মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
প্রধানমন্ত্রী অনাবশ্যক পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ করুন
মমতাজ লতিফ
আগেও প্রশ্ন ফাঁস সংক্রান্ত জাতীয় জীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কলাম লিখেছি। বিজি প্রেস, আমলা-কর্মকর্তা, লাখো শিক্ষক, কোটি শিক্ষার্থীকে কোটি কোটি প্রশ্ন পৌঁছানো, তাদের উত্তরপত্র ঠিকমতো দেখা, ফল প্রকাশ- এই বিপুল কর্মযজ্ঞটি প্রাথমিক স্তরের পঞ্চম শ্রেণীর প্রায় কোটি শিশুর জন্য প্রয়োজন নেই বলেই আমার মতো অনেক শিক্ষা বিষয়ে নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিবর্গ মনে করেন। আজকে আবার আরেকবার এই জাতি বিধ্বংসী প্রশ্ন ফাঁস প্রতিরোধের প্রথম বাধা এত বেশি পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজন নেই বলে মত প্রকাশ করছি এবং এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি।
এ প্রসঙ্গে সূচনাতে কয়েকটি বিষয়, বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীন হয়ে ওঠার ইতিহাস, এ পথে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা স্মরণ করব। ১৯৮০ সালে আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় ও উদ্যোগে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের প্রধান উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো ছিল- এলাকার সব ৫+ বয়সী শিশুদের ভর্তি করা। এলাকার সব শিশুকে বিদ্যালয়ে আনার উপযুক্ত শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা বাড়ানোসহ বিদ্যালয় সংস্কার, টয়লেট, টিউবওয়েল বসানো, শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে, একাডেমিক সুপারভিশন করার লক্ষ্যে সব থানায় এ্যাসিস্টেন্ট থানা শিক্ষা অফিসারের পদ সৃষ্টি ও বিএড, এমএড ডিগ্রী গ্রহণকারীদের এ পদে নিয়োগদান। শিক্ষকের শিক্ষকতার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ক্লাস্টার ট্রেনিং অর্থাৎ এক এলাকার শিক্ষকদের সপ্তাহের শেষদিনে একাডেমিক সুপারভাইজারের নেতৃত্বে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান। পিটিআই শিক্ষক প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন করে ‘সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন’ নামের নতুনভাবে পরিমার্জিত আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বসমৃদ্ধ বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কোর্স চালু। ’৯০ সালে এ প্রকল্প সারাদেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হয় এবং ৯০-এর দশকে প্রাথমিক স্তরের জন্য ‘যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম’ প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ও নতুন যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের প্রতিফলন ঘটাতে প্রাথমিক পর্যায়ের সব বিষয়ের জন্য নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ শুরু হয় এবং ’৯৩ সাল থেকে ১ম শ্রেণীতে এই নতুন বই ব্যবহার শুরু হয়, যা ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে। অবশ্য এর আগে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের ওপর সারাদেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক প্রশিক্ষক, সুপারভাইজার এবং শিক্ষকদের বছরব্যাপী বিষয়ভিত্তিক অবহিতকরণ ও এতে দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, এই শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে ১ম শ্রেণী ও ২য় শ্রেণীর জন্য গ্রহণ করা হয় ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি, যা প্রথমে লিবারেল প্রমোশন নামে পরিচিত হয়ে পরে শিক্ষার্থীর কৃতিত্ব অর্জনকে বছরব্যাপী ধারাবাহিক মূল্যায়নের নামে চিহ্নিত করা হয়। এই নতুন পাঠ্যবইতে সর্বপ্রথম লিঙ্গবৈষম্য দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় যেখানে বিষয়ে, ছবিতে, গল্পে, অঙ্কের প্রশ্নে বালকের বা পুরুষের পাশে নারী, বালিকার চরিত্র যোগ করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে নীতিগত অনুমোদন প্রদান।
যাই হোক, এ নিবন্ধে স্কুলের শ্রেণীকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও সম্প্রতি প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির প্রধান নীতির ওপর মূলত আলোচনা করব। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় যুক্তরাজ্যে বা পূর্ব এশিয়া কিংবা ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে এসব দেশের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক ও মূল্যায়ন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছেÑ ওইসব দেশের পাঠ্যপুস্তকের বিষয় ও পাঠে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য নেই, কিন্তু পাঠ উপস্থাপনে ব্যবহার করা হয় নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ উপকরণ ও পদ্ধতি-বর্ণ-শব্দ কার্ড, ফ্ল্যাশ কার্ড, প্রজেক্ট তৈরি অর্থাৎ নিজে নিজে চিন্তা করে কোন বিষয়ে প্রজেক্ট তৈরি করে শিশুরা সৃজনশীল ও স্থায়ী শিক্ষা অর্জন করে থাকে। এর সঙ্গে শিশুর শিক্ষা অর্জনের মূল্যায়নটি হয় ধারাবাহিকভাবে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের দ্বারা প্রায় প্রতিদিন। বছর শেষে ক, খ, গ, ঘ গ্রেডপ্রাপ্ত শিশুরা সবাই পরের শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়। ১ম, ২য় শ্রেণীতে কোন শিশুকে সাধারণত আটকে পড়তে দেখা যায় না, যদি না তার গুরুতর মানসিক প্রতিবন্ধিতা থাকে। তবে, সাধারণভাবে এটি আজ স্বীকৃত যে, একই শ্রেণীর সঙ্গীদের ছেড়ে বাদ পড়া শিশুটির মানসিক কষ্ট তাকে শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আরও অমনোযোগী করে। সেজন্য প্রতিবন্ধী হলেও, কম নম্বর পেলেও শিশুর শিক্ষা গ্রহণের আকাক্সক্ষাটিকে রক্ষার্থে নমনীয় প্রমোশননীতি শিশুবান্ধব নীতি বলে দেখা যাচ্ছে যা উন্নত দেশে প্রচলিত আছে।
পাশ্চাত্যে সাধারণভাবে ৫, ৬ ক্লাস পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের পাঠ গ্রহণ করা শিশুদের ফেল করা, পুনরায় একই ক্লাসে পড়ার দৃশ্য প্রায় অনুপস্থিত। তাই বলে ওদের দেশেও একটি শ্রেণীতে খুব ভাল, ভাল, দুর্বল শিশুরা অবশ্যই রয়েছে। খুব ভাল এবং ভালরা সব দেশে, আমাদের দেশেও সবরকম বাধা অতিক্রম করে উচ্চ শিক্ষাস্তরে প্রবেশ করবে, সন্দেহ নেই। দুর্বল শিশুরা প্রতি শ্রেণীতে বাধা না পেলেও তাদের নিচু ‘গ্রেড’ তাদের আরও পরিশ্রম করার তাগিদ দেবে এবং সত্য এই যে, এদের মধ্য থেকেও একটা দল শিক্ষক, বাবা-মার সহায়তায়, নিজের শ্রমে-উদ্যমে ‘মোটামুটি’ মান অর্জনে সক্ষম হয় এবং এরাও উচ্চশিক্ষা বা বৃত্তি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এটাই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম সার্থকতা। সব দেশে, সব শ্রেণীতে ২-৩% শিশু পারিবারিক, সামাজিক, মানসিক কারণে কখনোই তাদের বয়সোপযোগী শিক্ষার মান আয়ত্ত করতে পারে নাÑ দেশে, বিদেশে এরা আছে, থাকবে। বিদেশে এদের মানসিক অভিরুচি অনুযায়ী শিক্ষা, বৃত্তি বা দক্ষতা শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
যতই বিদেশের উদাহরণ দেই না কেন আমাদের নীতি-নির্ধারকসহ অভিভাবক-শিক্ষকদের স্মরণ রাখা প্রয়োজন- আমাদের যে কোন সেবা-শিক্ষা বা স্বাস্থ্য-খাদ্য, বাসস্থান, জীবিকার প্রশ্ন উঠলেই তা কোটি কোটি জনসংখ্যার কাছে পৌঁছানোর কথা ভাবতে হয়। বিদেশের কোন কোন দেশে ঢাকার সমান জনসংখ্যাও নেই। সুতরাং প্রাথমিক স্তরের কোটি শিশুর কোটি অভিভাবক একটি পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়াটা আমাদের জন্য, শিশুদের জন্য এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ লাভ বয়ে আনে না অথচ এটি যে বিপুল ব্যয় ও প্রশ্ন ফাঁসের মতো লজ্জাজনক, অবমাননাকর এক দুর্নীতির উত্থানের সুযোগ তৈরি করে সেটি করারও কোন অধিকার কিন্তু আমাদের কারও নেই!
এবার আসা যাক বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রসঙ্গে। শিক্ষার প্রথম স্তর প্রাথমিক শিক্ষাকে এই নীতিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার ঘোষণা করা হয়েছে। এ নীতি অনুসারে কিন্তু সরকারের বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৫ম শ্রেণী অন্তে কোন পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের কোন সুযোগ নেই। সে হিসেবে তারা আইনী একটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে যদি কেউ শিক্ষানীতির ওই ঘোষণার প্রেক্ষিতে ৫ম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করেন! আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- প্রাথমিক স্তর শেষ হচ্ছে ৮ম শ্রেণী শেষে। তাহলে প্রাথমিকের মধ্য পর্যায়ে শিক্ষানীতির পরিপন্থী এই শিশুদের, নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত বাবা-মায়েদের, অভিভাবকদের অন্যায় ‘পরীক্ষা’ নামক এক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়া বন্ধ করা হোক এবং তা দ্রুত করা দরকার। স্মরণ রাখতে হবে- প্রাথমিক স্তরের অধিকাংশ শিশুর বাবা-মা নিরক্ষর অথবা অল্প শিক্ষিত। এই পরীক্ষার নামে কোচিং, প্রশ্ন ফাঁস, উচ্চ গ্রেড ও ফেল ইত্যাদি চালু হওয়া নতুন নির্যাতনের হাত থেকে এই অসুবিধাগ্রস্ত বিপুল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। তাছাড়া একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে- কোন ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলের উচ্চ ও মধ্যবিত্তের শিশুরা এই ধরনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে না, এমনকি ৮ম শ্রেণী শেষের কোন পরীক্ষায়ও তারা অংশগ্রহণ করে না, কারণ এ দুটো পরীক্ষার কোন প্রয়োজন নেই। ওরা এসএসসির বদলে ও লেভেল, এইচএসসির বদলে ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় বসে তাদের স্কুল ও কলেজের লেখাপড়া শেষ করে কি ভাল মানের শিক্ষা অর্জন করছে না? ওদের শিক্ষার্থীদের তো কোচিংয়ের দরকার হয় না।
প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমরা, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কতগুলো বিষয় সম্পর্কে অবগত, তাই না? যেমন- প্রশ্ন ছাপা হওয়ার স্থান বিজি প্রেসে প্রশ্ন ফাঁসজনিত অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি-কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। অভিভাবকদের একটি গোষ্ঠী শিক্ষক ও কোচিং কেন্দ্রের সঙ্গে আঁতাত করে প্রশ্ন ফাঁস করতে পারে। প্রযুক্তির সাহায্যে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, প্রাচীন পদ্ধতিতেও প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পরীক্ষা পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত শিক্ষক তার পছন্দের পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নের সঙ্গে উত্তরপত্রও প্রদান করে অযোগ্য শিক্ষার্থীকে ফার্স্ট হতে, উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করতে পারে! একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ পদ্ধতি সদ্যসমাপ্ত ভর্তি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় ঘটিয়েছে বলে সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন। বিদেশে, ভারত, পাকিস্তানে প্রাথমিক পর্যায় শেষে কোন পাবলিক পরীক্ষা নেই, তাহলে বাংলাদেশ এত জনবহুল দেশে ৫ম শ্রেণী অন্তে, ৮ম শ্রেণী অন্তে দুটো পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয় কি? শুধু অযৌক্তিক নয়, এ দুটো পরীক্ষা সফলভাবে পরিচালনা করা এক কথায় অসম্ভব। এর চেয়েও বড় কথা, এ দুটো পরীক্ষার প্রকৃত অর্থে কোন প্রয়োজন নেই এবং অপ্রয়োজনীয় এই কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সরকারকে প্রশ্ন ফাঁসের মতো অবমাননাকর পরিস্থিতিতে বার বার কোন একটি গোষ্ঠী ফেলে দিচ্ছে, তাই নয় কি? তারা এ অপকর্মটি করার সুযোগ লাভ করছে বলে অপকর্মটি করেই যাবে।
সরকার কেন এ অপকর্ম করার সুযোগ তৈরি করে নিজের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে-তা আমি বুঝতে অপারগ। বরং সরকার যদি ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার মান বৃদ্ধির কাজে নানারকম উদ্যোগ গ্রহণ করে, শিক্ষার্থীদের ক, খ, গ, ঘ গ্রেড নিয়ে স্কুল পরীক্ষার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের পথের সব অন্তরায় দূর করে দিয়ে একবারে ১০ম শ্রেণী অন্তে পূর্বের নিয়মে প্রশ্ন ফাঁসের সব পথ বন্ধ করে এসএসসি পাবলিক পরীক্ষাটি সফলভাবে পরিচালনা করে এবং এর দু’বছর পর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটিও একইভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করে পরিচালনা করে, তাহলে একদিকে যেমন প্রশ্ন ফাঁসের দুটা সুবর্ণ সুযোগ বন্ধ হবে, অপরদিকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দুটোতে সবরকম দুর্নীতি বন্ধের পদক্ষেপ সুষ্ঠুভাবে গ্রহণ করাও সম্ভব হবে। ফলে কোচিং গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও অনেক কমে যাবে। শিক্ষার্থীরা এবং অভিভাবকরা ‘জিপিএ-৫’ নামক এক দানবীয় অকাজের জিনিসকে ‘মহামূল্যবান’ জ্ঞান করে যেনতেন পন্থায় সেটি অর্জনের ‘লোভ’ থেকে রক্ষা পাবে। শিশু, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে অসৎ পন্থা গ্রহণে আমরা কিছুতেই সুযোগ দিতে পারি না।
তাছাড়া, প্রযুক্তি ব্যবহার করে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে, মোবাইল বা ফেসবুক বন্ধ করে জিপিএ-৫ লাভের লোভ দমানো যাবে না। হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছু ৪৭ জন ছাত্র অভিনব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি হ্যাকাররা প্রশ্নগুলো ব্লাকআউট করে বা অন্য কোনভাবে বিনষ্ট করে দেয়, তখন পরীক্ষার হলে পরীক্ষার দিনে শিশু বা বয়স্ক শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষা পরিচালকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কি করবেন? প্রযুক্তির মন্দ ব্যবহার বন্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করার পেছনে বিপুল অর্থ ও সময় অপচয় না করাই হবে সরকারের পক্ষে যুক্তিযুক্ত অবস্থান। এ সঙ্গে বলব, এতে কিন্তু কোন পরাজয় নেই, হেরে যাওয়া নেই, বরং বুদ্ধিমানের প্রমাণ মিলবে যে, ভুল ও অপকর্ম রোধ করতে প্রয়োজনে সরকার সিদ্ধান্ত বদল করে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।
সবশেষে, প্রধানমন্ত্রীকে অগতির গতি হিসেবে অনুরোধ করব ৫ম ও ৮ম শ্রেণীর শেষের একদম অনাবশ্যক, ব্যয়বহুল পাবলিক পরীক্ষা দুটোকে বন্ধ অথবা আপাতত স্থগিত ঘোষণা করুন এবং নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে ‘নীতিবান’ মানুষ হওয়ার সুযোগ প্রদান করুন। অবশ্যই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁস রোধের প্রযুক্তিসহ সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই এবং মিত্র ও শত্রুর সমালোচনা বন্ধ করার পথই তো গ্রহণ করতে হবে এবং এতেই নিহিত আছে সরকার ও জাতির স্বার্থ।

লেখক : গবেষক ও শিক্ষাবিদ
সম্পাদক সমীপে
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই
চাঁদপুর সদরের ছোট গ্রাম চাপিলার অধিবাসী আমি হারুন অর রশিদ তালুকদার। পিতা মৃত হাজী হাছান আলী তালুকদার জীবদ্দশায় ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। অভাব অনটন ছিল না বললেই চলে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী-মুক্তিকামী বাঙালী জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ল পাক হানাদারের বিরুদ্ধে। বসে থাকতে পারিনি আমিও। ঘরে ছোট এক শিশু সন্তান রেখেই চলে গেলাম ভারতের সরিলাম প্রশিক্ষণ শিবিরে। ক্যাপ্টেন শর্মার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত হয়ে মুক্তিবাহিনীর দল বৃত্তি ফৌজে যোগ দেই। কঠোর সংগ্রামের পর পেয়ে গেলাম একটি স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু হায়! মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় কোথায়ও আমার নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরও আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সাত সন্তানের পরিবার নিয়ে সুখেই আছি আমি। পরিবারে অভাব-অনটন নেই। সকল সন্তানই ভাল আছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোন সুযোগ-সুবিধার দরকার নেই আমার। জীবনের শেষ মুহূর্তে যা দরকার তা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ওই অঞ্চলের সকল মুক্তিযোদ্ধা এমন কি সকল জনগণ। প্রমাণ নেই শুধু রাষ্ট্রীয় তালিকায়। ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার আবেদন করলেও সরকারি কর্তৃপক্ষ এর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। জেলা মুক্তিযোদ্ধা অফিস ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা অফিস একটিবারের জন্যও যোগাযোগ করেনি। তাই জীবনের শেষ সময়ে এসে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই।

হারুন অর রশিদ তালুকদার
ফারাক্কাবাদ, চাঁদপুর




আকুল আবেদন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির জনক। জাতির জনক হলো দেশের সব মানুষের জনক। জাতির জনককে কি লিয়ভাবে ব্যবহার করা কি ঠিক? সমীচীন? দলীয়ভাবে ব্যবহার করলে তো তিনি দলীয়ই রয়ে গেলেন। দলীয় সভায়, দলীয় মিছিলে, দলীয় পোস্টারে, ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর ছবি এবং স্লোগানে বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করা কি ঠিক?
সদ্য এ জাতি দেখাল দলীয় কিছু লোক একটি জায়গা দখল করে সেখানে কয়েকটি বাঁশের খুঁটি গেড়ে একটি খুঁটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি এবং আপনার ছবি টাঙ্গিয়ে রেখেছে। এইভাবে বঙ্গবন্ধুকে যেখানে সেখানে ব্যবহার করা কি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা এবং দলীয় গণ্ডিকে সীমাবদ্ধ রাখা নয়? আপনার নিকট অনুরোধ যেভাবে ব্যবহার করলে বঙ্গবন্ধু জাতির জনক আসনে সম্মানের সঙ্গে আসীন থাকতে পারেন সেই ব্যবস্থা করুন।
আমির হোসেন
লক্ষ্মীপুর

শিশুদের বাঁচান

দার্শনিক থেলিস বলেন, পানি থেকে জগতের উৎপত্তি এবং পানিতে জগতের পরিণতি ঘটবে। কিন্তু জগতের পরিণতির পূর্বেই আমরা একটু অসচেতনতার জন্য পানি দ্বারা নিজেদের জীবন হারাচ্ছি। ছোট শিশুরা যখন বসা থেকে দাঁড়ানো শেখে বাড়ির আঙিনা দিয়ে ছোট ছোট পায়ে হাঁটে তখন আমরা বাবা মা, দাদা দাদিরা শিশুদের রেখে নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বাড়ির পাশে পুকুর বা ডোবাতে শিশুরা মনের অজান্তে চলে যায় এর পরিণতিতে ঘটে মৃত্যু।
তার পরও সচেতনতার অভাব আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। শিশুদের যখন পুকুরে বা ডোবাতে পাওয়া যায় তখন আমরা শিশুদের ক্লিনিক বা বেসরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাই। অনেক সময় অনভিজ্ঞ ডাক্তার শিশুদের একটু নড়াচড়া করান এবং শিশুদের মৃত্যু বলে ঘোষণা দেন। পানিতে পড়া শিশুদের অনেক সময় দম বা শ্বাস আটকে থাকে। আমরা লবণ দিয়ে হাত বা পা মেসেজ করলে অনেক সময় দেখা যায় শিশু নড়ে উঠে। তখন আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। কিন্তু আমাদের জানা উচিত যে, প্রাথমিকভাবে আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে পারি। শিশুদের পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করতে পারি। বড়দের মাথায় নিয়ে ঘুড়িয়ে পানি বেড় করে আমরা শিশুদের বাঁচাতে পারি।
সর্বোপরি আমাদের সচেতনতাই আমাদের শিশুদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে। আমরা পুকুর বা ডোবার পাশে বেড়া দিয়ে শিশুদের পুকুরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারি। আমরা সর্বদা শিশুদের প্রতি খেয়াল রেখে যতœ নিয়ে শিশুদের পানি থেকে দূরে রাখতে পারি।
জিএএ মুবিধ
ঠাকুরগাঁও

জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ
করতে হবে

বাংলাদেশে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে ভয় হয় এই ছোট্ট জায়গাতে এত মানুষকে সুন্দরভাবে বসবাস করার সুযোগ হবে কি? সরকার চীনের মতো বাংলাদেশের জনসংখ্যা রোধে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে যদি বিষয়টি গুরুত্ব অনুধাবন করে। পাকিস্তান আমলে পরিবার-পরিকল্পনা কর্মীদের বাসায় যেয়ে জনসংখ্যা রোধে মহিলাদের উপদেশ পরামর্শ শুধু দিতেন না জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনা পয়সায় বিতরণ করতেন। এটা এখন দেখা যায় না। রেললাইনের পার্শ্বে বা রাস্তাঘাট ও ফুটপাতে এমন কি বস্তিতে বস্তিতে যে হারে বাল্যবিয়ে হচ্ছে আর পাশাপাশি জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু। অথচ এদের কাছে কোন পরিবার-পরিকল্পনা কর্মী যায় না। পরিবার-পরিকল্পনা অধিদফতরের কাজ কি? এই বিভাগটি প্রয়োজনে দেশের স্বার্থে এক্ষেত্রে প্রাইমারি স্কুলের মহিলা শিক্ষিকাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। আরও পারে মসজিদ মাদ্রাসার ইমাম ও শিক্ষকদের।
মনে রাখা উচিত আমাদের দেশের দিন দিন জনসংখ্যা যে হারে বেড়েই চলছে তাতে চাষাবাদের জমি কমছে, কমছে উৎপাদন খাদ্য রফতানির পরিবর্তে করতে হবে আমদানি। বেকারত্ব বাড়বে বিধায় অপরাধীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর হয়ে পরবে। অসৎ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে উঠবে। নিরাপত্তার অভাবে জনগণ আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। বস্তিতে সন্ত্রাসী বাড়ছে। সরকারকে পুলিশের এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে কমিটি গঠন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। দেশে কোন ক্ষেত্রে
যেন অপরাধীর সংখ্যা বাড়তে না পারে সেজন্য থানায় থানায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। অপরাধীদের যেই প্রশ্রয় দেবে তারই ক্ষতি হবে বেশি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য থানা পুলিশকে আজ এগিয়ে আসতে হবে।
এক্ষেত্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সর্বক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। উপায় নেই এই দেশকে দ্রুত উন্নতি করতে হলে জনসংখ্যা রোধ করার কোন বিকল্প নেই। জনসংখ্যা রোধে চীনের উদ্যোগকে কাজে লাগাতে হবে। চীনে আজ গরিব লোকের সংখ্যা থেকে বিত্তশালী প্রচুর। নেই কোন অপরাধ। কারণ তাদের মধ্যে দেশ-বিদেশে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে চীন আজ শক্তিশালী অর্থনীতির ওপর গড়ে উঠেছে। আমরাও একদিন পারব যদি জনসংখ্যা কমাতে পারি।
মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী
ফরিদাবাদ, ঢাকা

প্রসঙ্গ ভারতীয় ছবি

ঢাকায় নির্মিত ছবিগুলো দেশে বাজার পাবে না বলে ১৯৬৫ সালের পর থেকে আমাদের দেশের সর্বত্র প্রতিটি ছবি ঘরে ভারতীয় ছবি প্রদর্শনী বন্ধ রয়েছে। ঢাকার চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্র তারকা, কলাকুশলীদের ঘোর আপত্তির কারণেই ভারতীয় ছবি দেশের কোন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর আর কোন সুযোগ নেই। বছর দুই আগে কথা উঠেছিল, ‘ভারতীয় ছবি আসছে’Ñ এ সংবাদটি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার চলচ্চিত্র জগতের সবাই সেদিন সোচ্চার হয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। তাদের প্রতিবাদের কারণে ভারতীয় ছবি আনার বিষয়টি ওখানেই শেষ হয়ে যায়। তবে কথা হলো, কতিপয় দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাতার দ্বৈত আচরণ দেখে।
ইদানীং পত্রিকায় প্রকাশÑ ভারতীয় চিত্র তারকা ‘পাওলি দামকে’ এনে ঢাকার এক চিত্র নির্মাতা ছবি নির্মাণ শুরু“ করে দিয়েছেন। ভারতীয় ছবি আসতে দেয়া হবে নাÑএরাই বলে আর এরাই কিনা ভারতীয় তারকা এনে ছবি নির্মাণ করছেন। এতে কি আমাদের দেশের চিত্র তারকাদের ভাত মারা হচ্ছে না? ভারতীয় চিত্র তারকা পাওলি দাম ওই দেশে ‘বি-গ্রেডের’ তারকা।
অশ্লীলতার প্রতিকৃতিও বলা হয় তাকে। তাহলে অশ্লীল তারকা এনে ঢাকায় ছবি নির্মাণ কেন? এর বিরুদ্ধে দেশের চিত্র তারকারা কেন প্রতিবাদ জানাচ্ছেন না, কেনই বা হচ্ছেন না সোচ্চার। যারা ভারতীয় তারকা এনে ছবি বানাচ্ছেন তাদের ছবি যেন দেশের কোন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে না পারেÑ এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন কী? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশের স্বার্থে শিল্পীদের স্বার্থে বিষয়টি তলিয়ে দেখুন।
লিয়াকত হোসেন খোকন
রূপনগর, ঢাকা
বিজয়ের মাস
‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল, রক্তলাল/জোয়ার এসেছে জনসমুদ্রে, রক্তলাল/বাঁধন ছেঁড়ার হয়েছে কাল।’ চূড়ান্ত সময় এসেছিল একাত্তরে সে বাঁধন ছিন্ন করার। সেই লাল সূর্য প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছিল ডিসেম্বরে। আজ ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিন। শুরু হলো বিজয়ের মাসের যাত্রা। বাঙালীর জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্ব¡লতম একটি মাস। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে গৌরবের পথ ধরে এসেছিল বিজয়ের তূর্যধ্বনি। বীর বাঙালীর বিজয়ের মাসের সূচনার প্রথম দিনটি ‘মুক্তিযোদ্ধা দিবস।’ গত কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিকরা এ দিবসের উদ্যোক্তা। ইতিহাসের পথ বেয়ে এসেছিল একাত্তর। সুদীর্ঘ সময়ের আন্দোলন, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে, স্বাধিকারের দাবি হতে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পথ বেঁধে দিয়েছিল একাত্তর। শত সহস্র বছরের বাঙালীর জীবনে প্র্রথম স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা জ্বেলে দিয়েছিল একাত্তর। আর তা এসেছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়। পাকিস্তানীদের শাসন, শোষণের নিগড় ভেঙ্গে বাঙালীর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে ষাট দশকের মাঝামাঝি ঘোষিত হয় ছয় দফা। ছয় দফার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় ছাত্র সমাজের এগারো দফা।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দেশের মানুষের সমর্থনে বিপুল ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু পাকিস্তানী জান্তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। একাত্তরের ১ মার্চ হতে শুরু হয় স্বাধীনতার অভীষ্ট লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। তারই ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু করে ‘অপারেশন সার্চ লাইটের’ নামে। সুপরিকল্পিত সামরিক আগ্রাসনের মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে এবং পাকিস্তানী কারাগারে আটক রাখে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় যুদ্ধ, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। বাঙালী যোদ্ধারা গেরিলা কায়দায় ও সম্মুখ সমরে পাকিস্তানী হানাদারদের পর্যুদস্ত করতে থাকে। ডিসেম্বরে এসে ভারত যুক্ত হয় বাংলাদেশের যোদ্ধাদের সঙ্গে। যুদ্ধে হেরে যায় পাকিস্তানীরা এবং নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আসে বিজয় ১৬ ডিসেম্বরে। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা পত পত উড়তে থাকে। এই স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষকে জীবন দান করতে হয়। সম্ভ্রমহানি ঘটেছে লাখ লাখ মা-বোনের ।
নবীন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাতে যথাযথ ও সঠিকভাবে অবহিত হতে পারে, সেজন্য ১ ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। সরকারীভাবে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি, হলে তার ব্যাপকতা আরও বাড়বে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ নিশ্চিত হবে, সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন হবেÑ বাঙালী জাতি তাই আশা করে। বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের অটুট আন্তরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান।
শীতের পদধ্বনি
শীতের পদধ্বনি সর্বত্র। বেশ ঠাণ্ডা শীতল বাতাস বইছে গত ক’দিন ধরেই। সূর্য প্রায়শই আড়ালে নিচ্ছে আশ্রয়। রাতে ঝরছে শিশির। আর ভোরে কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে সবকিছু। সব মিলিয়ে ঋতুর আগমনের আগেই জেঁকে বসছে শীত। চলছে লেপ-তোশক তৈরি ও মেরামতের কাজও। ধুনুরিদের মৌসুম এখন। শহর নগরের পথে পথে শোনা যায় তাদের হাঁকডাক। শীতের কাঁপন বৃক্ষের পাতায় পাতায়। শীতবস্ত্র নামানো হচ্ছে। শীত ও শীত ঋতুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা অনাদিকাল হতেই বন্ধু ও বন্ধুর উভয় ধরনেরই। শীতের নানা উপহার ও উপাচার মানুষকে যেমন দেয় পরম প্রশান্তি, তেমনি তীব্র শীত নিয়ে আসে দুঃসহ কষ্ট ও যাতনা। প্রশাস্তি ও কষ্টের শীত নিয়ে রচিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে বহু কাব্যগাথা।
হেমন্তের রেশ না কাটতেই শীত উড়ে এসে জুড়ে বসতে শুরু করছে। শীত মানেই হাল্কা রোদের আনাগোনা। শীত মানেই পাতা ঝরার দিন। পত্রপুষ্পশূন্য নানা বৃক্ষের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। হিম হিম বাতাস শরীরে কাঁপন ধরায়। কখনও প্রবল বাতাস এসে হাড় কাঁপায়। আর ছড়ায় হাঁচি-সর্দি-কাশিসহ নানা রোগবালাই। গায়ে জড়াতে হয় ভারি ও মোটা বস্ত্র। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শীত আসে নলেন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধ নিয়ে। আসে পিঠে-পুলির আয়োজন নিয়ে। নানান ধরনের পিঠে মানেই শীতের আমেজে আন্দোলিত হয়ে ওঠা। নগরে নগরে দেখা মেলে পিঠা উৎসবের। পৌষের রোদ পোহানো দুপুর, মাঘের কনকনে হাওয়া আর কুয়াশা-শিশিরের পরিবেশে শীত হয়ে ওঠে কখনও ভয়ঙ্কর। শীতের স্পর্শে উত্তুরে হাড় কাঁপানো বাতাসের ছোঁয়ায় জীবের ভয়াবহ রূপও দেখা যায়। দরিদ্র মানুষের কাছে শীত আসে ভয়াবহতা নিয়ে। সূর্য যেন শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য উত্তাপ দেয় মানুষকে। দরিদ্রজনের আগুন জ্বেলে সম্মিলিতভাবে উত্তপ্ত হওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের চিরপরিচিত, চিরচেনা। শীতের আছে নিজস্ব আমেজ। সেই আমেজে আয়োজন হয় নানাস্থানে মেলার। পৌষ সংক্রান্তির মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। সংস্কৃতির অঙ্গনে নিয়ে আসে অন্যতম আবাহন। যাত্রা-পালাগানের আসরজুড়ে চাদর জড়ানো দর্শকের ভিড় নামে। নগরজীবনেও বসে গানের নানা আসর। খাবার-দাবারেও আসে বৈচিত্র্য। টাটকা শাকসবজি, তরি-তরকারির ব্যঞ্জন রন্ধন শিল্পের স্বাদকে করে মোহময় ও সুস্বাদু। গন্ধে বর্ণে স্বাদে এ এক অতুলনীয় সময়।
কনকনে হাওয়া এসে শরীরে বিঁধে। বয়স্ক মানুষের পক্ষেও শীত সহ্য করা দুরূহ হয়ে পড়ে। প্রতিবছর শীত ও শৈত্যপ্রবাহে মৃত্যুর খবর শোনা যায়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আসে নানা রোগ। অসুখ-বিসুখ হয়ে ওঠে পীড়াদায়ক।
শীতে খেজুর রস খুবই সুস্বাদু। কিন্তু সে রসও এখন হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। গত তিন বছরে খেজুর রস পান করে কোন কোন এলাকায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় অর্ধশত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। শীতে বাদুড় বা পরিযায়ী পাখিরা এ রোগ ছড়ায়।
দরিদ্র মানুষের জীবনযাপনে শীত যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। শীতার্তদের পাশে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান শোনা যায়, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অনেকে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন। গৃহহীন, ছিন্নমূল, নদী সিকস্তি মানুষের জীবনে শীত দারুণ কষ্ট এনে দেয়।
শীত কবিদের সৃষ্টিশীল চেতনা বিকাশে পালন করে বহুমাত্রিক ভূমিকা। শীতের ভোরে কুয়াশার মধ্য দিয়ে মানুষ ছুটে চলে কর্মক্ষেত্রে, জীবন-জীবিকার টানে শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে। থেমে থাকে না জীবনযাত্রা।
আহরণ
জাকার্তার নতুন গবর্নর


ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার নতুন গবর্নর হিসেবে শপথ নিয়েছেন বাসুকি তজহাজা পরনামা। পূর্বসূরিদের সঙ্গে তাঁর একটি বিষয়ে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তিনি একজন খ্রীস্টান ও চীনা বংশোদ্ভূত।
গত কয়েক বছরে ইন্দোনেশিয়ার চীনা বংশোদ্ভূতরা যথেষ্ট সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তবে বাসুকি তজহাজা পরনামা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, গবর্নর হিসেবে তাঁর ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় এতটুকু সমস্যার সৃষ্টি করবে না।
-ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস, ২১ নবেম্বর ২০১৪
আল হাদিস
প্রকৃত বিনয় সকর সদ্গুনেরই উৎস।
[ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত স্যার আবদুল্লাহ সূহরাওয়ার্দীর ‘রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণী’ থেকে।
বাণী চিরন্তনী
যাহা সুসংগত তাহা চিরদিনের নিয়মসম্মত, যাহা অসংগত তাহা ক্ষণকালের নিয়মভঙ্গ।
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জীবনের কোন পথ দিয়ে যখন বিপর্যয় আসে, মুহূর্তের জন্য নিমিষে সব ওলট পালট করে দিয়ে যায়- বন্ধনের দড়াদড়ি কখন যায় টুটে কেউ জানে না।
-কাজী নজরুল ইসলাম
বচন
কিবা জ্যেষ্ঠ কি কনিষ্ঠ
যে বোঝে সেই শ্রেষ্ঠ।
অর্থ : বয়সে ছোট বড়তে কিছু যায় আসে না- জ্ঞান বুদ্ধিতে যে বড় সেই শ্রেষ্ঠ- এ কথা বোঝাতে বলা হয়।
স্মরণীয়
১ ডিসেম্বর
১৯০০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরত-এ খুদার জন্ম।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে বিশ্বের প্রথম মহিলা বাণিজ্যিক বিমান চালিকা দুর্বা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে মার্কিন নিগ্রো নেতা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন শুরু করেন।
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশন সম্প্রচার চালু হয়।
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া স্বল্পপাল্লার পরমাণু অস্ত্র নিরোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে লেখক আবদুল আজিজ আল আমানের ইন্তেকাল।
পরামর্শ
দম্ভ ও অহমিকা মানুষের বড় শত্রু। এ দুটি শত্রুকে পরিহার করুন।
জানা-অজানা
শিলা গৃহ

বিভিন্ন প্রকার পাথর বা কঠিন শিলা দ্বারা নির্মিত গ্রহকে শিলা গৃহ বলা হয়। এতে সাধারণত চুনা পাথর ও বেলে পাথরই বেশি ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ আমেরিকার পার্বত্য অঞ্চলে এ ধরনের গৃহ দেখা যায়।