মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১১, ১১ অগ্রহায়ন ১৪১৮
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের দায় দাতাদের
সমন্বয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থছাড় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন ॥ টাস্কফোর্স গঠন
হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ সমন্বয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থছাড় বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এজন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনকহারে কমতে থাকায় এর আগে প্রতিশ্রম্নত অর্থের ছাড় ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নসহ সমন্বয় কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ দিয়েছিল বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এ প্রেৰিতে সমন্বয়ের কৌশল নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার এ টাস্কফোর্স অনুমোদন দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) একে খন্দকার। এ বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব ভূঁইয়া শফিকুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, টাস্কফোর্স অনুমোদন হয়েছে । আগামী রবিবার সাকর্ুলার জারি করা হবে এবং শীঘ্রই কাজ শুরু করবে এ টাস্কফোর্স। তবে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাসত্মবায়নে বিলম্ব হওয়ার পিছনে দাতারাই দায়ী বলে মনে করছেন প্রকল্প পরিচালকরা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গঠিত টাস্কফোর্স মূলত সমন্বয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থছাড় বাড়াতে কাজ করবে। আর যে কাজটি করবে তা হচ্ছে (উদাহরণ হিসেবে) প্রথমে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অবস্থা খারাপ সে প্রকল্পের পরিচালককে ডেকে জবাবাদিহি করতে বলা হবে। তিনি যদি বলেন, মন্ত্রণালয়কে চিটি দেয়া হয়েছে এখনও কোন পদৰেপ নেয়নি। তখন ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে জবাবাদিহি করতে হবে। তিনি যদি বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাহলে ইআরডির কর্মকর্তাকে জবাবাদিহি করতে হবে। আবার তিনি যদি জানান, ডোনারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তখন প্রকল্প পরিচালক, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, ইআরডির কর্মকর্তা এবং সংশিস্নষ্ট দাতা সংস্থার প্রতিনিধিকে ডেকে এক সঙ্গে বৈঠক করা হবে। সেখানে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।
সূত্র জানায়, কার্যক্রম বিভাগের প্রধান ভূঁইয়া শফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে ৮ থেকে ১০ সদস্যের এ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাসত্মবায়ন, পরিবীৰণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সেক্টর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এ টাস্কফোর্সের সদস্য রয়েছেন।
অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড়ের পরিমাণ বাড়াতে পরিকল্পনা কমিশনকে কিছু পরামর্শ দিয়েছে বাস্তবায়ন, পরিবীৰণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। পরিকল্পনা মন্ত্রীকে দেয়া এসব সুপারিশ হচ্ছে, প্রতিশ্রুত পরিমাণ অর্থের ছাড় ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নসহ সমন্বয় কার্যক্রম জোরদার করা। সংশিস্নষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং দাতা সংস্থার সঙ্গে ত্রি-পৰীয় বৈঠকের মাধ্যমে সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের সমস্যার অবসান ও ইআরডির উদ্যোগে নিয়মিত পর্যালোচনা ও সমম্বয় করা প্রয়োজন।
প্রকল্প প্রণয়নের পূর্বে ডিজাইন পর্যায়ে যথাযথভাবে সমীৰা করা ও হালনাগাদকৃত রেট সিডিউল অনুসরণ কর ব্যয় প্রাক্কলন করা প্রয়োজন, ক্রটিপূর্ণভাবে প্রণীত প্রকল্প দ্রম্নততার সঙ্গে অনুমোদিত হলেও তা সংশোধন অনিবার্য হয়ে পড়ে ফলে যথাসময়ে প্রকল্প সাহায্যের অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া জেলা প্রশাসককে অধিকহারে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কারণ ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হলে প্রকল্প বাসত্মবায়ন বিলম্বিত হয় ও প্রকল্প সাহায্যের ব্যবহার কমে।
মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থাগুলোর প্রকল্প বাসত্মবায়ন ও মনিটরিং এ বিশেষ পদৰেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, স্থানীয় প্রশাসনকে মনিটরিংয়ের কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
প্রাপ্ত সম্পদের আলোকে যৌক্তিক সংখ্যক প্রকল্প গ্রহণসহ প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে বাসত্মবায়ন কাজ সমাপ্ত করা প্রয়োজন যথাসময়ে বাসত্মবসম্মত ক্রয় পরিকল্পনা ও কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ প্রয়োজন। দরপত্র আহ্বান কন্ট্রাক এ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি কাজে দীর্ঘ সূত্রতা পরিহার করা আবশ্যক। ক্রয় কাজে ইজিপি প্রবর্তনের বিষয়টি দ্রম্নততর করা যেতে পারে। এছাড়া বৃহৎ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পরিকল্পনা উইং এ উর্ধতন পদ সৃষ্টিপূর্বক প্রকল্প প্রণয়ন ও মনিটরিং ব্যবস্থাকে জোরদার করা যেতে পারে।
সূত্র জানায়, গত ১৩ নবেম্বর পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ারভাইস মার্শাল (অব) একে খন্দকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এডিপি পর্যালোচনা সভা। এতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) বৈদেশিক অর্থের ব্যবহার কমে যাওয়ার বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং বৈদেশিক অর্থছাড় কম হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বৈদেশিক অর্থছাড় সম্পর্কিত দুটি সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়। এ প্রেৰিতে গত বুধবার বৈদেশিক সাহায্য সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় এমন ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শুধুমাত্র প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে প্রকল্প পরিচালকরা বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাসত্মবায়ন বিলম্ব হওয়ার পিছনে দাতাদেরকেই দায়ী করছেন। এ সময় তারা কিছু উদাহরণ তুলে ধরেন। এগুলো হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বেশিরভাগ দাতা সংস্থা টেন্ডার ডকুমেন্ট ও প্রকিউরমেন্ট সংক্রানত্ম বিষয়ে বিভিন্ন ধাপে ৫ থেকে ৬ বার অনুমোদন নিতে হয়। স্থানীয় অফিসগুলোর ৰমতা না থাকায় তারা আবার এগুলো তাদের হেড অফিসে পাঠিয়ে দেয়। ফলে এগুলোর প্রক্রিয়া ও সম্মতি পেতে ব্যাপক সময় অপচয় হয়।
অধিকাংশ পিডি জানান, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা। কেননা দাতারা ভূমি অধিগ্রহণে কখনও টাকা দেয় না। এ টাকা দিতে হয় সরকারকে। ফলে সরকারী তহবিল থেকে অনেক সময় টাকা পেতে দেরি হয়। বা জমির মালিকরা মামলা করলে সেৰেত্রে আরও দেরি হয়।
তারা আরও জানায়, রেট সিডিউল বেড়ে যাওয়ার কারণে কোন কোন প্রকল্প ২ থেকে ৩ বার সংশোধন করতে হচ্ছে। ফলে বাসত্মবায়নের সময় বেড়ে যাচ্ছে। বৈঠকে জানানো হয়, এডিবির সহায়তাপুষ্ট পেট্রোবাংলার একটি প্রকল্পের শুধুমাত্র ডকুমেন্ট সিডিউলের ক্লিয়ারেন্স পেতে সময় লেগেছে তিন মাস। তারা এটি তাদের হেড অফিস ম্যানিলায় পাঠিয়েছে। আবার ভারতীয় এঙ্মি ব্যাংকের ডকুমেন্ট ক্লিয়ারেন্স পেতে দেরি হওয়ায় এলসি খোলার কার্যক্রম আটকে আছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহয়তাপুষ্ট প্রাথমমিক ও গণশিৰা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে অর্থ ছাড় বন্ধ করে দিয়েছে সংস্থাটি। এর কারণ হিসেবে তারা বলেছে ২০০৩ সালে বাসত্মবায়িত ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে সাড়ে ৯ কোটি টাকার একটি অবজেকশন ছিল। সেটি সুরাহা না হওয়ায় ওই টাকা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কেটে দেয়া হয়েছে। ফলে জটিলতা দেখা দেয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে মাল্টিডোনারদের অর্থায়নের কৃষিসংশিস্নষ্ট একটি প্রকল্পে একবার মেইন চুক্তি স্বাৰরিত হয়েছে। কিন্তু তারা আবার তাদের শর্তের মধ্যে এই আম্ব্রেলা চুক্তির ভিতরে ছোট ছোট কাজের চুক্তি করার অপশন রেখেছে। ফলে অহেতুক সময় নষ্ট হচ্ছে।
দাতারা টেন্ডার কাজে অনেক বড় প্যাকেজ করতে চায়। ফলে প্রতিযোগিতা কম হয়। কেননা এত বড় কাজ করার মতো সামর্থ্য আমাদের দেশের ঠিকাদারদের বেশিরভাগ ৰেত্রেই থাকে না। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ও সংশিস্নষ্ট মন্ত্রণালয় চায় ছোট ছোট প্যাকেজ। এতে প্রতিযোগীতা বেশি হয় এবং অনেক ঠিকাদার কাজ পায়।