মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ১৯ মাঘ ১৪১৯
কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন
একসময় বৈজ্ঞানিক কল্প-কাহিনীতে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে গবেষকরা প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি এবং এর ব্যবহার এখন মানুষের হাতের নাগালে। গবেষকরা কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি এবং প্রতিস্থাপনে অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন। প্রতিবছর তারা গবেষণার মাধ্যমে দেহের বিকলাঙ্গ প্রতিস্থাপনের নিত্য নতুন উপায় হিসেবে কৃত্রিম অঙ্গের উদ্ভাবন এবং উন্নয়ন করে চলেছেন। গবেষকদের মতে, ভ্রƒণ কোষ থেকে কোন অঙ্গ বা স¤পূর্ণ মানব দেহ তৈরি করা সম্ভব। এখন পর্যন্ত গবেষকরা যেসব ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম প্রতিস্থাপনযোগ্য হৃৎপি-, ত্বক, হাত, অস্থি, লিগামেন্ট, লিভার, ফুসফুস, ককলিয়া, কিডনি এবং চোখ।

হৃৎপি- প্রতিস্থাপন
কৃত্রিম হৃৎপি- প্রতিস্থাপন করার বিষয়টি বেশ পুরনোই বলা চলে। ১৯৬০ সাল থেকে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন গবেষক ও চিকিৎসকরা। তবে গবেষকরা বলছেন, হৃৎপি- প্রতিস্থাপন করা গেলেও এটি স্থায়ী নয়। রোগীর হৃৎপি- স্থাপনের মাধ্যমে তাকে প্রাথমিকভাবে কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়। সম্প্রতি গবেষকরা এ্যাবিওকর নামের একটি পূর্ণাঙ্গ কৃত্রিম হৃৎপি- তৈরি করেছেন যা, একজন রোগীর দেহে প্রতিস্থাপনের পর ৫১৪ দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবে। ফ্রান্সের একজন ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, আগামী ২০১৩ সালের মধ্যে আরও উন্নত কৃত্রিম হার্টের উদ্ভাবন করা হবে।

কৃত্রিম ত্বক প্রতিস্থাপন
মানুষ তার ত্বকের প্রতি যতটা যতœশীল হয় অন্য কোন অঙ্গের ব্যাপারে সম্ভবত ততোটা যতœশীল হয় না। এতোদিন প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম চামড়া পাওয়া সম্ভব ছিল না। এর বদলে মৃত ব্যক্তির চামড়া ব্যবহার করতেন চিকিৎসকরা। ফলে পরবর্তীতে ত্বকে নানা রকম ক্ষতের সৃষ্টি হতো এমনকি চামড়া পুরোপুরি নষ্টও হয়ে যেত। তবে সাম্প্রতিক গবেষণার ফল বলছে, এই দুশ্চিন্তা দূর করার উপায় গবেষকরা বের করে ফেলেছেন। জানা গেছে, বিজ্ঞানীদের তৈরি নতুন এই কৃত্রিম চামড়াটিতে কোলাজেন স্ক্যাফোল্ডসহ রোগীর নিজের শরীরে কোষ থাকে, যা কিনা নতুন করে চামড়া তৈরি করে। তাছাড়া এই কৃত্রিম চামড়া সম্পূর্ণ নমনীয় এবং চাপ সংবেদনশীল।

ককলিয়া প্রতিস্থাপন
শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ককলিয়ার ট্রান্সপ্লান্ট এখন বিশ্বজুড়ে একটি প্রচলিত চিকিৎসা। এ প্রযুক্তিতে কানে বসানো যন্ত্রটি শব্দকে ইলেকট্রনিক পালসে পরিণত করে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। এ পদ্ধতিতে সঙ্গীতের সূক্ষ্মরস আস্বাদন সম্ভব না হলেও নিত্যদিনের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে বহু মানুষ।

পেশি প্রতিস্থাপন
কৃত্রিম পেশি তৈরির গবেষণায়ও অনেকটা এগিয়ে গেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, একটি পুরো অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বদলে নির্দিষ্ট একটি পেশিকে যন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপন করা গেলে এ চিকিৎসা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আর যার দেহে এটি প্রতিস্থাপন করা হবে, তার জীবন হবে আরও সহজ। সম্প্রতি গবেষকরা মানুষের কৃত্রিম পেশি তৈরি করেছেন। মায়োইলেক্ট্রিক প্রসথেসেস নামের একটি ডিভাইস পেশির মতোই কাজ করে। কৃত্রিম পেশি হাতের মাংস পেশি থেকে সঙ্কেতের মাধ্যমে এই ডিভাইসটি পরিচালিত করে।

লিভার প্রতিস্থাপন
এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম লিভার বা যকৃত তৈরি করতে সক্ষম না হলেও তারা এমন এক ডিভাইস তৈরি করেছেন যেটি লিভারের বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারবে। এই ডিভাইসটিকে মূলত বলা হচ্ছে এক্সট্রাকোরপোরিয়াল লিভার। হেপালাইফ নামে একটি কো¤পানি এরকম এক্সটার্নাল বায়ো রিঅ্যাক্টর নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। জানা গেছে, যখন এই ডিভাইসের ভেতর দিয়ে রক্ত অতিক্রম করে তখন বিষাক্ত এ্যামোনিয়ার পরিমাণ শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগই কমে যায়। যদি এভাবে ডিভাইসটি কাজ চালিয়ে যায় তাহলে গবেষকরা খুব শিগগিরই সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপনযোগ্য লিভার তৈরি করে ফেলবেন।

ফুসফুস প্রতিস্থাপন
‘এমসিথ্রি’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি প্রতিস্থাপনযোগ্য ফুসফুস তৈরির বিষয়ে কাজ করছে। এর নাম দেয়া হয়েছে বায়োলাঙ্গস। স্বাভাবিক ফুসফুসের মতোই বায়োলাঙ্গস একজন রোগীর দেহে শতকরা এক শ’ ভাগ অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। গবেষকরা আশা করছেন, এই ডিভাইসটি রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হলে স্বাভাবিক ফুসফুসের মতোই কাজ করবে।

কৃত্রিম চোখ প্রতিস্থাপন
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ‘বায়োনিক চোখ’ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, এটি আলোর সাহায্যে কাজ করবে। কৃত্রিম চোখে লাগানো থাকবে এক্সটার্নাল একজোড়া ক্যামেরা যা আলো গ্রহণ করে মস্তিষ্কে দেখার সংকেত পাঠাবে। রেটিনার অসুখে যারা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন তাদের বায়োনিক আই ব্যবহারে ইতোমধ্যেই সাফল্যের মুখ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। এখন পর্যন্ত মানবদেহে অত্যাধুনিক এই বায়োনিক আইয়ের পরীক্ষা করা হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে এর সফলতা পাওয়া গেছে।

কৃত্রিম হাড় প্রতিস্থাপন
কৃত্রিম হাড় তৈরির বিষয়টি তুলনামূলকভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন। সম্প্রতি গবেষকরা একটি কৃত্রিম হাড় তৈরি করেছেন যার নাম প্রসথেটিক। এই প্রসথেটিকটি মূলত বাচ্চাদের হাড়ে ক্যান্সার হলে প্রাথমিকভাবে সেই হাড়টি রক্ষা করতে পারে। আগে শরীর থেকে এই হাড় সরিয়ে ফেলতে হতো। এটি শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হাড়কে প্রতিস্থাপনই করে না এমনকি শিশুর বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটিও দৈর্ঘ্যে প্রসারিত হয়।

কৃত্রিম কিডনি প্রতিস্থাপন
বাংলাদেশি গবেষক শুভ রায় কৃত্রিম কিডনি উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর মতে কৃত্রিম কিডনি আসল অঙ্গের মতোই কাজ করতে সক্ষম। অর্থাৎ রক্তের বিষাক্ত পদার্থ ছঁাঁকা থেকে শুরু করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ভিটামিন ডি তৈরি, সব কাজই করতে পারবে এই কৃত্রিম কিডনি। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এবং তাঁর ৪০ জন সহকর্মী এই কৃত্রিম কিডনি তৈরিতে অংশ নেন।
প্রদীপ সাহা