মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৫ মার্চ ২০১৪, ১ চৈত্র ১৪২০
বর্বরতার সাক্ষী জয়পুরহাটের বধ্যভূমি
তপন কুমার খাঁ জয়পুরহাট থেকে
মার্চ মাস এলেই ১৯৭১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো প্রতিটা বাঙালীকে যেমনটা আলোড়িত করে তেমনটায় দুঃখভারাক্রান্ত করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে জয়পুরহাটে পাক বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে। পাকি হানাদার বাহিনী তৎকালীন মহকুমা বর্তমান জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবিতে ১৯ এপ্রিল প্রথম হানা দিয়ে নৃশংস হত্যাকা- চালায়। পরবর্তিতে ২৪ এপ্রিল জয়পুরহাটে একই কায়দায় শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। হানাদার বাহিনীর নির্যাতন চলতে থাকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ নির্যাতন-অত্যাচারে পাকবাহিনীকে সহায়তা করে জয়পুরহাটের রাজাকার, আলবদর বাহিনী। বেছে বেছে তারা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকা- চালাতে থাকে। একই সাথে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সমর্থকদেরও খুঁজে খুঁজে হত্যা করে। হত্যাকা-ের জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে তারা এই ধারাবাহিক হত্যাকা- চালায়।
জয়পুরহাট জেলায় যে সমস্ত এলাকায় বধ্যভূমি হিসাবে পাকি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর-রাজাকাররা নির্দিষ্ট করে সেগুলো হচ্ছে জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভারত সীমান্ত সংলগ্ন চকবরকত ইউনিয়নের পাগলা দেওয়ান গ্রাম। এই গ্রামটি জেলার মধ্যে সর্ববৃহৎ বধ্যভূমি হিসাবে চিহ্নিত। ১০ হাজারেরও বেশি বাঙালীকে এই বধ্যভূমিতে পাকি সৈনরা নৃসংশভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এই পথেই বাঙালীরা ভারতে জীবনের নিরাপত্তার জন্য পালিয়ে যাওয়ার জন্য আসছিল। পাকবাহিনী তাদের এখানে হত্যা করে। শুধু তাই নয় পাকি বাহিনী এই পাগলা দেওয়ান গ্রামে জুমার দিন মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ধরে এনে গুলি করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমিটি ১৯৯২ সালের ৩০ ডিসেম্বর জয়পুরহাট জেলার মুক্তিযুদ্ধের গবেষক সংস্কৃতি সংগঠক আমিনুল হক বাবুল ও সাংবাদিক নন্দকিশোর আগরওয়ালা আবিষ্কার করেন। এই বধ্যভূমিতে যেখানেই কোদাল দিয়ে মাটি তোলা হয় সেখানেই মানুষের হাড়, মাথার খুলি বেরিয়ে আসছিল। এলাকার বৃদ্ধদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলতে পারে না সংখ্যায় কত লোক এখানে হত্যা করা হয়েছে। শুধুই বলে মানুষের মিছিল আসছিল এমনভাবে আর পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের ধরে ধরে হত্যা করছিল। তাদের হাত থেকে নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পেত না। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে এই বধ্যভূমির পাশেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা যুবতী ও এই পথে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আসা পরিবারগুলো থেকে যুবতীদের ধরে রেখে তারা ৯ মাস ধর্ষণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে কয়েকটি ঘরে তাদের ধর্ষণের নানা আলামত যেমন চুরি, শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট পাওয়া যায়। পাকি সৈন্যরা জয়পুরহাট শহরের কড়ই কাদিপুর গ্রামে ২৬ এপ্রিল হিন্দু অধ্যুষিত পালপাড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুটপাট করে এবং ৩৭৩ হিন্দুকে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে একটি পুকুরে ফেলে রাখে। একইভাবে জয়পুরহাট সরকারী ডিগ্রী কলেজের মাঠের পাশে ও মাঠ সংলগ্ন বারোঘাটির পারে দুটি বধ্যভূমিতে শতাধিক বাঙালীকে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রাখে।
জয়পুরহাট শহর থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে খঞ্জনপুর কুটিবাড়ি ব্রিজের পাশে হত্যা করে জয়পুরহাটের প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ডা. আবুল কাশেমকে। এই বধ্যভূমিতেই শুরু হয় অসংখ্য বাঙালীকে হত্যার মহা উল্লাস। পাঁচবিবির বকুলতলা, কালিপুকুর, কড়িয়া এলাকার বধ্যভূমিতে অসংখ্য বাঙালীকে হত্যা করা হয়। আক্কেলপুরের আমুট্ট, ক্ষেতলালের হাটশহর, হারুঞ্জা বধ্যভূমিতেও চলে হত্যাযজ্ঞ। জয়পুরহাটের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণারত আমিনুল হক বাবুল জানায় এই জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৭টি বধ্যভূমি রয়েছে; যা সরকারীভাবে এখনও চিহ্নিত হয়নি। যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে ১৩টি বধ্যভূমির নাম দেয়া হয়েছে। এই বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে পাগলা দেওয়ান, কড়ই কাদিপুর এবং আমুট্ট ও পাঁচবিবির নন্দুইলে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। জেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক চিহ্নগুলো সংরক্ষণেন সরকারী উদ্যোগ ঢিমে তালে চলছে জন্যই এই বধ্যভূমিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের মন থেকে তা মুছে যাচ্ছে। ফলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি তাদের তৎপরতা চালিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকে কলংকিত করছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে।
জয়পুরহাটের পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমিতে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক স্মৃতি স্তম্ভটি শহর থেকে ৭ কিলোমিটর দূরে হলেও যাতায়াতের সমস্যা রয়েছে প্রায় ৩ কিলোমিটারের মতন যা পাকাকরণের দাবি একাধিকবার উঠলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রাস্তাটি পাকা না করায় জয়পুরহাটের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ইতোপূর্বে এই ৩ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণের জন্য এলজিইডি প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করলেও তা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সম্প্রতি পাবনায় শেষ হওয়া জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের জাতীয় সম্মিলনে জয়পুরহাট জেলা শাখা দাবি জানিয়েছে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে মুক্তিযুদ্ধের স্মারকসৌধ নির্মাণের।