মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটছে
মূলধনী কাঁচামাল ও খাদ্য পণ্য আমদানিতে গতি
রহিম শেখ ॥ বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটতে শুরু করায় ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য আমদানিতে গতি ফিরেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য খোলা ঋণপত্র (এলসি) বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। আর এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হতে থাকায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে ধীরে হলেও আস্থা ফিরছে। এ কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালসহ অন্য সব পণ্যের এলসি বাড়ছে। এদিকে পণ্য আমদানিতে গতি বাড়ার কারণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সাড়ে ৪ কোটি ডলার বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে আমদানি, রফতানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহ আরও বাড়বে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ১ হাজার ৩৮৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ২৩৯ কোটি ৯১ লাখ ডলার। এ সময়ে বিভিন্ন পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ২৯৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ১৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে জুলাই-অক্টোবর সময়ে শিল্প স্থাপনের মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হয়েছে ২৭ কোটি ৫ লাখ ডলারের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। এ হিসেবে চার মাসে এই পণ্যটির এলসি খোলা বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ কোটি ৬৫ লাখ। সূত্র জানায়, গত চার মাসে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও পেট্রোলিয়াম আমদানি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। গত কয়েক বছর ধরে কৃষিতে বাম্পার ফলন হওয়ার পরও খাদ্যসামগ্রী আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালের আমদানি বৃদ্ধি পাওয়াকে সার্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়লে দেশে শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটা অবশ্যই ভাল দিক। কিন্তু এসব পণ্য আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
জানা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে গত অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে বিনিয়োগ প্রকল্প নিবন্ধন যেমন আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় তেমনি আমদানির গতিও শ্লথ হয়ে পড়ে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হওয়ায় বিনিয়োগ ও আমদানি ইতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হয়। এ কারণে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ঋণপত্র খোলা (এলসি) বাড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ। আর এলসি নিষ্পত্তি বাড়ে প্রায় ১৪ শতাংশ। গত অর্থবছর মূলধনী ও শিল্পের কাঁচামালসহ সব পণ্যের আমদানিই উর্ধমুখী প্রবণতায় ছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত প্রকল্পগুলোতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছে তা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬৭ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ২৩৭টি। এসব শিল্প প্রকল্পে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৬৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর বিদেশী প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১১৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিদেশী প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ এসেছিল মাত্র ৭৮৭ কোটি টাকা।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট কাটাতে এবং দেশে পণ্য আমদানিতে গতি বাড়ার কারণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সাড়ে ৪ কোটি ডলার বিক্রি করে দিয়েছে। প্রতি ডলার বিক্রি করেছে ৭৭ টাকা ৬২ পয়সা দরে। সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংকগুলো এসব ডলার কিনেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, পুরনো জাহাজ, সার, ভোজ্যতেল ও চিনির কাঁচামাল আমদানির জন্য এগুলো ব্যয় করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এর ফলে বাজারে ডলারের সঙ্কট কেটে যাবে। ডলারের দাম কমে বাড়বে টাকার মান। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন হলে আরও ডলার বিক্রি করবে। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বশেষ ২০১২ সালের ২০ জুন ১ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। অথচ গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা তিন বছর ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে কেনে ১৩৪ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে কেনা হয় ৫১৫ কোটি ডলার। তার আগের বছর কিনেছিল ৪৫৩ কোটি ডলার। এর আগে ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ৭৮ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। তার আগের কয়েকটি বছরও ডলার বিক্রি করে ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদা মেটাতে হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, আমদানিতে খানিকটা গতি এসেছে। আবার বিদেশ থেকে আনা ঋণ ও বিনিয়োগের কিছু অর্থ পরিশোধের সময়ও হয়ে থাকতে পারে। সব মিলে একটা চাহিদা দেখা দিয়েছে বলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি আয় ও রেমিটেন্স প্রবাহ কমায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এক্সচেঞ্জগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিটেন্স সংগ্রহ করে বাড়তি মুনাফার আশায় নিজেদের কাছে আটকে রেখেছিল। ডলারের দাম বাড়লে বাড়তি মুনাফা নিয়ে তারা এগুলো বাজারে ছাড়বে এমন হিসেব কষেছিল। এ কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যায়। এতে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। বাজারে এখন ডলার ছাড়ায় টাকার দাম বেড়ে ডলারের দাম কমে যাবে বলে আশা ব্যক্ত করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা। হঠাৎ এত বেশি পরিমাণে ডলার বিক্রির কারণ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ এ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিনিয়োগ বাড়ায় আমদানির চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বেড়ে গেছে। এই চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে ডলার ছাড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, বাজারে ডলার সঙ্কট তৈরি করে টাকার মান কমে যাক এটা আমরা চাই না। ব্যাংকগুলোকে ডলারের যোগান বাড়িয়ে দেয়ায় কেউ যদি ডলারের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকে তবে তারা ব্যর্থ হবে। আমরা কোনক্রমেই বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে অস্থিতিশীল করতে দেব না।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে রেমিটেন্স এসেছে ৫০২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ ৪৫০ কোটি ডলার ছিল তার আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ২০ শতাংশ কম। আমদানির পাশাপাশি রেমিট্যান্সেও এখন ভালো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। অবশ্য গত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার কারণে তৈরি পোশাক রফতানির অর্ডার কমার প্রভাবে গত চার মাসে রফতানি কমেছে শূন্য দশমিক ৯৭ শতাংশ। এর প্রভাবে তিন বছর পর গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে এই প্রবণতাকে সাময়িক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রেমিটেন্স প্রবাহে বর্তমানের মতো প্রবৃদ্ধি এবং রফতানিতে আগের মতো প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে এক লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত পড়েছিল। এর মধ্যে একেবারে অলস ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এই অর্থের বিনিয়োগ নিয়ে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি চিন্তিত হয়ে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব অর্থের বিপরীতে ব্যাংকগুলো আমানতকারীকে বড় অঙ্কের সুদ দিলেও তাদের কোন আয় আসছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশিরভাগ ব্যাংক আমানতে সুদহার ৮ থেকে ৯ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছে। কিছুদিন আগেও যা ১২ শতাংশের ওপর ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ ঋণ চাহিদা বাড়ার কারণে গত অক্টোবর থেকে কয়েকটি ব্যাংক আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ধার নিচ্ছে। বৃহস্পতিবারও কলমানি থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছয় হাজার ৯ কোটি টাকা নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো ও তারল্য সহায়তার মাধ্যমে দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা নিচ্ছে। অথচ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে দৈনিক গড়ে চার থেকে পাচ হাজার কোটি টাকা জমা রাখত।