মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১১, ১৩ পৌষ ১৪১৮
মুজিব কন্যার শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন সম্ভব নয়
আবদুল মান্নান
প্রতিবছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে চেষ্টা করি এ দু'টি দিনে পাকিস্তানের প্রধান সংবাদপত্রগুলো কিভাবে দিন দু'টির ঘটনাপ্রবাহকে মূল্যায়ন করে, তা জানতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় সে দেশের প্রচার মাধ্যমে দিন দু'টি চেপে যাওয়া হয় অথবা এই দিনে হিন্দু ভারত মুসলিম পাকিস্তানকে ষড়যন্ত্র করে ভেঙ্গে ফেলেছে বলে দু'একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। মাঝে মঝে কিছু ব্যতিক্রম যে থাকে না, তা নয়। কোন কোন বিশ্লেষক এখন মনে করেন, একাত্তরের ঘটনাপঞ্জির জন্য মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়ী এবং তাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছে ইয়াহিয়া খান এবং তার সামরিক জান্তা। কারো কারো মতে, পুরো ঘটনার জন্য আইউব, ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও শেখ মুজিব প্রত্যেকে সমানভাবে দায়ী। সবাই নিজের মতো করে একাত্তরকে ব্যাখ্যা- বিশেস্নষণ করার চেষ্টা করেন। প্রতিবছর দু'একজন মনে করেন, একাত্তরের ঘটনার জন্য বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত। এবার এই বিষয়ে আবারও নতুন করে বলেছেন পাকিস্তানের এককালের তারকা ক্রিকেটার ও বর্তমানে পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের প্রধান ইমারন খান। তবে সে দেশের স্কুল-কলেজে বর্তমান প্রজন্মের পাকিস্তানীদের ভুলেও একাত্তরের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সঠিক-সত্য তথ্য জানতে দেয়া হয় না। বছর কয়েক আগে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে গিয়েছিলাম। সেখান হতে আমন্ত্রিত হয়ে গুজরানওয়ালার এক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিৰার্থীদের উদ্দেশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে সেমিনারে যোগ দিতে যাই। প্রায় শ'পাঁচেক শিক্ষার্থী আমার দীর্ঘ একঘণ্টার বক্তৃতা পিনপতন নিরবতার মধ্য দিয়ে শুনেছিল। সেমিনার শেষে তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, তারা প্রায় কেউই জানে না বাংলাদেশ এক সময় পাকিস্তানের অংশ ছিল এবং বাঙালীরা তা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে। তাদের পৰে এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাঙালী দূরে থাক কারো কাছে পরাজিত হতে পারে! ওই শিক্ষার্থীদের অবস্থা দেখে তাদের প্রতি করুণা করা ছাড়া আমার করার আর কিছুই ছিল না।
এবার ১৬ ডিসেম্বর লাহোর হতে প্রকাশিত পাকিসত্মানের প্রভাবশালী দৈনিক 'দি নেশন' পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মাজিদ নিজামীর একাত্তরের ঘটনাপঞ্জির ওপর একটি দীর্ঘ সাৰাতকার ছাপা হয়েছে। নিজামীর বর্তমান বয়স ৮৩ বছর। নওয়াজ শরিফ যখন পাকিসত্মানের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নিজামীকে পাকিসত্মানের প্রেসিডেন্ট করার প্রসত্মাব করেছিলেন। তিনি রাজি হননি। ব্যক্তিগতভাবে এই ভদ্রলোক সাংঘাতিকভাবে ভারতবিদ্বেষী এবং মনে করেন পাকিসত্মানের উচিত আণবিক বোমা ব্যবহার করে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করা। এতে হয়ত পাকিসত্মানের দু'একটি শহর ধ্বংস হবে তবে শেষতক জয় হবে পাকিসত্মানের।
সাৰাতকারে নিজামী বলেছেন, তাঁর সঙ্গে শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল এবং তিনি যখনই পশ্চিম পাকিসত্মানে সফরে যেতেন তাঁর সঙ্গে নিজামী দেখা করতেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হতে মুক্ত হয়ে মুজিব আইউব খানের গোলটেবিলে বৈঠকে গেলে পাকিসত্মানের রাজনীতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে নিজামী দীর্ঘ আলাপ করেন। নিজামী বলছেন, আলাপকালে তাঁর মনে হয়েছে শেখ মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টির ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছেন এবং তাঁর ধারণা হয়েছিল মুজিব পাকিসত্মানের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলেন, মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন যা পরবর্তীকালে তাঁকে দিতে হয়েছিল। তাঁর মতে, মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতার মতো পাকিসত্মানকে অনত্মর থেকে গ্রহণ করেননি বরং তাঁর স্থলে খালেদা জিয়া যদি প্রধানমন্ত্রী থাকতেন তাহলে পরিস্থিতি পাকিসত্মানের অনুকূলে থাকত এবং পাকিসত্মান ও বাংলাদেশের মধ্যে কনফেডারেশন গড়ে তোলা সম্ভব হতো। মাজিদ নিজামীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কী করলে পাকিসত্মান ও বাংলাদেশকে আরো কাছে আনা যায়? তাঁর উত্তর, বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর পাকিসত্মান কখনও মুজিব আর তাঁর কন্যার শাসনামলে এই কাজটি করতে চায়নি; তবে বাসত্মবে মুজিবকন্যা আজীবন ৰমতায় থাকবেন না (অভঃবৎ ধষষ গঁলরন্থং ফধঁমযঃবৎ রিষষ হড়ঃ ংঃধু রহ ঢ়ড়বিৎ ভড়ৎ মড়ড়ফ.) তিনি একাধিকবার এই কথাটির ওপর জোর দিয়েছেন যে বাংলাদেশ এবং পাকিসত্মানের মধ্যে একটি কনফেডারেশন হওয়া উচিত তবে তা মুজিবকন্যা সে দেশের রাষ্ট্রৰমতায় থাকার সময় সম্ভব নয় এবং তার জন্য বেগম জিয়াকে ৰমতায় আসতে হবে। তিনি আরো মনে করেন, বাংলাদেশ এবং পাকিসত্মানের মধ্যে একটি সামরিক চুক্তি হওয়া উচিত এবং তা প্রয়োজনে উভয়ের কমন 'শত্রম্ন' ভারতের বিরম্নদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এটি পরিষ্কার যে শুরম্ন থেকেই পাকিসত্মান কখনও বাংলাদেশের জন্মকে মেনে নেয়নি এবং পাকিসত্মান সব সময় চেষ্টা করেছে বাংলাদেশে বিএনপির মতো একটি পাকিসত্মানবান্ধব সরকার ৰমতায় থাকুক। এটি অত্যনত্ম পরিষ্কার, অতীতে বাংলাদেশে পাকিসত্মানের কুখ্যাত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই'র একটি শক্ত অবস্থান ছিল এবং কোন কোন ৰেত্রে তা এখনও আছে। অভিযোগ আছে, ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় আইএসআই'র নয় শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁদের একমাত্র কাজই ছিল আওয়ামী লীগকে পুনরায় ৰমতায় ফিরে আসার পথ রম্নদ্ধ করা। কোন কোন সূত্রের মতে (ঋৎরফধু ঞরসবং/চধশরংঃধহ), এ সময় এ কাজের জন্য আইএসআই বাংলাদেশে দশ লাখ ডলার ব্যয় করে । আওয়ামী লীগের বিরম্নদ্ধে যে এসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে তা তারা সে সময় অনুধাবন করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। বিএনপি যে একটি পাকিসত্মানবান্ধব দল এটি কেউ অস্বীকার করবে না। বেগম জিয়ার প্রথম শাসনামলে পাকিসত্মানের আইএসআই'র শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল জানজুয়ার মৃতু্য হলে তিনি সকল রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার ভঙ্গ করে তাঁর জন্য শোকবার্তা প্রেরণ করেন। উলেস্নখ্য, জানজুয়া একাত্তর সালে বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন এবং বাঙালী নিধনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ।
বাংলাদেশে পাকিসত্মানের সবচাইতে বড় সুহৃদ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত; তবে তাদের বিরম্নদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকার কারণে তারা খোলাখুলি পাকিসত্মানের পৰাবলম্বন করতে পারে না বলে তারা তাদের মিত্র বিএনপিকে নানাভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে এবং সফল হয় । আর যেহেতু বিএনপি দল হিসেবে শুরম্ন থেকেই পাকিসত্মানী ভাবধারার লোকজন নিয়ে গঠিত হয়েছিল সেহেতু তারা সহজে জামায়াতের ফাঁদে পা দেয়; যার সর্বশেষ উদাহরণ গত ১৮ ডিসেম্বর রাজধানী ও সিলেটসহ দেশের আটটি জেলায় সংঘটিত হঠাৎ করে চোরাগোপ্তা হামলায় অত্যনত্ম সুকৌশলে বিএনপিকে টেনে আনা এবং তাদের মাঠ ছেড়ে দিয়ে নির্বিঘ্নে সটকে পড়া। এটি মোটামুটি সবাই স্বীকার করবেন, বর্তমানে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত শুধু চরম সঙ্কটের মুখোমুখিই নয় বরং তাদের অসত্মিত্বই অনেকটা বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে ইতোমধ্যে তাদের পাঁচ শীর্ষ নেতা বিশেষ ট্রাইবু্যনালে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। হয়ত আর কয়েক দিনের মধ্যে আরো দু'একজন গ্রেফতার হতে পারে। সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সব সময় সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। তাদের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল তা এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে অজানা নয় । দেশের মানুষ সব সময় এই অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত ছিল তাদের বিচার চেয়েছে। সেই বিচার দেরিতে হলেও বর্তমানে শুরম্ন হয়েছে। বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের মৃতু্যদ-ও হতে পারে। তা যদি হয় তা হলে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত অনেকটা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, তবে তা হবে না। কারণ, তাদের আশ্রয় দেবে বিএনপি। জামায়াতের পকেটে সর্বোচ্চ ৬-৭ % পর্যনত্ম ভোট রয়েছে, আর রয়েছে বিরাট অর্থভা-ার । অর্থ উপার্জন করার জন্য এই মুহূর্তে তাদের রয়েছে ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, কিন্ডারগার্টেন স্কুলসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান । বারোটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় তারা নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার আনত্মর্জাতিক অঙ্গনে ৰতিগ্রসত্ম করার জন্য তারা তাদের বিদেশী সুহৃদদের কাছ হতে সংগ্রহ করেছে কোটি কোটি ডলার, যার মধ্যে আইএসআই'র বিরাট অনুদানও আছে বলে বিভিন্ন সূত্র হতে জানা গেছে।
বর্তমানে বিশেষ ট্রাইবুু্যনালে চলমান বিচার ব্যবস্থাকে ভ-ুল করার জন্য প্রথম বড় ধরনের বিএনপি-জামায়াতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল গত ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন বিএনপি মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনার নাম করে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সমাবেশ ডেকেছিল । বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের জন্য এটি ছিল অনেকাংশে ব্যতিক্রম। কারণ বিজয় দিবস শেষ হওয়ার দু'দিন পর প্রগতিশীল গণতন্ত্রী পার্টি এমন একটি সমাবেশ ডাকতে পারে, বিএনপি নয়। সমাবেশের সময় ছিল বেলা বারোটায়। প্রশাসন তাদের সমাবেশ করার জন্য অনুমতিও দিয়েছে এবং শানত্মিপূর্ণভাবে সমাবেশও হয়েছে, যাতে দলীয়প্রধান বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকা হতে আগত মুক্তিযোদ্ধাদের সূর্যোদয়ের আগেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরম্নত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্বাগতম জানানোর নাম করে যুবদল ও ছাত্রদলের একশ্রেণীর নেতাকর্মী সেদিন যে তা-ব সৃষ্টি করেছিল তা আসলে শুরম্ন করেছিল ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। যাঁরা বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন তাঁরা ভাল করেই জানেন ছাত্রশিবির ছাড়া সূর্যোদয়ের আগে কোন ছাত্র বা যুব সংগঠন তাদের কোন কর্মকা- শুরম্ন করে না। আর বিএনপি যদি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করতই তাহলে তারা তা আগে প্রকাশ-প্রচার করত; যা তারা করেনি। এটি এখন পরিষ্কার যে, তাদের দলের হাওয়া ভবনসম্পৃক্ত কিছু নেতা পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে বিরাট অঙ্কের অর্থের সংযোগে জড়িত ছিল ।
শেষতক হলোটা কি? ১৮ তারিখ জামায়াত-শিবির ঢাকায় যখন তা-ব শুরম্ন করল সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে যুবদল- ছাত্রদলের কর্মীরা মাঠে এসে গেল তখন তাদের আইনশৃঙ্খলা রৰাকারী বহিনীর মুখোমুখি রেখে তারা নিরাপদে সটকে পড়ল। এখন মামলা মাথায় নিয়ে অনেকে ঘরছাড়া আর পুলিশ হেফাজতে আছে কিছু বিএনপি নেতাকর্মী । বিএনপি কেন জামায়াত-শিবিরের এমন একটি আত্মঘাতী পরিকল্পনার অংশীদার হতে গেল বা তাতে ধরা দিল? তার একটাই কারণ_তারা ছলেবলে কৌশলে বর্তমান সরকারকে ৰমতাচু্যত করতে চায়। মানবতাবিরোধী আর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার বানচাল করতে চায় (এই মুহূর্তে দু'জন বিএনপি নেতাও বিচারের মুখোমুখি) এবং নানামুখী কর্মপরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেরা ক্ষমতায় আসতে চায় এবং একটি পাকিস্তানবান্ধব সরকার গঠন করতে চায় এবং আগামী দিনে কোন এক সময় বাংলাদেশের সঙ্গে মাজিদ নিজামীর মতো ব্যক্তিদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পাকিস্তানের কনফেডারেশন গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায় এবং এ কাজে তারা জামায়াতের অর্থ আর সংঘাত সৃষ্টি করার ৰমতাকে কাজে লাগাতে চায়। এ ব্যাপারে সরকার কতটুকু ওয়াকিবহাল তা কোটি টাকার প্রশ্ন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার স্বপ্নে বিভোর ছিল, পর্দার অনত্মরালে যে অন্য নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার অপেৰায় ছিল তা ঘুণাৰরেও টের পায়নি। এবার টের পাবে কিনা তা আগামীতে বোঝা যাবে ।
সকল পাঠককে খ্রিস্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক
গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে কবে?
ড. হারুন রশীদ
রাজধানীতে যাঁরা বাস করেন তাঁদের কাছে দিন দিন অসহনীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে গণপরিবহন। শুধু তাই নয়, ভোগান্তির তালিকা দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখানকার পরিবহন ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, রাস্তার সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। যাচ্ছেতাইভাবে সবকিছু চলাটাই যেন অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।
সমস্যা যে হারে বাড়ছে সমাধান সে গতিতে এগুচ্ছে না। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে অনেক আগেই। কোথাও যাওয়ার জন্য নাগরিকদের রাস্তায় নেমেই এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। গনত্মব্যে যাওয়ার জন্য তাড়া আছে কিন্তু যানবাহনের তীব্র সঙ্কট। অফিসে যাওয়া, বাচ্চার স্কুল, বিয়ে-দাওয়াত পার্টিতে যাওয়া, এমনকি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া_প্রয়োজনীয় কোন গন্তব্যেই যে সময়মতো পৌঁছা যাবে তার গ্যারান্টি নেই। বাসে উঠতে গেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ট্যাঙ্কি্যাব অপ্রতুল, ভাড়াও অতিরিক্ত। সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারবহির্ভূত অধিক ভাড়া নিয়েও প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যেতে নারাজ। এর বাইরে বিকল্প যানবাহনও অপ্রতুল। এ অবস্থায় মানুষজনের ভোগানত্মির সীমা-পরিসীমা নেই। যানজটের কারণে তো রাজধানী স্থবির হয়ে থাকে অধিকাংশ সময়। অথচ একটি দেশের রাজধানীর কর্মচঞ্চলতা যদি এভাবে রাসত্মাতেই নষ্ট হয় তাহলে সেই দেশের ভূতভবিষ্যত যে কি তা কি আর বলার অপেৰা রাখে।
যানজটের ফলে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। এছাড়া যানজট একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়ায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোন উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিনই অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ। যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘি্নত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ৰতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ৰতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রম্নটে যাত্রীদের চলাচলে কমপৰে ৩ কর্মঘণ্টা সময় অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোন উপায় নেই। বিভিন্ন সময় নানামুখী কর্মসূচী-পরিকল্পনা হাতে নেয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুব কমই। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। অথচ দুবির্ষহ যানজটের জন্য পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকেই দায়ী করা হয়।
রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে পালস্না দিয়ে বাড়ছে গাড়িঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাসত্মাঘাট বাড়ছে না। ফলে যানজট এক অনিবার্য বাসত্মবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করায় যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ, প্রাইভেট গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র পার্কিং নিষিদ্ধ করা, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীপথ এবং ঢাকার ভেতরের খাল দখলমুক্ত করে নৌপথের উন্নয়ন করা, রিকশামুক্ত সড়কসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়। এগুলো নিয়ে কথাবার্তা যতটা হয় কাজ ততটা যে হয় না তা যানজটের বর্তমান হালই বলে দিচ্ছে।
কিন্তু যানজট এখন এমন এক অবস্থায় পেঁৗছেছে, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। যানজট বর্তমান নগরবাসীকে স্থবির ও অচল করে রেখেছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফল হবে অত্যনত্ম ভয়াবহ। এজন্য পরিবহন খাতে একটি স্বসত্মিদায়ক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা অত্যনত্ম জরম্নরী হয়ে পড়েছে। এ জন্য অবকাঠামো, সুশাসন, অযান্ত্রিক পরিবহন, পরিবহনের পরিদর্শন ও ব্যবস্থাপনা, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ৰেত্রে গুণগত পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্য বন্ধ এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন বিআরটিসিকে সচল করতে হবে।
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে। জীর্ণশীর্ণ বাস সিটিংয়ের নামে 'চিটি'ং করছে যাত্রীদের সঙ্গে। ব্যসত্ম সময়ে লোকাল বাসগুলোও হয়ে যাচ্ছে সিটিং বাস। এতে একদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে অন্যদিকে লোকাল বাসে সিটিংয়ের নামে স্বল্পযাত্রী বহন করায় শত শত যাত্রীর অপেৰাকে আরও দীর্ঘতর করছে তারা। মানহীন ভাঙ্গাচোরা বাস, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নানা অনিয়মের বেড়াজালে যাত্রীদের বন্দী করছে বাস মালিকরা। সেবা নয়, মুনাফাই এদের আসল উদ্দেশ্য। এ অবস্থায় একটি গতিশীল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। এ জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিআরটিসিকে সচল করতে হবে।
দেশে যদি সত্যিকার অর্থে গণপরিবহন বলে কিছু থাকত তাহলে বেসরকারী বাস মালিকরা যে এই নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি করতে পারত না, সেটি বলার অপেৰা রাখে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠতেও এই চক্র প্রবল বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) বাস চলাচলেও চরম অসহযোগিতা করে পরিবহন খাতে একচেটিয়া প্রাধান্য বজায় রাখছে বেসরকারী পরিবহন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে যাত্রী ভোগানত্মির কোন সীমা পরিসীমা নেই। অপরদিকে বিআরটিসি নিজেও যেন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্রমাগত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিআরটিসি বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জনসাধারণের ভোগানত্মি বেড়েছে। একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় বেসরকারী পরিবহন মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছে। পরিবহন খাতকে নানাভাবে জিম্মি করে রাখছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিআরটিসিকে সচল করার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু কাজটি যে অতটা সহজ নয় তা তো এর আগের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই পরিষ্কার। বিআরটিসিকে কোণঠাসা করতে বেসরকারী পরিবহন মালিকরা এককাট্টা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় উত্তরাঞ্চলে বিআরটিসির সার্ভিস চালু হলে ওই অঞ্চলের মানুষজনের কাছে তা ব্যাপক সমাদৃত হয়। কিন্তু বেসরকারী পরিবহন মালিকদের তা চৰুশূলের কারণ হয়। তারা জনপ্রিয় এ সার্ভিস বন্ধে নানা ধরনের তা-ব চালায়। এমনকি ধর্মঘট ডেকে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। অবশেষে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। অথচ ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ বলে রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিসির বাস দেশের যে কোন স্থানে চলাচলের অধিকার রাখে। সরকার দেশে স্বল্পমূল্যে দ্রম্নত, দৰ, আরামপ্রদ, আধুনিক ও নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লৰ্য নিয়ে '৮০'র দশকে বিআরটিসি বাস সেবা চালু করে। কিন্তু এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে নানা কুচক্রী মহলের দৃষ্টি পড়ে। ২০০৪ সালে তৎকালীন জোট সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী বেসরকারী পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে এক চুক্তি করেন। পরবর্তীতে এই চুক্তির দোহাই দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন রম্নট থেকে বিআরটিসির বাস উঠিয়ে দেয়া হয়।
রাজধানীতেও বিআরটিসির পরিবহন সেবা ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে। যদিও প্রতিটি সরকার এসেই নতুন করে বিআরটিসিকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে। বর্তমান সরকারও কয়েক দফা বিআরটিসির নতুন বাস রোডে নামায়। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই অজানা কারণে বাসগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। দোতলা ভলভো বাসে সামান্য ত্রম্নটি দেখা দিলেই তা মেরামত না করে বন্ধ করে দেয়া হয়। বাস মেরামতের চেয়ে নতুন বাস কেনার দিকেই আগ্রহ বেশি বিআরটিসি কর্তৃপৰের। এতে টুপাইস কামানো যায়। তাছাড়া গণহারে লিজ দেয়ার ফলেও বিআরটিসিতে চলছে যাচ্ছেতাই কারবার।
আসলে মুক্তবাজারের নামে বেসরকারী পরিবহন মালিক শ্রমিকরা এখন পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ফেলেছে। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে হলে বিআরটিসিকে সচল করার কোন বিকল্প নেই। সারাদেশে বিআরটিসির বাস চলতে দিতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যায়। বিশেষ করে রাজধানীতে বাসের সংখ্যা বাড়ানো একানত্ম অপরিহার্য। জনস্বার্থে বিআরটিসিকে সচল করা এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার রাসত্মায় একই সঙ্গে চলছে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ধরনের বিভিন্ন যানবাহন। ফলে এক জগাখিচুড়ি অবস্থার কারণে যানজট এখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগুনো প্রয়োজন। সড়ক পথের উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নৌপথগুলো চালু করা দরকার। নৌপথে যাতায়াত অপেৰাকৃত সসত্মা এবং স্বসত্মিদায়কও বটে। এ জন্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ অন্যান্য নদীর দখল-দূষণ বন্ধ করতে হবে। ঢাকার খালগুলো পুনরম্নদ্ধার করে নৌরম্নট চালু করা যায়। এছাড়া মেট্রোরেল চালু করেও রাজধানীর গণপরিবহনের চাহিদা অনেকটাই মেটানো সম্ভব। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এবং যানজট দূর করে স্থবির ঢাকাকে বদলে না দিতে পারলে দেশের কাঙ্ৰিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী নানামুখী পদৰেপ গ্রহণ করতে হবে।
আশার কথা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের সময়ে কিছু কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। রাজধানীতে এই মুহূর্তে চলছে তিনটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ। এবং কাজ শুরম্নর অপেৰায় আছে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল সড়ক, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস র্যাপিড ট্রানজিট আরও চারটি আন্ডারপাস এবং সম্ভাব্যতা যাচাইপর্বে রয়েছে মেট্রোরেল। এসব প্রকল্প বাসত্মবায়ন হলে যানজটের নগরী ঢাকার চিত্র বদলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজধানীর উত্তর-দৰিণ দুই প্রানত্মে একসঙ্গে চলছে তিনটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ। যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিসত্মান হয়ে পলাশী, কুড়িল ক্রসিং এবং মিরপুর থেকে ক্যান্টনমেন্ট হয়ে স্টাফ রোড পর্যনত্ম দ্রম্নতগতিতে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা। মিরপুরের মাটিকাটা থেকে সেনানিবাসের ওপর দিয়ে এয়ারপোর্ট রোড পর্যনত্ম ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া এয়ারপোর্ট রোডের বনানী রেল ক্রসিংয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নির্মাণ হতে যাচ্ছে ওভারপাস। ফ্লাইওভার, উড়াল সড়কের পাশাপাশি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। ঢাকা ও এর চারপাশে সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং উড়াল সেতু, রেল ওভারপাস, রোড আন্ডারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকার চিত্র নিশ্চিতভাবেই পাল্টে যাবে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ভেঙ্গে দু'টি মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। এবং দু'জন প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দু'টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা তাঁদের কথায় আশ্বস্ত হতে চাই। সেই সঙ্গে চাই তাঁদের কথা ও কাজের মিল থাকুক। যে সমস্ত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হাতে নেয়া হয়েছে তাও যথাযথভাবে-যথাসময়ে বাস্তবায়ন হোক। কোন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে এগুলো যেন আবার আটকে না যায়।

harun_press@yahoo.com
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের অধিকার সমুন্নত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ক্রিসমাস ২০১১ উদযাপনের প্রাক্কালে খ্রীস্টান এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ অঙ্গীকার করেন। বাংলাদেশকে বাসযোগ্য ভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেন তিনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রৰার জন্য প্রয়োজন সবার আন্তরিক থাকা। প্রতিটি ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগের নিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরির কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ সব সময়ই শান্তি ও সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বাস করে আসছে যুগ যুগ ধরে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কোন সময়ই আমাদের গ্রাস করতে পারেনি। ধর্মীয় গোঁড়ামি আমাদের সমাজকে ভাগ করে ফেলতে পারেনি। কখনও কখনও দুষ্টচক্র সাম্প্রদায়িকতার ছোবল দিতে চেষ্টা করলেও বাঙালী তার স্বভাবসুলভ আন্তরিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা দিয়ে সে সঙ্কট কাটিয়ে উঠেছে। তাই ধর্মীয় উগ্রতা, জঙ্গীবাদ স্থায়ী শিকড় গাড়তে পারেনি বাংলাদেশের মাটিতে। মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রৰায়, ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে সব সময়ই জোটবদ্ধ হয়েছে। আমাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগোতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রৰা। এর গুরুত্ব অনুধাবন করা প্রয়োজন সবার। কারণ সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় বিভেদ আমাদের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে। যার ফলে ৰতিগ্রসত্ম হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং গণতন্ত্র পনুরম্নদ্ধারের পথে আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের মানুষ কোনদিন মেনে নেননি। তার প্রমাণ নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে ভোটাররা সব সময়ই প্রত্যাখ্যান করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্রও ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা। আমাদের সংবিধানেও নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যক্তিরই নিজের পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। ধর্মের স্বাধীনতাও স্বীকৃত।
বর্তমান সরকার সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রৰার পৰে। এবং ধর্মীয় উগ্রবাদকে কখনোই তারা প্রশ্রয় দেয়নি। বরং ধর্মীয় উগ্রতা এবং জঙ্গীবাদ নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টির প্রতি নজর দিয়েছে। সেই সঙ্গে সব ধর্মীয় সম্প্রদায় ধর্মমত ও শ্রেণীর কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। তাই আমরা আশা করতে পারি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রৰার আহ্বান শুধু কাগুজে কথা নয়। বরং এৰেত্রে রয়েছে সরকারের আন্তরিকতা। কারণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রৰার মাধ্যমেই সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
কাঁচপুর সেতু ঝুঁকিতে
দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কাঁচপুর সেতু বর্তমানে মারাত্মক হুমকির মুখে। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, এ সেতু যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার সড়কপথের যোগাযোগ এই সেতুর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে; দিবারাত্রি এই সেতুর ওপর দিয়ে বাস-ট্রাকসহ নানা ধরনের ভারি যান চলাচল করে থাকে। অথচ এ ধরনের কর্মব্যস্ত সেতুর জন্য যেমন নিয়মিত সংস্কার কার্যক্রম চালু থাকা উচিত- তেমনটি এ সেতুর ৰেত্রে হয়নি।
জানা গেছে, গত ৩৩ বছরে এই সেতুতে বড় ধরনের সংস্কার হয়েছে মাত্র দু'বার। এ ধরনের অবহেলা ও অব্যবস্থার কারণে সেতুর তিনটি পিলারের চারপাশ থেকে ১০ মিটার পর্যনত্ম মাটি সরে গেছে। সেই সঙ্গে সেতুর সংযোগস্থলের ইস্পাতের পেস্নট ও নাটবল্টু খুলে গেছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটির ভবিষ্যত নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকের মনে গভীর আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। কারও কারও মনে ইতোমধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, সেতুটি হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হলে কারা দায়ী হবে? এ ছাড়া যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের গত তিন বছরের দায়িত্বহীনতা নিয়েও সবার মনে ৰোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা কি যথাযথভাবে সড়ক ও সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী নন? অথচ তাঁদের এ দায়িত্বহীনতার কারণে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংস্কার ও মেরামতের অভাবে দেশে অনেক সড়ক ও সেতুই বর্তমানে ব্যবহারের প্রায় অনুপযুক্ত। এ জন্য দায়ী কারা? অথচ স্বল্প সময়ের মধ্যে এ সব সড়ক ও সেতুর মেরামত সম্ভব নয়। তাই সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি সেতু ও সড়ক মেরামতের কাজ অবিলম্বে শুরু করা। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে কাঁচপুর সেতুসহ আরও কয়েকটি সেতুর মেরামতের বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এই সেতুটি দেশের পূর্বাঞ্চলীয় ১৮টি জেলার মানুষের রাজধানীতে প্রবেশের একমাত্র পথ। এর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণে কাঁচপুর সেতু কিছুকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতির জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
কাদের দায়িত্বহীনতার কারণে কাঁচপুর সেতু বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ-তাদের অবশ্যই চিহ্নিত করা দরকার; তাদের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরম্নরী। কারণ একটি গণতান্ত্রিক দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাসত্মি দেয়া অপরিহার্য। সেতুটির ধারণ ৰমতা ২০ টন। অথচ বর্তমানে এ সেতুটির ওপর দিয়ে ৭০ টন পর্যন্ত মালামাল নিয়ে যানবাহন পার হচ্ছে। এ কারণে প্রতিদিনই সেতুর ৰতি হচ্ছে।
শুধু কাঁচপুর সেতু নয়; ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নির্মিত মেঘনা সেতু বর্তমানে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সেতুর এ হাল কেন? আসলে সর্বোচ্চ মহল থেকে এ ধরনের অব্যবস্থার বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত অপরিহার্য। এ ৰেত্রে এতটুকু অবহেলা কাম্য নয়।
আহরণ
ওবামার আহ্বান প্রত্যাখ্যান
ইরান দাবি করেছে তারা ৪ ডিসেম্বর তাদের সীমান্ত এলাকা থেকে একটি মার্কিন ড্রোন বিমান আটক করেছে। এরপর হোয়াইট হাউসে ওবামা ড্রোনটি ফিরিয়ে দিতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আমরা ইরানের কাছে এটি ফেরত চেয়েছি, দেখা যাক ইরান কিভাবে সাড়া দেয়।' এদিকে ইরান ওবামার এই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, বিমানটি আমাদের অধিকারেই থাকবে।
_আইএইচটি, ১৪ ডিসেম্বর ২০১১
সম্পাদক সমীপে
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও উপদেষ্টা সমীপে
আমাদের দেশে বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি পদ আছে, অনেক বেশি দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে, বর্তমানে ১২,০০০/- (৮ম গ্রেড) বেতন স্কেল আছে কিন্তু প্রধান শিৰক হওয়ার জন্য কোন কোটা নেই। বিগত জোট সরকার কিছুদিনের জন্য প্রধান শিৰক হওয়ার শর্ত হিসেবে ৩ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১৫ বছরের শিৰকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এমন পরিপত্র জারি করেছিল। তখন সহকারী প্রধান শিৰক সাহেবরা সারাদেশে বিশেষ মর্যাদা পেলেন। লিখতে দুঃখ লাগে প্রধান শিৰক ন্যায়সঙ্গত কারণে প্রশিৰণ, শিৰা অফিস, বোর্ড, অসুস্থতা, মিটিং, আতিথেয়তাসহ বিদ্যালয়ে না এলে সহকারী প্রধান শিৰকরা তাদের নিজ বিষয়ে পাঠদানসহ সবকিছু ম্যানেজ করে বিদ্যালয় অস্থায়ীভাবে পরিচালনা করেন। তাদের নেতৃত্ব সহকর্মীরা বিনা বাধায় মেনে নন। কিন্তু কোন কারণে ওই বিদ্যালয়ে প্রধান শিৰক পদটি শূন্য হলে বর্তমানে ৬ জুন ২০১১ পরিপত্র অনুযায়ী অসদাচরণের ভয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিৰক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন বা করছেন। পুরোপুরি সত্য প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হলে ঝ.গ.ঈ-কে ম্যানেজ করে সহকারী শিক্ষকরাই সারাদেশে প্রধান শিৰক হচ্ছেন।

কায়ছার আলী
দিনাজপুর সদর, দিনাজপুর
আল হাদিস
এক প্রহরের ধ্যান (গভীর চিন্তা) এক বছরের অর্চনা হইতে উৎকৃষ্ট।
[ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত স্যার আবদুল্রাহ সূহরাওয়ার্দীর 'রাসুলুল্লাহ (সা)-এর বাণী' থেকে।]
বাণী চিরন্তনী
উপদেশ দেয়া সহজ, উপায় বলিয়া দেওয়াই শক্ত।
_রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সত্যকে অস্বীকার করিয়া ভণ্ডামি দিয়া কখনও মঙ্গল উৎসবের কল্যাণ প্রদীপ জ্বলিবে না।
_কাজী নজরুল ইসলাম
বচন
সাগরে শয়ন যার
শিশিরে কি ভয় তার?
অর্থ : বড় বিপদে নিমজ্জিত ব্যক্তি ছোট বিপদ দেখলে বিচলিত হয় না_এ কথা বোঝাতে বলা হয়।

কপাল যদি মন্দ হয়
দূর্বা খেতে বাঘের ভয়।
অর্থ : মন্দ ভাগ্য হলে যেখানে বিপদাশঙ্কা নেই সেখানেও বিপদ উপস্থিত হয়_এ কথা বোঝাতে বলা হয়।
স্মরণীয়
২৭ ডিসেম্বর
১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে উর্দু কবি মির্জা আসাদুলস্নাহ খান গালিবের জন্ম।
১৮২২ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে ফরাসী অণুজীব বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের জন্ম।
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে মুজফফর আহমদের উদ্যোগে 'শ্রমিক কৃষক দল'_এর তিন দিনব্যাপী প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ওগঋ) গঠিত হয়।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে কল্লোল যুগের খ্যাতনামা সাহিত্যিক মনীশ ঘটকের মৃত্যু।
জানা-অজানা
অনুসূর
পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী ব্যবধান সব সময় ঠিক থাকে না। এই দূরত্ব ৩ জানুয়ারি সবচেয়ে কম থাকে (৯ কোটি ১৫ লাখ মাইল)। পৃথিবী হতে সূর্যের এই সর্বনিম্ন অবস্থানকে অনুসূর বলে। অর্থাৎ এই অবস্থানটি অপসূর অবস্থানের বিপরীত। অনুসূর অবস্থানে পৃথিবী হতে সূর্যের দূরত্ব কম থাকে বলে অপসূর অবস্থান অপেক্ষা ৭ শতাংশ বেশি পরিমাণে সৌরশক্তি লাভ করে।