মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০১৪, ২২ চৈত্র ১৪২০
জীবনযুদ্ধে লড়াকু সৈনিক আছিয়া
১৬ বছর সংসার করেও স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পদ-টাকাকড়ি থেকে বঞ্চিত আছিয়া বেঁচে থাকার তাগিদে নিরন্তর লড়াই করে আজ স্বাবলম্বী। এখন তিনি ১১ কাঠা জমি, একটি দোকান, চারটি গরু, ইটের দেয়াল দেয়া বাড়ির মালিক। দোকানে বসে খদ্দের সামলানোর পাশাপাশি অবসরে মোবাইলে তুলে রাখা গান শোনেন।
নাটোর শহরের অদূরে ঘোড়াগাছা আমহাটি গ্রামের ১৬ বছরের কিশোরী আছিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছিল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর গ্রামে। স্বামী শফিকুল ইসলাম ছিলেন সেনাসদস্য। স্বামীর সঙ্গে সংসার করেছেন মাত্র ১৬ বছর। ১৯৮৯ সালে আছিয়া বাবার বাড়ি নাটোরে বেড়াতে এসে কপাল পুড়িয়েছেন। একই সময় স্বামী অসুস্থ হয়ে গাজীপুরে নিজ বাড়িতে ফিরে দু’দিনের মাথায় মারা যান। এ দুঃসংবাদটি শ্বশুরবাড়ির লোকজন আছিয়াকে জানায়নি। স্বামীর মৃত্যুর মাসখানেক পর সে খবর তাঁর কানে আসে। খবর পেয়ে পাগলপারা হয়ে ছুটে যান তিনি গাজীপুর। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ফিরে আসেন বাবার বাড়ি নাটোরে। বাবার সম্পত্তির অংশীদার হয়ে পেয়েছেন পাঁচ কাঠা জমি। তাতেই মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। চাকরি সুবাদে স্বামীর পাওনা টাকাকড়ি থেকেও তাঁকে কৌশলে বঞ্চিত করা হয়েছে। নাটোর ফিরে এসে শুরু হয় আছিয়ার বেঁচে থাকার লড়াই। ফের সংসার পেতে নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন আছিয়া। কিন্তু মতলববাজ পুরুষটিকে চিনতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি। ধরা পড়ে বিদায় হয় সে পুরুষটি। এরপর আর সংসারমুখো হননি আছিয়া। জীবনযুদ্ধের শুরুতে নেমেছিলেন শাড়ি-কাপড়ের ব্যবসায়। তাতে দিনভর টো টো করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর কষ্ট পোষায় না। পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে মৌমাছি প্রতিপালন করে মধু বেচে আর কাঁথা সেলাই করে রোজগারের চাকা সচল রেখেছেন। তা থেকে পয়সা জমিয়ে কিনেছেন গাভী। দুধ বিক্রির পয়সায় বাবার দেয়া জমির লাগোয়া আরও ছয় কাঠা জমি কিনে আছিয়া এখন ১১ কাঠার মালিক। শহরের চায়ের স্টলে দুধ বিক্রির অভিজ্ঞতা থেকে বছর সাতেক আগে নিজেই বাড়ির সামনে চালা তুলে চায়ের কেটলি হাতে নেন। গ্রামের চায়ের স্টল। শুধু চা বিক্রি হয় না দেখে পরে বিস্কুট, চানাচুর, চিড়ে-মুড়ির মোয়া, কলা সবই রেখেছেন। নিঃসস্তান আছিয়ার বয়স এখন ৫৭। গরু আর দোকান নিয়ে তাঁর সংসার। গরুর দুধ বেচে আর দোকানের আয় যোগ হয়ে অভাব-অনটন অনেক আগেই তাঁর থেকে দূরে পালিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে তিনি দু’দফায় মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন। তবে বিজয়ের মালা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। তাতে কি? লোকে তো এখন তাঁকে মেম্বার নামেই ডাকে। স্থানীয়রা আছিয়ার নাম ভুলতে বসেছে। বলে মেম্বারের দোকান।

Ñজিএম ইকবাল হাসান,
নাটোর থেকে


মুক্তিযোদ্ধা ক্যাডেট আনোয়ারের কবর স্থানান্তর

৪৩ বছর পর অবশেষে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের দেহাবশেষ নিয়ে আসা হয়েছে শরণখোলা উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে। তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেন ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর লাশ দাফন করা হয় উপজেলার উত্তর সাউথখালীর গ্রামের বাড়িতে। কালের পরিবর্তনে বলেশ্বর নদীর করাল গ্রাসে কবরটি বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে কবরটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার শহীদ বীর এ মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ উত্তোলন করে যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকেল ৫টায় উপজেলা সদরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে দাফন করা হয়।
সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার অবঃ আঃ আজিজ, ফুলমিয়া, ইউসুফ আলী শিকদার, শেখ সামসুর রহমান ও আবু জাফর জব্বার জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট অফিসার হিসেবে চাকরিরত আনোয়ার হোসেন মাতৃভূমির টানে ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন। এরপর তিনি তাঁর নেতৃত্বে একটি মুক্তিবাহিনী দল গঠন করে সুন্দরবনে ক্যাম্প স্থাপন করেন। ১২ জুন বাগেরহাটের শরণখোলায় প্রথম রাজাকার বাহিনী এসে উপজেলা সদর রায়েন্দার থানা ভবনে ক্যাম্প স্থাপন করে এলাকায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীরা রাজাকারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেন। ১৯৭১ সালের ১১ জুলাই আঞ্চলিক কমান্ডার ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৪৭ জনের একটি মুক্তিবাহিনীর দল রায়েন্দার রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করেন। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে শহীদ হন ক্যাডেট অফিসার আনোয়ার হোসেন, বিমানবাহিনীর সদস্য ইসমাইল হোসেন ও আসমত আলী নামের তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরে সহযোদ্ধারা শুধুমাত্র আনোয়ার হোসেনের লাশ উদ্ধার করতে পেরে রাতের অন্ধকারে তার গ্রামের বাড়ি উত্তর সাউথখালীতে দাফন করেন। কালের বিবর্তনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরটি বলেশ্বর নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম হলে তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন একটি লিখিত আবেদন জানালে স্থানীয় প্রসাশন কবরটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। সম্প্রতি শহীদের দেহাবশেষ উত্তোলন করে উপজেলা সদর রায়েন্দা পাইলট হাই স্কুল মাঠে রাখা হলে শতশত মুক্তিযোদ্ধা, এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। সেখানেই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে এম মামুন উজ্জামান জানান, লিখিত আবেদন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের দেহাবশেষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরের অন্যান্য শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। এমন এক বীর সন্তানের কবরটি রক্ষা করতে পেরে তিনি নিজেকে গর্বিত মনে করছেন।
Ñবাবুল সরদার, বাগেরহাট