মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৪, ৮ অগ্রহায়ন ১৪২১
৩৬ বছর ধরে ৬১ হাজার বই সামলাচ্ছেন শুকুর ভাই
১৩০ বছরের প্রাচীন রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার
মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী থেকে ॥ চারদিকে গ্যালারি ভর্তি গাদা গাদা বই আর বই। একশ’ কিংবা দুইশ’ নয়, ৬১ হাজার বইয়ের সমাহার। এটি আজ থেকে ১৩০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন এক লাইব্রেরির গল্প। রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। নগরীর মিয়াপাড়ায় অবস্থিত বলে এটিকে ‘মিয়াপাড়া সাধারণ গ্রন্থাগার’ বলেই চেনে অনেকে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রানী ভবানীর বংশধর রাজা আনন্দনাথ। কালে কালে বহু মনীষীর পদধূলি মিশে আছে এ গ্রন্থাগারে। গ্রন্থাগারের ৩৬ বছরের সাক্ষী হয়ে আছেন শুকুর মোহাম্মদ। ‘শুকুর ভাই’ বলে পরিচিত। বিগত ৩৬ বছর ধরে একাই সামলে চলেছেন ৬১ হাজার বইয়ের এ সম্ভার।
সবার প্রিয় শুকুর ভাই ৩৬ বছর ধরে আগলে রেখেছেন লাইব্রেরিটি। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ, রুয়েট এবং রাজশাহী নার্সিং ইন্সটিটিউটে চাকরি পেয়েও যাননি এই প্রতিষ্ঠানের মায়া ছেড়ে।
শুকুর ভাইয়ের ভাষায় তাঁর চার সন্তান। বড় ছেলে পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত, তার পরেরটা ডিগ্রীতে পড়ে। শেষের জন রাজশাহী কলেজে হিসেব বিজ্ঞানে ¯œাতক শ্রেণীর ছাত্র। তাঁর অপর সন্তান রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। ১৮৮৪ সালের ১৯ জুলাই বুধবার প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরিটি প্রতি বুধবার বন্ধ থাকে।
বিশিষ্ট লেখক আবদুর রশীদ খানের ‘রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা হয় এ গ্রন্থাগার। তবে এর আগে ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত ডাব্লিউ ডাব্লিউ হান্টারের স্ট্যাটিস্টিক্যাল এ্যাকাউন্ট বইতে এই লাইব্রেরির কথা বলা হয়েছে। ১৮৮৪ সালে ভবন এবং জমি পাওয়ার পর এই লাইব্রেরিটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। হান্টারের দেয়া তথ্য মতে ১৮৭১-৭২ সালে এই লাইব্রেরিতে বই ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৪৭টি এবং সাময়িকী ছিল ছয়টি। এ সময় পাঠক ছিল নয়জন। এর মধ্যে ছয়জন ছিল ইংরেজ।
রাজা আনন্দ রায়ের পরে তাঁর ছেলে রাজা চন্দ্র রায় বছরে ২০ পাউন্ড বা ২০০ টাকা অনুদান দিতেন। বর্তমান ভবনে আসার আগে লাইব্রেরিটির বিভিন্ন জায়গাতে কাজ চলেছে। এর মধ্যে পুরাতন বাস স্ট্যান্ডের কাশিমপুর হাউসে এক সময় ছিল এই গ্রন্থাগার। দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের দান করা বর্তমান ভবনে মিয়াপাড়ায় গ্রন্থাগারটি স্থানান্তিরত হয়। তার চার ছেলে রাজা প্রমদানাথ রায়, কুমার বসন্ত কুমার রায়, কুমার শরৎ কুমার রায়, কুমার হেমন্ত কুমার রায় এবং মেয়ে রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা রায় রাজশাহীর অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো এই লাইব্রেরিতে বিভিন্নভাবে সহায়তা দেন। বর্তমানে ৬১ হাজার বইপত্র রয়েছে এখানে। এরমধ্যে ৩৬ হাজার বই এবং ২৫ হাজার পত্রিকার সংকলন রয়েছে। প্রতিদিন মোট ১৬টি স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকা রাখা হয়। তবে পাঠক বর্তমানে কমে গেছে। দিনে ৫০ থেকে ৬০ জন পাঠক আসেন। এর অধিকাংশ পত্রিকার পাঠক। দোতলা ভবনের নিচের তলায় রয়েছে অফিস, পত্রিকা পাঠের কক্ষ এবং মিলনায়তন। ওপরতলাতে তিন কক্ষে রয়েছে লাইব্রেরি। এর একটি রেফারেন্স শাখা।
আগে জেলা প্রশাসন, রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে নিয়মিত অনুদান পাওয়া যেত। এখন শুধু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বছরে অনুদান পাওয়া যায় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে বই হিসেবে দেয়া হয় ৩০ হাজার টাকা এবং নগদ অনুদান পাওয়া যায় ৩০ হাজার টাকা। গত দুই বছর এই অনুদান পাওয়া যায়নি। অন্য কেউ এই অনুদান উত্তোলন করে নেয়। সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক কবি অসিম সাহা এই লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন। তার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করা হয়। তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন।
এই গ্রন্থাগারে রয়েছে অনেক দুষ্প্রাপ্য বই। এর মধ্যে শেক্সপিয়ার রচনাবলীর প্রথম সংস্করণ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং মধুসূদন দত্তের রচনার প্রথম সংস্করণ রয়েছে এখানে। মহাত্মা গান্ধী, সরোজিনী নাইডু, নেতাজী সুভাষ বোস, ডক্টর সুনিতি কুমার চট্টোপাধ্যায় পরিদর্শন করেছেন এই গ্রন্থাগার।
১৯৮৪ সালে শতবর্ষ স্মারক গ্রন্থে তাদের স্বাক্ষরসহ মন্তব্য প্রকাশিত হয়। এছাড়া এই গ্রন্থাগার নিয়ে রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশন প্রকাশ করে শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলী। এছাড়া প্রকশিত হয়েছে আবদুর রশিদ খান রচিত রাজশাহীর সাধারণ গ্রন্থাগারের ইতিহাস। গ্রন্থাগারের আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে মিলনায়তন এবং মুক্তমঞ্চ ভাড়া। সম্প্রতি এটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।