মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৮ জুন ২০১৪, ১৪ আষাঢ় ১৪২১
বিশ কিমি পথ কমাতে পারে একটি ব্রিজ
কংস নদীর ওপর ব্রিজ না থাকায় হাজারও মানুষের দুর্ভোগ
বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে ॥ হালুয়াঘাটে কংস নদীর ওপর একটি পাকা ব্রিজের অভাবে হাজারো মানুষ নিত্যদিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ব্রিজ না থাকায় সাখুয়াই বাজার সংলগ্ন কংস নদী পাড়ি দিতে হালুয়াঘাটসহ ধোবাউড়ার গোয়াতলা, পূর্বধলা, তারাকান্দা ও ফুলপুর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের ভরসা নৌকা। বর্ষায় নৌকায় পারপারের সময় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। ব্রিজ না থাকায় স্থানীয় কৃষক ও রোগীর স্বজনরাও চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। অথচ ব্রিজটি নির্মাণ করা হলে এসব এলাকা থেকে ময়মনসিংহ জেলা সদরের ২০ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে বলে দাবি ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর। ব্রিজটি নির্মাণে নির্বাচনের সময় অনেকে আশ্বাস দিলেও পরে আর সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে হতাশ এলাকাবাসী।
সাখুয়াই গ্রামের ষাটোর্ধ সম্পন্ন কৃষক নুরুল ইসলাম জানান, হালুয়াঘাটের সাখুয়াই ইউনিয়নের এই কংস নদীর ওপর ভর করে একসময় গড়ে উঠেছিল প্রসিদ্ধ বাজার সাখুয়াই। খরস্রোতা কংস কেবল সুস্বাদু মাছের জন্যই বিখ্যাত ছিল না। কংস নদী হয়ে বড় বড় নৌকা পাট ও ধান বোঝাই করে পাড়ি দিত কলকাতা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশ-বিদেশের নানাস্থানে। এলাকার কৃষিপণ্যনির্ভর সেই অর্থনীতি ছিল অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু পাঁচ-ছয় দশকে বদলে গেছে সেই চিত্র। বর্ষা ছাড়া এখন আর কংস দুকূল ছাপিয়ে চলে না। শুকনায় মরা গাং। তারপরও পাহাড়ি ঢলে যে কোন সময় উত্তাল হয়ে ওঠে কংস। এটিই কংসের চরিত্র, জানালেন বড়ইকান্দি গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ কৃষক মারফত আলী। একই গ্রামের খলিলুর রহমান জানান- হালুয়াঘাট উপজেলার সাখুয়াই, বিলডোরা, মুন্সিরহাট; ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলা, বাঘবেড়; ফুলপুর উপজেলার বালিয়া, বওলা, ঢাকুয়া, রুপসীসহ তারাকান্দা ও পূর্বধলা উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ ময়মনসিংহ সদরে যেতে এই কংস পার হতে হয়। ব্রিজ না থাকায় এসব এলাকার মানুষকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে ময়মনসিংহ জেলা সদরে।
হালুয়াঘাটের মুন্সিরহাট থেকে ময়মনসিংহ জেলা সদরে যাতায়াতে কেবল দূরত্বই নয় সময়ও কমবে অন্তত একঘণ্টা। ব্রিজটি হলে একই সঙ্গে হালুয়াঘাট থেকে তারাকান্দা ও তালদীঘি হয়ে ময়মনসিংহ জেলা সদরে যাতায়াতে দুই ঘণ্টার স্থলে সময় লাগবে মাত্র এক ঘণ্টা। এছাড়া সাখুয়াই ও বালিয়া বাজারের মধ্যে কৃষিপণ্য পরিবহনে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেটিও দূর হয়ে যাবে । ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, কংসের ওপর পাকা ব্রিজ না থাকায় তাদের কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। ন্যায্য মূল্যও পাচ্ছে না তারা। কারণ ব্রিজটি নির্মাণ করা হলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ দেশের নানাস্থান থেকে পাইকার এসে কৃষিপণ্য নিয়ে যেত। কিন্তু এখন প্রয়োজনীয় পাইকার না থাকায় স্থানীয় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী পাইকারদের কাছে অনেক সময় বাধ্য হয়ে পানির দরে তাদের কৃষিপণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। যোগাযোগ ও পরিবহন সমস্যার কারণে চাইলেও অনেক কৃষক সরাসরি তাদের কৃষিপণ্য ঢাকা কিংবা ময়মনসিংহ সদরে নিয়ে বিক্রি করতে পারছে না। এতে স্থানীয় কৃষকরা বছরের পর বছর লোকসানের মুখে পড়ে আসছেন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন জরুরী ও জটিল রোগীর স্বজনরা। সাহিদা আক্তার এমনই এক ভুক্তভোগী। জানালেন, জরুরী প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নিতে ফুলপুর কিংবা হালুয়াঘাট যাতায়াতে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। বিশেষ করে রাত ১০ টার পর কোন নৌকা ঘাটে না থাকায় রোগী ও স্বজনদের আল্লার ওপর ভরসা করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। আর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে চাইলে ন্যূনতম ২০ কিলোমিটার ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। সাহিদার দাবি অচিরেই যেন কংসের ওপর পাকা ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। কংস নদীর দুপারেই রয়েছে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই কংস পার হতে হচ্ছে। বর্ষায় এসব শিক্ষার্থীর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কংস পারাপারে উদ্বিগ্ন থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কারণ প্রতি বর্ষায় খরস্রোতা কংস নদীতে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। নৌকা দিয়ে নদী পারাপারে বিলম্বের কারণে অনেক সময় ক্লাস ও পরীক্ষা মিস করছে শিক্ষার্থীরা। এলাকাবাসীর এই সমস্যা সমাধানে প্রতি নির্বাচনেই প্রার্থীরা কংস নদীতে পাকা ব্রিজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর কেউই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেননি। ফলে এলাকাবাসীর সেই স্বপ্নের ব্রিজ স্বপ্নেই থেকে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে পাকা ব্রিজ নিয়ে হতাশ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন। সাখুয়াই ইউনিয়ন পরিষদে পর পর একাধিকবার নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধি আক্ষেপ করে জানালেন, কংস নদীতে পাকা ব্রিজ নির্মাণে বহুবার ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভাতে রেজুলেশন করা হয়েছে। সেই রেজুলেশন পাসও হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আবেদনও করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পাকা ব্রিজ নির্মাণে কার্যকর কোন পদক্ষেপের খবর জানেন না বলে জানালেন এই ইউপি চেয়ারম্যান। তার দাবি ব্রিজটি হলে এলাকার হাটবাজারসহ কৃষি অর্থনীতির বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন হতো। ইউপি চেয়ারম্যান আরও জানালেন, প্রতিদিন গড়ে কংস পার হয়ে নানা গন্তব্যে যায় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ। আর স্থানীয় হাটবারে পাঁচ-ছয় হাজার মানুষকে কংস পার হতে হচ্ছে। অথচ ব্রিজটি নির্মাণে সরকার ও প্রশাসন কারও কোন গরজ নেই। তবে এ নিয়ে কিছুটা আশার কথা শুনালেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল এলজিইডি, ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম ইসমত কিবরিয়া। জনকণ্ঠকে তিনি জানান, কংস নদীতে পাকা ব্রিজ নির্মাণে প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ চলছে। এরই মধ্যে পাকা ব্রিজ নির্মাণে এটিকে এলজিইডির একটি প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।