মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১১, ১১ অগ্রহায়ন ১৪১৮
রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা তিমি শিকার
পেশার কি শেষ আছে? এমন অনেক পেশা আছে যা আলোচিত ও চ্যালেঞ্জিং। তেমনি একটি পেশা তিমি শিকার। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৮০০ সালেও মহাসাগরগুলোর বুকে তিমি শিকারি জাহাজগুলো ঘুরে বেড়াত। সভ্যতার পালাবদলে এখন আর সেই পালতোলা কাঠের জাহাজ আর হাত দিয়ে নিক্ষেপ করার হার্পুন দেখা যায় না। এখন আধুনিক জাহাজে যন্ত্রচালিত হার্পুন দিয়ে তিমি শিকার করা হয়। আগে তিমির তেলে তৈরি হতো মোমবাতি। তেলের ব্যবসার জন্য শিকার করা হতো ঝাঁকে ঝাঁকে তিমি।
পালতোলা জাহাজে হস্তনিক্ষিপ্ত হার্পুন দিয়ে তিমি শিকার অভিযান ছিল রোমাঞ্চকর, উত্তেজনাপূর্ণ আর বিপজ্জনক তো বটেই। শিকারে বেরিয়ে এক একটি জাহাজ ৫-৬ মাস এমনকি কয়েক বছরও সাগরে কাটিয়ে দিত। তিমি শিকারে বেরুনোর আগের মুহূর্তগুলো খুবই ঝামেলার মধ্য দিয়ে কাটে। সাগরের বুকে দীর্ঘদিন কাটানোর জন্য সব ধরনের জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হয়। জাহাজকেও মেরামত করে দীর্ঘ যাত্রার উপযোগী করে তোলা হয়। এগুলো করতে কেটে যায় অনেক সময়। এরপর সুবিধামতো একদিন বন্দর ত্যাগ করে জাহাজ। শুরম্ন হয় তিমির পিছনে ছুটে চলার শ্বাসরম্নদ্ধকর ক্লানত্মিহীন যাত্রা। জাহাজ বন্দর ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে একজন লোক তুলে দেয়া হয় জাহাজের মাস্টহেডে। মাস্টহেড হলো জাহাজের মাস্তুলের সঙ্গে ঝোলানো একরকম ঝুড়ির মতো। জাহাজের ডেক থেকে অনেক উপরে মাস্টহেডে বসে তিমির প্রতি নজর রাখা হয়। মাস্টহেড থেকে সঙ্কেত দেয়া হলে নির্দিষ্ট দিকে তিমির পেছনে ছুটতে থাকে জাহাজ। বন্দর থেকে বেরিয়ে এসে দুই-একদিন সাগরে ঘুরলেই তিমি দেখা যায় না। অনেক সময় দেখা যায় দীর্ঘদিন ঘোরার পরও কোন তিমি চোখে পড়ে না। মূলত তিমির খাবার থাকে যেখানে সেখানেই সাধারণত তিমির দেখা পাওয়া যায় বেশি। তিমি শিকারিরা সেদিকেই তাদের জাহাজ ছোটায়। এরপর হয়ত দেখা পাওয়া যায় এক ঝাঁক তিমির। মাস্টহেড থেকে চেঁচিয়ে ওঠে ক্রু এবং দিকনির্দেশনা দেয়। কখনও জাহাজের কাছাকাছি ভেসে ওঠে তিমি। তখন ডেকে দাঁড়ানো নাবিকরাই প্রথমে তিমি দেখতে পায়। তিমির কাছাকাছি গিয়ে জাহাজের গতি কমানো হয়। এরপর জাহাজ থেকে নামানো হয় ছোট কয়েকটি নৌকা। প্রতিটি নৌকায় প্রধানত দু'জন ব্যক্তি থাকে। একজন প্রধান তিমি শিকারি, আরেকজন হার্পুনার। এছাড়াও কয়েকজন থাকে নৌকা এগিয়ে নেয়ার জন্য। হার্পুনার হলো যে ব্যক্তি তিমির দিকে হার্পুন ছুড়ে মারে আর প্রধান শিকারি হাল ধরে এবং নির্দেশনা দেয়। তীব্র চিৎকার চেঁচামেচি করে হার্পুনাররা ছুটনত্ম তিমিটিকে ঘাবড়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এরপর সুবিধামত সময়ে ছুড়ে মারা হয় হার্পুন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একবারের নিক্ষেপে তিমির মতো বিশাল আকৃতির প্রাণীকে মারা সম্ভব হয় না। এ জন্য কয়েকটি হার্পুন নিক্ষেপ করা হয়। অনেক সময় হার্পুনবিদ্ধ অবস্থায় তিমি পালিয়ে যায়। সঠিকভাবে কয়েকটি হার্পুন নিক্ষেপ করতে পারলে মারা যায়। এরপর শুরম্ন হয় মৃত তিমিকে বাঁধার কাজ। এটা করতে প্রায় ১০-১৫ জন প্রয়োজন হয়। বাঁধা শেষ হলে তিমিকে টেনে জাহাজের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং মাথা আলাদা করে শরীরের অংশটুকু ফেলে দেয়া হয়। তেলের জন্য সাধারণত স্পার্ম তিমি শিকার করা হয়। কারণ এর বিশাল মাথায় থাকে উন্নতমানের তেল। বিশাল আকৃতির তিমির মাথা কাটা সহজ কথা নয়। দেহ থেকে মাথা কেটে আলাদা করার জন্য শুরম্নতেই ১০-১২ ইঞ্চি পুরম্ন চামড়া কাটতে হয়। এই চামড়াকে বলা হয় বস্নাবার। তিমির মাথা সাধারণত জাহাজের পাশে পানিতে রেখেই কাটা হয়। এই সময় মাথার অর্ধেক ডুবে থাকে পানিতে। তিমির মাথার আকৃতি একটু অদ্ভুত। এর চোয়াল থাকে মাথার নিচের দিকে। স্পাউটের ফুটো রয়েছে মাথার উপরে আর চোখ ও কান দুপাশে। তিমির মাথা তাদের শরীরের তুলনায় বিশাল আকৃতির হয়। প্রাপ্তবয়স্ক স্পার্ম তিমি বা নীল তিমির মাথা বিশ ফুটের বেশি বড় হয়। এই বিশাল আকৃতির মাথার ভেতরেই থাকে চমৎকার তেল। হাতলওলা ধারালো কুড়াল নিয়ে তিমির মাথায় নেমে পড়ে কোন একজন হোয়েল ম্যান। এরপর মাথায় একটা গর্ত করে বালতি দিয়ে তোলা হয় তিমির তেল। কাঁচা দুধের মতো দেখতে এই পদার্থের নাম স্পার্মাসেটি যেটিকে আমরা তিমির তেল বলি। ছোট ছোট বালতিতে করে স্পার্মাসেটি তুলে ঢালা হয় বড় একটি বালতিতে। এরপর এই বালতি জাহাজের ডেকে তুলে নিয়ে বড় আকৃতির পিপেতে ভরে রাখা হয়। একটা তিমির তেল সংগ্রহ করার কাজ শেষ হলে শুরম্ন হয় আরেকটির সন্ধান। তিমি শিকার করতে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনারও শিকার হয় অনেক জাহাজ। হোয়েলম্যানদের ছোট নৌকাগুলো তিমির কাছাকাছি গেলে অনেক সময় তিমির লেজের বাড়িতে ভেঙ্গে চৌরির হয়ে যেত। হোয়েল লাইনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েও অনেক নাবিক মারা যায়। সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যদি তিমি পালিয়ে যাবার বদলে গোটা জাহাজকে আক্রমণ করে। দল বেঁধে আক্রমণ করলে সেই জাহাজের তীরে ফিরে আসার সম্ভাবনা একেবারেই কম।
তিমি বিপন্ন প্রানী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিমি শিকারীদের বিরম্নদ্ধে অভিযান চলছে। এছাড়া তিমি শিকার না করতে বিভিন্ন সংগঠন জনসচেতনতা মূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
এস এম নাজমুল হক ইমন