মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১১, ১১ অগ্রহায়ন ১৪১৮
মহাকাশ অভিযানের সফল পরীক্ষা 'মঙ্গল ৫০০'
অদেখাকে দেখার এবং অজানাকে জানার সাধ মানুষের চিরায়ত স্বভাব। চাঁদের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার পর এখন চেষ্টা চলছে মঙ্গল গ্রহে অভিযানের। তারই একটি পর্যায় হিসেবে অনুরূপ অভিযান 'মঙ্গল ৫০০' নামের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে রাশিয়া। ২০১০ সালের ২৩ জুন রাশিয়ার ইনস্টিটিউট ফর বায়োমেডিক্যাল প্রোবলেমস_ আইবিএমপি শুরু করে মোট ৫২০ দিনের এই পরীক্ষা। এই পরীক্ষামূলক অভিযানের নাম দেয়া হয় 'মার্স ৫০০' বা 'মঙ্গল ৫০০'। রাশিয়ার তিন জন এবং ইটালি, ফ্রান্স ও চীনের একজন করে বিজ্ঞানী অংশ নিয়েছিলেন এই নমুনা মহাকাশ অভিযানে। মস্কোয় মহাকাশযানের আদলে নির্মিত ১৮০ বর্গমিটারের আধারের মধ্যে প্রায় ১৮ মাস কাটাতে হয়েছে ছয় জন বিজ্ঞানীকে। এ সময় তাঁরা পৃথিবীতেই ছিলেন কিন্তু তাঁদের এমনভাবে দৈনন্দিন কাজ করতে হতো যেন তাঁরা মঙ্গল গ্রহের পথে উড়ে গেছেন এবং সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসছেন।
এ সময় ৩০টিরও বেশি ক্যামেরা দিয়ে তাঁদের কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে কিছু সময়ের জন্য মহাকাশযান থেকে কৃত্রিম মঙ্গল গ্রহে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন ইটালির ডিয়েগো উরবিনা, রাশিয়ার আলেঙ্ন্ডার স্মলেভস্কি এবং চীনের ওয়াং ইয়ু। এ সময় মূল নভোযানে সহকর্মীদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন রাশিয়ার এ্যালেক্সই সিটেভ ও সুখরব কমোলভ এবং ফরাসী নভোচারী রোমাঁ শার্ল। রেড পস্ন্যানেট নামে পরিচিত মঙ্গল গ্রহে ৫২০ দিনের পরীক্ষামূলক অভিযান শেষে সুস্থ ও সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরেছেন ছয় বিজ্ঞানী। তবে এই দীর্ঘ সময় পৃথিবীর পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় এই অভিযান থেকে বের হওয়ার পর প্রায় তিন দিন তাঁদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল। এ সময় তাঁদের দেহের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। এরপর ৭ নবেম্বর থেকে তাঁদের চলাফেরা কিছুটা স্বাধীনভাবে শুরম্ন হয়েছে। তবুও আগামী এক মাস তাঁদের মস্কোয় আরও পরীক্ষার আওতায় থাকতে হবে। এই পরীক্ষামূলক নভোযানের ভেতর একঘেয়েমি এবং একাকিত্ব বোধ করেছেন সম্ভাব্য এই নভোচারীরা। রোমাঁ শার্ল স্বীকার করেছেন, ৫২০ দিনের পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল একঘেয়েমি। তবে সেই সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে শার্ল এবং উরবিনা গিটারে সুর তুলেছেন মাঝে মাঝে। গেয়েছেন 'হোম সুইট হোম' কিংবা 'রকেট ম্যান'সহ প্রিয় গানগুলো। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই ধরনের খাবার নিয়েও বেশ কষ্টে ছিলেন তাঁরা। শার্ল জানালেন, একজন ফরাসী হিসেবে তিনি মচমচে ক্রঁস, পনির এবং রেড ওয়াইনের অভাব বোধ করেছেন খুব বেশি। আসলে খাওয়ার মধ্যে কোন মজাই ছিল না। বরং শুধু বাঁচার তাগিদে খেতে হতো বলে মনত্মব্য করলেন চীনা চিকিৎসক ওয়াং ইয়ু।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট-এর সহকারী অধ্যাপক ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এই অভিযানের কিছু বিশেষ দিক তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, 'একটি ছোট নভোযানের মধ্যে দীর্ঘদিন নভোচারীরা থাকলে কি ধরনের স্বাস্থ্যগত ও পারিপাশ্বর্িক অবস্থার মুখোমুখি হবে তা এটির মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া নভোযানে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে সেসব যন্ত্রপাতির সঙ্গে পরিচিতকরণ, সেগুলো চালনা ও নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানীদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করা হয়েছে এই অভিযানের মধ্য দিয়ে। এই নমুনা অভিযানে প্রয়োজনীয় প্রায় সকল সুযোগ সুবিধা, যান্ত্রিক ও কারিগরি কর্মকা- সংযোজন করা হয়েছিল। তবে বাসত্মবে মঙ্গল অভিযানের সময় পাঁচ কোটি কিলোমিটার ফ্লাইটের জন্য যে অভিকর্ষ ত্বরণ এবং তার ফলে ওজনশূন্যতা অনুভূত হবে তা এই অভিযানে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বাসত্মব অভিযানে যে কসমিক-রে বা মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব থাকবে সেটিও 'মঙ্গল ৫০০' অভিযানে ছিল না।' তবুও এটিই সবচেয়ে দীর্ঘকালীন মহাকাশ অভিযানের পরীক্ষা বলে উলেস্নখ করে আইবিএমপি।
এই পরীক্ষামূলক মঙ্গল অভিযানের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. ফারসীম বলেন, 'নিকট ভবিষ্যতে না হলেও দূর ভবিষ্যতে মনুষ্যবাহী নভোযান যে মঙ্গল গ্রহ পানে যাবে তার পর্যায়ক্রমিক একটি ধাপ বলা যেতে পারে এটিকে। আমাদের অনেকেই যারা এখন বেঁচে আছেন তাঁরা হয়ত দেখতেই পাবেন, মানুষ মঙ্গল গ্রহে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সবমিলিয়ে বলা যায়, এসব গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের নভোচারীদের মানসিকভাবে, স্বাস্থ্যের দিক থেকে এবং অবশ্যই প্রযুক্তির দিক থেকে তৈরি করা, যাতে করে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানো একটি যৌক্তিক সম্ভাবনা হয়ে যায় অদূর ভবিষ্যতে।'
জুবায়ের আব্দুল বারি
সূত্র : নাসা অনলাইন