্টার জিয়াউদ্দিন, সহকারী স্টেশনমাস্টার সোহরাব উদ্দিন, টিকেট বুকিং সহকারী আল আমিনসহ স্টেশনের কয়েক কর্মচারীকে মারধর করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। এ ঘটনায় আতঙ্কিত লোকজন ছুটোছুটি শুরু করেন। এ সময় জামায়াত শিবিরের কর্মীরা স্টেশনের ট্রফিক কন্ট্রোল (টিসি) রুম ও কর্তব্যরত স্টেশনমাস্টারের অফিস রুমে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে ও পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে কন্ট্রোল বোর্ডসহ কম্পিউটার, টেলিফোনিক যোগাযোগের টেবলেট টোকেন বক্স, এনটিঅই, ব্লক ইন্সট্রুমেন্ট, বিভিন্ন স্টেশন ও গেটে যোগাযোগের জন্য ৮টি টেলিফোন লাইনের সব লাইন, আসবাবপত্র, জরুরী কাগজপত্র, ও যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। হামলাকারীরা জংশনের টিকেট কাউন্টারের একটি কম্পিউটারও ভাংচুর করে। এ সময় পুলিশ এগিয়ে গেলে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে। এতে জয়দেবপুর থানার এসআই দুলাল আকন্দ ও কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন মাথায় আঘাত পেয়ে আহত হয়েছে। একপর্যায়ে পুলিশ শটগানের কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। আগুনে কন্ট্রোল রুমের কম্পিউটার ও বিভিন্ন মালামালসহ পুরো সিগন্যালিং সিস্টেম পুড়ে যায়। হামলাকারীদের পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণে প্ল্যাটফরমে অপেক্ষমাণ ট্রেনের যাত্রী শামসুন্নাহার নামের এক গার্মেন্টকর্মী দ্বগ্ধ হন। তাঁকে গাজীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর হাত ও পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান ঝলসে গেছে। এ ঘটনায় ঢাকা থেকে জয়দেবপুর জংশন হয়ে উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, খুলনা, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, তারাকান্দি, সৈয়দপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুর রুটে রেল যোগাযোগ কিছু সময় বন্ধ ছিল।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ॥ নীলফামারী থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, জেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে হাটবাজারের শতাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘু সস্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট করেছে জামায়াত-শিবির। রাত ১২টা থেকে জামায়াত-শিবির এ তা-বলীলা চালাতে থাকে। যে সব গ্রামে তা-বলীলা চালানো হয়, সে সব গ্রামের সকল রাস্তাঘাটে শতশত গাছ কেটে এবং বেইলি ব্রিজের পাটাতন উপড়ে এবং ছোট ছোট পুল কালভাট ভেঙ্গে দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ফলে এ সব এলাকায় পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা যেতে পারেনি। এ ছাড়া জেলা সদরের সঙ্গে ডোমার, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রধান সড়ক কেটে ফেলায় ওই সব উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক পথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রাত ১টার দিকে জলঢাকা থানায় হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় জামায়াত-শিবির। পুলিশ ও এলাকাবাসীর প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হয়। অগ্নিকা-ের ছবি তুলতে গেলে শিবিরকর্মীরা স্থানীয় একজন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালায় এবং তাঁর মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। রাত ১২টার পর জেলা সদরের লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের কাচারী, বেলতলী ও শীশাতলী এই তিন বাজারে অবস্থিত আওয়ামী লীগ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকাধীন অন্তত শতাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের মালামাল লুটপাটের পর পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এর পর লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি শ্যামচরণ রায়, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফাসহ ৬ জন আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এ সময় নারায়ণ চন্দ্র রায় (২৮) ও স্মরণী কান্ত রায়সহ ৮-১০ জন জামায়াত-শিবিরের হামলায় আহত হন। জেলা সদরের পলাশবাড়ি ইউনিয়নের তরুণীবাড়ি গ্রামের বিধান মাস্টারের হিন্দুপাড়ার বড়বাড়িতেও পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। ডোমার উপজেলার ধরনীগঞ্জ বাজারের ১৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল লুটপাট করে ভাংচুর করা হয়েছে। ডোমার উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে জামায়াত-শিবির। জলঢাকা উপজেলার রাজারহাট, টেঙ্গনমারী বাজারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান লুটপাট করা হয়। জেলা সদরের সঙ্গে অন্যান্য উপজেলার সংযোগ সড়কের তিনটি বেইলি ব্রিজের পাটাতন তুলে এবং রাস্তায় বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
নীলফামারী-জলঢাকা-কিশোরগঞ্জ উপজেলা সড়কের দুহুলী ব্রিজ, কঁচুকাটা ব্রিজ, ইটভাঁটির কালভাট ভেঙ্গে এবং নীলফামারী-ডোমার সড়কের হরতকীতলা বেইলি ব্রিজের পাটাতন উপড়ে ফেলে এবং ডিমলা উপজেলা সড়কের ভাদুরদরগাঁও নামক স্থানে রাস্তা কেটে ফেলেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। শুক্রবার ভোরে জেলার সৈয়দপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোবায়দুল হক সরকারের কামারপুকুর কলেজপাড়ার বাড়ির ধানের গাদায় আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
সংখ্যালঘুদের অর্ধশত দোকান ও বসতবাড়ি ভাংচুর, লুট ॥ কক্সবাজার থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, জেলার বিভিন্ন স্থানে তা-ব নৈরাজ্য, সংখ্যালঘুদের দোকান এবং বসতবাড়িতে ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে সদরের খুরু স্কুলের পালপাড়া ও টাইম বাজার এলাকায় সংখ্যালঘুদের প্রায় অর্ধশত দোকান ও বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এ ছাড়া রাতে খুরুশকুল টাইমবাজার এলাকার মগদ্বেশরী মন্দিরে আগুন দেয় তারা। এ ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সেখানকার হাজার হাজার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন। স্থানীয়রা জানান, রাতে তেতৈয়া, রুহুল্লার ডেইল, মনুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত সশস্ত্র জামায়াত-শিবির ক্যাডার এসে এ তা-ব চালায়। এ ছাড়া রাতে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টিসহ দুটি ট্রাক ও একটি টমটমে অগ্নিসংযোগ করে এবং ট্রাকভর্তি পেঁয়াজ লুট করে। শহরের কালুর দোকান, বাজারঘাটা, বার্মিজ মার্কেট, আলির জাহাল, লিংক রোডসহ ১০-১৫টি স্পটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় জামায়াত-শিবির কর্মীদের।
যানবাহন অফিস ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে আগুন ॥ বগুড়া থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, বগুড়ার দক্ষিণে জাতীয় মহাসড়কের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছ কেটে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক বন্ধ করা হয়। পুলিশ রাস্তা পরিষ্কার করার পর ফের গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করা হয়। শেরপুরে এক বৃদ্ধ রাস্তার গাছ অপসারণ করতে গেলে শিবিরের ক্যাডাররা তার হাতের আঙুল কেটে দেয়। উত্তরদিকে মাটিডালি এলাকায় জাতীয় মহাসড়কের অনেকটা কেটে ফেলা হয়। কাহালু রেলস্টেশনের কাছে ইলাসটিক রেল ক্লিপ খুলে রেললাইনের নিচে মাটি খুঁড়ে বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়। বিকাল পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি যানবাহন ভাংচুর ও আগুন লাগানো হয়। শহরতলীতে আকিজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের আঞ্চলিক গুদামে আগুন লাগিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়। সেখানে ১০টি ট্রাক ৪টি প্রাইভেটকার ৯টি মোটরসাইকেল ও ১৫টি হালকা যানবাহন ভাংচুর করে আগুনে পোড়া হয়। ফটকি ব্রিজের কাছে চিনিবোঝাই ও পোলট্রি ফিডের ২টি ট্রাকে আগুন লাগানো হয়। ধামছায়াপুরে আগুন লাগানো হয় সবজিবোঝাই ট্রাকে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর অফিসে আগুন লাগানো হয়। চেংরামাগুর এলাকায় যুবলীগের অফিস ভাংচুর করে ব্যবসায়ী তুহিকে পেটানো হয়। গণজাগরণ মঞ্চে অংশ নেয়ায় বৃন্দাবনপাড়ার দুই যুবককে বেধড়ক মারপিট করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা অফিস ভাংচুর ॥ কুড়িগ্রাম থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, কুড়িগ্রামে রাতের অন্ধকারে সদরের ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের পাটেশ্বরীবাজারে শতাধিক জামায়াত-শিবির ক্যাডার ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। পরে তারা ব্যবসায়ীদের দোকানপাটে হামলা ও ভাংচুর চালায়।
ফেনী ॥ শুক্রবার সকালে মহাসড়কে ৪টি গাড়িতে আগুন দেয় এবং টেলিফোন ভবনে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে এবং বৃহস্পতিবার রাতে শহরের এসএসকে রোডের মার্কেন্টাইল ব্যাংকে আগুন দেয় শিবিরকর্মীরা। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপালে ১০টি ট্রাকে ও ফাজিলপুর রেলস্টেশনে আগুন দেয়।
দিনাজপুর ॥ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা চিরিরবন্দর উপজেলার ভূষিরবন্দরে জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি ভবানী শংকর আগরওয়ালা ও ইউপি চেয়ারম্যান সুনীল কুমার সাহার বাড়ি ও মিলে অগ্নিসংযোগ করেছে। দফায় দফায় হামলা চালিয়ে তারা ৫টি বাস, একটি জিপ, একটি পিকআপ ও ২টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ওই এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় তারা। এ ছাড়া দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল হক চৌধুরীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর এবং চিরিরবন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইয়ুর রহমান শাহর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। চিরিরবন্দরের কাঁকড়া ব্রিজের পাটাতন খুলে দিনাজপুর-চিরিরবন্দর সড়ক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
পার্বতীপুর ॥ উপজেলার যশাই হাটের বেশকিছু দোকান ভাংচুর ও লূটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। যশাই মোড় থেকে আমবাড়ী হাট পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার ও পার্বতীপুর-দিনাজপুর সড়কে ভবেরবাজার থেকে ২ কিলোমিটার পশ্চিম পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশের শত শত মূল্যবান গাছ কেটে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে।
কুমিল্লা ॥ জেলা পরিষদের প্রশাসক ওমর ফারুকের নগরীর ঠাকুরপাড়া বাড়িতে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে ২টি পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করা হয়। শুক্রবার সকালে নগরীর টমছমব্রিজ এলাকায় কমিউনিটি পুলিশ বক্স এবং ভোরে জেলার চৌদ্দগ্রামের বাতিশা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও মিয়াবাজারের শুয়ারখিল সড়কে মুজিব সেনা ক্লাবে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা ॥ একটি ট্রাক, ইউপি কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা।
চাঁদপুর ॥ শহরে গাড়ি ভাংচুর ও সড়কে আগুন দিয়েছে শিবিরকর্মীরা। সন্ধা ৭টার পর চাঁদপুর সরকারী কলেজ গেট এলাকায় একদল শিবিরকর্মী হঠাৎ রাস্তায় এসে কয়েকটি অটোবাইক ও রিক্সা ভাংচুর করে।
ঝিনাইদহ ॥ মধ্যরাতে সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা বাজারের পাশে ৫টি পণ্যবাহী ট্রাক ও ১টি প্রাইভেটকারে আগুন দেয়। একই সময় তারা মহেশপুর উপজেলার সামন্তা ও ইসলামপুর গ্রামে কয়কজন আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থকদের বাড়িঘরে আগুন দেয় এবং সামন্তা বাজারে ৫টি দোকান ভাংচুর করে।
কচুয়া, চাঁদপুর ॥ উপজেলার কাশিমপুর-ঢাকা সড়কের মনপুরা নামক স্থানে একটি বাস পুড়িয়ে দেয় এবং গাছে আগুন, ব্রিজ ভাংচুর ও রাস্তা কেটে ফেলে। এ ছাড়া চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের জগতপুর এলাকায় গাছ কেটে সড়ক অবরোধ, মনপুরা ও বাছাইয়া নামক দুই স্থানে সড়ক কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
রায়পুর, লক্ষ্মীপুর ॥ সশস্ত্র জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের মালিকানাধীন প্রাইভেট হাসপাতাল, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে।
নওগাঁ ॥ পোরশা উপজেলার নিতপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে পার্কিং করা সোনারতরী নামক ঢাকাগামী কোচে আগুন ধরিয়ে দেয় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এছাড়া উপজেলা ভূমি অফিসেও আগুন দেয়।
জয়পুরহাট ॥ জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, লুটপাট চালায় ব্যাপকভাবে। তাদের দানবীয় আচরণে জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি এলাকার শত শত সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ॥ রাতে শহরের বড় ইন্দারা মোড় এলাকায় মার্কেন্টাইল ব্যাংক, যমুন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢিল ছুড়ে কাচ ভাংচুর করে ও বেশ কিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও মহাসড়ক কেটে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
ঠাকুরগাঁও ॥ ২৮ মাইল ও ২৯ মাইল নামক এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ঠাকুরগাঁও-ঢাকা মহাসড়কের প্রায় ৫ কিলোমিটারজুড়ে গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে।
সুনামগঞ্জ ॥ মধ্যরাতে ছাতকের গোবিন্দগঞ্জে সন্ত্রাসীরা পুলিশ বক্স ভাংচুর করেছে। এ সময় তারা ছাতক-সিলেট সড়কের গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্ট এলাকায় ৩টি সিএনজি, ২টি ট্রাক ও ১০টি দোকানে ভাংচুর করে।
দেখামাত্র জামায়াত-শিবির হেফাজতকে গুলি করার নির্দেশ দিন
গণজাগরণ মঞ্চের বিজয় সমাবেশে শাহরিয়ার কবির
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘাতক মুক্ত দেশ প্রতিষ্ঠা করে ঘরে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে গণজাগরণ মঞ্চকর্মী তথা জাহানারা ইমামের সন্তানেরা। মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাকারী কাদের মোল্লার ফাঁসির পর শুক্রবার শাহবাগ বিজয় সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, কসাই কাদেরের ফাঁসির মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। বক্তারা বলেন, রাজাকার মুক্ত দেশ প্রতিষ্ঠা করতে গ্রামে-গ্রামে, বাড়িতে-বাড়িতে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জামায়াত-শিবিরি ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধ শুরু করেছে মন্তব্য করে তাঁরা বলেন, এর জবাব যুদ্ধের মাধ্যমে দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ও মানবিক বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে ডিসেম্বরের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি করেন তাঁরা।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় গণজাগরণ মঞ্চের বিজয় সমাবেশ। শুক্রবার বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে শুরু হয় সমাবেশ। এছাড়া আলোচনার শেষের দিকে গত ১০ মাসে গণজাগরণ মঞ্চের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
শাহরিয়ার কবির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ’৭১ সালে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধে নেমেছে। তাদের যুদ্ধের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। একই সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও হেফাজতকে মাঠে দেখা মাত্র গুলি করার নির্দেশ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও দেশ রক্ষা করতে হলে জামায়াত-শিবির হেফাজতকে নিষিদ্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জাহানারা ইমামের সন্তানেরা জাগরণ মঞ্চ যে দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে তা দেশের ১৬ কোটি মানুষের দাবি বলে মন্তব্য করেন তিনি। ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তানসহ তথাকথিত যে সব মুসলিম দেশ যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে চাচ্ছেন, তাদের উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও কাদের মোল্লার রায় কার্যকর করে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে কোন চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করে না। এর আগে একইভাবে সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত মোকাবেলা করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিজয় অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। শাহরিয়ার কবির বলেন, কয়েকদিন আগে আমরা ব্রিটেন থেকে চৌধুরী মাঈনুদ্দীনকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে বলেছিলাম, যদি আপনারা মাঈনুদ্দীনকে ফেরত না দেন একই সঙ্গে গণহত্যাকারীদের পক্ষে অবস্থান নেন, তা হলে একদিন ব্রিটেন হবে গণহত্যাকারীদের স্বর্গরাজ্য। যেটি কারও কাম্য নয়। শাহরিয়ার কবির আক্ষেপ করে বলেন, প্রতিবছর আমরা ডিসেম্বর মাসের প্রথম তারিখ থেকে বিজয়ের উৎসব শুরু করি। আর এবার বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়ে সেই উৎসব থেকে আমাদের বিরত রেখেছে। এমন অবস্থায় সকল গণহত্যাকারীর বিচার না হওয়া পর্যন্ত জাহানারা ইমামের সন্তানেরা রাজপথে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতেই গণজাগরণ মঞ্চের তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযোদ্ধা আখ্যায়িত করে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে বাঙালীরা পরাজয় মানে না। সকল যুদ্ধাপরাধীর শাস্তির মাধ্যমে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, আমার কখনও ঘাতকদের কাছে পরাজয় মানব না। বিজয় আমাদের নিশ্চিত।
শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে আসছি। জাহানারা ইমাম সেই দাবিকে গণদাবিতে পরিণত করেন। আর গণজাগরণ মঞ্চ তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে দাবি আদায়ের কাজ করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দাবি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করেছিলেন, আর জিয়া এসে তাদের মুক্ত করে দেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তরুণ প্রজন্ম আন্দোলন অব্যাহত রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবীর বলেন, আমরা ’৭১ সাল ভুলিনি। ইতিহাস ভোলা যায় না। তা এই প্রজন্ম তা আবারও প্রমাণ করেছে। জাগরণ মঞ্চ কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে যেভাবে পুরো জাতিকে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে তা আমাদের বড় অর্জন। তিনি বলেন, মাঝখানে বিভিন্ন নামে পরাজিত শক্তি দেশ শাসন করেছিল বলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিলম্ব হয়েছিল।
দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার । এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেন ইমরান। দোদুল্যমান অবস্থায় না থেকে অবিলম্বে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি করেন ইমরান এইচ সরকার। ইমরান বলেন, এক ধরনের বুদ্ধিজীবী বলে থাকেন, জাগরণ মঞ্চ ট্রাইবুনালের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের উদ্দেশে ইমরান বলেন, যারা রাজপথে মানুষ হত্যা করছে, বাসে পেট্রোল বোমা মেরে ট্রাইব্যুনালের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে সে বিষয়ে কিছুই বলছেন না ওই সব বুদ্ধিজীবী। এ ধরনের বুদ্ধিজীবীদের নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে সারাদেশে জামায়াত-শিবির যে নাশকতা চালাচ্ছে তা রুখে দিতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, এবার ভিন্ন রকম আনন্দে ১৬ ডিসেম্বর ঐক্যবদ্ধভাবে পালন করবে জাতি।
বিজয় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু, ছাত্রলীগ (বাসদ) সভাপতি শামসুল ইসলাম সুমন, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এসএম শুভ, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কমান্ডের সভাপতি ইসহাক খান, সম্মিলিত ইসলামিক জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট্রের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন, বাসদের কমরেড খালেকুজ্জামান প্রমুখ।
জুমার পর ফকিরাপুল এলাকায় শিবিরের আকস্মিক তাণ্ডব
০ মহিলা শিশুসহ ১২ গুলিবিদ্ধ, আহত ২০ ॥ আটক ৫
০ নির্বিচারে গাড়ি ভাংচুর আগুন
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ‘মিরপুরের কসাই’ যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ব্যাপক তা-ব চালায় জামায়াত-শিবির। শুক্রবার জুমার নামাজের পর শিবির ক্যাডাররা মুসল্লির ছদ্মবেশে রামপুরা, মালিবাগ, ফকিরাপুল, মতিঝিল এজিবি কলোনি, আইডিয়াল স্কুল, পল্টনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। রাজপথে চালায় ব্যাপক তা-ব। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রেস জ্যাকেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে রাস্তায় নামে শিবির ক্যাডাররা। তাদের সবার হাতে ছিল লাঠি, বোতলে পেট্রোল বোমা ও ককটেল। বিভিন্ন গলির মুখ থেকে বের হয়ে শিবিরের জঙ্গী ক্যাডাররা ‘আল্লাহ আকবর’ বলে রাস্তায় দাঁড়ানো প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ প্রায় ২০টি যানবাহনে নির্বিচারে ভাংচুর চালায়, আগুন ধরিয়ে দেয়। আকস্মিক এ ঘটনায় লোকজন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। এ সময় তারা ফুটপাথের দোকান ও কয়েকটি রিক্সায়ও আগুন দেয়। তারা দফায় দফায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে এ তা-ব চালায়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শিবিরকর্মীদের ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শিবিরকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাল্টা ককটেল, পেট্রোল বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আধাঘণ্টার এ সংঘর্ষে মহিলা ও শিশুসহ ১২ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ২০ জন আহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, মতিঝিল ও ফকিরাপুলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাঁচ শিবিরকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজের পর পরই মতিঝিল এজিবি কলোনি ও আরামবাগ এলাকায় জামায়াত-শিবির জঙ্গী মিছিল বের করে। এ সময় তারা প্রধান সড়কের পাশে এজিবি কলোনি ও আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজসংলগ্ন দুই গলির প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ প্রায় ১৫ যানবাহন পুড়িয়ে দেয়। এ সময় সেখানে কয়েকটি রিক্সায় আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গলির মুখ থেকে বেরিয়ে শিবিরকর্মীরা ‘আল্লাহ আকবর’ বলে হাতে লাঠি, ককটেল ও পেট্রোল বোমা হামলা চালায়। এ সময় শিবিরকর্মীরা আইডিয়াল স্কুলের সামনে শিক্ষার্থী অভিভাবকদের রাখা কয়েকটি প্রাইভেটকারে ভাংচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। অবরোধের কারণে ৬ দিন রাজধানীর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হয়নি। এ কারণে এ দিন মতিঝিল আইডিয়ালে স্থগিত পরীক্ষা চলছিল। কয়েক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক জানান, স্কুল থেকে বের হয়ে তারা শিবিরের তা-বের মুখে পড়েন। শিক্ষার্থী ফেরদৌস আরা রুমা জানায়, জামায়াতকর্মীদের আগুন থেকে তার গাড়িও রক্ষা পায়নি। গাড়িচালক আলমগীর হোসেন জানান, পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজার পর গাড়ি নিয়ে স্কুলের সামনে এগোনোর সময় জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল আসতে দেখে তিনি গাড়ি নিয়ে একপাশে নিরাপদ স্থানে সরে যান। এ সময় মিছিলকারীরা তাঁর গাড়িও ভাংচুর শুরু করলে তিনি কোনরকমে গাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এর পর মিছিলকারীরা তাদের প্রাইভেটকারে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের দমকলকর্মীরা এসে এখানে আগুন ধরে যাওয়া কয়েকটি যানবাহনের আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পাশাপাশি পুলিশের জলকামানের পানি ব্যবহার করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়। চালক আলমগীর সাংবাদিকদের আরও জানান, জুমার নামাজের পর পর একদল লোক লাঠিসোটা ও হাতে পেট্রোলভর্তি বোতল নিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ সেøাগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে যানবাহন ভাংচুর ও আগুন দিতে থাকে। এ সময় তারা ৮-১০টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। তাদের হাতে ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র দেখেছেন অনেকে। আবার পিকআপভ্যানে লাঠিসোটা আনে তারা। স্থানীয় দোকানদাররা জানান, তারা এজিবি কলোনির মোড়ে দেওয়ানবাগ দরবার শরিফের সামনেই একটি ভ্যান ও পাঁচটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। মিছিলকারীদের হাতে লাঠিসোটা ও পেট্রোলভর্তি বোতল ছিল। একপর্যায়ে তারা গলিতে হলিডে মার্কেটে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। পাশের ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১০ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়েও আগুন দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মতিঝিল এজিবি কলোনির মুখ থেকে বের হয়ে শিবিরকর্মীরা হলিডে মার্কেটে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। হলিডে মার্কেটের কয়েক দোকানদার জানান, নামাজের পর পরই ওই দুই গলি দিয়ে জামায়াত-শিবিরের দুটি মিছিল আসে এবং ‘ধর ধর’ বলে চিৎকার দিয়েই ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এ সময় একের পর এক ককটেল ও পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াতকর্মীরা সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখা প্রাইভেটকার, রিক্সা ও ভ্যানে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়। এমনকি ফুটপাথের কয়েকটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। দোকানদাররা জানান, মার্কেটের কাছেই পুলিশের একটি টহল দল থাকলেও কয়েক শ’ জামায়াত-শিবিরকর্মীকে এগিয়ে আসতে দেখে তারা পিছু হটে যায়। এর পর আশপাশের এলাকায় প্রায় ২০ মিনিট ধরে তা-ব চালায় মিছিলকারীরা। এ ব্যাপারে মতিঝিল জোনের এডিসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ এসে শটগানের গুলি ছুড়ে জামায়াতকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় সেখানে শহীদুল ইসলাম (৩২), রোমান (২৮) ও শিবলী সাদেক (২৮) নামে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। পরে তাদের শিবির সন্দেহে পুলিশ আটক করে। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আশরাফুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুজন গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। অবরোধের কারণে টানা ৬ দিন কার্যত অবরুদ্ধ থাকার পর এ দিন অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজে তাদের নিজস্ব যানবাহন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। জুমার পর দুপুর ২টায় ফকিরাপুল গলি মুখ থেকে জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল প্রধান সড়কে এসে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৫-৬টি গাড়িতে ভাংচুর চালায়। তারা ৪টি প্রাইভেটকারে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের ছোররা গুলিতে ১০ বছরের শিশু শান্তা ইসলাম, মামা-ভাগ্নে হোটেলের মালিক আলী হোসেন (৪০), তাঁর ভাগ্নে কিবরিয়া (২৮), রিক্সাচালক নাজমুল (২৫), গার্মেন্টকর্মী শাহানাজ (৩০), ব্যবসায়ী আতিয়ার (২৫), রুমান (২৮), মোঃ ফরিদ (২৬) ফিরোজ আহমেদ (২৮) ও ফরহাদ (৩০) আহত হন।
এদিকে দুপুর পৌনে ২টার দিকে রামপুরা আবুল হোটেলের সামনে প্রেস লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে ও হেলমেট পরে শিবিরকর্মীরা হঠাৎ লাঠিসোটা ও ককটেল বোমা নিয়ে প্রধান সড়কে এসে তা-ব শুরু করে। এ সময় তারা ১৫-২০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাস্তা অবরোধ করে ৬-৭টি গাড়িতে ভাংচুর চালায়। পরে দুটি গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। শিবিরকর্মীরাও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে অলিগলিতে ঢুকে পড়ে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে ককটেল বিস্ফোরণে ফরহাদ (৩০) নামে এক গার্মেন্টস কর্মকর্তা আহত হন। সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় শাপলা গার্মেন্টকর্মী আমেনা বেগম (৪০) ও রিনা বেগম (৩৫)) গুলিবিদ্ধ হন। রিনার চোখে গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল থেকে চক্ষু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। রামপুরা থানার ওসি কৃপা সিন্ধু বালা জানান, পৌনে ২টার দিকে একদল শিবিরকর্মী প্রেস লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে দিয়ে ও হেলমেট পরে আবুল হোটেলের সামনে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে তারা রাস্তা অবরোধ করে গাড়ি ভাংচুর শুরু করে। এ সময় তারা দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ধাওয়া দিলে শিবিরকর্মীরা গলিতে ঢুকে পড়ে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করতে করতে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সময় খিলগাঁও ও মানিকনগরে সোহাগ পরিবহনের একটি গাড়িতে ভাংচুর চালায় শিবিরকর্মীরা।
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবার ভিন্নমাত্রায়
উত্তম চক্রবর্তী ॥ আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলিতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে/ একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ/’... কিংবা ‘একঝাঁক ঝাঁ ঝাঁ বুলেট তাদের বক্ষ বিদীর্ণ করুক/ এমন সহজ শাস্তি আমি কামনা করি না তাদের জন্য ...।’
দেশের প্রধান কবি মরহুম শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় এভাবেই জাতির সূর্য সন্তানদের হন্তারক দেশদ্রোহী রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের শাস্তি কামনা করেছেন। দেশের প্রধান কবির দেশদ্রোহীদের সেই শাস্তির দাবি স্বাধীনতার ৪২ বছর পর হলেও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রক্ত বৃথা যায়নি। বুদ্ধিজীবী হন্তারক কুখ্যাত কসাইখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার মাধ্যমে দায়মোচনের শুভসূচনা করেছে বর্তমান সরকার। কারাগারের ফাঁসির সেলে মৃত্যুর দিন গুনছে অন্য রাজাকার শিরোমনিরা। এসব দেশদ্রোহীদের মৃত্যুদ- কার্যকরের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
তাই আজ বুদ্ধিজীবী দিবসে একাত্তরের শহীদ ও সংশ্লিষ্ট পরিবারে আজ স্বস্তি ও প্রশান্তির হাসি। ৪২ বছর ধরে পিতৃ-মাতৃহন্তারকদের আস্ফালন দেখে যে একবুক ব্যথা-বেদনা ও কষ্ট নিয়ে তাঁদের পথ চলতে হয়েছে, কাদের মোল্লার ফাঁসির মাধ্যমে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবার এক অন্য ধরনের পরিবেশে শ্রদ্ধা জানাবেন শহীদ প্রিয়জনদের। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে নির্বাচনী ওয়াদা আওয়ামী লীগ করেছিল, শত ষড়যন্ত্রের কুহেলিকা ভেদ করে কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে সেই ওয়াদাও বাস্তবায়ন শুরু করেছে তাঁরা। আর এই রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিছুটা হলেও পাপ ধুয়ে নিল বাংলাদেশ। দীর্ঘকাল ধরে বয়ে বেড়ানো পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির পথে হাঁটাও শুরু হলো।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে সামনে রেখে শহীদ ও সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যরা আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের মাধ্যমে শুধু তাঁদের পরিবারের শহীদ সদস্যরাই নন, ১৯৭১ সালের ৩০ লাখ শহীদের আত্মা শান্তি পেল। দেশ ও জাতি দায়মুক্তির পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। এমন শাস্তি দেখার জন্য ৪২ বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। আমাদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর এতদিনের কষ্ট-যন্ত্রণার কিছুটা হলেও উপশম হয়েছে। এখন আমাদের একটাই দাবি, মৃত্যুদ- প্রাপ্ত সব বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদেরও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হোক।
আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধনের মর্মন্তুদ স্মৃতিঘেরা এক দিন। বাঙালীর মেধা-মনন-মনিষা শক্তি হারানোর দিন আজ। ইতিহাসের পাতায় কালো আক্ষরে উৎকীর্ণ বেদনা বিধূর কালবেলা। স্বাধীনতার ৪২ বছর ধরে গোটা জাতি দাবি করেছে- ঘৃণ্য নরপশু বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেয়া হোক। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে শত ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে এক গণহত্যাকারী কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছে। তাই এবার এক ভিন্ন রকম পরিস্থিতিতে জাতি পালন করছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।
শুধু একাত্তরে কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে। ক’জন রাজাকার শিরোমনি শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদালত। তবে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় মরিয়া স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার দল বলে দাবিদার বিএনপিও। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এই জঙ্গী গোষ্ঠীর দেশব্যাপী তা-ব ও সহিংস রূপ প্রত্যক্ষ করছে দেশবাসী। বসে নেই স্বাধীনতাকামী মানুষ, একাত্তরের মতোই কারা জেগে উঠতে শুরু করেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ জনগণও জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করতে মাঠে নেমেছে। খোদ সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, যতই যড়যন্ত্র হোক, সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হবে।
একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী।
এঁদের মধ্যে রয়েছেন- ড. জিসি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য. ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দিন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমেদ লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আনম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নতুন চন্দ্র সিংহ, আরপি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, সায়ীদুল হাসান, হাবিুবর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীনসহ অনেকে।
যথাযোগ্য মর্যাদা শোকের আবহে আজ শনিবার পালিত হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এ উপলক্ষে রায়ের বাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তান এলাকায় নেয়া হয়েছে নিñির্দ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়েছে নানা কর্মসূচী। এর মধ্যে রয়েছে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনাসভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
কর্মসূচী ॥ যথাযোগ্য মর্যাদায় ও শোকের আবহে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন নিয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচী। জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- আজ সকাল ৭টায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাগণ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন জানাবেন। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আনুষ্ঠানিকতা শেষে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধেও শ্রদ্ধার্র্ঘ্য অর্পণ করবেন।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে- ভোরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশের দলীয় সংগঠনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৮টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, সকাল ৭টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, সাড়ে ৭টায় ধানম-ির বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি, ৮টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনাসভা। সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, গণফোরাম, জাতীয় পার্টি (জেপি), সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলা একাডেমী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ অজস্র সংগঠন বুদ্ধিজীবী দিবস পালনে নিয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচী।
চট্টগ্রামে ব্যাপক আয়োজন ॥ চট্টগ্রাম অফিস জানায়, আলোচনাসভা, আলোক প্রজ্জ্বলন, শ্রদ্ধা নিবেদনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতায় আজ শনিবার চট্টগ্রামে পালিত হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এ উপলক্ষে বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে গৃহীত হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচী। ভাবগম্ভীর পরিবেশে দিবসটি উদযাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন এবং অঙ্গ সংগঠনগুলো নিজ নিজ ব্যানারে কর্মসূচী পালন করবে। এরমধ্যে রয়েছে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনাসভা।
এক শ’ দুই আসনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নেই ॥ প্রত্যাহার পর্ব শেষ
এরশাদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও প্রার্থিতা থাকছে
স্টাফ রিপোর্টার ॥ আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। শেষ দিনে দেশের ৩০০ আসনে জাতীয় পার্টি, স্বতন্ত্র ও অন্য প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ায় ১০২ আসনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নেই। বিকল্প প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায় এসব আসনে একক প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এসব আসনে যারা নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এ ছাড়াও ১৪ দলীয় জোটের শরীক জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টির সদস্যরা রয়েছেন। স্বাধীনতার পর দেশের জাতীয় নির্বাচনে এভাবে অধিক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। তবে শতাধিক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আসনে কোন একক প্রার্থী নেই। জাতীয় পর্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হলেও অনেক আসনে তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করা হয়নি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন জানালেও তা যথাযথ না হওয়ায় দলের চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদসহ দলের কেন্দ্রীয় অনেক নেতারই এবারের নির্বাচনের প্রার্থিতা বহাল থাকছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র যথাযথ না হওয়ায় রংপুর-৩ আসনে, লালমনিরহাট এক আসনে এরশাদের প্রার্থিতা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেছে স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তা। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে তাদের প্রার্থিতা বহাল থাকছে। নিয়মানুযায়ী তাদের আজকের মধ্যে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির যেসব নেতাকর্মী দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি তারা সবাই লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবেন বলে কমিশন জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে এত বেশি সংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। দেশে বহুল আলোচিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ৪৯ জন বিএনপির প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১১ জন, ১৯৮৯ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আমলে ১১ জন, এরশাদের আমলে ১৮ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া বাতিল হওয়া বাতিল নবম সংসদে ১৮ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ায় যারা আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আজকের মধ্যে তাদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। এর পর থেকেই প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে পারবেন। তবে যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তাদের আসনে আর কোন নির্বাচন হবে না। শুধু রিটার্নিং কর্মকর্তা বিজয়ী ঘোষণা করলেই তাদের সাংসদ হিসেবে গেজেট প্রকাশ করা হবে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, মনোনয়ন প্রত্যাহারের পরদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক দেয়া হবে। তবে বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তার এখতিয়ার। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পার হওয়ার পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ মেনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের নাম গণবিজ্ঞপ্তি করার পর তাদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। তবে এসব প্রার্থীদের গেজেট ৫ জানুয়ারি ভোটের পর এক সঙ্গে প্রকাশ করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। ঘোষিত সময়ের মধ্যে এবারের ২০টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ১১শ’ ৭ জন মনোনয়ন দাখিল করে। বাছাইয়ের পর ৮৪৭ জনের মনোনয়ন বৈধ হয়। বাতিল হয় ২৬০ জনের। এর পর ৭-৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৮টি আপীল আবেদনের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার ৪২ জনের আপীল মঞ্জুর করে ইসি।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন যারা ॥ এবারের নির্বাচনে নির্বাচন যেসব আসনে একক প্রার্থী রয়েছেন তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এখন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষ হওয়ার পর যেসব আসনে একক প্রার্থী রয়েছেন- লালমনিরহাট-২ নুরুজ্জামান আহমেদ, রংপুর-৫ এএইচএন আসিকুর রহমান, রংপুর-২ আসনে আবুল কালাম মোঃ হাসানুল হক ডিউক, রাজশাহী-১ ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-৪ এনামুল হক, নাটোর-১ আবুল কালাম, নাটোর-২ শফিকুল ইসলাম শিমুল, নাটোর-৪ মোঃ আব্দুল কুদ্দুস, সিরাজগঞ্জ-১ মোহাম্মদ নাসিম, সিরাজগঞ্জ-২ হাবিবে মিল্লাত, সিরাজগঞ্জ-৩ ইসহাক হোসেন তালুকদার, সিরাজগঞ্জ-৬ মোঃ হাসিবুর রহমান স্বপন, যশোর-১ শেখ আফিল উদ্দীন, বাগেরহাট-১ শেখ হেলাল উদ্দীন, বাগেরহাট-২ মীর শওকত আলী বাদশা, ভোলা-১ তোফায়েল আহমেদ, ভোলা-৪ আসনে আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, বরিশাল-১ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, বরিশাল ৫ আসনে আলহাজ শওকত হোসেন হিরুন, ঝালকাঠি-২ আমির হোসেন আমু, পিরোজপুর-১ এ কে এম আউয়াল (সাইদুর রহমান), পিরোজপুর-২ আনোয়ার হোসেন- জাতীয় পার্টি- জেপি, টাঙ্গাইল-১ আসনে আব্দুর রাজ্জাক, টাঙ্গাইল-৩ আমানুর রহমান রানা, টাঙ্গাইল- ৪ আসনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, টাঙ্গাইল-৭ আসনে একাব্বর হোসেন, টাঙ্গাইল-৮ আসনে শওকত মোমেন শাজাহান, ময়মনসিংহ-১ প্রমোদ মানকিন, ময়মনসিংহ-২ শরীফ আহমেদ, ময়মনসিংহ-৯ আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিন, কিশোরগঞ্জ-১ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৪ রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিক, মানিকগঞ্জ-২ মমতাজ বেগম, মুন্সীগঞ্জ-৩ মৃণাল কান্তি দাস, গাজীপুর-১ আ ক ম মোজাম্মেল হক, গাজীপুর-২ আসনে জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর-৩ আসনে এ্যাডভোকেট রহমত আলী ও গাজীপুর-৫ আসনে মেহের আফরোজ চুমকি, নরসিংদী-৫ রাজিউদ্দীন আহমদ রাজু, নরসিংদী-৪ আসনে এ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ-২ মোঃ নজরুল ইসলাম বাবু, নারায়ণগঞ্জ-৪ শামীম ওসমান, রাজবাড়ী-১ কাজী কেরামত আলী, রাজবাড়ী-২ মোঃ জিল্লুল হাকিম, ফরিদপুর-১ আব্দুর রহমান, ফরিদপুর-৩ খন্দকার মোশারফ হোসেন, মাদারীপুর-১ নূর-ই আলম চৌধুরী, মাদারীপুর-২ শাজাহান খান, মাদারীপুর-৩ আ ফ ম বাহাউদ্দিন (নাছিম), শরীয়তপুর-১ বি এম মোজাম্মেল হক, শরীয়তপুর-২ শওকত আলী, শরীয়তপুর-৩ নাহিম রাজ্জাক, মৌলভীবাজার-৪ আব্দুস শহীদ, কুমিল¬া-৭ অধ্যাপক আলী আশরাফ, কুমিল্লা-১০ আ হ ম মুস্তফা কামাল, চাঁদপুর-১ মহীউদ্দীন খান আলমগীর, চাঁদুপর-২ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী, চাঁদপুর-৩ দীপু মনি, চাঁদপুর-৪ মোহাম্মদ শামসুল হক ভুঁইয়া, চাঁদপুর-৫ মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম, ফেনী-১ জাসদের শিরিন আকতার, ফেনী-২ নিজাম উদ্দিন হাজারী, নোয়াখালী-২ মোর্শেদ আলম, নোয়াখালী-৫ ওবায়দুল কাদের, লক্ষ্মীপুর-৩ এ কে এম শাহজাহান কামাল, লক্ষ্মীপুর ২ আসনে জাপা প্রার্থী মোঃ নোমান।
চট্টগ্রাম-১ ইঞ্জিয়ার মোশারফ হোসেন, চট্টগ্রাম-৫ জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (জাতীয় পার্টি), চট্টগ্রাম-৬ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ হাছান মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৮ জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল, চট্টগ্রাম-১০ ডা. আফসারুল আমীন, চট্টগ্রাম নজরুল ইসলাম, নওগাঁ-১ আসনে সাধন চন্দ্র মজুমদার, নওগাঁ-২ এ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান সরকার বাবলু, নওগাঁ-৬ আসনে ইস্রাফিল আলম, মৌলভীবাজার-৩ সৈয়দ মহসীন আলী, জয়পুরহাট-১ শামসুল আলম দুদু, জয়পুরহাট-২ আবু সাঈদ আল মাহমুদ, সুনামগঞ্জ-২ বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ঠাকুরগাঁও-২ আলহাজ দবিরুল ইসলাম, নেত্রকোন-৪ বেওরেকা মোমিন, নেত্রকোনা-৫ ওয়ারেসাত হোসেন বেল্লাল বীরপ্রতীক, বগুড়া-১ মোঃ আব্দুল মান্নান, বগুড়া-২ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ (জাতীয় পার্টি), বগুড়া-৭ হাবিবুর রহমান, নড়াইল-২ কবিরুল হক মুক্তি, নীলফামারী-২ আসাদুজ্জামান নূর, কুষ্টিয়া-২ হাসানুল হক ইনু, জামালপুর-৩ মির্জা আজম, রাজশাহী-২ ফজলে হোসেন বাদশা, রাজশাহী-৫ আব্দুল ওয়াদুদ দ্বারা, পটুয়াখালী-২ আসনের আসম ফিরোজ, সাতক্ষীরা-৩ আফম রুহুল হকের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোন প্রার্থী নেই। ফলে যে কোন সময়ে এসব প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবেন রিটার্নিং অফিসার। এ ছাড়া ঢাকার আসন থেকে যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন তাদের মধ্যে রয়েছে নসরুল হামিদ দিপু, আইন প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাভারের ডা. এনামুর রহমাম প্রমুখ।
নির্বাচন কমিশনে শেখ হাসিনার স্বাক্ষিত একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদক আব্দুস সোবাহান গোলাপ চিঠিটি নির্বাচন কমিশনে পৌঁছে দেন। চিঠিতে আওয়ামী লীগের শরিক জাসদের ৪টি আসন, ওয়ার্কার্স পার্টির ৪টি ও তরিকত ফেডারেশনের দুটি আসনের প্রার্থীদের নৌকা প্রতীক দেয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে জাসদের যে ৪ জনের প্রতীক নৌকা প্রতীক বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। অপরদিকে ওয়ার্কার্স পার্টির একজন ফজলে হোসেন আবেদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। স্টাফ রিপোর্টার মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থী শুক্রবার মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়ায় মুন্সীগঞ্জের ৩টি আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ জনে। রিটার্নিং অফিসার ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল শুক্রবার সন্ধ্যায় জানান, বাছাইয়ের শেষ দিনে যাদের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ি-লৌহজং) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনিত সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলী, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ ও খেলাফত মজলিসের মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ। মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী আওয়ামী লীগ মনোনিত সুকুমার রজ্ঞন ঘোষ, জাসদের (ইনু) একেএম নাসিরুজ্জামান খান ও জেপির নুর মোহাম্মদ। এ নিয়ে জেলার মোট ৩টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে ভোটযুদ্ধ হবে ২টি আসনের ৬ প্রার্থীর মধ্যে।
স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ থেকে জানান, জেলার সদর আসন থেকে প্রার্থী হচ্ছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ। জেলার ১১ আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন শুক্রবার ১১ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
নিজস্ব সংবাদদাতা মৌলভীবাজার থেকে জানান, জেলার তিন এবং চার নম্বর আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজন আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিতরা হচ্ছেন মৌলভীবাজার-৩ এ আওয়ামী লীগের সৈয়দ মহসীন আলী এবং মৌলভীবাজার-৪ এ চীপ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহিদ।
এখন মৌলভীবাজার-১ আসনে ৩ জন প্রার্থীর মধ্যে জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন এ্যাডভোকেট মাহবুবুল আলম শামীম। এ আসনে আওয়ামী লীগের মোঃ শাহাব উদ্দিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আহমেদ রিয়াজ উদ্দিনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
মৌলভীবাজার-২ আসনে ৪ জন প্রার্থীর মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মুহিবুল কাদির চৌধুরী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রীনা বেগম চৌধুরী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহর করে নেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সৈয়দ বজলুল করিম এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মতিনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
নিজস্ব সংবাদদাতা চাঁদপুর থেকে জানান, জেলার ৫টি আসনে অন্য কোন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের ৫ জন প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। জেলা রিটার্নিং অফিসার শুক্রবার বিকেলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
স্টাফ রিপোর্টার সিরাজগঞ্জ থেকে জানান, জেলার ৬টি আসনের ৫টিতে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী। তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। শুক্রবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন তিন জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন।
চিকন আলী থেকেই মৃত্যুদণ্ড, কাদের মোল্লার কার্যকর
বিকাশ দত্ত ॥ শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধীদেরই দণ্ড নয় এর আগে এ জাতীয় অপরাধ করার জন্য দালাল আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাজাকার চিকন আলীকে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করা হয়েছিল। সে অর্থে বলা যায় এ পর্যন্ত চিকন আলী থেকে ট্রাইব্যুনাল ১০ জনকে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যদিও চিকন আলীর বিচারটি ছিল দালাল আইনের বিচার। অন্যদিকে নুরেনবার্গ ট্রায়াল থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যেখানে এই ধরনের অপরাধীর বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছিল আর বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের। এক কথায় বলা যায় বিশ্বে যেখানে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেখানেই তাদের বিচার হয়েছে। বিচারে তাদের দণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সে দিক থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে সব অপরাধীর বিচার হচ্ছে তারা আপীল করাসহ শর্তাধীনে জামিন, দিনের পর দিন জেরা করার সুযোগ পেয়েছে। যা নুরেনবার্গ ট্রাইব্যুনালেও এ সব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়নি। সে দিক থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতা বিরোধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর পর আসামির সংখ্যা বৃদ্ধি ও মামলা নিরপেক্ষভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ২০১২ সালের মার্চ মাসে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে ২৯টি মামলার মধ্যে এ পর্যন্ত ৯টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ আদালতে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর করাও হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতে ৬টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে ৮টি মামলার বিচার কাজ চলছে। তদন্ত সংস্থা জামায়াতসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে যাচ্ছে।
এর মধ্যে আপীল বিভাগে প্রথম পর্যায়ে শুনানি হচ্ছে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার। তার মামলার শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি করা হবে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার জন্য মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মামলাটি সিএভি রাখা হয়েছে যে কোন দিন তার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। নবেম্বরের ১৩ তারিখে বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখা হয়। এর পর আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেনের মামলটিও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তার মামলা এখন সাফাই সাক্ষীর জন্য রবিবার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সাফাই সাক্ষী ও যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করা হবে। এর পর রয়েছে বিএনপি নেতা খোকন রাজাকার ও জামায়াত নেতা একেএম ইউসুফ।
কাদের মোল্লার রায় কার্যকর প্রসঙ্গে সুপীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ শম রেজাউল করিম বলেছেন, কাদের মোল্লাই নয় ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালে এ জাতীয় অপরাধ করার জন্য দালাল আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চিকন আলীর সাজা হয়। কেউ যে আইনের উর্ধে নয় অনেক বিলম্বে হলেও আইনের আমলে আসতে হয় তার জলন্ত প্রমাণ এই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্তদের দ- দেয়া থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, অপরাধ করে দায় মুক্তির সংস্কৃতি কখনই যে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা যায় না। তাও কাদের মোল্লার দ- কার্যকরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো।
চিকন আলীকে মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। যদিও তা কার্যকর হয়নি। উল্লেখ্য, কুষ্টিয়ার দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত রাজাকার চিকন আলীকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির আদেশ দেন। আসামি চিকন আলীকে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ দালাল আদেশের ১১(ক) ধারার সঙ্গে গঠিত ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারা মতে দ- দান করা হয়। দালাল আদেশের অধীনে এটা দেশের প্রথম দ-। মামলার বিবরণে প্রকাশ, মিরপুর গ্রামের অধিবাসী আসামি চিকন আলী বাংলাদেশ দখলদার আমলে রাজাকারে ভর্তি হয় এবং হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ ও মহিলাদের শ্লীলতাহানি কাজে অংশগ্রহণ করে। গণহত্যাসহ অন্য ধরনের অপরাধমূলক কাজে সে সক্রিয়ভাবে পাকবাহিনীর দালালি করে। আসামি ১৯৭১ সালে তার গ্রামের জনৈক কামাল উদ্দিন ম-লকে ডেকে নিয়ে বলে যে সে (চিকন আলী) ইয়াজুদ্দীনের বাড়ি থেকে দুলালী বেগমকে অপহরণ করতে চায়। উল্লেখ্য, যে আবদুল গফুরের কন্যা দুলালী বেগমকে দখলদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ইয়াজুদ্দিনের গৃহে রাখা হয়েছিল। তার পর চিকন আলী ইয়াজুদ্দিনের গৃহে গিয়ে দুলালী বেগমকে তার কাছে দিতে বলে। কিন্তু ইয়াজুদ্দিন অস্বীকার করলে তাকে রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ওই জজ আসামিকে একই মামলায় দালাল আদেশ ১১(খ) ধারার সঙ্গে ফৌজদারি আইনের ১২১ ধারা মতে দোষী সাব্যস্ত করেন। তবে ইতোমধ্যে তাকে মৃতুদ- দেয়ার ফলে পৃথক কোন দ- দেয়া হয়নি।
এর আগে দালাল আইনে অনেকের দ- প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে চেয়েছিলেন। প্রথম পর্যায় দালাল আইনে এদের বিচার হয়। তখন ১১ হাজার দালাল আটক করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিচারে ২২ জনের মৃতুদ-, ৬৮ জনের যাবজ্জীবন ও ৭০০ জনকে বিভিন্ন দ-ে দ-িত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দালালদের বিচার বন্ধ হয়ে যায়।
প্রসিকিউটর রানা দাশ গুপ্ত বলেছেন, নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে জামিন, প্যারোলে মুক্তি, আপীল ছিল কিনা তা আমার জানা নেই। তবে আমাদের ট্রাইব্যুনালে আসামিরা দিনের পর দিন জেরা করার সুযোগ পয়েছে। তাদের আপীল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। যে থেকে প্রমাণিত হয় আমাদের ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ। তিনি আরও বলেন চিকন আলীকে দালাল আইনে বিচার করা হয়েছিল। আর ট্রাইব্যুনালে যে অভিযুক্তদের বিচার করা হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল। এটা আন্তর্জাতিক অপরাধ।
বাংলাদেশে একমাত্র অভিযুক্ত কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বিচারে আরও ৯ জনকে দ- প্রদান করেছেন। দ-প্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতা রয়েছেন। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদ-, বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদ-, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কমারুজ্জামানকে মৃত্যুদ-, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মুত্যুদ-, আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খানকে মুত্যুদ-, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃতুদ-, বিএনপির আরেক নেতা আব্দুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদ-ের রায় প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে বাচ্চু রাজাকার, আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দীন এবং চীফ এক্সিকিউটর মোঃ আশরাফুজ্জামান খান পলাতক রয়েছে।
নুরেনবার্গ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তির পাশাপাশি ৭টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের বিচার হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে ১) নাৎসি পার্টির নেতৃত্ব ২) রাইখ সরকারর মন্ত্রীসভা ৩) এসএস ৪) গেস্টাপো ৫) এসডি ৬) এসএ এবং ৭) জার্মান হাই কমান্ড। বিচারে এ সব সংগঠনকে দোষী প্রমাণিত হয়েছে এবং রায়ে এদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নুুরেমবার্গে প্রথম দফায় ২৪ নাৎসি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছিল। এদের প্রত্যেকের এক বা একাধিক আইনজীবী ছিলেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুবালে ৯৯ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়। যাদের অধিকাংশেরই মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। কয়েক যুদ্ধাপরাধী বিচার চলাকালে আত্মহত্যা করেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান শুধু চীনে নয়, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা ও ফিলিপাইনসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশে গণহত্যা, নারীনির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধ্বংসাযজ্ঞ সাধন করে। টোকিও ট্রাইব্যুনালে ক শ্রেণীর ২৮ জন জাপানী যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ শুরু হয়। বিচারকাজ চলাকালে দুজন অভিযুক্ত মৃত্যুবরণ করেন। একজন উন্মাদ হয়ে যান। বাকি ২৫ জনের বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হন। এদের মধ্যে ৭ জনকে শীর্ষ স্থানীয় জাপানী যুদ্ধাপরাধীকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। মৃত্যুদ- প্রাপ্তরা হলেন, জেনারেল কেনজি দোইহারা, বারোন কোকি হিরোতা, জেনারেল সোশিরো ইতাগাকি, জেনারেল হেইতারো কিমুরা, জেনারেল আইওয়ানে মাতসুই, জেনারেল আকিরা মুতো, জেনারেল হিদেকি তোজো।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের মতো এখানেও সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। ১৮ আগস্ট থেকে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারী সংস্থার প্রধান এমএ হান্নান খান বলেছেন, দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ও তদন্ত করা হচ্ছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তারা তদন্ত করে যাচ্ছে। তিনি বলেন আমি আশা করছি ডিসেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে ‘অপরাধী সংগঠন’ (ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ট্রাইব্যুনাল তার রায়গুলোর পর্য্যবেক্ষণে বলেছেন, আলবদর হলো জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র গ্রুপ। আলবদর গঠিত হয়েছিল ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মীদের দ্বারা। জামায়াতে ইসলামী মিলিটারিদের কার্য্যক্রমে সাহায্য করার জন্যে ২টি শাখা গঠন করে। সুতরাং ঐতিহাসিকভাবে বলা যেতে পারে, জামায়াতে ইসলামী কার্য্যকর ভূমিকা আলবদর, রাজাকার, আলশামস এবং শান্তিকমিটি গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বেসামরিক লোকজন এবং তাদের সম্পদ রক্ষা করার কোন ক্রমেই কোন ভূমিকা রাখেনি। জামায়াতে ইসলামী ২টি প্যারমিলিটারি ইউনিট গঠন করে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার রাজাকার রিক্রুট করা হয়। জামায়াতে ইসলামী আলবদরের দ্বারা সংগঠিত হত্যা, নির্যাতনের দায় এড়াতে পারে না। যদিও জামায়াত বলত যে, তাদের মানবিকতা এগুলো মহান ধর্ম ইসলামের জন্যে। এর পর তদন্ত সংস্থা জামায়াতের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করে।
সূত্র মতে, নুরেমবার্গ ট্রায়াল, টোকিও ট্রায়াল, ইয়ামাশিতা ট্রায়াল থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কারণ এখানে আসামিরা শর্ত সাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন, তাদের আপীল করার সুযোগ দেয়া হযেছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে তারা ট্রাইব্যুনালে কথা বলতে পারছেন। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী না থাকলে রাষ্ট্রের খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দুই নেত্রীর হাতে
তৃতীয় দফা বৈঠক ॥ আওয়ামী লীগ বিএনপি প্রস্তাব বিনিময়
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ তৃতীয় দফা বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেদের মধ্যে প্রস্তাব বিনিময় করেছে। প্রস্তাবগুলো নিয়ে দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে স্ব স্ব দলের নেতারা আলোচনা করে পরবর্তী বৈঠকে তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরা।
জাতিসংঘ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর পর এবার ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী নিল ওয়াকারের উপস্থিতিতে শুক্রবার প্রধান দুই দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত তৃতীয় দফা এই বৈঠকে পরস্পরের প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে। উভয়পক্ষই এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে কোন পক্ষই বৈঠকে কী কী প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসন ও সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন নিশ্চিত করতে বিকেল সোয়া ৪টা থেকে সোয়া ৬টা পর্যন্ত গুলশানে ইউএনডিপি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দুই দলের শীর্ষ ৮ নেতার এ বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কিছু প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। দুই পক্ষই পরস্পরের কাছে অভিমত তুলে ধরেছে। এই প্রস্তাব নিয়ে দুই দলই তাদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তবে প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি। আশরাফ জানান, আবারও দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও প্রস্তাব বিনিময়ের কথা স্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আমরা তিনদিন ধরে সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথা বলেছি। আলোচনা হয়েছে। সকলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের জন্য আমরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি। তাঁরাও কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে বসে এসব নিয়ে আলোচনা করব আমরা। তাঁরাও তাঁদের নীতিনির্ধারণী ফোরামে বসে আলোচনা করবেন। অতি শীঘ্রই এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে আবারও আলোচনা হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের কোন জবাব দেননি মির্জা ফখরুল।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও দলের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষে ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান ও শমসের মবিন চৌধুরী।
গুলশানের ওই বাড়িতেই গত বুধবার সর্বশেষ বৈঠক করেন দুই দলের এই আট নেতা। সেদিন তাদের মধ্যস্থতায় ছিলেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। ওই দিনই সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা ছাড়েন অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। আর শুক্রবারের বৈঠকে মধ্যস্ততা করেন জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকার।
আনুষ্ঠানিকভাবে কোন পক্ষ মুখ না খুললেও বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সংবিধানের মধ্য থেকে কিভাবে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কটের সমাধান করা যায় সেসব বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা হয়। বিএনপির তরফে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান পদে শেখ হাসিনাকে না রাখা, নির্বাচনের তফসিল স্থগিত করে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান, দলের গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং দমন-পীড়ন বন্ধের দাবি জানানো হয়। জবাবে শাসক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবিধানের বাইরে তাদের যাওয়া যে সম্ভব নয়, তৃতীয় বৈঠকেও বিএনপি নেতাদের তা সাফ জানিয়ে দেন। তবে বৃহত্তর স্বার্থে সংবিধানের মধ্যে থেকে বেশকিছু ছাড় দিতেও যে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত সে কথাও জানানো হয়। একই সঙ্গে আলোচনার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য হরতাল-অবরোধের নামে সহিংসতা, নাশকতা, ধ্বংসযজ্ঞ ও মানুষ হত্যার মতো অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বিএনপির প্রতি দাবি জানানো হয়।
যে ভাবে কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো
মশিউর রহমান খান ॥ বৃহস্পতিবার রাতে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে কিছুটা বিমর্ষ হয়ে যান যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা। ওই রাতে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা শেষবারের মতো দেখা করতে কারাগারে যান। কারাগারের কনডেম সেলে একটি মোড়াতে বসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই শেষবারের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা বলেন বলে সূত্র জানায়। তাঁরা বেরিয়ে আসার পর পরই কাদের মোল্লাকে কারা কর্তৃপক্ষ জানান, আজ বৃহস্পতিবার রাতেই আপনার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে। আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন। ফাঁসির কথা শোনার পর তিনি বিচলিত হননি কিংবা তাঁকে চিন্তিত মনে হয়নি। রাত সাড়ে ৮টায় গোলাপজল মিশ্রিত গরম পানি ও সাবান দিয়ে কাদের মোল্লাকে গোসল করানো হয়। পরে কারা কর্তৃপক্ষ কাদের মোল্লার কাছে রাতের খাবার সরবরাহ করেন। খাবারের মেন্যুতে ছিল ভাত, গরুর গোশত, মুরগির গোশত এবং তিন প্রকারের সবজি। রাতের খাবার খেয়ে নামাজ আদায় করে কোরান তিলাওয়াত করেন। ৯টা ৩৩ মিনিটে কনডেম সেলে কারা মসজিদের ইমাম তাঁকে তওবা পড়ান ও তাঁকে নিয়ে মোনাজাত করেন। এ সময় কাদের মোল্লা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। সেলের বাইরে সিনিয়র জেল সুপার, জেলার ও অন্যান্য কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী কাদের মোল্লার কাছে তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে এ ব্যাপারে হ্যাঁ বা না কোন উত্তর দেননি। এর আগে কারারক্ষীদের কাছে তিনি স্বাভাবিকভাবে তাঁর লাশটি গ্রামের বাড়িতে মায়ের কবরের পাশে কবর দেয়ার অনুরোধ করেন।
পরে কাদের মোল্লাকে দুই জল্লাদ কনডেম সেল থেকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে যমটুপি পরিয়ে দেন। এ সময় কাদের মোল্লা মাথায় থাকা আগের টুপি খুলতে রাজি না হলেও নিয়মানুযায়ী তা খুলে যমটুপি পরানো হয়। কনডেম সেল থেকে কয়েক শ’ মিটার দূরত্বের রাস্তা ফাঁসির মঞ্চ। যমটুপি পরা অবস্থায় কাদের মোল্লাকে দুই সহযোগী জল্লাদ দুদিক দিয়ে ধরে এবং পেছন থেকে প্রধান জল্লাদ শাজাহান তাঁকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে আসেন।
মঞ্চে তোলার আগে কাদের মোল্লা কয়েকবার সুপার সাহেব কোথায় বলে জেল সুপারকে ডেকে খুঁজতে থাকেন। পরে জেল সুপার এই তো আমি আছি বললে কাদের মোল্লা শান্ত হন। যখন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয় তখনও তিনি কোন প্রকার জোর করেননি। তিনি নিজেই ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। এর আগে মঞ্চের পাশে কর্পুর, গোলাপজলসহ কাফনের কাপড়, কফিন প্রস্তুত রাখা হয়।
৯টা ৫৭ মিনিটে তাঁকে ধরে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়। এ সময় তাঁর পা বাঁধার জন্য দুই পা এক করতে চাইলেও তা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন জেল সুপার কাদের মোল্লাকে পা দুটো এক করতে বললে তিনি তা এক করেন। তখন কাদের মোল্লা হঠাৎ করে বলে ওঠেন সুপার সাহেব আমার একটা বক্তব্য আছে বলে। ততক্ষণে ফাঁসি কার্যকরের সময় হয়ে যায় বিধায় তা শোনা সম্ভব হয় না। ঠিক ১০টা ১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকরের পর ১৭ মিনিট ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধা লাশের ময়নাতদন্ত করে ফাঁসি কার্যকরের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হন। এর পর রাত ১১টা ১৪ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পক্ষে ডেপুটি জেলার আশরাফ ও র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির সহায়তায় কাদের মোল্লার লাশবাহী গাড়িটি তাঁর গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরে পৌঁছে দেয়া হয়।
মেনন-ইনুসহ ১০ জনকে নৌকা প্রতীক দিতে সিইসিকে শেখ হাসিনার চিঠি
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জোটের শরিকরাও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতীক বরাদ্দ পেলেন। জাতীয় পার্টি নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আওয়ামী লীগের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও তরিকত ফেডারেশনও এবার নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়বেন।
বিরোধী দলের অনড় অবস্থান এবং জাতীয় পার্টির প্রধানের নানা নাটকীয়তার মধ্যেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে জোটভুক্ত তিন দলকে নৌকা প্রতীক দিলো আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি শুক্রবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পৌঁছানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় উপসম্পাদক এ্যাডভোকেট এ বি এম রিয়াজুল কবির কাওছার ওই চিঠিটি নির্বাচন কমিশন সচিবের কাছে পৌঁছে দেন। ওই চিঠিতে আওয়ামী লীগের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থীদের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উল্লেখ্য, শুক্রবার বিকেল ৫টায় মনোনয়ন প্রত্যাহারের সুযোগ শেষ হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের উপসচিব ফরহাদ আহমেদ খান জানান, যারা প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেবেন তাঁদের বাদ দিয়ে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা এখন প্রকাশ করা হবে। কোন আসনে একক প্রার্থী থাকলে তাঁদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। আজ শনিবার দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে এবার প্রার্থী হয়েছেন চার জন। রাজশাহী-২ আসনে ফজলে হোসেন বাদশা, নড়াইল-২ আসনে শেখ হাফিজুর রহমান, সাতক্ষীরা-১ আসনে মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এবং ঢাকা-৮ আসনে দলের সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আর জাসদের হয়ে সভাপতি হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২ আসনে, জায়েদুল কবির নরসিংদী-২ আসনে, শিরীন আকতার ফেনী-১ আসনে এবং মঈনুদ্দিন খান বাদল চট্টগ্রাম-৮ আসনে লড়বেন।
আর তরিকত ফেডারেশনের লায়ন এম এ আউয়াল লক্ষ্মীপুর-১ ও নজিবুল বশার মাইজভাণ্ডারী চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী রয়েছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে দলের জন্য সংরক্ষিত প্রতীক দলীয় প্রার্থীরা বরাদ্দ পাবে। তবে জোটভুক্ত হলে [আরপিও ২০[১] দলীয় সভাপতির অনুমতি লাগবে।
শেখ হাসিনার বার্তাবাহক রিয়াজুল কবির কাওছার সাংবাদিকদের জানান, মহাজোটের আসন ভাগাভাগির মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৪২টি আসনে, জাতীয় পার্টি (এ) ৪৬ আসনে, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ৪টি করে আসনে এবং তরিকত ফেডারেশন ২টি আসনসহ মোট ২৯৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বাকি দুটি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। জানা গেছে, ফাঁকা থাকা দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি)।
আত্মঘাতী বোমা হামলা কবিরা গুনাহ, ওরা জাহান্নামে যাবে ॥ সৌদি মুফতি
সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আল শেখ আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের ‘অপরাধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তারা জাহান্নামে যাবে। দেশটির দৈনিক আল-হায়াত এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
আল-হায়াত জানিয়েছে, শেখ আব্দুল আজিজ কিছু দিন আগে রিয়াদে এক বক্তৃতায় বলেন, আত্মঘাতী বোমা হামলা ‘কবিরা গুনাহ’ এবং হামলাকারীরা তাদের এ কর্মের দরুন দ্রুত জাহান্নামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা মানসিকভাবে বিভ্রান্ত অভিহিত করে শেখ বলেন, তারা নিজেদের এবং সমাজকে ধ্বংসের কাজে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ আব্দুল আজিজ সন্ত্রাসকে অনৈসলামিক আখ্যা দেন এবং সাধারণ মানুষকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। বলেন, এমন ধরনের হামলা কোনভাবেই ইসলাম সমর্থন করে না।
ডিসেম্বরের ৫ তারিখে আত্মঘাতী কার বোমা হামলার প্রাথমিক তদন্তের পর শেখের সাম্প্রতিক এ মন্তব্য আসল। ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাঙ্গণে ওই বোমা হামলায় যারা নিহত হন তাদের অধিকাংশই ছিলেন সৌদি নাগরিক। হামলায় ৫৬ জন নিহত হয়েছিল।
সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের জিহাদী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত ‘আল-কায়েদা ইন দ্য এ্যারাবিয়ান পেনিনসিউলা’ (একিউএপি) হামলার দায় স্বীকার করে।
শেখ ও ধর্মীয় অন্য নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মঙ্গলবার আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট এক জিহাদীকে সৌদি আরবের একটি আদালত ১৬ বছর কারাদ- প্রদান করেন। সূত্র: ডন।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকেই উস্কে দিচ্ছেন খালেদা জিয়া
১৪ দলের বৈঠকে নাসিম
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে স্বাধীনতা পক্ষের শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ১৪ দল। শুক্রবার ধানম-ির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত কেন্দ্রীয় ১৪ দলের বৈঠকে জোটের পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানান আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম।
এরশাদকে সরকার আটক করেছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এ ধরনের গ্রেফতারের কোন ঘটনা ঘটেনি। তিনি অসুস্থ বোধ করায় তাঁকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান হিসেবে সিএমএইচে চিকিৎসা নিতেই পারেন তিনি। তাছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশাসন তাঁকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে যেতেই পারে।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, খালেদা জিয়া সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছেন। একাত্তরের ঘাতকদের জ্বালাও-পোড়াও করতে প্রকাশ্যে মদদ দিচ্ছেন তিনি। একাত্তরের ঘাতকদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার একাত্তরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক রায় কার্যকর হয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুখ দিয়ে এ ব্যাপারে একটি কথাও নেই, একটি বক্তব্য নেই। বরং তিনি (খালেদা জিয়া) যে কথাগুলো বলেছেন এতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকেই উসকে দেয়া হয়েছে।
নাসিম বলেন, আমরা কিসের জন্য, কার সঙ্গে সমঝোতা করব? যারা একাত্তরের ঘাতকদের সঙ্গে সমঝোতা করে, সারাদেশে সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে- তাদের সঙ্গে কোন সমঝোতা নেই।
বৈঠকে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং জোটবদ্ধ নির্বাচন নিয়ে জোটের নেতারা আলোচনা করেন। বৈঠকের শুরুতেই কুখ্যাত কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করায় সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে জোটের নেতারা বলেন, আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতির কলঙ্ক মোচন শুরু হলো। এর মধ্য দিয়ে জনগণ আশ্বস্ত হলো বাকি রায়গুলোও যথাসময়ে কার্যকর করা হবে।
মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, কেন্দ্রীয় নেতা সুজিত রায় নন্দী, একেএম এনামুল হক শামীম, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান ও ন্যাপের ইসমাইল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
বিজয়ের মাস
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বিয়াল্লিশ বছর আগের কথা। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিয়াজি তখনও গোঁ ধরে বসে আছে, কিন্তু বাকি প্রায় সবারই হৃৎকম্প উঠে গেছে। ঢাকা বিজয়ে প্রচণ্ড হামলা রাজধানীর চারদিকে। ১৩ ডিসেম্বর রাত থেকে ১৪ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে মিত্রবাহিনীর কামান অবিরাম গোলা ছুড়ে চলল। নিয়াজিসহ পাকি-হানাদারদের হৃৎকম্প তখন তুঙ্গে। পরাজয় নিশ্চিত বুঝে রণেভঙ্গ দিয়ে পাকি-গবর্নর মালিকের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে আশ্রয় নেয় রেডক্রসে।
মালিক ও তার গোটা ‘পূর্ব পাকিস্তান সরকারের’ এই সিদ্ধান্তের পর নিয়াজির অবস্থা আরও কাহিল হলো। জীবন বাঁচাতে আত্মসর্পণের পথ খুঁজছে পরাজিত পাকি-হায়েনার দল। পাকি-জেনারেল নিয়াজি বারংবার নিরাপদ আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের সেনাপ্রধান মানেকশ’র সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল। আত্মসমর্পণের পর হামলা নয়, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছিল জেনারেল নিয়াজিসহ পাকি-জেনারেলরা।
মিত্রবাহিনীর কামানের গোলা গিয়ে পড়ল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেও। সে গোলার আওয়াজে গোটা শহর কাঁপল। ঢাকার সবাই বুঝল, আর রক্ষা নেই। গবর্নর মালিক সেদিন সকালেই ‘সমগ্র পরিস্থিতি’ বিবেচনার জন্য গবর্নর হাউসে মন্ত্রিসভার এক জরুরী বৈঠক ডাকলেন। ওই বৈঠক বসানোর ব্যাপারেও রাও ফরমান আলী এবং চীফ সেক্রেটারি মুজাফফর হোসেনের হাত ছিল। মন্ত্রিসভার বৈঠক বসল বেলা ১১টা নাগাদ। একটি পাকিস্তানী ওয়ারলেস ম্যানেজ করে মিত্রবাহিনীও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে গেল এই বৈঠকের খবরটা।
সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ চলে গেল ভারতীয় বিমান বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় হেড কোয়ার্টারে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই একঝাঁক ভারতীয় জঙ্গী বিমান গবর্নর হাউসের ওপর একেবারে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে রকেট ছুড়ল। গোটা পাঁচেক গিয়ে পড়ল গবর্নর হাউসের ছাদের ওপর। মালিক ও তার মন্ত্রীরা ভয়ে প্রায় কেঁদে উঠল। চীফ সেক্রেটারি, আইজি পুলিশসহ বড় বড় অফিসারও মিটিংয়ে উপস্থিত ছিল। তারাও ভয়ে যে যেমনি পারল পালাল।
বিমান হানা শেষ হওয়ার পর মালিক সাহেব তার পাকিস্তানী মিত্রদের সঙ্গে আবার বসল। তার পর আর পাঁচ মিনিটও লাগল না তাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। তারা সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিল। পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তারা সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির প্রতিনিধি রেনডকে জানাল এবং তাঁর কাছে আশ্রয় চাইল। রেনড তখন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলকে (বর্তমানে রূপসী বাংলা হোটেল) রেডক্রসের অধীনে ‘নিরাপদ এলাকা’ করে নিয়েছেন। বহু বিদেশী এবং পশ্চিম পাকিস্তানী আশ্রয় নিয়েছিল ওই হোটেলে।
একাত্তরের এদিন মালিক পদত্যাগ করে সদলবলে সেখানে আশ্রয় নিল। রেনডের এলাকায় মালিক ও তার দলকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে, খবর পৌঁছল জেনেভায়। সে বার্তায় বলা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সর্বোচ্চ কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছে এবং রেডক্রস আন্তর্জাতিক অঞ্চলে আশ্রয় চেয়েছে। জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী তাদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারকে যেন অবিলম্বে সব ঘটনা জানানো হয়। খবরটা যেন ভারতীয় সামরিক বাহিনীকেও জানানো হয়।
মালিক ও তার গোটা ‘পূর্ব পাকিস্তান সরকারের’ এই সিদ্ধান্তের পর নিয়াজির অবস্থা আরও কাহিল হলো। ঢাকার ওপর তখন প্রচ- আক্রমণ চলছে। প্রধান লক্ষ্য কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট। নিয়াজি তখনও মার্কিনীদের ভরসায় মুখে বলছে, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিরাপদ আত্মসমর্পণের জন্য মরিয়া। মার্কিন সপ্তম নৌবহর যে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে এ খবর চার-পাঁচদিন আগে থেকেই জানা ছিল। গোটা দুনিয়ায় তখন সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আগমন নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনা চলছে।
মার্কিন সরকার যদিও ঘোষণা করল যে, কিছু আমেরিকান নাগরিক অবরুদ্ধ, বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করল না। সবার মনে তখন প্রশ্ন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন কী ইয়াহিয়াকে রক্ষার জন্য মার্কিন নৌবহরকে যুদ্ধের মাঠে নামাবেন? ঠিক কি উদ্দেশ্যে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে এসেছিল এবং কেনইবা তারা কিছু না করে ( বা করতে না পারে) ফিরে গেল সে রহস্যের এখনও সম্পূর্ণ কিনারা হয়নি।
ওদিকে মিত্রবাহিনী তখন প্রচ-ভাবে ঢাকার সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তখনও তারা ঠিক জানে না যে, ঢাকার ভেতরের অবস্থাটা কী। পাকিবাহিনী কিভাবে ঢাকার লড়াইয়ে লড়তে চায় এবং ঢাকায় তাদের শক্তিই বা কতটা, সে খবর মিত্রবাহিনী জানে না। নানাভাবে আসল খবরটা কিছুতেই পাওয়া গেল না। যা পাওয়া গেল সব ভুল। মিত্রবাহিনী মনে করল, ঢাকার ভেতরে লড়াই করার জন্য যদি সৈন্যদের এগিয়ে দেয়া যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে যদি বিমান আক্রমণ চালানো হয়, তবে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষও মরবে।
মিত্রবাহিনী এটা কিছুতেই করতে চাইছিল না। তাই ওইদিনই তারা একদিকে যেমন ফের পাকিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের আবেদন জানাল এবং তেমনি অন্যদিকে ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের অনুরোধ করল, আপনারা শহর ছেড়ে চলে যান। উত্তর এবং পূর্ব- রাজধানীর দুদিকেই তখন আরও বহু মিত্রসেনা এসে উপস্থিত। চাঁদপুরেও আর একটা বাহিনী তৈরি হচ্ছে নদীপথে অগ্রসর হওয়ার জন্য।
জীবনযুদ্ধে পরাস্ত মুক্তিযোদ্ধা
একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম আবদুস সাত্তার (৭৫)। প্রতিদিন জীবনযুদ্ধে পরাস্ত হচ্ছে তিনি। অভাব-অনটনের কারণে নিজের চিকিৎসা সেবাটুকু নিতে পারছেন না। এই অবস্থায় মৃত্যুই যেন তাঁর কামনা।
বাউফলের ধুলিয়া ইউনিয়নের গুছরাকাঠী গ্রামে তাঁর বাড়ি। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ৯নং সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেছেন তিনি। পটুয়াখালী জেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল বারেক ছিলেন তার দলনেতা। মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার পটুয়াখালী জেলার আমতলী, নাপ্তেরহাট, কালিশুরী, সোনাবাটিসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এই অপরাধে পাক বাহিনী ওই সময় তাঁর বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। স্বাধীনতা অর্জনের পর সেনাবাহিনীতে চাকরি নেন আবদুস সাত্তার। কিছুদিন চাকরি করার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে বাড়ি চলে আসেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তারের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, তিনি শয্যাশায়ী। রোগাক্রান্ত শরীর। শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছেন। জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরে থাকেন তিনি। কাঠের চৌকিতে বিছানা পেতে একটি ছেঁড়া কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে আছেন। চোখে মুখে তাঁর বিষন্নতার ছাপ। কেমন আছেন, জানতে চাইলে, মাথা কাত করে বললেন, ভাল। নিজের চোখের সামনে তাঁর এ করুণ পরিণতি দেখে একটওু বিশ্বাস করার সুযোগ নেই যে, তিনি ভাল আছেন। ২ ছেলে ১ মেয়ে তাঁর। বড় ছেলে সোহরাব হোসেন, ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। আর একটি গার্মেন্টসে চাকরি করছেন মেয়ে কানিজ ফাতেমা। ৫ বছর বয়সী সোহেল বাবা-মায়ের সঙ্গে আছেন। মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তারের স্ত্রী নুরজাহান বলেন, একবেলা খেলে দু’বেলাই উপোস থাকতে হয়। তার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ২ হাজার টাকার সম্মানী ভাতা দিয়ে সংসার চলে না। ছেলেটির কোথাও একটি চাকরি হলে অভাব কিছুটা দূর হতো। এই বিজয়ের মাসে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তারের দিকে কেউ মমতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, এমন প্রত্যাশা করেছেন তিনি। -কামরুজ্জামান বাচ্চু, বাউফল থেকে।