মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ২৪ মে ২০১৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২১
রোয়াইলবাড়ি দুর্গ
সুলতানী আমলের শৌর্যবীর্যের সাক্ষী
সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে ॥ রোয়াইলবাড়ি দুর্গ। বাংলার প্রাচীন শাসনকর্তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যমন্ডিত এক স্থান। একসময় বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে এ দুর্গে। বাংলার সুলতান হুসেন শাহ্, নছরৎ শাহ্ এবং ঈশা খাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর ঠক ঠক শব্দে দিনের পর দিন কেঁপেছে এর মাটি। সেই শাসকরা এখন আর নেই। কিন্তু তাঁদের অহংকার ও সৌর্য্য-বীর্য্যরে সাক্ষী হয়ে আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন দুর্গটি। যদিও হারিয়ে গেছে এর আগের রূপ-অবয়ব। রোয়াইলবাড়ি এখন কেবলই এক নীরব, নিথর ধ্বংসস্তূপ।
জানা গেছে, ‘রোয়াইল’ একটি আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ ‘ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনী।’ সুতরাং ‘রোয়াইলবাড়ি’র অর্থ দাঁড়ায় ‘অশ্বারোহী বাহিনীর বাড়ি’। রোয়াইলবাড়ি এখন একটি পুরো গ্রাম বা ইউনিয়নের নাম। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। রোয়াইলবাড়ি দুর্গের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেতাই নদী। ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত আরেক ঐতিহাসিক স্থান কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি দুর্গও রোয়াইলবাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে কামরূপের রাজা নিলাম্বরের বিরুদ্ধে এক প্রচ- যুদ্ধ পরিচালনা করে কামরূপ রাজ্য দখল করেন। এরপর কিছুদিন তাঁর পুত্র নছরৎ শাহ্ কামরূপ শাসন করেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে তিনি বিতাড়িত হন এবং এক পর্যায়ে কামরূপ থেকে পালিয়ে আসেন। কথিত আছে, নছরৎ শাহ্ কামরূপ থেকে পালিয়ে এসে পূর্ব ময়মনসিংহের (বর্তমান নেত্রকোনার) রোয়াইলবাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি এ অঞ্চলটির নামকরণ করেন ‘নছরৎ ও জিয়াল’ (কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে- ‘নছরৎ আজিয়াল’)। পরবর্তীতে তাঁর শাসন অন্তর্গত সমস্ত প্রদেশটিই (বৃহত্তর ময়মনসিংহ) ‘নছরৎশাহী পরগনা’ নামে পরিচিত হয় এবং আকবর শাহ্র সময় পর্যন্তও পরগনাটি এ নামেই পরিচিত ছিল। এর পর বাঙালীর গৌরব মসনদে আলী ঈশা খাঁ এ অঞ্চলে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ও নেত্রকোনার রোয়াইলবাড়ি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নেন। জানা গেছে, রোয়াইলবাড়ি থেকে জঙ্গলবাড়ি পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তাও ছিল, যা ধ্বংস হতে হতে কিছুদিন আগে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এদিকে ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পারিষদ দেওয়ান জালাল এখানকার আধিপত্য গ্রহণ করেন। তিনি রোয়াইলবাড়ি দুর্গের ব্যাপক সংস্কার এবং দুর্গের বহিরাঙ্গনে একটি সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি ‘মসজিদ-এ জালাল’ বা ‘জালাল মসজি’ নামে পরিচিত ছিল।
এসব কিংবদন্তী ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী রোয়াইলবাড়ি দুর্গের বিস্তীর্ণ অংশ দু’যুগ আগেও মাটির নিচে চাপাপড়ে ছিল। প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রোয়াইলবাড়ি দুর্গে খনন কাজ পরিাচলনা করে। দীর্ঘ সময়ের এ খনন কাজে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে প্রাচীন প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ। উদ্ধার করা হয়- ইটের দেয়ালবেষ্টিত দুর্গ, মূল প্রবেশদ্বার (সিংহদ্বার), বহু কক্ষবিশিষ্ট একাধিক ইমারতের চিহ্ন, শান বাঁধানো ঘাটসহ দুটি বড় পুকুর, দুটি পরিখা, বুরুজ ঢিবি বা উঁচু ইমারত (টাওয়ার), বার দুয়ারী ঢিবি, কবরস্থান, মসজিদ, মিহরাব, চওড়া প্রাচীর, লতাপাতা ও ফুল-ফলে আঁকা রঙিন প্রলেপযুক্ত কারুকাজ, পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, টালি, জ্যামিতিক মোটিফ, টেরাকোটা, বর্শা, প্রস্তরখন্ড এবং লোহা ও চিনামাটির নানা জিনিসপত্র।
প্রায় ৪৬ একর ভূমির ওপর রোয়াইলবাড়ির প্রাচীন সুরক্ষিত এলাকাটি অবস্থিত। সমস্ত দুর্গ এলাকাটি তিনভাগে বিভক্ত। মূল দুর্গের পূর্বদিকে ছিল দু’টি পুকুর, যার অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। দক্ষিণ দিকের মাটিরে দেয়ালের দু’পাশে ছিল দুটি পরিখা। একটি পরিখা বেতাই নদী থেকে আসা নৌযানসমূহ নোঙ্গর করার জন্য ব্যবহৃত হতো বলে অনুমান করা হয়। ধারণা করা হয়, দুর্গের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে বড় বড় পাথরখ- দিয়ে নির্মিত আরও দুটি প্রবেশ পথ ছিল। দুর্গের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষিত এলাকার উত্তরাংশে ছিল একটি বুরুজ ঢিবি একটি প্রবেশপথ ও কবরস্থান।
এছাড়াও বুরুজ ঢিবির পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ, সমান্তরাল তিনটি দেয়াল, প্রবেশদ্বার, ওয়াচ টাওয়ার (পর্যবেক্ষণ চিলেকোঠা) ও চওড়া সিঁড়ি। খননের সময় পর্যন্ত দুর্গের অভ্যন্তরের উত্তর ও পূর্বদিকের প্রবেশ দেয়াল দুটি সাদা, নীল, সবুজ ও বাদামী রংয়ের চকচকে টালি দিয়ে বিভিন্ন ফুল-ফল, লতাপাতা এবং দড়ির নকশায় সজ্জিত ছিল। এখন এগুলো শেওলায় ঢেকে গেছে। জানা যায়, এ মসজিদের ১৫টি গম্বুজ ছিল। এছাড়া মসজিদের কাঠামোতে ছিল, ১২টি দরজা, পাঁচটি খুতবা পাঠের মেহরাব (মিম্বর) এবং মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল কয়েকটি খিলান। চমৎকার সূর্যমূখী ফুলের নকশায় পরিপূর্ণ ছিল মসজিদের দেয়ালগুলো। দুর্গের দক্ষিণ দিকের খোলা ময়দানটিকে সৈন্যবাহিনীর প্যারেড গ্রাউন্ড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়াও দুর্গের বিভিন্ন অংশে বেশ কয়েকটি ভবন বা ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। কথিত আছে- এ দুর্গের অভ্যন্তরের একটি কবরেই শুয়ে আছেন নেয়ামত বিবি। গবেষকদের মতে, রোয়াইলবাড়ির দুর্গের সমস্ত স্থাপনা সুলতানী আমলের স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত হলেও এর কারুকাজ ছিল অনেক বেশি নান্দনিক ও শিল্পসমৃদ্ধ।
ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্তের অনেক লোক ছুটে আসেন। সেখানে গেলে অশ্বারোহী বাহিনীর সেই ঠক ঠক শব্দ আর শোনা না গেলেও, নিজের অন্তর্দৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য হলেও সুলতান হুসেন শাহ্, নছরৎ শাহ্ এবং ঈশা খাঁর সেই হারানো দিনগুলোতে নিয়ে যায়। দুর্গের সুদৃশ্য ইমারত, অপরূপ কারকার্যখচিত পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ দর্শকমনকে ডেকে নেয় হাতছানি দিয়ে।

যে ভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী অথবা ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদী সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে প্রথমে নেত্রকোনা যেতে হয়। পরে নেত্রকোনা থেকে বাস, অটোরিকশায় যেতে হয় কেন্দুয়া উপজেলা সদরে। এর পর কেন্দুয়া থেকে আবার অটোরিকশা বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে সোজা যাওয়া যায় রোয়াইলবাড়িতে।