মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০১৪, ২২ চৈত্র ১৪২০
রক্ষাগোলা আদিবাসীদের রক্ষাকবজ
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ২৬টি গ্রামের আদিবাসীর ‘রক্ষাগোলা’ নিশ্চিত করেছে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা। প্রতিটি পরিবার প্রতিবেলায় রান্নার সময় একমুষ্টি চাল জমা করে গড়ে তুলেছে বিশাল রক্ষাগোলা। ২০০৩ সালে গড়ে তোলা এ রক্ষাগোলার বর্তমান তহবিল দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৮১ টাকা। ৫টি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠার পর ১০ বছরে এখন ২৬ গ্রাম এ তহবিলের আওতায় এসেছে।
পরিবারপ্রতি একমুষ্টি সংগৃহীত চাল এখন আদিবাসীদের রক্ষাকবজে পরিণত হয়েছে। এখন কোন আদিবাসী পরিবার খাদ্য সঙ্কটে পড়লে বা আপৎকালীন সঞ্চয়কৃত চাল ওই পরিবারকে সহায়তা হিসেবে দেয়া হয়। পরবর্তীতে সহায়তাকৃত চাল ওই পরিবার পরিশোধ করে। ফলে রক্ষাগোলার সঞ্চয়কৃত চালের মজুদের স্থিতি বাড়তে থাকে। এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে রক্ষাগোলা। বর্তমানে এর আওতা বাড়ছে। বাড়ছে সদস্য সংখ্যাও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে উপজেলার ২৬টি গ্রামে রক্ষাগোলা গ্রামভিত্তিক স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের সমাজ কমিটিতে ১১০৫ পরিবার সম্পৃক্ত। নারী, পুরুষ ও শিশু মিলে মোট সদস্য সংখ্যা ৫ হাজার ৬৬৫। আর একমুষ্টি চাল সংগ্রহ করে এখন রক্ষাগোলা কমিটিগুলোর তহবিল রয়েছে ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৮১ টাকা।
জানা যায়, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়ার কারণে আদিবাসী সম্প্রদায় যখন খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য সংগ্রামরত, ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। সেন্টার ফর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব ভলান্টারি অর্গানাইজেশন নামের এ বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাটি প্রায় একযুগ ধরে আদিবাসীদের মৌলিক ইস্যুতে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রক্ষাগোলা বা খাদ্যব্যাংকের উৎপত্তি।
২০০৩ সাল থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর, শাহানাপাড়া, ঈদলপুর-কান্তপাশা, নিমকুড়ি ও পাথরঘাটা গ্রামে প্রথম ‘গ্রামভিত্তিক সমন্বিত সামাজিক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি’র আলোকে জনগণের স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর আওা ১৬টি গ্রামে ‘রক্ষাগোলা গ্রামভিত্তিক স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচী’ শুরু হয়। বর্তমানে উপজেলার ২৬টি গ্রামে এ কার্যক্রম চলছে। সংযুক্ত অন্য গ্রামগুলোÑবেলডাঙ্গা, গোলাই, জিওলমারী, মুলকিডাইং, ডাইংপাড়া, নিমঘটু, গণকের ডাইং, ফারসাপাড়া, নরসিংহগড়, ঈদলপুর, কমলাপুর বিলপাড়া, গড়ডাইং, বাগানপাড়া, গুনিগ্রাম, দাদৌড়, আগোলপুর, উদপুর, সাকুড়া, গোগ্রাম, শ্রীরামপুর ও মুরারীপুর।
সম্প্রতি এ রক্ষাগোলার বার্ষিক সাধারণসভা অনুষ্ঠিত হয় উপজেলার রাজাবাড়ি হাইস্কুল মাঠে। সেখানে জমায়েত হয়েছিল ২৬টি গ্রামের নারীপুরুষ ও শিশুরা। সেখানে নিজ নিজ গ্রামের প্রধানরা তাঁদের বার্ষিক রিপোর্ট তুলে ধরেন।
রিপোর্টে জানানো হয়, ২৬টি গ্রামে বর্তমানে ১১০৫ পরিবারের ১৬৩০ নারী, ১৬২৪ পুরুষ, ১২০৩ মেয়েশিশু ও ১২০৮ ছেলেশিশু; সর্বমোট ৫৬৬৫ জন সংগঠিত হয়েছেন। গ্রামগুলিতে উঁরাও, সান্তাল, রাজুয়াড়, রায়, পাহাড়িয়া, শিং, হাজরা নৃজাতিগোষ্ঠীর বসবাস। গ্রামগুলোতে এ পর্যন্ত সর্বমোট সঞ্চিত চালের পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৫ দশমিক ৫ কেজি এবং ধান ৬৪ হাজার, ১৬৯ কেজি। ২৬টি গ্রামের প্রায় সকল পরিবারকে সংগঠনসমূহের মাধ্যমে আপৎকালীন খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পারিবারিক অন্যান্য প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে ১১ লাখ ৩৭ হাজার ২০৯ টাকা।
গ্রামভিত্তিক রক্ষাগোলা খাদ্য নিরাপত্তা কার্যক্রমের ব্যাপারে রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের প্রধান সন্তোষ এক্কা জানান, গ্রামভিত্তিক রক্ষাগোলা মূলত গ্রামবাসীরাই পরিচালনা করে। প্রত্যেকটি রক্ষাগোলা গ্রাম সংগঠনের একটি করে পরিচালনা কমিটিসহ রক্ষাগোলা নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কমিটি রয়েছে। এ সম্প্রদায়ের লোকজন একত্র হয়ে রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠন তৈরি করে। প্রতিটি পরিবারই এ সংগঠনের সদস্য।
প্রতিটি পরিবারেরই রয়েছে পৃথক পৃথক পরিচিতি নম্বর। রক্ষাগোলায় খাদ্য সঞ্চয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবার প্রতিবেলায় রান্নার সময় একমুষ্টি চাল পৃথক করে রাখে। সপ্তাহ শেষে এ চাল রক্ষাগোলায় জমা করা হয়। নিমকুড়ি রক্ষাগোলা সংগঠনের পরিচালনা কমিটির নেতা সিমা টপ্প্য বলেন, শুধু চাল নয়, প্রতিবছরের দুটি মৌসুমে ধানও সঞ্চয় করা হয় সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে। প্রতিটি সদস্য পরিবার ৫ থেকে ১০ কেজি ধান রক্ষাগোলায় জমা দেয়। চালের মতো ধানও আপৎকালীন সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করেন সদস্যরা।
শাহানাপাড়া গ্রামের রক্ষাগোলা সংগঠনের প্রধান পরেশ কুজুর বলেন, সংগঠনের সব সদস্যের সিদ্ধান্তে উদ্বৃত্ত চাল বা ধান বিক্রির পর ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ব্যাংকের হিসাব বা এ্যাকাউন্ট সংশ্লিষ্ট রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ কমিটির নামে থাকে। এ হিসেবে এ টাকার মালিক সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্যরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৬টি সংগঠনের সকল পরিবারই বছরে কমপক্ষে দুইবার খাদ্য সহায়তা নিয়েছে। এর পরিমাণ ২ লাখ ১৯ হাজার ০৪৭ কেজি চাল এবং ২০ হাজার ৮৫৮ দশমিক ৫ কেজি ধান । এছাড়া আর্থিক সহায়তা নেয়ার পরিমাণ ১১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সদস্যরা গ্রহণকৃত খাদ্যশস্য এবং টাকা ফেরত দিয়েছেন। রক্ষাগোলা কমিটির সদস্যরা উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে জমি লিজ নিয়ে সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ শুরু করেছেন।
আদিবাসীরা জানান, মুষ্টিচাল উত্তোলনের পর তাদের সমিতির কোষাধ্যক্ষের কাছে জমা করা হয়। কোন পরিবার অভাব-অনটনে পড়লে সহায়তা হিসেবে রক্ষাগোলা থেকে চাল নেন। ৫ কেজি চাল নিলে সুদ হিসেবে অতিরিক্ত ৫০০ গ্রাম চালসহ রক্ষাগোলায় ফেরত দিতে হয়।
পাকড়ী ইউনিয়নের লহড়াপাড়ার অচিন্ত প্রামাণিকের স্ত্রী রিপা রানী বলেন, তার পরিবারে ৩ মেয়ে ও ১ ছেলেসহ ৬ সদস্য। স্বামী-স্ত্রী কৃষি জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে যে পরিমাণ আয় হতো তা দিয়ে তিনবেলা খাবার জোটানো কষ্টকর হয়ে পড়ত। রক্ষাগোলা থেকে অল্প সুদের বিনিময়ে টাকা ঋণ নিয়ে জমি লিজ নেয়া হয়। এরপর জমিতে ধান ও সবজি চাষ করে পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
উপকারভোগী আদিবাসীরা জানান, আদিবাসী পরিবারগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মুষ্টিচাল উত্তোলনের মাধ্যমে রক্ষাগোলা গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। শুরুতেই আদিবাসী পরিবারগুলো চাল দিতে রাজি না হলেও কিছুদিন পরেই আদিবাসী নারীরা এগিয়ে এলে তাদের সঙ্গে পুরুষরাও এগিয়ে আসেন। ভবিষ্যতে উপজেলার অন্য ইউনিয়নগুলোতে আদিবাসীদের মধ্যে এ ধরনের সমিতি গড়ে তোলার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের বিষয়টি তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
গত ২৮ মার্চ আদিবাসীদের রক্ষাগোলার বার্ষিক সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অন্যদের মধ্যে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এইচকেএস আরেফিন। আদিবাসীদের এ অনন্য উদ্যোগে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের মাধ্যমে তাদের দারিদ্র্য দূর করে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। কারণ খাদ্যের অভাব মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যত নষ্ট করে দেয় এবং দারিদ্র্যচক্র মানুষের জীবন শেষ করে দেয়। এই অবহেলিত জনগণ নিজেদের প্রচেষ্টায় খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলে তাদের জীবন রক্ষা করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। এটি তাদের রক্ষকবজ বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

Ñমামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী