মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৮ জুন ২০১৪, ১৪ আষাঢ় ১৪২১
রেকর্ড গড়ল ঋষি সম্প্রদায়ের তিন ছাত্রী
বাল্যবিবাহ যেখানে হয় হরহামেশা, মেয়েদের বিবাহ দেয়া হয় যেখানে ১০ বছর বয়সে, কুসংস্কার যাদের নিয়মে পরিণত, দারিদ্র্যতা যাদের নিত্যসঙ্গী; সেই জায়গার মেয়েদের এসএসসি পাস কল্পনার অতীত। এই সব কিছু অতিক্রম করে এবার যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ঋষিপাড়ার ৩ মেয়ে এসএসসি পাস করেছে। অথচ বয়স ১০ বছর হয়ে যাওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাবার কথা তাদের। ব্যতিক্রম ওই তিন মেয়ে। তারা এবার যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছাতিয়ানতলা-চুড়ামনকাটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে। দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছরেও এ পাড়া থেকে কোন মেয়ে এসএসসি পাস করতে পারেনি। সেই ঋষিপাড়ার ৩ মেয়ে এবার এক সঙ্গে এসএসসি পাস করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে এ পাড়ায় চলছে অনেকটা উৎসবের আমেজ।
যশোর শহরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত চুড়ামনকাটি গ্রাম। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে মাত্র ৭ কিলোমিটার উত্তরে এ পাড়ার অবস্থান। স্থানীয় বয়জ্যেষ্ঠদের মতে, আনুমানিক সাড়ে তিন শ’ বছর পূর্ব থেকেই এ গ্রামে ঋষি সম্প্রদায়ের বসবাস। বর্তমানে এদের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। এদের মধ্যে ভোটার প্রায় ৯শ‘। তবে নানা কুসংস্কারের কারণে বরাবর পিছিয়েই ছিল তারা। লেখাপড়া করা তো দূরের কথা, সমাজে চলাফেরা করতে পারত না তারা। মেয়েদের ছিল আরও দৈন্যদশা। বয়স ১০ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যেত তাদের। তারপর অল্প বয়সে সন্তানের মা হওয়াসহ সংসার সামলাতে সামলাতে আক্রান্ত হতো রোগব্যাধিতে। এভাবেই একদিন সাঙ্গ হতো তাদের জীবনের গতি। তবে সময়ের ব্যবধানে আস্তে আস্তে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় চুড়ামনকাটি ঋষিপাড়ার ৩ মেয়ে শিক্ষার্থী এবার ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএস সি পাস করেছে।
চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য আবু বকর সিদ্দিকী জানান, ঋষিপাড়ার মানুষের দৈন্যদশা দেখে এলাকার কয়েক সমাজ হিতৈষী মানুষ এগিয়ে আসেন। তারা বাল্য বিবাহ রোধ ও মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করেন। এ ছাড়া যে সমস্ত কারণে সমাজের মানুষ তাদের গ্রহণ করত না সেসব কাজ করা থেকে তাদের নিবৃত্ত করতে উৎসাহিত করেন। এর ফলে এক পর্যায়ে সমাজে উঠতে পারাসহ তাদের ছেলেসন্তানরা স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। তবে বাল্য বিবাহ আর অর্থকষ্টের কারণে সে সুযোগ পাচ্ছিল না এ পাড়ার মেয়েরা। তিনি বলেন, শুধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নয়, এ অবস্থা চলে আসছিল সাড়ে ৩শ’ বছর ধরে। এবার তার অবসান ঘটেছে। এ পাড়া থেকে বিপুল দাশের মেয়ে দিপ্তী রানী দাশ, মহাদেব দাশের মেয়ে ভাবনা রানী দাশ, রবিন্দ্রনাথ দাশের মেয়ে অর্পনা দাশ এবার ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ ও বি গ্রেডে এসএসসি পাস করেছে। পাড়ার মাতব্বর অতুল চন্দ্র দাস জানান, ৩ মেয়ে যা করেছে তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তাদের হাত ধরে এখন অন্যরাও এগিয়ে যেতে পারবে।
যাদের মাধ্যমে এই ইতিহাস রচিত হয়েছে সেই ৩ শিক্ষার্থীও বেজায় খুশি। তারা বলছে-তারা আলোর পথ দেখিয়ে দিল। এজন্য তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তার পরও তারা খুশি এজন্য যে আর কেউ বলতে পারবে না ঋষিপাড়ার মেয়েরা লেখাপড়া করে না। আমরা ৪৪ বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে ঋষিপাড়ায় আলোর প্রদীপ জ্বালতে সক্ষম হয়েছি।
-সাজেদ রহমান, যশোর থেকে