মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১ নভেম্বর ২০১৪, ১৭ কার্তিক ১৪২১
বাঘার শাহী মসজিদ
মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী থেকে ॥ শাহদৌল্লাহর মাজার আর প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন সমৃদ্ধ অন্যতম দর্শনীয় স্থান রাজশাহীর বাঘা। প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো শাহী মসজিদ এখানকার সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান। ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ ঘিরে সুবিশাল দীঘি, প্রাচীন আন্দরমহল, পুকুরের ধ্বংসস্তূপ, হযরত আবদুল হামিদ দানিশ মান্দ এবং তদ্বীয় হযরত মুয়াজ্জেম দানিশমান্দসহ শাহ্দৌল্লাহর মাজার এবং সম্প্রতিক সময়ে গড়ে ওঠা জাদুঘর ও উৎসব পার্ক ভ্রমণপ্রিয় এবং ধর্মানুরাগী মানুষের জন্য হতে পারে এক সেরা আকর্ষণীয় স্থান।
রাজশাহী নগর থেকে ৫০ কিলোমিটারের পথ ইতিহাস সমৃদ্ধ বাঘা উপজেলার অবস্থান। পদ্মার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন ও স্থাপত্য কীর্তির প্রাচীন নিদর্শনটি দেশের অন্যান্য পর্যটন শিল্পের চেয়ে কোন অংশেই কম সম্ভাবনাময় নয়। দেশ স্বাধীনের পর থেকে সরকারী এবং বিরোধী দলের প্রধানসহ বহু এমপি, মন্ত্রী, বাঘাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ অবধি তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ উদ্যোগ নিলেই এটি হয়ে উঠতে পারে অন্যতম পর্যটক এলাকা।
এ উপজেলার পর্যটন শিল্পের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে শাহী মসজিদ। বাঘার এই বিখ্যাত ও বহুল প্রচারিত ঐতিহ্যের সাক্ষী শাহী মসজিদ এককালে এতদঞ্চলে ইসলাম প্রচারে নিবেদিত এক সাধকের প্রতি বাংলার সুলতানী আমলের অন্যতম সুযোগ্য শাসকের স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধার নিদর্শন। যা বর্তমানে দেশের ৫০ টাকার নোটে ও ১০ টাকার ডাক টিকিটে শোভা পাচ্ছে। পদ্মা নদীর তীরে প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দর্শনীয় শাহী মসজিদ, সুবিশাল দীঘি ও অন্য আউলিয়াদের সমাধি স্থান, মূল দরগাহ্ সবকিছু। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু একটি বেদির ওপরে এ মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। এর দুই পাশ দিয়ে দুটি বিশাল গেট রয়েছে। মসজিদের গায়ে তৎকালীন বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যকে টেরাকোটা তথা পোড়ামাটির কারুকাজের দেশজ নিদর্শন দিয়ে শাপলা ও লতা-পাতাসহ পর্সিয়ান খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম কারুকাজ।
মসজিদটিতে রয়েছে ৫টি দরজা, ১০টি গম্বুজ, ৪টি চৌচালা গম্বুজ, ভেতরে ৬টি স্তম্ভ, ৪টি অপূর্ব কারুকাজ খচিত মেহেরাব। দৈর্ঘ্য ৭৫ ফিট, প্রস্থ ৪২, উচ্চতা ২৪, দেয়াল চওড়া ৮ গম্বুজের ব্যাস ২৪, উচ্চতা ১২ ফিট। মাঝখানের দরজার উপরে ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। শাহী মসজিদের প্রতিষ্ঠাকাল ১৫২৩-২৪ খ্রিষ্টাব্দে। পরে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে স্থানীয় অন্যান্য ঐতিহাসিক ইমারতের সঙ্গে বাঘা শাহী মসজিদটিরও ক্ষতি হয়। এরপর ১৯৭৬-৭৭ সালে তা পুনঃনির্মাণ করা হয়। মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশেই রয়েছে হযরত শাহ্দৌল্লাহ ও তার ৫ সঙ্গীর মাজার। ১৯৭২ সালে এখানে তৈরি হয়েছে শাহ্দৌল্লার নামে বাঘা শাহ্দৌল্লাহ ডিগ্রী কলেজ।
এখন ঐতিহাসিক এই সুরম্য মসজিদ দর্শন করতে ও মাজার জিয়ারত করতে দূর-দূরান্তের লোকজন আসে প্রতিদিন। প্রতি শুক্রবার বসে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মিলনমেলা। তারা শরিক হন শুক্রবারের জামায়াতে। কিন্তু ভেতরে আর জায়গা ধরে না। এজন্য ৯০ বাই ৪০ একটি চত্বর বেঁধে দেয়া হয়েছে মসজিদের বাইরে। এছাড়া প্রতি ঈদে এখানে লক্ষাধিক লোকের আগমন ঘটে এবং সেই উপলক্ষে ঈদে বিশাল জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই বলে থাকেন, শোলাকিয়ার পরই বাঘা ঈদগাহের স্থান। এ উপলক্ষে যুগ যুগ ধরে এখানে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী বিরাট ঈদমেলা। ৫০০ বছরের অন্যতম এ স্থাপত্য কীর্তির সংস্কার ও সংরক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। ২০০৮ সালের আগস্টে রেডিও ফুর্তি (এফএম) ও গ্রামীণফোনে সৌজন্যে দেশের ২১টি প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা থেকে ৭টিকে এসএমএসের মাধ্যমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় নির্বাচনের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানালে বাঘা শাহী মসজিদ প্রথম স্থান অধিকার করে। এখানে আছে জহরখাকী পীরের মাজার। মূল মাজারের উত্তর পাশেই এটি অবস্থিত।
মাজারের পাশেই রয়েছে ৩ গম্বুজবিশিষ্ট একটি ছোট মসজিদ। একই ধরনের ইট, চুন সুরকিতে গাঁথা সুদর্শন এ মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২০, প্রস্থ ১৩। জানা গেছে, রইশ পরিবার ও বাইরের পর্দানসিন মহিলাদের জন্য তৈরি হয়েছিল এ মসজিদ। সম্প্রতি মাজার এলাকায় নারীদের নামাজের জন্য একটি সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি মাজার ঘেঁষে আরও একটি মোজাইকবিশিষ্ট নতুন মসজিদ নির্মিত হয়েছে অপরূপ কারুকাজে। এর দৈর্ঘ্য ৫০ ফিট, প্রস্থ ৫৫, উচ্চতা ১৩। বাঘার আরেকটি অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে সুবিশাল স্বচ্ছ পানির দীঘি। বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দীন হুসাইন শাহের ছেলে নাসির উদ্দীন নুশরত শাহ্ মসজিদের সঙ্গে জনকল্যাণের নিমিত্তে খনন করেন এ দীঘি। শাহী মসজিদ ও মাজার সংলগ্ন এ দীঘিটি ৫২ বিঘা জমির উপরে রয়েছে। প্রতি শীত মৌসুমে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে এ দীঘিতে আগমন ঘটে অসংখ্য অতিথি পাখি। যা ভ্রমণবিলাসী মানুষের নজর কাড়ে। সময়ের প্রয়োজনের এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পিকনিক কর্ণার। প্রতি শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে বাঘায়। ১৯৯৪ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের মাধ্যমে এটি পুনঃখনন করানো হয়। নতুন করে বাঁধানো হয় এর পাড়। চারিধারে লাগানো হয়েছে সারি সারি নারিকেল গাছ। ফলে বৃক্ষরাজি পরিবেষ্টিত দীঘি ও মসজিদের সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভ্রমণবিলাসী মানুষের মন কাড়তে এই স্থানের কোন জুড়ি নেই। বাঘার শাহী মসজিদ প্রাঙ্গণেই অবস্থিত জাদুঘর। সম্প্রতি এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ বছরের শেষের দিকে জাদুঘরটি চালু করা হবে। এতে এলাকার মুসলিম স্থাপত্যর নিদর্শনগুলো স্থান পাবে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে।
এসব দেখার পরে যে কেউ বাঘার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর মনোরম দৃশ্যও উপভোগ করতে পারেন। বয়ে যাওয়া নদী ও নদীর বুকে জেগে ওঠা চর যে কারও মন কাড়তে সক্ষম।
বাঘায় কেউ ঘুরতে যদি গৌড় মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে না যাওয়া হয় তাহলে বেড়াতে আসাটা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিষ্টি রাজশাহীজুড়ে প্রসিদ্ধ। প্রায় ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা সেখানে মিষ্টি তৈরি করে আসছে। আর এর স্বাদ অন্য এলাকার মিষ্টির থেকে আলাদা। রাজশাহী থেকে সরাসরি বাস যোগাযোগ আছে। সেখানে মাত্র ৫০ টাকা বাস ভাড়া লাগে। এছাড়া কেউ যদি রাজশাহী থেকে মাইক্রোবাস ভাড়া করে যেতে চায় তাহলে ২ হাজার থেকে টাকার মধ্যেই পাওয়া যাবে।