মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
‘মাটির ময়না’র আনু এখন সীতাকুণ্ডের পান দোকানি
জাহেদুল আনোয়ার চৌধুরী, সীতাকুণ্ড থেকে
জা তীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি মাটির ময়নার ‘আনু’ এখন সীতাকুণ্ডের পান-সিগারেটের দোকানদার। প্রয়াত জাতীয় চলচিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদের ছবি ‘মাটির ময়না’এবং ছবিটির সেই ছোট্ট ছেলেটি যাকে নিয়ে লেখা যার ছবির চরিত্রের নাম ‘আনু’ বাস্তব নাম নূরুল ইসলাম বাবলু। সে সীতাকু- উপজেলার বারআউলিয়া হাফিজ জুট মিলের সামনে এখন পান-সিগারেটের দোকানদার। দেশের সীমানা পেরিয়ে যে চলচ্চিত্রটি সাড়া ফেলেছিল বিখ্যাত কান চলচিত্র উৎসব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাতে ‘আনু’ নামের সুন্দর চেহারার বালকটির অতি সাবলীল চরিত্রে অভিনয় করে হৃদয় আকৃষ্ট করেছিল বহু দর্শকের। ১১ বছর বয়সের বালক মাটির ময়নার ‘আনু’ এখন টগবগে তরুণ। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পটা বর্তমানে খুবই সাদামাটা। এতে উজ্জ্বল হয়ে থাকার শৈল্পিকতা বৃন্দুমাত্র নেই বললে চলে। আনু বাংলা চলচিত্রের ‘মাটির ময়না’ ছবির নাম। বাস্তবের নূরুল ইসলাম বাবুলের জীবন বর্তমানে তৎকালীন কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুখু মিয়ার মতো বলা চলে। আনু এতদিনে হতে পারতেন এ দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের ব্যস্ততম অভিনেতাদের মধ্যে একজন কিন্তু তার বদলে তিনি এখন ব্যস্ত থাকেন শ্রমিক বাবার কর্মস্থল চট্টগ্রামের সীতাকু-ের হাফিজ জুট মিল কলোনির ছোট্ট চায়ের দোকানে পান-সিগারেট বিক্রি করা নিয়ে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার কালিকাপুর গ্রামে ১৯৮৮ সালের ৩ এপ্রিল বাবলুর জন্ম। পড়ালেখার আগ্রহ থাকলেও অতিরিক্ত দুষ্টামির কারণে ছোটবেলা থেকে তা খুব একটা এগোয়নি। ১৯৯৯ সালে মামা আবু সাঈদ বাবলুকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। ইউসেফ স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। মামারা থাকতেন মগবাজার চেয়ারম্যান গলিতে স্থায়ী বাসিন্দা ভোলা চাচার বাসায়। একদিন ভোলা চাচার আত্মীয় চলচিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের এক ভাগ্নি বেড়াতে আসেন ভোলা চাচার বাসায়। ভাগ্নির নাম পূর্বা। তারেক মাসুদ তখন চলচ্চিত্রের জন্য একজন শিশু শিল্পী খুঁজছিলেন। পূর্বাই তার মামাকে জানান বাবলুর কথা। তারপর একদিন বাবলুকে নিয়ে পূর্বা তার মামা তারেক মাসুদের সঙ্গে ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় সাক্ষাত করিয়ে দেন। আর সেদিন জন্ম হয় তারেক মাসুদের শিশু শিল্পী আনুর।
দেড়-দু’মাস পর হঠাৎ একদিন বাবলুকে ডেকে তার হাতে একটি স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দেয়া হয় এবং বলে দেয়া হয় এটা ভালভাবে শেখার জন্য। এরপর ২০০০ সালের শেষের দিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় প্রথম মাটির ময়না ছবির কাজ শুরু হয়। বাবলু বলেন, আমি যে চলচ্চিত্রে অভিনয় করছি, প্রথমে তা বুঝতে পারিনি। ২০০২ সালে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার আগে আমাকে দেখানো হয়। তখন আমি সব বুঝতে পারলাম। ছবিটি মুক্তি পেল এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি অর্জন করল। ছোটখাটো কিছু কাজ আসত। তবে ঠিকমতো পয়সা পাওয়া যেত না। ঢাকায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ল বাবলুর জন্য। কাজ না থাকলে কিভাবে ঢাকা থাকা। মামার বাসায় এভাবে আর কতদিন।
তেমন বেশি পড়াশোনা না করে বাবলু এখন অভিমানের সুরে বললেন, ‘মাটির ময়নার কাজ করার পর তেমন কাজ হাতে আসেনি। তারেক স্যারের সঙ্গে কিছু কাজ করতাম। এভাবেই অনেকটা সময় কেটে গেছে। হঠাৎ একদিন আমার জীবনের আশার ওপর অন্ধকার নেমে আসল। যিনি আমাকে চলচ্চিত্রে আশার এত বড় সুযোগ করে দিল তিনিই তারেক মাসুদ স্যার ২০১১ সালে ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের দোহারে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর তো আমি আর কাজের আশা করতে পারি না। চলচ্চিত্রের কারো সঙ্গে তেমন কোন যোগাযোগ না করে অনেকটা অভিমানে ফিরে আসেন এ পথ থেকে।
ছেলেকে একজন বড় অভিনেতা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন বাবলুর বাবা হায়দার আলী। ‘মাটির ময়না’ অভিনয় করার পর দেশজুড়ে যে সাড়া জেগেছিল। তখন আমি মনে করতাম আমার ছেলে বাবলু একদিন অনেক বড় অভিনেতা হবে কিন্তু না তারেক মাসুদ স্যার মারা যাওয়ার পর তেমন কোন ভাল কাজ পাইনি আমার ছেলে’। তাই আমার চাকরিস্থলের পাশে এ চায়ের দোকান করতে দিলাম, ছেলের মতো বাবাও আক্ষেপের সঙ্গে উপরোক্ত কথাগুলো বললেন।
আনু বলেন, তারপরও ছবি নির্মাতা মুস্তফা সরওয়ার ফারুকী, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করে বায়োডাটা দিয়ে আসছিলাম কিন্তু তেমন কোন কাজ এখনও হয়নি। অন্য নির্মাতাদের কাছেও তেমন কোন কাজ ছিল না। তাই ছবির জগৎ থেকে আস্তে আস্তে সরে যেতে বাধ্য হলাম। তবে মনে এখনো আশা জাগে ‘হয়ত’ আবার কোন একদিন আনু থেকে আরো বড় চরিত্রে অভিনয় করার জন্য কোন নির্মাতা আমাকে ডাকতে পারে।