মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারী ২০১১, ২১ পৌষ ১৪১৭
সময়োচিত ভাবনা
সাঈফ আবেদীন
'আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।' কবি কুসুমকুমারী দাশের শিশু-কিশোরদের উজ্জীবিত করার জন্য লেখা এ কবিতাটি স্নেহধন্য পুত্র জীবনানন্দ দাশকে প্রত্যহ শোনাতেন। জীবনানন্দ দাশ জননীর কবিতাটির মতো 'সেই ছেলে' হয়েছেন। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা কি পারেন না এমনটি হতে? নিশ্চয়ই পারেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে, এক কাতারে শামিল হয়ে '৭১-এ আমরা পাক হানাদারদের পরাজিত করে পৃথিবীর মানচিত্রে একটু জায়গা করে নিতে সৰম হয়েছি। সেদিন ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তকণিকা জমাটবদ্ধ হয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট একটি দ্বীপ তৈরি করেছিল। এ রক্তে তরুণ-তরুণীদেরও রক্ত ছিল। এখন পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের একটি দেশ আছে। স্বাধীন দেশ। পত্্পত্্ করে উড়ে আমাদের লাল সবুজের পতাকা। বঙ্গবন্ধুকন্যা যখন এ দেশটিকে ডিজিটাল দেশে রূপানত্মর করার স্বপ্ন দেখছেন, ঠিক তখনই এ দেশের তরম্নণ সমাজের নানা কুকর্মের খবর পুরোদমে প্রচারিত হচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। চারদিকে নানা খবর_ 'ইভটিজিংয়ে কলেজ বা স্কুলছাত্র গ্রেফতার', '৬ মাস বা ১ বছরের কারাদ-', 'নেশাগ্রসত্ম কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গ্রেফতার।' এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে দেশের আনাচেকানাচে। আর এতে করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশের দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশে। বর্তমানে ইন্টারনেটের এ যুগে একটি খবর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড।
এদেশে পূর্বে তরম্নণদের এমন অধঃপতন ছিল না। তখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একাডেমিক শিৰার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও জড়িত ছিলেন। একটি দেশ ও একটি জাতির প্রথম পরিচয় হলো তার 'সংস্কৃতি'। তখন বই পড়ার প্রচলনও ছিল। একে অপরে সহপাঠীদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তেন। আর যাদের বই কেনার সামর্থ্য থাকত তারা পছন্দের বইটি কিনে ফেলতেন। কিন্তু এখন আমাদের তরম্নণ সমাজ অনেকটা বদলে গেছে। বই পড়ার সময় তাদের নেই। আকাশ সংস্কৃতি গ্রাস করে ফেলেছে তাদের। বিদেশী সংস্কৃতির বেড়াজালে আটকে পড়েছে তারা। আর ঐ সব সংস্কৃতি অনুসরণ ও অনুকরণ করে তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির গ-ির বাইরে চলে যাচ্ছে। এ কারণে আমাদের তরম্নণরা খুব সহজেই অশালীন কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। আমাদের তরম্নণ সমাজকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে সরকারও নানা পদৰেপ নিচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও কি তরম্নণ সমাজকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে? দিন দিন যেন কেউ কেউ বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। এটা আমাদের দেশ ও সমাজের জন্য কখনোই হিতকর নয়। তবে সরকারী পদৰেপ যদি কিছুটা সফল হয় তাহলে উপকৃত হবে সমাজ-রাষ্ট্র। সরকার ইচ্ছে করলে তরম্নণ সমাজকে বই পড়ার প্রতি মনোনিবেশ করাতে নানা পদৰেপ নিতে পারে। তারা বইয়ে বুঁদ হয়ে থাকলে অবশ্যই জ্ঞানের ভা-ার তাদের সামনে খুলে যাবে। তারাও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সৈনিকে পরিণত হবে। সারাবিশ্বে আমরা পরিচিত শুধুমাত্র 'বাংলাদেশ' নামক দেশটির জন্য। আর এ দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য ত্রিশ লাখ বাঙালী রক্ত দিয়েছেন। এ জন্য আমরা 'গর্বিত জাতি' হিসেবে বিশ্বে স্থান করে নিয়েছি। তরম্নণ সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। সবাইকে পৃথিবীর সবকিছু মনের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে হবে। আর মনের চোখই হলো 'বিবেক'। বিবেক জাগ্রত হলেই আর কোন তরম্নণ ইভটিজিং করবে না; ছাত্রজীবনেই ড্রাগসের শিকার হয়ে স্বপ্নভরা জীবনটাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে না। বন্ধু-বান্ধব বা কারও সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা মানেই অশালীন কিছু নয়। বন্ধুত্ব তৈরি হওয়া ভাল। এটা যদি সত্যিকারের বন্ধুত্ব হয়, তাহলে একে অপরের সুখ-দুঃখো অংশীদার হতে পারে। অন্যান্যভাবেও উপকৃত হওয়া যায়। আজ দেশে গোটা কয়েক ছেলেমেয়ের বখাটেপনার জন্যই লাখো-কোটি ছেলেমেয়েকে কলঙ্কের ভাগীদার হতে হচ্ছে। একটি ছেলে বা মেয়ে দোষ করলে সমাজ আঙ্গুল উঁচিয়ে বলছে_ 'আজ তরম্নণ সমাজ অধঃপতনে চলে গেছে।' কথাটি পূর্ণ সত্য নয়। শুধু সাজা দিলেই কি তরম্নণ সমাজ আর বিপথগামী হবে না? এটা হলফ করে কেউ বলতে পারবে না। সর্বপ্রথম শহর গ্রামের প্রতিটি বাবা-মাকে তার সনত্মানের জীবনযাপনের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি নানা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শহরের প্রতিটি মহলস্নায়, গ্রামে পাঠাগার স্থাপন করতে হবে। খেলাধুলারও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে তরম্নণ সমাজ সৃজনশীল কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়বে এবং কোন অনৈতিক কাজে জড়াবে না।
তাই দৈনিক জনকণ্ঠের ডি-প্রজন্মের প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে আমার অনুরোধ আসুন আমরা গ্রাম-শহর মিলে বন্ধুত্ব করি। একাডেমিক শিৰার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজেও জড়িয়ে পড়ি। অসৎ বন্ধুদের থেকে দূরে থাকুন। বন্ধুকে চেনার চেষ্টা করম্নন। আপনাদের মধ্যে থেকেই একদিন জন্ম নেবে বড় একজন লেখক, বিশ্বখ্যাত কোন ক্রিকেটার; ফুটবলার বা অন্য কিছু। যা আমাদের দেশমাতৃকার জন্য সুফল বয়ে আনবে। আমাদের বাবা-মায়ের স্বপ্নকে বাসত্মবে রূপদান করবে। নেশাগ্রসত্ম হয়ে বা ইভটিজিং করে কিংবা সমাজ দেশের অকল্যাণকর কোন কর্মকা-ে না জড়িয়ে আসুন আমরা আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে তুলি। এতে করে আপনি নিশ্চয় পৃথিবীতে ভাল কোন অবদান রেখে যেতে পারবেন। এবং পরবতর্ী জীবনে নতুন প্রজন্মের মাঝে আপনি বেঁচে থাকবেন।
পরিশেষে এ কথাই প্রণিধানযোগ্য যে, আমাদের তরম্নণ-তরম্নণীদের ভবিষ্যৎ জীবন যাতে আরও সুন্দর হয় তার জন্য বাবা-মা, দেশের এলিট পার্সন, সরকার_একযোগে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু শাসত্মির বিধান দিয়েই তরম্নণ সমাজকে বিপথগামিতার হাত থেকে মুক্ত করা যাবে না। ক্লাসের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আলোকিত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য অন্যান্য বইও তাদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং এটা যত দ্রম্নত হবে ততই তরম্নণ সমাজের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। আর তরুণ সমাজকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত হতে হবে। তবেই তরুণ সমাজের মুক্তি মিলবে।