মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১১, ১১ অগ্রহায়ন ১৪১৮
ভেলায় চড়া শামুক যেভাবে এলো
এনামুল হক
কিছু কিছু শামুক আছে যারা বুদবুদের ভেলায় চড়ে সাগরে ভেসে বেড়ায়। এসব ক্ষুদক্ষুদ ভেসে বেড়ানোর পস্নাটফর্ম ছাড়াও ডিম সংরৰণের আধার এবং শিশু শামুকদের দাঁড়াবার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারটা লৰ্য করে এসেছেন। কিন্তু এই শ্রেণীর শামুকের উৎপত্তি কিভাবে হলো, কিভাবেই বা তাদের জীবনযাপনের এই বিচিত্র পদ্ধতি গড়ে উঠল তা তাদের অজানা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি মিশিগানের এক পিএইচডি ছাত্রের গবেষণায় তাদের এই অজানা তথ্যটি উন্মোচিত হয়েছে।
বুদবুদের ভেলায় ভেসে বেড়ানো শামুকের প্রজাতির সংখ্যা ১০টিরও কম। গবেষণায় মলিকুলার কৌশল ব্যবহার করে এই প্রজাতির শামুকের ডিএনএ'র সঙ্গে অন্যান্য সমগোত্রীয় শামুকের ডিএনএ মিলিয়ে দেখে এই উপসংহার টানা হয়েছে যে, সাগর তলে বসবাসকারী ওয়েন্টেনট্র্যাপ নামে এক জাতের শামুক থেকে এই বুদবুদের ভেলায় ভেসে বেড়ানো শামুকের উৎপত্তি। ওয়েন্টেনট্র্যাপ শামুকের অসত্মিত্ব আজও আছে।
উভয় জাতের শামুকের পা থেকে শেস্নষ্মা নির্গত হয়। পা বলতে বোঝায় শরীরের তলায় মাংসপেশীর একটা কাঠামো। বেশিরভাগ শামুক সেই শেস্নষ্মাকে ডিমের আকরে পরিণত হতে দিলেও বুদবুদের ভেলায় ভেসে বেড়ানো শামুক বা বাবল্-র্যাফটাররা অন্য কাজ করে। তারা শেস্নষ্মার ভিতর বাতাস আটকে ফেলে একে বুদবুদে পরিণত করে। শেস্নষ্মার একটা বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো দ্রুত কঠিন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। কিন্তু ভিতরে বাতাস আটকা থাকায় শেস্নষ্মার এই বুদবুদ জলরাশিতে ভেসে বেড়ানোর ৰমতা অর্জন করে। এসব বুদবুদ পরস্পরের গায়ে গা লাগিয়ে গুচ্ছবদ্ধ হয় এবং ভেলা রচনা করে। এই ভেলার ওপর বাবল্ র্যাফটার শামুকরা বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়। বলাবাহুল্য, এরা ভেলার ওপর চড়ে থাকে না। বরং ভেলাকে অবলম্বন করে উল্টো হয়ে থেকে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটায়।
বাবল্-র্যাফটার শামুক কয়েক জাতের থাকলেও অতি সচরাচর যে জাতটাকে দেখা যায় তার নাম জানথিনা জানথিনা। এটি বেগুনি রংয়ের স্ত্রী জাতীয় শামুক। জানথিনা জানথিনা একমাত্র বাবল-র্যাফটিং শামুক, যার স্ত্রী জাতটি ভেলার ওপর ক্যাপসুল আকারের ডিম না পেড়ে নিজেদের শরীরের ভিতর ডিম পাড়ে। পরে সেই ডিম ভেলার গায়ে মজুদ রাখে।
এই শামুকরা উভয়লিঙ্গ। তার মানে এদের পুরম্নষরা শেষ পর্যনত্ম স্ত্রীজাতে পরিণত হয়। তারপর নিজেদের ভেলা রচনা করে এবং সেই ভেলায় চড়ে ভেসে ভেসে চলে যায়। সাগরের বুকে লার্ভা হিসেবে এদের সবার জীবন শুরম্ন হয়। সেই লার্ভা রূপানত্মরিত হয়ে কৈশোর অবস্থা লাভ করে। সেখান থেকে তারা প্রথমে পুরম্নষে পরিণত হয় এবং পুরম্নষ থেকে পরে স্ত্রী শামুকে রূপায়িত হয়। অবশ্য লিঙ্গ পরিবর্তনের এই ব্যাপারটা শামুকদের এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
বাবল্ র্যাফটিং শামুকদের পূর্বপুরম্নষরা সাগরতলে বাস করত। এরা কি করে ভেলাকে অবলম্বন করতে শিখল? এ ব্যাপারে গবেষকদের ব্যাখ্যা হলো_কোন এক পর্যায়ে উপকূলের কাছে বসবাসরত স্ত্রীজাতের শামুকরা ডিমসহ সমুদ্রের ঢেউয়ের দ্বারা অন্য স্থানে বাহিত হয়ে থাকবে। এভাবে কোন কিছুকে অবলম্বন করে সাময়িকভাবে ভেসে থাকার অভ্যাস এই শামুকগুলোর হয়ে থাকবে। শেষপর্যনত্ম পূর্বপুরম্নষদের মধ্যেকার এই শ্রেণীর শামুকগুলো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নিজেদের শেস্নষ্মা দিয়ে বুদবুদ সৃষ্টির এবং তারপর ভেলা বানানোর ৰমতা করায়ত্ত করে ফেলে। অবশ্য বুদবুদ তৈরির ক্ষমতা নিশ্চয়ই রাতারাতি হয়নি। বরং বেশ কিছু সময় লেগেছে। শেষপর্যনত্ম এরা অনেক বুদবুদকে একত্রিত করে ভেলার মতো বানিয়ে তাতে ভাসতে শিখেছে। এভাবেই এক সময় সাগরতলের বাসিন্দা শামুক ভেলায় চড়ে ভেসে বেড়ানো শামুকে রূপানত্মরিত হয়ে যায়। এই বিবর্তনগত পরিবর্তনের ফলে বাবল্ র্যাফটাররা সাগরপৃষ্ঠে খাদ্যের নতুন নতুন উৎসের সন্ধান পায়, যেখানে তারা প্রতিযোগিতা ছাড়াই মোটামুটি স্বাধীনভাবে বিচরণ করে বেড়াতে পারে।
বাবল্ র্যাফটিং শামুক উভয়লিঙ্গ। এই বৈশিষ্ট্যটি ছাড়াও এদের প্রজননচক্র এখনও কতকটা রহস্যের আবরণে ঢাকা। তবে এটা ঠিক যে, শুক্রাণু দেয়ার জন্য পুরম্নষদের অবশ্যই স্ত্রীদের খুঁজে বের করতে হয়। পুরম্নষরা যদি সাগরতলে বাস করে আর স্ত্রীরা সাগরপৃষ্ঠে ভেলায় চড়ে ভেসে বেড়ায় তাহলে মিলনের জন্য পরস্পরের সাৰাত পাওয়া তাদের কি করে সম্ভব? এই প্রশ্নসহ কিছু প্রশ্নের জবাব বিজ্ঞানীরা এখনও পাননি।
সূত্র : সায়েন্স ডেইলি