মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৪ জানুয়ারী ২০১৩, ১ মাঘ ১৪১৯
আখেরি মোনাজাত
বিশ্ব এজতেমার প্রথম পর্ব শেষ
আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত তুরাগ তীর
ফিরোজ মান্না/ মোস্তাফিজুর রহমান টিটু/নূরুল ইসলাম ॥ পরকালের সুখ-শান্তি লাভে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আল্লাহর দরবারে হাত তুলে ‘আমিন আমিন ছুম্মাআমিন’ আর কান্নার মধ্য দিয়ে নাজাত চাইলেন। দীর্ঘ ১৭ মিনিট আখেরী মোনাজাতে তুরাগ তীরে এমনই এক বিনম্র পরিবেশ বিরাজ করে। অবনত মাথায় যে যেখানে যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থায় আল্লাহর দিদার লাভে হাত তুলে ধ্যানমগ্ন হন। মোনাজাতের মধ্য দিয়ে মুসল্লিরা নিজেদের আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেন। এবার আখেরী মোনাজাতে ৮৭ দেশের প্রায় ১২ হাজার বিদেশীসহ লাখ লাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব এজতেমা শুরু হবে ১৮ জানুয়ারি। চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্বের এজতেমা শেষ হওয়ার পর আবার এক বছর পরে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্ব এজতেমা।
প্রথম পর্বের মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়েছে। জীবনের সব পাপ-অন্যায় থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে মোনাজাতে অংশ নেন মুসল্লিরা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে ও বিভিন্ন যানবাহনে ধর্মপ্রাণ মানুষ এজতেমাস্থলে রবিবার ভোর থেকে আসতে শুরু করেন। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনার মধ্য দিয়ে তবলীগ জামাতের বিশ্ব এজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে।
ভারতের বুজুর্গ মাওলানা জোবায়রুল হাসান মোনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি দুপুর ১টা থেকে মোনাজাত শুরু করেন এবং তা চলে ১টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত। মোনাজাত শুরু হতেই পুরো এলাকায় নেমে আসে গভীর নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে ‘আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন।’ অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার (১১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছিল বিশ্ব এজতেমার প্রথম পর্ব।
রবিবার মোনাজাতের আগে চলে হেদায়াতি বয়ান। হেদায়াতি বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সা’দ আহমেদ। বয়ানে মাওলানা সা’দ বলেন, নামাজ হলো সবচেয়ে উঁচু আমল। নামাজ ছাড়া ইসলাম কল্পনা করা যায় না। আল্লাহর ভা-ার থেকে কিছু নেয়ার সবচেয়ে বড় উপায় হলো নামাজ। কাফের নামাজ পড়বে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মুসলমান নামাজ পড়বেন না, এটা চিন্তা করা যায় না। টাকা পয়সা দিয়ে নিশ্চিতভাবে দুনিয়ার কোন সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু আল্লাহ্র আমল সব সমস্যা সমাধান হবে এটা নিশ্চিত। ইসলামে নামাজের গুরুত্ব মানুষের শরীরে মাথার শামিল। নামাজ মানুষকে সকল হারাম কাজ করা থেকে বিরত রাখে। নামাজের পর দোয়া কবুল হয়। হেদায়াতি বয়ানের আগে রবিবার বাদ ফজর বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা জমির উদ্দিন শেখ। বয়ানে তিনি বলেন, মসজিদে ও ঘরে দ্বীনি আমলের তালিম আনতে হবে। একাজে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টা, কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা দ্বীনের দাওয়াতির মেহনত করতে হবে। দাওয়াতে মেহনতের কাজে হেঁটে চললে আল্লাহর গোস্সা কমে। রাতের ইবাদতের কথা তুলে ধরে বলেন, আল্লাহর কাছে হাত উঠিয়ে কান্নাকাটি করলে আল্লাহ ফরিয়াদকারীকে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা পান।
আখেরী মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার ভোর থেকেই টঙ্গীর এজতেমা অভিমুখে শুরু হয় মানুষের ঢল। টঙ্গীর পথে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোটর চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মোনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি হেঁটেই এজতেমাস্থলে পৌঁছেন। সকাল ১০টার আগেই এজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা,অলি-গলিতে অবস্থান নেন। এজতেমাস্থলে পোঁছুতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন শীট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস- দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষ আর মানুষ। সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরু হবে সেই কাক্সিক্ষত আখেরী মোনাজাত। এজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। আখেরী মোনাজাতের জন্য রবিবার আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।
বিশেষ ব্যবস্থায় মোনাজাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ॥ রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান বঙ্গভবন থেকে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকেই টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্বের মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব এজতেমার আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন।
গণভবন সূত্র জানায়, মোনাজাতে অংশ নেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও শামিল হন। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী সাহারা খাতুন, রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক, বেবী মওদুদ এমপি, লুৎফুন নাহার লাইলী এমপি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জনগণের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে শেখ হাসিনা গণভবন থেকেই আখেরী মোনাজাতে শামিল হন।
বিরোধীদলীয় নেতার মোনাজাতে অংশ গ্রহণ ॥ টঙ্গীর এটলাস (হোন্ডা) কারখানার ছাদে বিশেষভাবে তৈরি মঞ্চে বসে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সেলিমা রহমান, মির্জা আব্বাস, অধ্যাপক এমএ মান্নান, আমানউল্লাহ আমান, হাসান উদ্দিন সরকার, একেএম ফজলুল হক মিলন আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন। টঙ্গীর টেশিস মাঠের পুলিশ কন্টোলরুমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও প্রতিমন্ত্রী সামছুল হক টুকু, আমির হোসেন আমু, আকম মোজাম্মেল হক, সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেল, আজমত উল্লাহ খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুসহ তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক সহকর্মীরা আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার আব্দুল বাতেন।
টেলিভিশন-মোবাইল ও ওয়্যারলেস সেটে মোনাজাত ॥ এজতেমা মাঠে না এসেও মোনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য মানুষ। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মাঠ, নলজানি ওয়্যারলেস মাঠ, ভুরুলিয়া ওয়াপদা মাঠ, কালিয়াকৈর উপজেলার রতনপুর, আন্দারমানিক, সফিপুর বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ওয়্যারলেস সেটে, মোবাইল ফোনে ও টিভি চ্যানেলে মোনাজাত প্রচার করা হয়। এসব স্থানে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। আবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করার কারণে অনেকে বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন।
এজতেমায় ভারতের নাগরিকসহ ১৩ মুসল্লির মৃত্যু ॥ গত দু’দিনে ৯ জন মুসল্লিসহ এবারের প্রথম দফায় ১৩ জন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেনÑ ভারতের কলকাতার ২৪ পরগনার কাতালবাজার রোড এলাকার রবিয়াল হকের ছেলে রফিক উদ্দিন (৫০), সিরাজগঞ্জের বেলকুচি এলাকার জালাল মোল্লা (৬৫), নরসিংদীর আলগীকান্দাপাড়া এলাকার চাঁন মিয়া (৬০), রংপুর সদরের জলফর এলাকার খলিলুর রহমান (৮০), ফরিদপুরের বোয়ালমারি ময়োন্দিয়া এলাকার আলাউদ্দিন শেখ (৪৬), যশোরের মনিরামপুর থানার তেতুলিয়া এলাকার সৈয়দ আলী খান (৬০), চাঁদপুর সদরের দাসদি এলাকার আবুল খায়ের পাটোয়ারী (৪০), যশোরের কেশবপুর রাজনগর এলাকার আনসার আলী মিস্ত্রি (৬৪)। এর আগে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার মৃত্যু হয়েছে আরও চার জনের। তাঁরা হলেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানার কয়রাডাঙ্গা এলাকার ফজলুর রহমান মোল্লা (৬৫), চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ঘরদুয়ারা এলাকার আ. মোতালেব (৬০), কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার পষা এলাকার আব্দুল হামিদ (৭৫), নরসিংদীর রায়পুরা থানার বড়চর এলাকার মোঃ সামছুল হক (৬০) ও শেরপুরের তারাকান্দি গ্রামের ওস্তর আলী ওরফে তারা মিয়া (৫০)। এদের মধ্যে ভারতের নাগরিক রফিক উদ্দিনের লাশ রবিবার ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ॥ গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহনওয়াজ দিলরুবা খান জানান, এজতেমা এলাকায় ১২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। তারা এজতেমাস্থলের আশপাশের বিভিন্ন খাবার দোকানে অভিযান চালিয়ে ৪২টি মামলা ও ১ লাখ ৮৯ হাজার ১শ’ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।
টঙ্গী হাসপাতালে চিকিৎসা ॥ টঙ্গী হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে গত ১০ জানুয়ারি থেকে ১৩ জানুয়ারি (শুক্রবার) সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগ জনিত ২৫ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং ৮৪ জনকে টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন, গাজীপুরের সিভিল সার্জন সৈয়দ হাবিব উল্লাহ। এছাড়া আশপাশের বিভিন্ন ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে আরও কয়েক হাজার মুসল্লিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
মহিলাদের অংশগ্রহণ ॥ এদিকে বিশ্ব এজতেমার আখেরী মোনাজাতে আগের তুলনায় মহিলাদের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মহিলাদের মাইলের পর মাইল হেঁটে টঙ্গী পৌঁছে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারের সব পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় হাজার হাজার মহিলা শ্রমিক মোনাজাতে যোগ দেন।
ফিরতি যাত্রায় বিড়ম্বনা ॥ আখেরী মোনাজাত শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ফিরতে শুরু করলে সর্বত্র মহাজটের সৃষ্টি হয়। টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশনে ফিরতি যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমাণ ট্রেনগুলোতে উঠতে মানুষের জীবনবাজির লড়াই ছিল উদ্বেগজনক। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে ও দরজা-জানালায় ঝুলে শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মানুষের উপচেপড়া ভিড়ে ট্রেন ঢাকা পড়ে যায়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ফিরতি মুসল্লিদের বিড়ম্বনা ও কষ্টের সীমা ছিল না। ৪/৫ দিন ধরে টঙ্গীতে জমায়েত হওয়া মুসল্লিরা জোহরের নামাজের পর একযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে চাইলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। হাজার হাজার বৃদ্ধ শিশু কিশোর ও মহিলা মাইলের পর মাইল ঁেহটে মোনাজাতে শরিক হন এবং একইভাবে ফেরেন।
৪শ’ বিদেশী লাপাত্তা
এরা নাইজিরিয়া ও ঘানার নাগরিক
এ্যারাইভ্যাল ভিসায় ঢাকায় ঢুকেই
আজাদ সুলায়মান ॥ আগমনী ভিসায় ঢাকায় আসার পর প্রায় ৪শ’ বিদেশী নাগরিক লাপাত্তা হয়ে গেছে। পুলিশ তাদের কোন হদিস পাচ্ছে না। পুলিশের ধারণাÑ এসব বিদেশী নাগরিক রাজধানীতেই ঘাপটি মেরে আছে এবং নানা ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। এরা সবাই আফ্রিকার ঘানা ও নাইজিরিয়ার নাগরিক। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ এদের ব্যাপারে জোর তদন্তে নেমেছে। এখন পর্যন্ত তাদের সন্ধান না পেলেও রাজধানীর উত্তরা এলাকায় বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাগরিক বসবাস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে পুলিশ।
স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি সূত্র জানায়, গত এক বছরে আগমনী ভিসায় প্রায় চার হাজার বিদেশী দেশে প্রবেশ করেছে। তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকার ঘানা ও নাইজিরিয়ার। এসব নাগরিক সরাসরি বিমানবন্দরে এসে আগমনী ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। বাংলাদেশের কোন ভিসা নীতিমালা না থাকায় তাদের বিনা কারণে প্রত্যাখ্যানও করা যায় না। যাদের নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকেÑ কেবল তাদেরই প্রত্যাখ্যান করা হয়। গত এক বছরে এমন প্রায় ২৫ জনকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
সূত্রমতে, চার হাজার আফ্রিকান ত্রিশ দিনের আগমনী ঢাকায় এলেও তাদের বেশিরভাগই পরে পর্যায়ক্রমে পাসপোর্ট অধিদফতর থেকে ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে। ব্যবসায়িক ও লেখাপড়ার জন্য যারা থাকার প্রয়োজন উল্লেখ করে তাদের বিশেষ বিবেচনায় নেয় পাসপোর্ট অধিদফতর। এদের মধ্যে ফিরে গেছে প্রায় তিন হাজার। ছয় শ’ নাগরিক ঢাকাতেই বৈধভাবে অবস্থান করছে। কিন্তু এখনও ৪শ’ নাগরিকের কোন হদিস মিলছে না। এ ব্যাপারে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ তদন্তে নেমেছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, হারিয়ে যাওয়া এসব নাগরিক ঘানা ও নাইজিরিয়া থেকে আগত। তারা ট্যুরিস্ট ভিসায় দেশে প্রবেশ করলেও পরে আর ভিসার মেয়াদও বাড়ায়নি। সরকারের কোন সংস্থাকেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেনি। এদের গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ার পর পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ তদন্তে নামে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের খোঁজে গোয়েন্দারা প্রায়ই হানা দেয়।
কোথায় গেল এসব আফ্রিকান জানতে চাইলে স্পেশাল ব্রাঞ্চের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেনÑ এসব নাগরিক সবাই কৃষ্ণাঙ্গ। উত্তরা, মোল্লারটেক, আশকোনা ও নিকুঞ্জ এলাকায় বেশ কিছু আফ্রিকান নাগরিকের সন্ধান মিলেছে। তবে তারা ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় শনাক্ত করতে জটিলতা দেখা দেয়। এতে ধারণা করা হচ্ছে এরা বিশেষ উদ্দেশ্যেই গা-ঢাকা দিয়ে থাকছে। গত মে মাসে উত্তরা থানা পুলিশ একটি মেস থেকে কয়েকজনকে প্রতারণা ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেফতার করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, মাদক ব্যবসা, আদম পাচার, অসামাজিক কার্যকলাপ ও প্রতারণার মতো জঘন্য অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়েছে। এমনকি এলসি খুলে আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির আশ্বাসে বেশ ক’জন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীকেও প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। রাজধানীর মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও রয়েছে এদের যোগাযোগ। এ চক্রের নারী সদস্যরাও উত্তরার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের আস্তানায় গিয়ে অনেকে নিরীহ বাংলাদেশী প্রতারণার শিকার হচ্ছে।
এ ব্যাপারে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় এখন বিভিন্ন ক্লাবে বেশ ক’জন নাইজিরিয়া ও ঘানার খেলোয়াড় নিয়মিত খেলছে। খেলার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অনেক খেলোয়াড় নিজ দেশে ফেরেনি। তারা রাজধানীতেই আত্মগোপন করে রয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে ধরা পড়লে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হয়। এরপর গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঘানা ও নাইজিরিয়ার খেলোয়াড়দের আগমনী ভিসা প্রদান বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে বেশ ক’জন নাইজিরিয়ান ফুটবলারকে গত সেপ্টেম্বরে বিমানবন্দরে ভিসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
উত্তরা থানা পুলিশ জানায়, গত এক বছরে প্রায় ৩০ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র ১৮ জন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে। বাকিরা জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে।
পুলিশ জানায়, জুলাইয়ে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ তিন নাইজিরীয় তরুণী ও ৬ যুবককে গ্রেফতার করে। প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীকে প্রতারণার অভিযোগে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তারা স্বীকার করেÑ রাজধানীতে কম করে হলেও ৫শ’ নাইজিরিয়ান ও ঘানার নাগরিক সরকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে বসবাস করছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া
দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহে হুমকিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন
কাওসার রহমান ॥ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের আবহাওয়া। বিশ্বের চরম আবহাওয়ার বিপর্যয় এখন বাংলাদেশেও অনুভূত হচ্ছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র গরম অনুভবের পর চলতি শীত মৌসুমে তীব্র শীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোর এ আবহাওয়া বিপর্যয় মোকাবেলার সামর্থ্য থাকলেও, বাংলাদেশের সে সামর্থ্য নেই। ফলে আর্থিক বিচারে জলবায়ু পরিবর্তনের এ প্রভাবটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বল্পআয়ের দেশ বাংলাদেশ। চলমান এ শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি, স্বাস্থ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। এ তিন খাতের ক্ষতি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশকে।
চরম আবহাওয়া বিপর্যয়ে এ দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো কৃষির ক্ষতি। যা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত গ্রীষ্ম মৌসুমে একই সময়ে খরা এবং বন্যায় যেমন আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেমনি এবারের তীব্র শীতে দেশের সবচেয়ে বড় ফসল বোরো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন। ইতোমধ্যে দুই দফা শৈত্যপ্রবাহে দেশের প্রায় তিন লাখ হেক্টর এলাকার বীজতলা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল আলু এবং শীতকালীন সবজি। বাংলাদেশ ঠিক যে সময়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে চাল রফতানির চিন্তাভাবনা করছে, সেই সময়ে আবহাওয়ার বৈরী আচরণে ফসলের ক্ষতি দেশের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর। যা বাংলাদেশকে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধাপ পিছিয়ে দিতে পারে। অথচ বাংলাদেশ এজন্য দায়ী নয়। উন্নত দেশগুলোর ভোগবিলাসের কারণেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে আবহাওয়া এ কঠিনতম বৈরী আচরণ করছে।
এ প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত বলেন, ২০১২ সালে আমরা আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত বেশ কিছু ঘটনা বাংলাদেশে ঘটতে দেখেছি। এগুলো হলো গত বছর সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার সর্বোচ্চ উচ্চতা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা প্রভৃতি এলাকায় বন্যা। সারাদেশে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অর্ধেক বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবার ডিসেম্বরের ১৫ তারিখে আমি কদম ফুল ফুটতে দেখেছি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদশে আবহাওয়ার উল্টাপাল্টা আচরণ শুরু হয়েছে। এ অস্বাভাবিক আচরণের বিরূপ প্রভাব দেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’
ড. আইনুন নিশাত বলেন, এ ধরনের আরও দুই-তিনটি শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলে তা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত করবে। ইতোমধ্যে গত দুই দফা শৈত্যপ্রবাহে ফসল আবাদের এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা ৫-৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে গেছে। এতে বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে আলুসহ শীতের সবজি। তবে এই শীতে গম ভাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। আগামী মার্চ-এপ্রিলে যে পরিমাণ গরম পড়ার কথা, তা না পড়লে ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’
বাংলাদেশে এবার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তাপমাত্রা তিন ডিগ্রীতে নেমে এসেছে। এবারের বৈশিষ্ট্য হলো দেশের সব এলাকাতেই তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রীর নিচে নেমে গেছে। অতীতে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা এটাকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশে গত বছর তীব্র গরম অনুভূত হয়েছে। আবার গত বছর দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, হয়েছে তার মাত্র অর্ধেক। এ বছর আবার শীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আইনুন নিশাত বলেন, প্রক্রিয়াটা ইন্ডিকেট করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটা ঘটছে। কারণ আগে সাইবেরিয়া থেকে যে বাতাসটা আসত তা অনেক ওপর দিয়ে আসত। এখন মাঝে মধ্যে নিচ দিয়ে চলে আসছে। বদলে যাচ্ছে বাতাসের গতিপথ। এটা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটছে।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবে শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কী হয় তা এখনই বলা মুশকিল।’
ঢাকার বাসিন্দাদের জন্যও এবারের শীত খানিকটা অপ্রত্যাশিত। ঢাকার মার্কেট ও ফুটপাথগুলোতে গরম জামা-কাপড় কেনার হিড়িক দেখেও সেটি বোঝা যায়। ঢাকায়ও এবারের শীতের তীব্রতা কম নয়। রাস্তা ছাড়াও বিভিন্ন অফিসে শীতের তীব্রতা বেশ অনুভূত হচ্ছে। দিনের একটি বড় সময় কুয়াশায় আছন্ন থাকে ঢাকার রাস্তা। ঢাকায় যেসব ছিন্নমূল মানুষের বসবাস তাদের জন্য এই শীতের তীব্রতা অনেক।
বাংলাদেশের বাসাবাড়ি ও অফিসগুলোতে গরম মোকাবেলার প্রস্তুতি থাকলেও শীতের জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়ায় অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে গরম মোকাবেলার জন্য এসি আছে, কিন্তু ঠা-ার জন্য কিছু নেই। গরম রাখার জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা যেমন হিটার তো ব্যবহার করা হয় না।
বাইরের দেশে এমন ঠা-ায় সবার অভ্যাস থাকে। এই দেশে সেটা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত বলেন, কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতে তাপমাত্রা মাইনাস ডিগ্রীর অনেক নিচে চলে গেছে। কিন্তু তাতে তাদের দেশের মানুষ ঠা-ায় কাবু হচ্ছে না। কারণ তাদের ঠা-া মোকাবেলার ব্যবস্থা আছে। তাদের ঘর, অফিস, গাড়ি, শপিং মল সব কিছুতে হিটারের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে ঠা-া মোকাবেলার প্রস্তুতি নেই। ফলে এবারের তীব্র ঠা-ায় মানুষ কাবু হয়ে গেছে। তাই আমাদের শীতের এই তীব্রতা মোকাবেলা করার জন্য অভিযোজন কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট স্থপতি রবিউল হোসেন বলেন, ঢাকা শহরের উচ্চবিত্তদের জন্য তৈরি কিছু ভবন ছাড়া বাকিগুলোতে শীত কিংবা গরম আবহাওয়ার মোকাবেলার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে গরমকে খানিকটা গুরুত্ব দেয়া হলেও, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে শীতকে মোটেও প্রাধান্য দেয়া হয় না।
তিনি বলেন, ‘এটা গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। শীতপ্রধান দেশে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, আমাদের এখানে তেমন হয় না। সিস্টেম আছে, কিন্তু আমরা সেটা অনেক কম করি। যেমন দুটি দেয়াল তৈরি করে তার মাঝে পাঁচ ইঞ্চি করে গ্যাপ দেয়া হয়। কিন্তু এটা আমরা সাধারণত করি না। কয়েকটি জায়গায় এটা করা হয়েছে, তবে এটা মনে হয় যেন বেশি বেশি করা হচ্ছে।’
একদিকে শীতের তীব্রতা অন্যদিকে লম্বা সময় ধরে এর স্থায়িত্বÑ এ দুয়ে মিলে এবারের শীত বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন ব্যতিক্রম, তেমনি ফসলের জন্য ক্ষতিকর। হাড়কাঁপানো শীতে মানুষের যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনি ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বোরো বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। আলুতে পচন ধরতে শুরু করেছে।
দেশের বেশিরভাগ বোরো চাষের এলাকায়ই ঘন কুয়াশা ও পাঁচ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা বিরাজ করছে। ফলে ওই অঞ্চলের মাঠে থাকা বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট হতে শুরু করেছে। এতে বোরোচাষীরা বেশ বিপাকে পড়েছেন।
কৃষক বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন। অনেকে জমির পাশে বসে থেকে ধানের ওই চারা গাছ থেকে কুয়াশার পানি সরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের এই আপ্রাণ চেষ্টা হলো বোরোর বীজতলাকে রক্ষা করা। কারণ বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে বোরো আবাদ ব্যাহত হবে। ফলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে গেলে বোরো আবাদ বিলম্বিত হবে। এতে খরচও বেড়ে যাবে। এমনিতেই ধানের খরচ কম। তার ওপর ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেচ খরচ বেড়ে গেছে। এতে বোরোর উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে কৃষককে লোকসান গুনতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য তিন লাখ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত কৃষক বীজতলায় ধানের চারা তৈরি করেন। শৈত্যপ্রবাহে চারা মারা যাওয়ায় অনেক এলাকার কৃষকই আগামী বোরো চাষ কীভাবে করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
আবহাওয়াবিদরা জানান, সাইবেরিয়া থেকে আসা হিমেল হাওয়া এবার আগের বছরগুলোর তুলনায় নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পশ্চিম দিক দিয়ে আসা ওই হিমশীতল বায়ুপ্রবাহ হিমালয়ের নিচের দিকে বাধা পেয়েছে। ফলে এটি ধীরে ধীরে ভারত ও বাংলাদেশের ওপরে বিস্তৃতি লাভ করে এবারের শৈত্যপ্রবাহটিকে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
শৈত্যপ্রবাহের কারণে কেবল বাংলাদেশেই নয়, ভারতের বিহার, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ শীত নেমেছে। শৈত্যপ্রবাহটি হিমালয় পর্বতমালা অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসায় এর তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তিন দিন ধরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদফতরের উপপরিচালক শাহ আলম বলেন, কয়েক বছর ধরেই শৈত্যপ্রবাহের সময়কাল ও তীব্রতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই শৈত্যপ্রবাহগুলো তীব্র ও স্থায়ী হচ্ছে। এ অঞ্চলে তাপমাত্রা কমার প্রধান উপাদান, সাইবেরিয়ান বায়ুপ্রবাহটি আগের চেয়ে নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে।
শৈত্যপ্রবাহগুলো নিচ দিয়ে ধীরে প্রবাহিত হওয়ার ধরন দেখে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলতি মাসের শেষের দিকে ও আগামী মাসে আরও দুই থেকে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে।
প্রায় একই কথা শোনা যাচ্ছে বিশ্বের আবহাওয়া বিশারদদের মুখেও। তাঁদের মতে, বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই এ মৌসুমে যে শীত দেখা গেছে, তা অতীত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ছাড়িয়ে গেছে এবার উষ্ণতার রেকর্ডও। ঠিক এ মুহূর্তে পৃথিবীর এক প্রান্তে পূর্ব রাশিয়ায় মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার শীতে মানুষের চলাফেরা যেমন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, তেমনই রেকর্ড ৪২ ডিগ্রীরও বেশি তাপমাত্রার উষ্ণতা আর দাবানলে অস্থির অস্ট্রেলিয়ার মানুষ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বিশ্বের চরম আবহাওয়া বিপর্যয় এখন প্রত্যক্ষ করছে পৃথিবীবাসী। আবহাওয়ার এই বৈরী আচরণ রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে তাঁদের। মধ্যপ্রাচ্যের অনাকাক্সিক্ষত ও পাকিস্তানের অসময়ের বন্যা, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপের শীত এবং অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের এ মুহূর্তে গরম কোনটাই ঠিক স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের বিশেষ কারণ হলো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার এই ‘তীব্রতা’ এখন একই সময় ঘটে চলেছে।
এ প্রসঙ্গে জেনেভায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ওমর বাদ্দার বলেছেন, ‘প্রতিবছরই আবহাওয়ার চরম আচরণ আমরা দেখতে পাই। কিন্তু প্রায় একই সময়ে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার তীব্রতম চিত্র অতীতে কখনই দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার চলমান তাপপ্রবাহ, যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ আকস্মিক বন্যা এবং সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে বন্যা ও তুষারপাতÑ চরম আবহাওয়া বিপর্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব ঘটনা চলতি সময়টাকে অনেক বড় করে তুলেছে।’
গত ৩০ বছরের মধ্যে এবার চীন তীব্রতম শীতকাল পার করছে। জিয়ানজিং প্রদেশে এক হাজার বাড়িঘর বরফের নিচে। মঙ্গোলিয়ায় এক লাখ ৮০ হাজার গবাদিপশু ঠা-ায় জমে মারা গেছে। পূর্ব রাশিয়ায় এবার শীত রীতিমতো নিষ্ঠুর। মাইনাস ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দিশেহারা মানুষ। কোথাও আবার গরমও চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। ব্রাজিলের তাপমাত্রা ৯৮ বছর পর রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশে এক আচমকা সর্বগ্রাসী ঝড়ের প্রভাবে ঘটল বৃষ্টি, তুষারপাত এবং একইসঙ্গে বন্যা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা সে দেশের গত বছরের গরমকালটিকে এ যাবৎকালের উষ্ণতম সময় হিসেবে রেকর্ড করেছেন।
যুক্তরাজ্যে গত বছরের হঠাৎ বন্যায় যারপরনাই অবাক হয়েছেন আবহাওয়া বিশারদরা। যুক্তরাজ্যের মানুষ ওয়ালপেপারে বন্যার যে চিত্র দেখে অভ্যস্ত, এবার তারা সেটা প্রত্যক্ষ করেছে নিজেদের জীবনেই। আবহাওয়ার ক্রুদ্ধ রূপ দেখছে এবার অস্ট্রেলিয়াবাসীও। দেশটিতে এ মুহূর্তে যে গরম পড়েছে, গত ৬৩ বছরের মধ্যে তা দেখা যায়নি। গত ৮ জানুয়ারির ১০৮ দশমিক ১ ডিগ্রী ফারেনহাইট (৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াস) তাপমাত্রার রেকর্ডটি ১৯১০ সালের পর পঞ্চমবারের মতো রেকর্ড করা হলো। গত সেপ্টেম্বরে অসময়ের এক ভয়ঙ্কর বন্যায় ভেসে গেল পাকিস্তান। এমনটি এর আগে হয়নি। অথচ অস্ট্রেলিয়ায় এর আগে দুটি বছর ছিল আর্দ্রতম বছর। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশনের ক্লাইমেট এ্যাডাপটেশন ফ্ল্যাগশিপের পরিচালক মার্ক স্ট্যাফর্ড স্মিথ জানান, ‘অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৫০ সালের পর থেকে প্রতি দশকেই উষ্ণতা বাড়ছে।’
দক্ষিণ আমেরিকার অবস্থাও একই। ১০৪-১০৮ ডিগ্রী ফারেনহাইটের রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রার অসহ্য দাবদাহে ব্রাজিলে দুই দিনেই মারা গেছে ৩২ জন। এমন তাপমাত্রা ৯৮ বছর পর রেকর্ড করা হলো। ব্রাজিলে পানির অভাবে অনেক বিদ্যুতকেন্দ্রে বিদ্যুত উৎপাদন কমে গেছে। দেশটিতে এ বছরের গ্রীষ্মকে প্রকৃতির শাস্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ বাদ্দার বলেন, ‘আবহাওয়ার এমন আচরণ যেমন তীব্র হচ্ছে, তেমনই তা ঘন ঘন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবলই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া নয়, বরং এটি তীব্র, অসহ্যকর ও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার ব্যাপারও।’
মধ্যপ্রাচ্যে জর্ডানে এবার দেখা গেল ভয়াবহ বন্যা। প্রচ- বৃষ্টিপাত, তুষার ও শিলাবৃষ্টি অভূতপূর্ব। সিরিয়া ও লেবাননে ভয়াবহ বন্যা দেখা গেছে। সেখানে ভেসে যায় অনেক সিরীয় নাগরিকের আশ্রয়শিবির। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে বন্যায় ভেসে যায় অনেক এলাকা।
আবহাওয়ার বৈরী আচরণের ব্যাপারে ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির আর্থ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক বেরি লিন বলেন, পুরো বিষয়টাতেই ধাক্কা লাগার মতো ব্যাপার হলো, উচ্চতর বায়ুম-লে তীব্র ও প্রলম্বিত শীত এখন নেই। আর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের আবহাওয়ার ওপর আটলান্টিক মহাসাগরের সহনীয় প্রভাবও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘তবে শীতের তীব্রতা অস্বাভাবিক। মনে হয়, আবহাওয়া এখন অনেক তীব্রতর হতে যাচ্ছে। অনেক চরম হতে যাচ্ছে।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি ও স্বাস্থ্যের। বাড়ছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। কৃষির ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব পড়ার কারণে আগামী দিনে কৃষি সবচেয়ে হুমকির মুখে। কৃষির উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এর প্রভাব পড়বে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ায়, মানুষের জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ায় মানুষ নিজের বসতভিটায় থাকতে পারছে না। তারা নিজ বসতভিটা ছেড়ে মাইগ্রেট করে শহরসহ অন্যান্য অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এতে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানে এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলেও মনে করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেছে। জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন ঘটছে। এসব ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু তহবিল করেছে। সেখান থেকে ব্যয় করা হচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বেশ কিছু প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার কৌশল, নীতিনির্ধারণসহ নানা কর্মসূচী নিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নও হচ্ছে সরকারী অর্থায়নে। এর বাইরে যারা এই ক্ষতির জন্য দায়ী সেই উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়েও আন্তর্জাতিকভাবে তৎপর রয়েছে সরকার।’
বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এদেশে একাধারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বিভিন্ন অঞ্চলে লবণাক্ততার সমস্যা দেখা দিয়েছে, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক বদলে যাচ্ছে, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও এখন বেশি। সব মানদ-েই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। আর জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে গেছে, বেড়ে গেছে লবণাক্ততা, মরুকরণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, সুপেয় পানির অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। ধ্বংস হচ্ছে উদ্ভিদ প্রজাতি, বিলুপ্তি ঘটছে পক্ষী প্রজাতির। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় জনপদের মানুষ। সাতক্ষীরা-খুলনার সুন্দরবন, ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় বা টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস, স্থায়ী জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি ও তীব্র বন্যার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় বন্যা ও লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। দিনে দিনে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষাবাদ, তেমনি তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি। বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাষীরা পাট চাষে বিমুখ হয়ে পড়েছেন। পাট চাষ কমে যাওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করেন। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় রেশমের মৌসুমে কোন গুটি না হওয়ায় উৎপাদন মার খেয়েছে। নওগাঁয় অপ্রতুল বৃষ্টিপাতের কারণে এ এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল বর্ষাকালীন মরিচের চাষ ঠিকমতো হয়নি। দেশের উত্তর-পূর্বাংশে পাহাড়ী অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ঢলের অনিয়মিত বন্যায় পাট, আখ, ধানের বীজতলা ও অন্যান্য নিচু জমির ফসল নষ্ট হয়। এছাড়া দেশে তাপ ও শৈত্যপ্রবাহের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গ্রীষ্মকালে রবিশস্যের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কখনও কখনও শীতকালের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় রবিশস্যের জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শৈত্যপ্রবাহের ফলে বোরো ধানসহ সরিষা, মসুর, ছোলা প্রভৃতি ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শৈত্যপ্রবাহের কুয়াশার কারণে গমসহ বিভিন্ন ফসলের পরাগায়ন ও বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান উদ্দিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সঙ্কট বাড়ছে। তাঁর মতে, তিনটি বিষয়ে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথমত, গড় তাপমাত্রা পরিবর্তন হয়েছে যে কোন মৌসুমের ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টিপাত আগের মতো হচ্ছে না। ধরন ও সময় বদলে গেছে। তৃতীয়ত, সমুদ্রের উপরিস্থলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় লঘু চাপ ও ঘূর্ণিআবহ তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সমুদ্রে মাছ শিকারে যাওয়া জেলেরা প্রায়সময়ই ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
উদ্বাস্তু সমস্যা প্রসঙ্গে ড. আহসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে যাচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবেলা একা দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য শক্তিশালী দূতিয়ালি করতে হবে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে কিছু পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা নিতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরের মূল্য নির্ধারণে দুর্নীতি গচ্চা যাবে ৫০ কোটি টাকা
পদ্মা সেতুর জন্য জাজিরায় অধিগ্রহণ করা ভূমির ওপর ঘরের মূল্য ১০ গুণ বেশি ধরে তালিকা ॥ দুই কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ
আবুল বাশার, শরীয়তপুর থেকে ॥ পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় চলছে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কাজ। অধিগ্রহণকৃত ভূমির ওপর স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের কাজ করছে শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগ। এ কাজে গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগ থেকে মূল্যতালিকা সংগ্রহ করে রবিবার সকালে নাওডোবা এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের মূল্য ১০ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি করে মূল্যতালিকা জমা দেয়া হয়েছে। শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে কয়েক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি নির্ধারণ করে তালিকা প্রস্তুত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের গচ্চা যাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে বাড়তি সুবিধার লোভ দেখিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। আবার যারা ঘুষ দিতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের ঘরের প্রকৃত মূল্যের চেয়েও কম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর গাইডবাঁধের জন্য জাজিরা উপজেলার নাওডোবা ও দিয়ারা নাওডোবা মৌজার ১৫৫ দশমিক ১৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট অধিগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হয়। অধিগ্রহণকৃত এলাকায় ৪৩০টি পরিবারের বসবাস। জেলা প্রশাসন ও সেতু বিভাগ গত বছর ১ নবেম্বর ভূমির ওপরে স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত করে। সে তালিকা অনুযায়ী স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসন গত ১৬ জুলাই শরীয়তপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দেন। গত ২০ ডিসেম্বর গণপূর্ত বিভাগ থেকে মূল্য তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন তালিকা যাচাইবাচাই করে অনুমোদনের জন্য সেতু বিভাগের কাছে পাঠাবে। গণপূর্ত বিভাগের প্রস্তুত করা এ মূল্য তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলী নুর, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান, কার্য সহকারী আবু তাহের খান ও নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরের মূল্যতালিকা প্রস্তুত করেন। উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামের বাড়ি প্রকল্প এলাকার পাশে জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর গ্রামে। এ সুবাদে ওই এলাকার মানুষ তাঁর চেনাজানা। এ কারণে তিনি মাঠ পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণ কাজের নেতৃত্ব দেন।
নাওডোবা মৌজার ৭৬১নং দাগের উপরে মোতালেব জমাদ্দার, তার পুত্র রাজা মিয়া ও সুরুজ মিয়ার ৩টি টিনের বসতঘর রয়েছে। ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থ এই ৩টি ঘরের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী মূল্য রয়েছে ৫ লাখ হতে ৮ লাখ টাকা। কিন্তু এই ৩টি ঘরের মূল্য নিধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪ টাকা। তাঁর বাড়ির পেছনে পদ্মা নদীর তীরে পরিত্যক্ত জায়গায় ২টি পাটকাঠির ঘর, ৩টি টিনের ছাপরা ঘর রয়েছে। ঘরগুলো বাঁশ দিয়ে নির্মিত। পরিত্যক্ত এ ঘরগুলোতে কেউ বসবাস করে না। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ঘরগুলোর দাম রয়েছে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা মাত্র। কিন্তু মূল্য তালিকায় মোতালেব জমাদ্দারের পুত্রবধূ জোসনা বেগমের নামে ঘরগুলো লেখা হয়েছে এবং ঘরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ লাখ ২৩ হাজার ৪৫৯ টাকা।
জানতে চাইলে জোসনা বেগম বলেন, ঘরের মূল্য কত হয়েছে জানি না। মনির ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আমার স্বামী যোগাযোগ করে মূল্য তালিকায় আমার নাম উঠিয়েছে। পাটখড়ির নির্মিত এমন ৫টি ঘর নির্মাণ করতে কত টাকা ব্যয় হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা লাগতে পারে।
এসব বিষয়ে মোতালেব জমাদ্দার, রাজা মিয়া ও সুরুজ মিয়া কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জমির হাওলাদার কান্দি গ্রামের ইব্রাহিম খান। তাঁর বাড়িতে ১২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থ ২টি টিনের ছাপরা ঘর রয়েছে। বাঁশ ও কাঠের অবকাঠামোর উপরে টিন দিয়ে ঘরগুলো নির্মিত হয়েছে যার আনুমানিক মূল্য ২ থেকে ৩ লাখ টাকা হতে পারে। তার একটিতে জেনারেটরের মাধ্যমে এলাকায় ৬০টি পরিবারের মধ্যে বিদ্যুত সরবরাহের ব্যবসা করেন। ঘরের মূল্য তালিকায় ইব্রাহিম খানের নামে ৩১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৫১ টাকা উঠেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইব্রাহিম খান বলেন, ৩৫০টি বাড়িতে জেনারেটরের সংযোগ আছে এমন তথ্য মনিরুল ইসলাম ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে লিখিয়েছি। সে কত টাকা বিল করেছে জানি না। একটু বেশি বিল করার কথা। কেন বেশি বিল করার কথা প্রশ্ন করলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
জৈনউদ্দিন মাদবর কান্দিগ্রামের আবদুল হালিম মাদবরের ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থ একটি টিনের ঘর রয়েছে। কাঠের অবকাঠামোর উপরে ঘরটি নির্মিত। মূল্যতালিকায় ঘরটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার ১২৯ টাকা। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ঘরটির মূল্য রয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার হতে ৩ লাখ টাকা। একই মাপের তার পাশের তোতা মাদবরের একটি ঘরের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৪১ হাজার ৯১৪ টাকা।
আবদুল হালিম মাদবরের পুত্র চঞ্চল মাদবর বলেন, মূল্যতালিকা প্রস্তুত করার সময় গণপূর্ত অধিদফতরের ইঞ্জিনিয়ার মনিরুল ইসলাম আমার কাছে ১ লাখ টাকা চেয়েছিল। আমরা গরিব মানুষ টাকা দিতে পারিনি। এ কারণে ঘরের মূল্য কম লিখেছে।
গণপূর্ত বিভাগ থেকে মূল্যতালিকা সংগ্রহ করে রবিবার সকালে নাওডোবা এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের মূল্য ১০ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি করে মূল্যতালিকা জমা দেয়া হয়েছে। পদ্মার তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় ওই এলাকার বেশির ভাগ ঘর পাটকাঠি, বাঁশ ও কাঠের অবকাঠামো ও টিন দিয়ে নির্মিত। ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী কোন ঘরের মূল্যই ৬ লাখ টাকার উপরে নেই। গাইড বাঁধের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করার পর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য অনেকে ফসলি জমি ও বাগানে ঘর নির্মাণ করেছে। সে সকল ঘরেরও মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প এলাকার পাশে আমার বাড়ি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা পরিচিত। তাদের অনুরোধে মূল্য সামান্য কিছু বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম করা হয়নি। কারও কাছ থেকে আর্থিক কোন সুবিধাও নেয়া হয়নি। পাটকাঠি ও বাঁশের নির্মিত ঘরের মূল্য লাখ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে কেন এমন প্রশ্ন করলে মনিরুল ইসলাম উত্তেজিত হয়ে এ প্রতিবেদককে গালিগালাজ করেন। এ বিষয়ে কোন সংবাদ পরিবেশন করা হলে এ প্রতিবেদককে দেখে নেয়ার হুমকি দেন।
শরীয়তপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন অনিয়ম করা হয়নি। আমাদের উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক রাম চন্দ্র দাস বলেন, মূল্য তালিকাটি জমা হওয়ার পরে আমাদের কাছে মনে হয়েছে নিয়মের কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে। এ কারণে তালিকাটি যাচাইবাছাই চলছে। যাচাইবাছাই শেষ করে অনুমোদনের জন্য সেতু বিভাগে পাঠানো হবে।
ডাক্তার হওয়ার আগেই ঝরে গেল জেরিন, এ কি হত্যাকা- না দুর্ঘটনা!
স্টাফ রিপোর্টার ॥ চিকিৎসক হয়ে ওঠা হলো না মীর জেরিনা আরাদিন জেরিনের। আর মানবসেবার মতো মহৎ কাজেও নিজেকে জড়াতে পারলেন না। অকালেই ঝরে পড়লেন। ছোট ভাইদের প্রতি কর্তব্যটুকুও পালনের সুযোগ পেলেন না। বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে রেললাইনে হাঁটতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল জেরিনের। তার মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্য ঘুরপাক খাচ্ছে। পুলিশ জেরিনের মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে বয়ফ্রেন্ড মহিউদ্দিন স্মরণকে গ্রেফতার করেছে। মাদকাসক্ত স্মরণ ধাক্কা দিয়ে জেরিনকে ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করতে পারে বলে দাবি করেছে পুলিশ।
জেরিনের পিতা মীর কায়কোবাদ বাবলু। মা মীর মেরী। ২ ভাইয়ের একমাত্র বোন জেরিন। সে সবার বড়। পুরো পরিবার কানাডা প্রবাসী। আপনজন বলতে বাংলাদেশে তার আছে একমাত্র খালু। তাও অনেকটাই দূরের। বড় সন্তান হিসেবে জেরিনকে কাছে পেতেই চেয়েছিলেন কানাডা প্রবাসী পিতামাতা। এজন্য জেরিনকে কানাডায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেরিন দেশ ভালবেসে দেশেই রয়ে যান। ডাক্তার হয়ে মানবসেবায় নিয়োজিত করতে চান। নেহায়ত যদি কোন অসুবিধা অনুভব হয় তখন কানাডায় যাবে বলে তার পিতামাতাকে জানায়।
জেরিনের এমন ইচ্ছায় পিতামাতা বাঁধা দেননি। কথা রাখেন তার পিতামাতা ও ভাইরা। তারা সবাই কানাডা চলে যান। আর জেরিন রয়ে যায় বাংলাদেশে। সে ভর্তি হয় রাজধানীর উত্তরার উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজে। প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছিল। কলেজের হোস্টেলেই বসবাস শুরু করে সে।
আর সমসাময়িক বয়স হওয়ার সূত্র ধরে পারিবারিকভাবেই পরিচয় হয় মহিউদ্দিন স্মরণের (২৫) সঙ্গে। মহিউদ্দিনের পিতা একজন উর্ধতন সরকারী কর্মকর্তা। স্মরণদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানায়। তারা রাজধানীর বিমানবন্দরের কাছেই দক্ষিণখান থানাধীন এলাকায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করে। লন্ডন থেকে এমবিএ শেষ করে বাংলাদেশে এসেছে বলে দাবি করেছে স্মরণ। দীর্ঘ দিনের পরিচয়ের সুবাদে স্মরণের সঙ্গে জেরিনের প্রেমের সম্পর্ক হয়। সেই সূত্র ধরেই শনিবার স্মরণ ও জেরিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে রেডিসনের পেছনে রেললাইন ধরে হাঁটছিলেন। হাঁটার এক পর্যায়ে জেরিন ট্রেনে কাঁটা পড়ে।
জেরিনকে প্রথমে স্মরণ উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু সেখানে জেরিনের অবস্থার অবনতি হয়। এমন পরিস্থিতিতে জেরিনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে চিকিৎসকরা। ডিএমসিতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেরিনের মৃত্যু হয়। জেরিনের মৃত্যু সম্পর্কে অসংলগ্ন তথ্য দিতে থাকলে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক তাপস স্মরণকে আটক করেন। পরে তাকে শাহবাগ পাঠানো হয়। রাতেই এ ব্যাপারে রেলওয়ে থানায় মামলা হয়। শাহবাগ থানা পুলিশ স্মরণকে রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এদিকে রাতেই জেরিনের খালু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে যোগাযোগ করেন। তবে জেরিনের খালু নিজের কোন পরিচয় দেননি। তাঁর নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেননি।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জনকণ্ঠকে জানান, শনিবার বিকেলে ওই জায়গায় বেড়াতে যায় তারা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘটে দুর্ঘটনা। স্মরণকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে এবং জিজ্ঞাসাবাদে স্মরণ মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। লন্ডনে এমবিএ পড়াকালীন স্মরণ নানা ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। ক্লাসে অনিয়মিত ছিল। এমন নানা কারণেই লন্ডনের ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্মরণকে বের করে দেয়। স্মরণ ইয়াবা ও হেরোইনে আসক্ত।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, জেরিনের মৃতদেহ যে অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, তাতে মনে হয় স্মরণ জেরিনকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের নিচে ফেলে দিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই জেরিনের খালুর মাধ্যমে কানাডায় জেরিনের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছানো হয়েছে।
এদিকে আটকের পর স্মরণ দাবি করেছে, জেরিনের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল দুই পরিবারের সম্মতিতে। তারা স্বামী-স্ত্রীর মতোই চলাফেরা করত। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে স্মরণ রেজিস্ট্রারে জেরিনকে স্ত্রী বলে উল্লেখ করে।
স্মরণের মা ঘটনার দিন একটি পত্রিকাকে জানান, স্মরণ কোন মতেই জেরিনকে হত্যা করতে পারে না। কারণ আমাদের দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আগামী মাসে জেরিনের বাবা-মা কানাডা থেকে এসে তাদের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি জানান, শুক্রবার রাতেও জেরিন তাঁর বাসায় আসে। এরপর রাতে তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দেয় স্মরণ।
বোরহানউদ্দিন থানায় ক্ষুব্ধ জনতার হামলা সংঘর্ষ, আহত ৩০
ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ দাফন করতে না দেয়ার জের
নিজস্ব সংবাদদাতা, ভোলা, ১৩ জানুয়ারি ॥ জেলার বোরহানউদ্দিন থানায় রবিবার সকালে এলাকাবাসী হামলা চালিয়েছে। এ সময় থানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ভাংচুর ও ওসির বিরুদ্ধে জুতা মিছিল করা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ এবং জনতার মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশ, সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ সময় পুলিশ ৪ জনকে আটক করেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক ছাত্রের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফনের জন্য প্রশাসনের অনুমতিপত্র ওসিকে দেয়ার পরও লাশ ফেরত না দেয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে নিহতের মা সামছুন নাহার অভিযোগ করে বলেছেন, থানার ওসি মাসুমকে (চলতি দায়িত্বে) টাকা না দেয়ায় লাশ দেয়া হয়নি। পুলিশ এখন নিরীহ মানুষকে থানায় হামলা, ভাংচুর মামলায় আটক করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানিয়েছে, শনিবার দুপুর ৩টার দিকে বোরহানউদ্দিন-কালিহাট সড়কের ছাগলা মাদ্রাসা এলাকায় দুর্ঘটনায় আহত মাদ্রাসা ছাত্র সোহাগকে (১২) আশঙ্কাজনক অবস্থায় বোরহানউদ্দিন থানায় নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বোরহানউদ্দিন থানায় নিয়ে আসে।
এদিকে নিহতের অভিভাবকরা মামলা না করার শর্তে কোন অভিযোগ নেই মর্মে ময়না তদন্ত ছাড়া লাশ দাফনের জন্য ভোলা জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে। জেলা প্রশাসক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে জানান, তারা কোন সন্দেহ বা আপত্তি না থাকলে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফনের অনুমতি প্রদান করেন। সন্দেহ বা আপত্তি না থাকলে লাশ দেয়া যেতে পারে বলে প্রশাসনের অনুমতির ওই কপি স্বজনরা রাতেই থানায় দাখিল করেন। কিন্তু দায়িত্বরত কর্মকর্তা মাসুম তালুকদার (ওসি চলতি দায়িত্বে) লাশ হস্তান্তর না করে সন্দেহজনক বিধায় রবিবার ভোরে ভোলা সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। নিহতের মা সামছুন নাহার অভিযোগ করেছেন থানার ওসি মাসুমকে টাকা না দেয়ায় তাদের লাশ পোস্টমর্টেম ছাড়া ফেরত দেয়নি।
এদিকে লাশ দাফনের জন্য ফেরত না দেয়ার বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রবিবার সকালে কয়েক শত নারী বোরহানউদ্দিন পশ্চিম বাজার থেকে জুতা ও ঝাড়ু মিছিল নিয়ে থানা ঘেরাও করে। এ সময় উত্তেজিত জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। জনতা এলোপাতাড়ি থানায় ইট নিক্ষেপ করে। এ সময় থানার গ্লাস, মোটরসাইকেল ভাংচুর করা হয়। সংঘর্ষে পুলিশ জনতা ও সাংবাদিকসহ ৩০ জন আহত হয়। আহত পুলিশ সদস্যরা হচ্ছেন, এসআই ফোরকান আলী, মাইনুল ইসলাম, এএসআই নাছির, কনস্টেবল রবিউল ইসলাম, মাছুদ করিম, আবুল কালাম, মিজানুর রহমান, সহিদুল ইসলাম, এনায়েত হোসেন, সফিকুল ইসলাম, মানবজমিন প্রতিনিধি এমরান হোসেন। গ্রেফতারের ভয়ে স্থানীয়রা বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নেয়ায় তাদের নাম পাওয়া যায়নি। বোরহানউদ্দিন থানার ওসি মাসুম তালুকদারকে একাধিকবার মোবাইলে ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ভোলা পুলিশ সুপার বশির আহমেদ জানান, পুলিশ আইন অনুয়ায়ী কাজ করেছে। ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ দাফনের জন্য প্রশাসন কোন অনুমতি দেয়নি। তাই লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পোস্টমর্টেম করতে পাঠিয়েছে পুলিশ। থানায় হামলার ঘটনায় বোরহানউদ্দিন থানায় মামলা করা হবে।
যারা গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তারা দেশদ্রোহী
রাজশাহীতে সেমিনারে মুনতাসীর মামুন
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী ॥ প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন বলেছেন, ‘যারা গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তারা দেশদ্রোহী। যুদ্ধাপরাধ আদালতকে আইন পাস করে স্থায়ী আদালতে রূপ দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।’ এছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করার আহ্বান জানান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলার জাগরণ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক দুদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনারের সমাপনী অনুষ্ঠানে রবিবার সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মোট চারটি সেশনে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এসব প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. গোলাম মুরশিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের সহায়তায় অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রথম দিনে ‘বাংলার জাগরণ : একুশ শতকের চোখে’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. গোলাম মুরশিদ। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাপিডিয়ার সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম ও রাবি অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা।
রবিবার দ্বিতীয় দিনে সকাল সাড়ে ৯টায় ‘বাংলার জাগরণ : চেতনার সম্প্রসারণ’ শীর্ষক দ্বিতীয় সেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। এতে মোট তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ‘বাংলার জাগরণ ও লোকদর্শন’, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ঊনিশ শতকে নারী জাগরণ’ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন ‘নারী জাগরণের সূচনা লগ্ন : পতিতা রমা বাই ও রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
শেষ সেশনে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের স্বরূপ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে এতে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শাহরিয়ার কবির, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক আলোচনা করেন।
শেষ সেশনে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, বলেন, ‘গণহত্যাবিষয়ক তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে বেশি বেশি তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ বিষয়ে শিক্ষকদের গবেষণা হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে কম গবেষণা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে যাঁরা বিরোধিতা করছেন তাঁদেরও বিচার হওয়া দরকার।’ এছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করার আহ্বান জানান।
পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন ও অস্ত্র ক্রয় চুক্তি হবে
প্রধানমন্ত্রী আজ রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন
কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন, অস্ত্র ক্রয় চুক্তি ও ছয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে সামনে রেখে আজ সোমবার তিন দিনের সফরে রাশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাত্তরে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বিনির্মাণে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়া অকৃত্রিম Ÿন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়ায় (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) সরকারের শেষ বছরে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য দেয়ার আয়োজন এ সফরে বাড়তি আবেগ হিসেবে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে, সকাল ৯টায় বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ বিমান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করবে। বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর বহনকারী বিমানটি মস্কোর শেরেমেতিয়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবে। বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে মোটরশোভাযাত্রা সহকারে মস্কোর প্রেসিডেন্ট হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। রুশ নেতার আমন্ত্রণে রাশিয়ায় ৩ দিনের সফরকালে তিনি এ হোটেলেই অবস্থান করবেন।
সফরের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর ক্রেমলিন কার্যালয়ে একান্ত বৈঠক করবেন। সে সময় তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন এবং বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এর পর শেখ হাসিনা এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নেবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ভøাদিমির পুতিনের দেয়া আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। রুশ ফেডারেশনের ফেডারেল কাউন্সিলের চেয়ারপার্সন ভ্যালেন্তিনা ইভানোভানো ম্যাতভিয়েনকো এবং রুশ ফেডারেশনের যোগাযোগ ও গণমাধ্যম মন্ত্রী নিকোলে নিকিফোরভ শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করবেন। এছাড়া রাশিয়ার পরমাণু সহযোগিতা সংস্থা আরওএসএটিওএম-এর জেনারেল ডিরেক্টর সার্গেই কিরিয়েঙ্কো শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করবেন।
প্রধানমন্ত্রী মস্কোর নাম না জানা সৈন্যদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিখ্যাত ক্রেমলিন জাদুঘর ও বলশয় থিয়েটার পরিদর্শন করবেন। শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি গ্যাজপ্রম কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। প্রধানমন্ত্রী ঐতিহ্যবাহী মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করবেন। সেখানে তিনি ‘কনটেম্পরারি বাংলাদেশ-পার্সপেক্টিভ ফর কলাবোরেশন উইথ রাশিয়া’ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন। তিনি সেখানে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেবেন এবং ইউনিভার্সিটির রেক্টরের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
উল্লেখ্য, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বক্তব্য রেখেছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিলে মস্কো সফরের সময় বঙ্গবন্ধু ওই বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেছিলেন। একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনে বাংলাদেশকে অপরিসীম সহায়তা দেয়ার কারণে সেই সময় তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আগামী ১৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে আসবেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, এ্যাম্বাসেডার এ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং সংশ্লিষ্ট খাতের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিসহ মোট ৫১ জন।
এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটি প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় রাশিয়া সফর। এর আগে ২০১০ সালের নবেম্বরে শেখ হাসিনা বাঘ সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ফোরামের এক পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে যোগ দিতে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ সফর করেন।
এদিকে রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফর উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২টি চুক্তি ও ৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের তথ্য তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রূপপুরে এক হাজার মেগাওয়াটের দু’টি পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রটি নির্মাণে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এর মধ্যে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে আর্থিক, কারিগরি এবং নির্মাণপূর্ববর্তী কার্যক্রম পরিচালনা এবং নিরাপত্তার জন্য পৃথক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার বিষয় চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সামরিক অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সন্ত্রাস দমন, আইন ও বিচার এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রে মোট ৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ফলে প্রকল্পের মোট বাজেট ও মেয়াদকালসহ বিস্তারিত তথ্য ইআরডির কাছে রয়েছে। একইভাবে সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তিটির বিস্তারিতও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হক, অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল, ইউরোপ অনুবিভাগের মহাপরিচালক রিয়াজ হামিদুল্লাহ, বহির্প্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক শামীম আহসান, কনস্যুলার ও কল্যাণ অনুবিভাগের মহাপরিচালক সুলতানা লায়লা হোসেনসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন অধ্যায়
সম্পর্ক নিয়ে একটা টানাপড়েন চলছিল অনেক আগে থেকেই। তারই চূড়ান্ত পরিণতি বিচ্ছেদ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মার্কিন পপ তারকা ব্রিটনি স্পিয়ার্স এবং প্রেমিক জ্যাসন ট্রাউইকের জীবনে এখন নতুন অধ্যায় শুরু হলো। জ্যাসনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং ব্রিটনির বাবা জেমি স্পিয়ার্স তার মেয়ের সব দায়িত্ব এরই মধ্যে বুঝে নিয়েছেন।
পারস্পরিক সম্মতিতেই এই বিচ্ছেদ। ব্রিটনি এবং জ্যাসন দু’জনই তাঁদের সম্পর্ককে আর এগিয়ে না নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা এই সিদ্ধান্তও নিয়েছেন যে, বাকি জীবন আমরা একে অপরের বন্ধু হিসেবে টিকে থাকবো। তারা দুজনেই প্রাপ্ত বয়স্ক তাই তাদের এই সিদ্ধান্ত পরিবারের সবাই মেনে নিয়েছে। ব্রিটনির বক্তব্য হচ্ছে, জ্যাসন আর আমি একসাথেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি সবসময় তাকে শ্রদ্ধা করি এবং আগামীতেও আমরা ভালো বন্ধু হিসেবে থাকব। জ্যাসন বলেছেন, ‘কেবল একটা অধ্যায় শেষ হলো, আবার নতুন অধ্যায়ের শুরু হবে। সেই অপেক্ষায় আছি। আমি ব্রিটনি এবং তার দুই ছেলেকে অনেক পছন্দ করি। তাদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করব।
২০০৯ সালে ব্রিটনির সঙ্গে জ্যাসনের প্রেম শুরু হয়। ২০১১ সালে তা জনসম্মুখে আসে। তাঁদের এই সম্পর্ক নিয়ে নানা গুজবও রটেছিল। খবর ওয়েবসাইটের।
‘গ্রেনেড হামলার আগে হাওয়া ভবনে যান এনএসআই প্রধান আব্দুর রহিম’
কোর্ট রিপোর্টার ॥ একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কয়েকদিন আগে এনএসআইয়ের তৎকালীন প্রধান আব্দুর রহিম হাওয়া ভবনে গিয়েছিলেন বলে গতকাল রবিবার আদালতে সাক্ষ্যে জানালেন ওই সংস্থার সহকারী পরিচালক ইউসুফ হোসেন। পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে এই মামলার বিচারে স্থাপিত ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের কাছে তিনি মামলাটির ৬৬তম সাক্ষী হিসেবে এ সাক্ষ্য দেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ মামলার ৫২ আসামির মধ্যে আব্দুর রহিম।
ইউসুফ জবানবন্দীতে বলেন, আব্দুর রহিম ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ রহিমের তত্ত্বাবধানে। ২০০৪ সালের ১২ আগস্টের পর ২১ আগস্টের আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একদিন আব্দুর রহিম হাওয়া ভবনে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, আমি ও কনস্টেবল মনোয়ার সিএমএইচে ডিজি (রহিম) স্যারের দেখভালের জন্য রোস্টার ডিউটি করতাম। আমাদের সঙ্গে ওয়াকিটকি থাকত। ‘ডিউটি চলার সময় একদিন ড্রাইভারকে (রহিমের গাড়িচালক) ওয়েটিং রুমে পাইনি। ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, স্যারকে নিয়ে সে বনানীতে হাওয়া ভবনে গিয়েছিল।’
তিনি আরও জানান, ২১ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় তিনি তাঁর ওয়াকিটকিতে শুনতে পান যে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়েছে। খবরটি ডিজি স্যারকে জানালে তিনি (রহিম) শেখ হাসিনার খবর জানতে চাইলে বলি, তিনি বেঁচে থাকলেও গুরুতর আহত হয়েছেন।
ইউসুফের জবানবন্দীর পর আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তাঁকে জেরা শুরু করেন। তবে জেরা অসমাপ্ত রেখেই আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়।
রবিবার সাক্ষ্যগ্রহণকালে সাবেক মন্ত্রী জামায়াতনেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানসহ এ মামলায় কারাগারে আটক আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়।
রবিবার জামিনে থাকা আসামি খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মোঃ আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আদালতে হাজির হন।
সারাদেশে তাপমাত্রা বাড়ছে, ৭২ ঘণ্টায় স্বাভাবিক হবে শীত
স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশজুড়ে তাপমাত্রা বাড়লেও তীব্র শীতে দুর্ভোগ রয়েই গেছে। কুয়াশাচ্ছন্ন দেশে আগামী ৭২ ঘণ্টায় শৈত্যপ্রবাহ কমে যেতে পারে। অব্যাহত থাকবে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। আজ সোমবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রী এবং সর্বনিম্ন ৬ থেকে ৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস হতে পারে। দিনের তাপমাত্রা এক থেকে দু’ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে। রাতের তাপমাত্রাও ক্রমান্বয়ে বাড়তে পারে। অবশ্য চলতি মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি বৃষ্টি হতে পারে বলে জানায় আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, আজ শ্রীমঙ্গল অঞ্চলের ওপর দিয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, সন্দ্বীপ, সীতাকু-, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা, মাইজদীকোর্ট, ফেনী, হাতিয়া, কুতুবদিয়া ও সিলেট অঞ্চলসহ রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। ঢাকায় বাতাসের বেগ ও গতি উত্তর/উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৮ থেকে ১২ কিলোমিটার থাকতে পারে। মাঝরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকায় ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপের বর্ধিতাংশ হিমালয়ের পাদদেশ ও সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। এদিকে মৌসুমী লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে এবং তা উত্তর বঙ্গোপসাগরের দিকে বিস্তার লাভ করছে। সূত্রটি আরও জানায়, রবিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সন্দ্বীপে ২৫.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন শ্রীমঙ্গলে ৫.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড হয়। শনিবারের তুলনায় রবিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১.৬ ডিগ্রী এবং সর্বনিম্ন শূন্য দশমিক ৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়। ঢাকার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় যথাক্রমে ১.৮ ও ও ২.৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। দেশের সবক’টি স্টেশনেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় রবিবার।
আবহাওয়া অধিদফতরের মতে, চলতি মাসের শেষ দিকে আরেকটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তবে আগামী কয়েকদিন মৃদু শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। আর আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে একটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সে সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ দিকে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ১ থেকে ২টি বজ্রঝড় হতে পারে। সূত্র আরও জানায়, আগামী মার্চে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ২ থেকে ৩টি মাঝারি/তীব্র কালবৈশাখী/বজ্রঝড় ও দেশের অন্যত্র ৩ থেকে ৪ দিন হালকা/মাঝারি কালবৈশাখী/বজ্র ঝড় হতে পারে। ও মাসে দেশে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়াসে পৌঁছে যেতে পারে।
অধিকাংশ শিক্ষক ক্লাসে ফেরেননি, অনিশ্চিত ভর্তি পরীক্ষা
ইবিতে হামলার জের
ইবি সংবাদদাতা ॥ শনিবার কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্তৃক শিক্ষকদের ওপর বর্বরোচিত হামলার জের ধরে এখন পর্যন্ত কোন ক্লাস-পরীক্ষায় ফেরেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক। এতে করে হাতে গোনা কয়েকটি বিভাগ ছাড়া বেশিরভাগ বিভাগেই ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরে না আসায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। জানা যায়, দীর্ঘ চার মাস ধরে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থায় নিয়মিত বিক্ষোভ, সমাবেশ, প্রশাসন ভবন ঘেরাও, মহাসড়ক আবরোধসহ বিভিন্ন আন্দোলন করে আসছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের অংশ হিসেবে শনিবার তাঁরা অনশন এবং কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। এক পর্যায়ে সেই আন্দোলনে ইবি ছাত্রলীগ যোগ দিয়ে কৌশলে আন্দোলন তাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেয়। এদিকে দুপুর ১২ টায় ক্যাম্পাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য শিক্ষক সমিতির পূর্ব নির্ধারিত আন্দোলন স্থগিত করার লক্ষ্যে শিক্ষক লাউঞ্জে সমঝোতার বৈঠকে বসে শিক্ষক সমিতি। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীর নামে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেই লাউঞ্জে থাকা শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখে এবং পরে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে শিক্ষক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদকসহ ৩০ শিক্ষক আহত হন। পরে হামলাকারীদের তোপের মুখে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ক্লাস-পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দিলে তাঁরা অবরুদ্ধ থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।
শিক্ষকদের ওপর এই হামলার প্রতিবাদে শনিবার রাত ১০ টায় কুষ্টিয়া শহরে শিক্ষকদের বিভিন্ন ফোরাম তাঁদের পূর্বঘোষিত দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ছাত্র-উপদেষ্টার পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরে যাবে না বলে ঘোষণা দেয়। ফলে রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগ ছাড়া অধিকাংশ বিভাগই ছিল শিক্ষার্থী শূন্য। তবে চার মাস ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকার পর কয়েককটি বিভাগে ক্লাস চললে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম প্রত্যেকটি অনুষদ পরিদর্শন করেন। এদিকে দুপুর ১ টায় বিভিন্ন পত্রিকায় ছাত্রলীগের হামলার নামে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এমন দাবি করে টিএসসিসিতে সাংবাদ সম্মেলন করেছে ইবি শাখা ছাত্রলীগ।
এদিকে আন্দোলকারী শিক্ষকদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার ক্লাস-পরীক্ষা থেকে বিরত থাকবে এমন সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। ফলে বিপাকে পড়েছে ফরম উত্তোলনকারী ৯০ হাজার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সরকার বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি আর একটু স্বাভাবিক হলে আমরা খুব শীঘ্রই ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে নেব।
৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিহতদের লাশ দেশে আনা হবে ॥ দীপু মনি
কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ বাহরাইনে অগ্নিকা-ের ঘটনায় নিহত বাংলাদেশী কর্মীদের লাশ ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেশে আনা হবে। ইত্যেমধ্যে বাহরাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে লাশ আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। শনিবার রাত পর্যন্ত নিহত বাংলাদেশীর সংখ্যা ১০ শোনা গেলেও সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও একজন বাংলাদেশীসহ মোট ১১ জনের নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেন। মোট ১১ বাংলাদেশীর পরিচয়ও তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বাহরাইনের রাজধানী মানামার মুখারকা এলাকার তিনতলা একটি ভবনে আগুন লাগলে ১১ বাংলাদেশী কর্মী নিহত হন। নিহতরা হলেন, সাগীর আহমেদ, পিতা : নাজির আহমেদ, গ্রাম : চর খিজিরপুর, থানা : বোয়ালখালী, জেলা চট্টগ্রাম। জসিম মিয়া, পিতা : নাসের মিয়া, গ্রাম : গোয়ালি, থানা : নবীনগর, জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আপন সহোদর স্বপন ও সাইফুল, পিতা : মৃত শহীদ মিয়া, গ্রাম : কাইতলা, থানা : নবীনগর, জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া। মাহবুব আলম, পিতা : হাজী রশীদ আহমেদ, গ্রাম : বতুয়া, থানা : পটিয়া, জেলা : চট্টগ্রাম। জামাল, পিতা : আব্দুল আজিজ, গ্রাম : মারিপারা, থানা : পটিয়া, জেলা : চট্টগ্রাম। সহোদর দুই ভাই শাহাদত ও টিটু মিয়া, পিতা : আলম, গ্রাম : নওপাড়া, থানা : কচুয়া, জেলা চাঁদপুর। মোহাম্মদ আনোয়ার, পিতা : আবুল বাশার, গ্রাম : গুড়িগ্রাম, থানা : নবীনগর, জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ওসমান গনি, পিতা : আব্দুর রহিম, গ্রাম : কাশিপুর, থানা : সোনাইমুড়ি, জেলা : নোয়াখালী এবং গুরু মিয়া, পিতা : চান মিয়া, গ্রাম : ভৈরবনগর, থানা : নবীনগর, জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাহরাইনের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গভীর শোক এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব নিহত ১১ জনের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। সেক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে লাশ দেশে আনা সম্ভব হবে। মন্ত্রী বলেন, ১১ জন নিহত হওয়া ছাড়াও ২ জন বাংলাদেশী আহত হয়েছেন। ৬৩ জন সহায়সম্বল সব হারিয়েছেন। আহতদের সে দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আশ্রয়সহ সর্বস্ব হারিয়েছেন এমন বাংলাদেশী কর্মীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে মানামার বাংলাদেশ দূতাবাস।
তিনি আরও জানান, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাহরাইনের কর্মকর্তার- এর তদন্ত করছেন। সে দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস তাদের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। এ ঘটনায় নিহত, আহত ও সর্বস্ব হারানো বাংলাদেশীদের জন্য করণীয় সবই করবে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতি হতাশ ॥ তরিকুল
স্টাফ রিপোর্টার ॥ মহাজোট সরকারের চার বছরপূর্তিতে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ভাষণকে অসত্য ও দলীয় বক্তব্য আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। রবিবার বিকেলে দলটির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালেয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দলটির সমন্বয়কারী তরিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কোনও বক্তব্য না দেয়ায় জাতি হতাশ হয়েছে। অবিলম্বে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের জন্য বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারকে সংলাপ করার আহ্বান জানান তিনি।
একই দিন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অন্য এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে অন্তঃসারশূন্য বলে আখ্যায়িত করেন।
মঙ্গলবারের ১৮ দলীয় জোটের মানবপ্রাচীর কর্মসূচীকে সামনে রেখে রবিবার বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যৌথসভা শেষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম-মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, আমান উল্লাহ আমান, রুহুল কবির রিজভী, সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া, বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবীর খোকন, যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক জাফরুল হাসান ও জাসাস সভাপতি এমএ মালেক।
সংবাদ সম্মেলনে তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে জাতি হতাশ হয়েছে। সরকার সকল ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে তা ফুটে উঠেনি। তিনি সরকাররকে ধাপ্পাবাজ, অযৌগ্য, মিথ্যুক আখ্যায়িত করে বলেন, এমন সরকার জাতির জীবনে আর আসেনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, তোফায়েল আহমেদসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম বলেন, তারা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলেন তা তারা জানেন। তবে যারা তত্ত্বাবধায়কবিরোধী কথা বলেন তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। কারণ তারা সিনিয়র আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা। তবে তাদেরও দায়িত্ব আছে দেশ যাতে খারাপ দিকে না যায় তা লক্ষ্য রাখার।
জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ফলে সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে গেল কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তরিকুল বলেন, সংলাপের পথ অবশ্যই খোলা আছে। আর পথ বন্ধ হলে রাজপথেই সমাধান হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংলাপ কখনও বন্ধ হয় না। কারণ যুদ্ধের সময়ে মাও সেতুংও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করেছিলেন। তরিকুল বলেন, যেভাবেই যা করুক, তত্ত্বাবধায়ক হতেই হবে। তত্ত্বাবধায়কের মাধ্যমেই নির্বাচন দিতে হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষের জন্য উচ্চ আদালত। উচ্চ আদালতের জন্য মানুষ নয়। ওয়ান-ইলেভেনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করে তরিকুল বলেন, সেনা সমর্থিত সরকারকে সমর্থন দিয়েই তিনি ক্ষমতায় আসেন। সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন ও এরশাদ সরকারকে আওয়ামী লীগ বৈধতা দিয়েছে। তিনি বলেন, টালবাহানা বাদ দিয়ে গণঅভ্যুত্থান হওয়ার আগেই তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। জনগণ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দুঃশাসনের অবসানের অভ্যুত্থান ঘটানোর অপেক্ষায় আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের দল দাবি করে তরিকুল ইসলাম বলেন, বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় তবে সেই বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। বিএনপির সমন্বয়ক বলেন, সরকার ফাঁসির আসামিদের ক্ষমা করে দেয়, হত্যা মামলার আসামিকে জামিন দেয়। অথচ ময়লার গাড়ি ভাংচুরের মিথ্যা মামলায় বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে বন্দী করে রেখেছে। তিনি দলের সকল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে কারাবন্দী নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেন। এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।
প্রতিহিংসার চার বছর : সংবিধান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার শীর্ষক প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত অপর এক আলোচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ গতানুগতিক। মওদুদ বলেন, আগামী নির্বাচন হবে কি না, হলে কীভাবে হবে, তা নিয়ে জাতি উদ্বিগ্ন। মানুষ আশা করেছিল প্রধানমন্ত্রী সর্বজনীন ভাষণ দেবেন। গণতন্ত্রের যে সঙ্কট চলছে, তা নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু তা হয়নি।
মওদুদ আহমদ বলেন, এ ভাষণের কোন মূল্য আছে বলে আমি মনে করি না। আশা করি প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে এমন ভাষণ দেবেন যাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমিত হবে, তাতে মানুষ খুশি হবে।
দ্রব্য মূল্যের উর্ধগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশ্বজিৎ হত্যা, পদ্মা সেতু, হলমার্ক কেলেঙ্কারি এসব বিষয়ে কোন বক্তব্য না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সমালোচনা করেন বিএনপির এই নেতা।
এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে বলে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন মওদুদ আহমদ। তবে তিনি বলেন, আবার এক-এগারোর মতো কোন ঘটনা ঘটলে তার দায় আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ১৮ দল কোন নির্বাচনে যাবে না উল্লেখ করে মওদুদ বলেন, উপযুক্ত সময়ে কঠোর কর্মসূচী দেয়া হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালে সরকারকে বাধ্য করা হবে।
আমিনবাজারে ৬ ছাত্র হত্যা ৬০ জন অভিযুক্ত
আদালতে চার্জশীট
সৈয়দা ফরিদা ইয়াসমীন জেসি ॥ বহুল আলোচিত সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের কেবলাচর বালুর মাঠে ছয় ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা মামলায় ৬০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে র‌্যাব। ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একমাত্র ছাত্র আল-আমিনকে ডাকাতি মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। চার্জশীট আমলে নেয়া হবে কি-না তা আগামী ১৬ জানুয়ারি জানানো হবে বলে জানিয়েছে আদালত।
রবিবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলামের আদালতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার র‌্যাবের সিনিয়র সহকারী পরিচালক শরিফ উদ্দিন আহমেদ চার্জশীট দাখিল করেন। ওই ঘটনায় একই তদন্ত কর্মকর্তা নিহত ছয় ছাত্র ও জীবিত আল-আমিনের নামে দায়ের করা ডাকাতি মামলায়ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। শুনানি শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে আদালত।
চার্জশীটভুক্ত ৬০ আসামি হলো ডাকাতি মামলার বাদী আব্দুল মালেক, সাঈদ মেম্বর, আব্দুর রশিদ, ইসমাইল হোসেন রেফু, নিহর ওরফে জমশের আলী, মীর হোসেন, মজিবর রহমান, কবির হোসেন, আনোয়ার হোসেন, রজুর আলী সোহাগ, আলম, রানা, আ. হালিম, আসলাম মিয়া, শাহীন আহমেদ, ফরিদ খান, রাজীব হোসেন, হাতকাটা রহিম, ওয়াসিম, সেলিম মোল্যা, সানোয়ার হোসেন, শামসুল হক ওরফে শামচু মেম্বার, রাশেদ, সাইফুল, সাত্তার, সেলিম, মনির, ছাব্বির আহম্মেদ, আলমগীর, আনোয়ার হোসেন আনু, মোবারক হোসেন, অখিল খন্দকার, বশির, রুবেল, নূর ইসলাম, আনিস, সালেহ আহমেদ, শাহাদাত হোসেন রুবেল, টুটুল, অখিল, মাসুদ, নিজামউদ্দিন, মোখলেছ, কালাম, আফজাল, বাদশা মিয়া, তোতন, সাইফুল, রহিম, শাহজাহান, সুলতান, সোহাগ, লেমন, সায়মন, এনায়েত, হয়দার, খালেদ, ইমান আলী, দুলাল ও আলম।
আসামিদের মধ্যে ১১ জন কারাগারে, ১৩ জন জামিনে এবং অপর ৩৬ জন পলাতক। গ্রেফতারকৃত ২৪ জনের মধ্যে ১৪ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। চার্জশীটে ৯২ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
রবিবার আদালতে হাজির হয়েছিলেন নিহত ৬ ছাত্রের মধ্যে দুই ছাত্রের পিতা। তাঁরা মনে করেন, চার্জশীটে ৬০ জনকে আসামি করা হলেও এত মানুষ এতে জড়িত ছিল না। আজগর আলী, আকিল উদ্দিন, আবু সাঈদ ও আলা উদ্দিন খানদের ছেড়ে দিয়ে অনেককে মিথ্যাভাবে এখানে জড়ানো হয়ে থাকতে পারে। আব্দুর রশিদ বলেন, জীবিত থাকা আল-আমিন তাদের বলেছে, তাদের মারার সময় ১৫ জনের মতো লোক ছিল। এটা বিচার বিলম্বিত এবং না পাওয়ার ষড়যন্ত্রও হতে পারে।
২০১১ সালের ১৮ জুলাই শব-ই-বরাতের রাতে ভোরে আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামসংলগ্ন কেবলারচরে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের তিন শিক্ষার্থীসহ ছয় কলেজ ছাত্রকে। নিহতরা হলেন, ‘এ’ লেভেলের ছাত্র শামস রহিম শামাম (১৮), মিরপুর বাঙ্লা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদুর রহমান পলাশ (২০), একই কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইব্রাহিম খলিল (২১) ও উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র কামরুজ্জামান কান্ত (১৬), তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র টিপু সুলতান (১৯) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সিতাব জাবির মুনিব (২০)। তারা পরস্পরের বন্ধু ছিলেন বলে জানা যায়। নিহতদের সঙ্গে থাকা আরেক বন্ধু আল-আমিন গুরুতর আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনার পর কথিত ডাকাতির অভিযোগে বেঁচে যাওয়া আল-আমিনসহ নিহতদের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগে একটি মামলা করেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক (বর্তমানে এ মামলার আসামি) এবং পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করে।
এ হত্যার ঘটনায় সাভার থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হলে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। একই সঙ্গে থানার পুলিশের ভূমিকা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি করে পুলিশ সদর দফতর। ওই কমিটি তথ্যানুসন্ধানের পর মত প্রকাশ করে, ওই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ছিল ‘অপেশাদার ও দায়িত্বহীন।’
অন্যদিকে ওই ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে মানবাধিকার সংগঠন ন্যাশনাল ফোরাম ফর প্রোটেকশন অব হিউম্যান রাইটসের মহাসচিব আইনজীবী তাজুল ইসলাম গত বছরের জুলাইয়ে একটি রিট আবেদন করেন।
ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। চূড়ান্ত শুনানির পর হাইকোর্ট বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়।
বিচার বিভাগীয় তদন্তে নিহতরা ডাকাত নয় বলে প্রতিবেদন দেয়া হলে সাভার থানার পুলিশ থেকে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। কিন্তু সিআইডির তদন্ত সন্তোষজনক না হওয়ায় হাইকোর্ট গত ৭ আগস্ট র‌্যাবের কাছে তদন্তভার হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। র‌্যাবকে চার মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
র‌্যাবের তদন্তের আগে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোঃ সিরাজুল হক মামলাটির তদন্ত করে আসছিলেন। তারও আগে সাভার থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মতিয়ার রহমান মিয়া মামলাটির তদন্ত করেছিলেন।