মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৮ জুন ২০১৪, ১৪ আষাঢ় ১৪২১
দুলাল রাজা ও থানা বিবির দীঘির কাহিনী
আলমগীর তালুকদার, কচুয়া থেকে ॥ চাঁদপুর জেলাধীন কচুয়া উপজেলার পালগিরি একটি বহুল আলোচিত প্রাচীন জনপদ। উপজেলা সদর হতে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ও গুরুত্বপূর্ণ কালিয়াপাড়া সড়ক সংলগ্ন উত্তর পাশে পালগিরী গ্রামে দুলাল রাজা ও থানা বিবির দীঘি রয়েছে। দেশের বহু প্রাচীন জনপদকে ঘিরে রয়েছে কিংবদন্তি মূলক গল্প কাহিনী। এসব গল্প কাহিনী শোনার জন্য মানুষ চরম কৌতূহল বোধ করে থাকে।
বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের লোকজনরা আজও চরম আগ্রহ ভরে পৌরাণিক কাহিনী শুনে থাকে। এটি কিংবদন্তি ঘেরা দেশের এক উল্লেখযোগ্য জনপদ রূপে মানুষের নিকট পরিচিত। দুই বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পালগিরী গ্রামে প্রায় ৬ হাজার লোকবাস করে। উচুঁ ভূমি ও প্রায় সমতল বিশিষ্ট এ গ্রামে পথ ঘাট বেশ উন্নত। হরেক রকম প্রাচীন বৃক্ষ-লতা দিয়ে ঘেরা ছায়া সুনিবিড় এ গ্রামে সৌন্দর্যবোধ সকলেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, পালরাজাদের আমলে নদী পথে এ প্রশস্ত স্থান (পালগিরি গ্রাম অংশ) ব্যবসায়ীদের একটি আড়তে পরিণত হবার কারণেও এ গ্রামের নাম করণ পালগিরি হয়ে থাকতে পারে।
প্রাচীন বাংলার প্রথানুযায়ী কথিত এ নদীর পাড়েই একটি ছোট জনবসতি এলাকা (পালগিরি গ্রাম) কান্দিরপাড় নামে লোকজনের নিকট পরিচিত। পালগিরি গ্রামকে ঘিরে যেমনি রয়েছে অনেক অনেক কিংবদন্তি, তেমনি সে সব কাহিনীর প্রেক্ষাপটে কিছু প্রতীকী সাক্ষীরের অস্তিত্ব আজও বিদ্যমান রয়েছে পালগিরি গ্রামে। ফলে কিংবদন্তির কাহিনীগুলো আজও পরম সমাদরে লোক মুখে আলোচিত হচ্ছে। এ গ্রামের বিভিন্ন স্মৃতি চিহ্ন আবিষ্কার থেকে ধারণা করা হচ্ছে ৭৬এর মনন্তরে (বাংলা ১১৭৬ সন) কিংবা সমসাময়িক কালে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভৌগোলিক এবং সামাজিক প্রকৃতি পরিবেশ পাল্টে যায়।
এ গ্রামের বর্তমানে অধিবাসীদের পূর্ব পুরুষরা অন্যত্র থেকে এ গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। এ থেকে এক সময়ে এক পালগিরি গ্রাম এলাকা যে জনশূন্য হয়ে পড়েছিল এ ধারণা বোধই সৃষ্টি করছে। এ গ্রামে রয়েছে কয়েকটি প্রাচীন দীঘি, একটি প্রাচীন মসজিদ, স্থানে স্থানে ইটের ডিবি, পুরনো ইমারতের ভগ্নাবশেষ প্রাচীন আমলের তৈরি মাটির বাসন কোসন। তাছাড়া বিভিন্ন সময় এ এলাকায় মাটি ও পুকুর খনন করে পাওয়া গেছে ঘড়া (ঘটকি) ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা, স্বর্ণালঙ্কার, নৌকার বৈঠা, দীর্ঘদেহী মানুষের কংকাল, শিবের দশভুজা মূর্তি (কুমিল্লা জাদুঘরে রক্ষিত), গভীর নলকূপ বসাতে গিয়ে পাওয়া যায় ২৪০ ফুট নিচে হলদে বর্ণের গাছের টুকরা। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, এককালে দুলাল রাজা নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। লোক মুখে তিনি রাজা হিসাবেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
দুলাল রাজা তাঁর অনিন্দ্যসুন্দরী ভাগ্নে বধূ থানা বিবির রূপের মোহে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করার অভিলাষ ব্যক্ত করেন। এতে বুদ্ধিমতী রূপের রানী থানা বিবির শর্ত আরোপ করেন যে, থানা বিবি ও দুলাল রাজা একই রাতে পৃথক-পৃথক দু’টি দীঘি খননের কাজ সম্পন্ন করবে। দুলাল রাজার দীঘিটি হবে থানা বিবির দীঘির তুলনায় বড় এবং থানা বিবির দীঘি খননের পূর্বেই দুলাল রাজার দীঘি খননের কাজ সমাপ্ত করতে হবে। এ পরীক্ষায় দুলাল রাজা জয়ী হলে তিনি থানা বিবিকে বিয়ে করতে পারবেন। তবে ব্যর্থ হলে দুলাল রাজাকে সূর্যোদয়ের পূর্বেই দেশ ত্যাগ করতে হবে। শর্তানুযায়ী দু’জন একই রাতে একই সময়ে দীঘি খননের কাজে লেগে যান। থানা বিবির দীঘি খননের কাজ রাতের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু দুলাল রাজার দীঘির তিনপাড় বাঁধা শেষে উত্তর পাড় বাঁধা শুরু করলে থানা বিবির চাতুরিতে তারই পোষা মোরগ রাত শেষ হওয়ার ডাক ডেকে ওঠে। ফলে উত্তর পাড় আর বাঁধা হয়নি।
দুলাল রাজার দীঘি খননের কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। পরাজিত দুলাল রাজা সূর্যোদয়ের পূর্বেই দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অনেক খুঁজাখুঁজির পরও দুলাল রাজার সন্ধান মিলেনি। কেউ বলেন- তিনি আত্মহত্যা করেছে। ৩ একর আয়তন বিশিষ্ট থানা বিবির দীঘিটি এখনও গ্রামের দক্ষিণাংশে এবং ২০ একর আয়তন বিশিষ্ট দুলাল রাজার দীঘির উত্তর-পূর্বাংশে। দুই দীঘির দূরত্ব প্রায় ৫শ’ মিটার। লোকমুখে শোনা যায় আগের দিনের লোকজন বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে (বিয়ে, মেসবানী ইত্যাদি) তাদের দরকার মতো থালা বাসন চাইলে থানা বিবির দীঘিতে নৌকায় ভেসে উঠত পিতলের থালা-বাসন। ৭০/৭৫ বছর পূর্বে কেউ একজন নাকি কিছু থালাবাসন চুরি করে রেখে দিয়েছিল আর সেই থেকেই থালা-বাসন ওঠা বন্ধ হয়ে যায়। তবে আজও অনেকেই বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে থানা বিবির দীঘিতে দুধ, কলা ভোগ দেয়াসহ দীঘির পানি পান করেন। এতে কেউ কেউ উপকার পাওয়ার কথা দাবি করছেন।
স্থানীয় লোকজনরা দুলাল রাজার দীঘির বিভিন্ন অংশ বন্দোবস্ত নিয়ে তাদের ইচ্ছানুযায়ী ফসলাদি ফলানোসহ মাছ চাষ করে থাকে। এ দীঘির সংস্কার কাজ করে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করলে বছরে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মাছ উৎপাদন সম্ভব।