মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০১৪, ২২ চৈত্র ১৪২০
বরগুনার গণহত্যা ॥ শহীদ স্বজনদের যন্ত্রণা
শংকরলাল দাশ, গলাচিপা ॥ মুক্তিযুদ্ধের ভয়ঙ্কর সেই দিনগুলো নিয়ে পুষ্প রানী দেবনাথ এখন আর সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চান না। তাদের ওপর প্রচ- অনুযোগ। প্রশাসন এবং রাজনীতিকদের ওপরেও তাঁর তীব্র অভিমান। বলেন, ‘কি হবে আমার দুঃখের কথা বলে। বছরে মাত্র দু’বার আমাদের কাছে আসেন। স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে ডেকে নিয়ে যান ডিসির (জেলা প্রশাসক) কাছে। হাজারও মানুষের সামনে আমরা আমাদের যন্ত্রণার কথা বলি। চোখের জল ফেলি। আপনারা সে সব শোনেন। হাতে একটা গেলাস কিংবা প্লেট ধরিয়ে বিদায় করেন। এরপরে আর সারা বছর কোন খোঁজ নেন না। আমরা কী করে বেঁচে আছি কেউ তা জানতেও চায় না। তাই আর কারও সঙ্গে বলতে চাই না।’
এ ক্ষোভ শহীদ জায়া পুষ্প রানী দেবনাথের একার নয়। বরগুনা জেলার প্রায় সব শহীদ পরিবারের। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৩ বছরেও শহীদ পরিবারগুলো পায়নি যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। পায়নি ন্যূনতম সরকারী-বেসরকারী সুযোগ-সুবিধা। এমনকি শহীদদের সম্পূর্ণ নামের তালিকাও করা হয়নি। এমন হাজারও অভিযোগ শহীদ পরিবারের। এরপরেও তাঁরা কথা বলেন। জানান সে সব দুঃসহ দিনের স্মৃতির কথা। কারণ ওই দিনগুলো যে তাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে আছে। শুধু স্বজন হারিয়েছেন, তাই নয়। এর পাশাপাশি ভয়াবহ সে দিনগুলোতে তারা হারিয়েছেন বেঁচে থাকার অবলম্বনও। তাইতো সে সব দিনের স্মৃতি তারা কিছুতেই ভুলতে পারেন না।
বরগুনা শহরের নাথ পাড়ার বাসিন্দা পুষ্প রানী দেবনাথ একাত্তরে ছিলেন পঁচিশ বছর বয়সের গৃহবধূ। কোলে তাঁর তিন মেয়ে। সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র ৮-৯ মাস। বড় মেয়ের বয়স পাঁচ এবং মেজ মেয়েটির বয়স তিন বছর। স্বামী কানাই লাল দেবনাথের ছিল বেশ বড় কাপড়ের দোকান। দোকানে ছিল ৫/৬ কর্মচারী। স্বামী, সন্তান আর সংসার নিয়ে কেটে যেত দিন। কিন্তু একাত্তরের হানাদার বাহিনীর তা-বে তার সুখের দিনগুলো ভেঙ্গে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। যা আর কোনদিনই ফেরত পাননি।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করে প্রায় ৭০ বছর বয়সী পুষ্প রানী দেবনাথ জানান, দিনটি ছিল বুধবার। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কয়েকজন বাঙালী সহযোগী সকালে তাঁর বাসায় হানা দেয়। কোলের শিশু সন্তানসহ স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে পাকিস্তানী সেনাদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর স্বামীকে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাকে জেলখানার মহিলা ওয়ার্ডে এবং স্বামীকে পুরুষ ওয়ার্ডে ঢোকানো হয়। পুরো তিনদিন তাঁকে জেলখানায় রাখা হয়। পরে শুক্রবার বিকেলে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়।
জেলখানার স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, জেলখানায় প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে আতঙ্কে। যখন তখন পাকিস্তানী সেনারা এসে মহিলা ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ত। বিশেষ করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামলেই সেনাদের আনাগোনা বেড়ে যেত। জেলখানার ওয়ার্ডে তাঁর মতো আরও এক-দেড়শ’ নারী বন্দী ছিল। পাকিস্তানী সেনাদের লক্ষ্য ছিল যুবতীদের ওপর সবচেয়ে বেশি। যাকে পছন্দ হতো তাকেই তুলে নিয়ে যেত। কেউ না যেতে চাইলে বুট দিয়ে লাথি মারত। রাইফেলের বাঁট দিয়ে পেঠাত। দু’ একজনকে গুলি করেও মেরে ফেলত। সারারাত পাশের একটি খালি ওয়ার্ডে মেয়েদের ওপর চলত পাকিস্তানী সেনাদের পাশবিক নির্যাতন। অসহায় মেয়েদের চিৎকার আজও যেন তাঁর কানে ভেসে আসে। সকালে যখন মেয়েদের আবার আগের ওয়ার্ডে ঢোকানো হতো তখন মনে হতো তার পুরো শরীর রক্তে রাঙিয়ে দেয়া হয়েছে। বহু নারীকে আবার লাল কাপড় পরিয়ে দেয়া হতো। যাতে রক্ত না দেখা যায়।
পুষ্প রানী দেবনাথ জানান, শুক্রবার রাত পর্যন্ত তাঁর স্বামী জীবিত ছিলেন। শনিবার সকালে বাসায় বসেই তিনি জেলখানার অভ্যন্তর থেকে আসা গুলির শব্দ শুনতে পান। এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে বুক। দৌড়ে ছুটে যান জেলখানার দিকে। কিন্তু কিছু লোকের বাধার কারণে জেলখানা পর্যন্ত যেতে পারেননি। হানাদাররা স্বামীর লাশও তাকে ফেরত দেয়নি। জেলখানার অভ্যন্তরেই কানাইলাল দেবনাথের লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়। হানাদার ও তাদের সহযোগীরা কানাইলাল দেবনাথকে গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি। দোকানপাট থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির সবকিছু লুটপাট করে নেয়। স্বাধীনতা তাঁকে করেছে সর্বস্বহারা।
স্বাধীনতার পরে পেটের তাগিদে পুষ্প রানী দেবনাথ ঘুরে বেরিয়েছেন বনে জঙ্গলে। কুড়িয়েছেন শাকসবজি। মানুষের বাসায় দিনমজুরি করেছেন। দিন কেটেছে না খেয়ে। এভাবে বড় করে তুলেছেন তিন মেয়েকে। তাদের বিয়েও দিয়েছেন দান খয়রাত করে।
এ যন্ত্রণা শুধু পুষ্প রানীর একার নয়। একই পাড়ার যোগমায়া দেবনাথ (৮৩) হারিয়েছেন স্বামী ব্রজবল্লভ নাথ ও দেবর গৌরাঙ্গ নাথকে। আট সন্তানের জননী যোগমায়া দেবনাথকে স্বামী, দেবর ও দেবরের স্ত্রীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার বাহিনীর দোসর এক বিহারীসহ কয়েক বাঙালী সহযোগী। জেলখানার অভ্যন্তরে তিনিও দেখেছেন একই দৃশ্য। নারীদের সম্ভ্রম হারানোর কান্না আজও তাঁকে কাঁদায়। প্রায় প্রতিদিন রাতে শুনতেন গুলির শব্দ। সে শব্দ শুনে অনুমান করে নিতেন নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। স্বামী এবং দেবরকে হত্যা করার পর তাকে পাকিস্তানী সেনারা ছেড়ে দেয়। সেই থেকে বইছেন দুঃসহ কষ্টের বোঝা।
তৎকালীন বরগুনা মহকুমা শহর হানাদার বাহিনী কবলিত হওয়ার পরে অঞ্জলি দেবনাথ তাঁর আট সন্তান নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সঙ্গে স্বামী গৌরাঙ্গ দেবনাথও ছিলেন। পাকবাহিনীর দোসরদের আশ্বাসে গৌরাঙ্গ দেবনাথ বরগুনা শহরে ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু পাকজান্তার দোসররা তাদের দেয়া আশ্বাস রক্ষা করেনি। গৌরাঙ্গ দেবনাথকে জেলখানার অভ্যন্তরে গুলি করে হত্যা করা হয়। অঞ্জলি দেবনাথ তাঁর স্বামীর লাশটি শেষবারের মতো একবার চোখের দেখাও দেখতে পাননি। লাশটির ঠাঁই হয়েছিল জেলখানার অভ্যন্তরের গণকবরে।
এ হত্যাকা-ের তিন-চারদিন আগে পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগীরা বরগুনা শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় অভিযান চালায়। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আমতলা পাড়া, কর্মকারপট্টি ও নাথপট্টিসহ হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলো। হানাদাররা যাকে যেখানে পেয়েছে, সেখানেই তাকে আটক করেছে। কোমরে রশি পরিয়ে গরু-ছাগলের মতো বেঁধে তাদের জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনার আরও কয়েকদিন আগে পাকিস্তানী সেনাদের সহযোগী শান্তি কমিটির নেতারাসহ অন্যরা এ মর্মে শহরে খবর ছড়িয়ে দেয় যে, হিন্দুরা অনায়াসে শহরে চলে আসতে পারে। তাদের কাউকে কিছু বলা হবে না। বিশেষ করে বর্ণহিন্দু ছাড়া কাউকে হত্যা করা হবে না। শান্তি কমিটিসহ দালালদের আশ্বাসে বহু হিন্দু শহরে নিজ নিজ বাসাবাড়িতে চলে আসে। কেউ কেউ দোকানপাট খুলে বসে। কিন্তু ২৭ মে সকাল থেকে শুরু হয় পাকিস্তানী সেনা ও দালালদের বাঙালী আটক অভিযান। এদিন সকাল থেকে শহরে ছিল প্রচ- বৃষ্টি। অধিকাংশ মানুষ বাড়িঘরে অবস্থান করছিল। বাইরে বের হওয়ার উপায় ছিল না। যে কারণে আটক অভিযানের খবর অধিকাংশ মানুষ জানতে পারেনি। বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগীরা নেমে পড়ে বাঙালী নারী-পুরুষ আটক অভিযানে।
বিকেলের মধ্যে পাকিস্তানী সেনা ও দোসররা শহর থেকে ৫-৬ শ’ নারী-পুরুষকে আটক করে জেলখানায় নিয়ে যায়। আগে থেকে জেলখানায় আরও বেশ কিছু নারী-পুরুষ আটক ছিল। এদিনের আটক অভিযানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পক্ষে ক্যাপ্টেন শাফায়াতসহ চারজন খান সেনা এবং স্থানীয় শীর্ষস্থানীয় কয়েক দালাল নেতৃত্ব দেয়।
এদিন রাতে ৩৬ জন ও পরের রাতে ৪৪ জনকে হত্যার প্রমাণ মিললেও আরও বহু হত্যার কোন প্রমাণ মেলেনি। পরবর্তীতে জেলখানার অভ্যন্তরে আরও অনেক মানুষ হত্যা করা হয়।