মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৮ জুন ২০১৪, ১৪ আষাঢ় ১৪২১
চরম দারিদ্র্য থমকে দিচ্ছে রাখাইনদের শিক্ষাজীবন
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েও হতাশা নেমে এসেছে রাখাইন শিক্ষার্থী নীলার জীবনে। তার বড় বোন চান্দাও এএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কিন্তু আর্থিক চরম দৈন্যের কাছে ভাল কোন কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সে এখন কলাপাড়ার মোজাহারউদ্দিন বিশ্বাস কলেজের ডিগ্রীর ছাত্রী। দরিদ্র বাবা বাঁচো মং তালুকদারের উপার্জন বলতে কবিরাজি। দৈনিক সর্বোচ্চ ৪০ টাকা। মা নেয়সে বাড়িতে তাঁতের দু একটা কাপড় বুননের কাজ করছেন। এ দিয়ে সংসারে দু’বেলা খাবার জোটে না। তার উপরে লেখা-পড়ার খরচ তো মেটানোর সুযোগ নেই। এ কারণে নীলার ভাল কোন কলেজে ভর্তি হওয়া ঝুলে আছে চরম অনিশ্চয়তায়।
ধুলাসার ইউনিয়নের বৌলতলী রাখাইনপাড়ায় বাড়ি নীলাদের। অনেক কষ্টে নিজে টিউশনির টাকায় কোনমতে এসএসসি পার হয়েছে। ডালবুগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ বছর নীলা জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাড়ি থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে হেঁটে রোদ-বৃষ্টির ধকল পেরিয়ে এ ধাপ পার করলেও এখন কী হবে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না ।
রাখাইন হতদরিদ্র এ পরিবারের দুঃখের যেন শেষ নেই। নীলার বড়বোন চান্দা অদম্য মেধাবী থাকলেও আর্থিক দৈন্যে দিশাহারা হয়ে তার বাবা তাঁকে বিয়ে দিয়েছেন। এমনকি হতাশ হয়ে নীলাকেও বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন অসহায় এ মানুষটি। তারপরও থমকে যায়নি এ দুবোনের শিক্ষার অগ্রযাত্রা। ইস্পাতকঠিন দৃঢ় মনোবল নিয়ে শিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করার স্বপ্নে ছিল এরা বিভোর। কিন্তু তেল সলতে না থাকা হারিকেনে যেমন আলো জ্বালানো যায় না। আবার জ্বললেও ধপ করে নিভে যায়- এমনই দশা নীলাদের। নীলা জানায়, প্রতিদিন সকালেই ছুটতে হয়েছে স্কুলে। কখনও খালি পেটে কখনও আধাপেট, তাও নুনে-পান্তা। আর দুপুর তো নিত্য উপোস। সেই শেষ বিকালে বাড়ি ফিরে হয়ত জুটত কিছু খাবার। এর পরেই টিউশনি। তাও তাদের রাখাইনপাড়ার ৪/৫টি শিশু। এ দিয়ে আয় বলতে মাসে চার-পাঁচ শ’ টাকা। এরপরে গভীর রাত অবধি নিজের বইয়ে চোখ মেলানো। এটুকু যোগান দিয়ে কোনমতে পার হয়েছে নীলার এসএসসি মিশন। নীলাদের বসত ঘরটিরও দশা চরম বেহাল। টংঘরটি যেন জীর্ণদশার মডেল হয়ে আছে। জং ধরা টিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে। ফুটো হয়ে আছে অসংখ্য। বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায়। আবার এখন ক্ষয়ে যাওয়া চালে টিনের ছিদ্র দিয়ে রোদের আলোর ঝলকানিও পড়ছে ঘরের মধ্যে। দুরবস্থা দেখে যেন প্রকৃতিও হাসছে। এ অবস্থা ঠেকাতে পলিথিন দিয়েছেন নীলার বাবা। ঘরটির বেড়া এমনিতেই ধসে পড়ছে। অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী নীলার ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন নিয়ে এখন চরম শঙ্কায় পড়েছেন বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা। অসহায়ত্ত ফুটে উঠছে তাদের চেহারায়ও। বোঝা যায় কথাবার্তায়। ছোট মেয়ের ভাল ফলাফলে বৃদ্ধ মানুষ দু’টির যখন হাসিখুশি থাকার কথা। উল্টো তারা হতাশায় পড়েছেন মেয়ের লেখাপড়ার ভবিষ্যত অনিশ্চয়তা নিয়ে।
নীলার বাবা বাঁচো মং জানালেন, এখন তার বয়স ৬৪ বছর। ডায়াবেটিসের রোগী। নিজের কোন উপার্জন নেই। সরকার থেকে মাত্র ৩০০ টাকা ফি-মাসে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। যেন অসহায়ত্তের সব ধকল এ পরিবারটির ওপর চেপে বসেছে। চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। আমরা ক’জন সংবাদকর্মী যখন কথা বলে ফিরব তখন অসহায় মানুষটি তার ভাষায় বললেন, ‘মাইয়াতো পড়াইতে চায়, কিন্তু ক্যামনে পড়াইবে?’ এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে আমরাও হোন্ডায় চেপে ফেরত গন্তব্যের দিকে।
-মেজবাহউদ্দিন মাননু,
কলাপাড়া থেকে