মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ন ১৪২০
চোখজুড়ানো সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন গোয়াইনঘাট
প্রকৃতি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। ভোরের সূর্য অন্যরকম আলো ছড়ায়। সন্ধ্যায় পাহাড়ী মায়া নজর কাড়ে। টিলা পাহাড় সবুজ আর সবুজ। এখানেই সব ভাললাগা। প্রকৃতির প্রেমের সাথেই মাখামাখি করে বয়ে যাচ্ছে সময়-সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা। কার না ভাল লাগে? চোখজুড়ানো অপার সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন সিলেটের গোয়াইনঘাট। জেলার পূর্ব-উত্তর সীমান্তে গোয়াইনঘাট উপজেলার অবস্থান। সীমান্তবর্তী এই উপজেলায় রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। জাফলং ও বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারি ছাড়াও তেল-গ্যাসের মজুদ রয়েছে এই মাটিতে। সারি, গোয়াইন দুুটি নদীতেই রয়েছে বালু। এই বালু মহালের ইজারা প্রদান করে সরকার যেমন রাজস্ব আয় করছে, তেমনি এখান থেকে সরবরাহকৃত বালু সারাদেশের কন্সট্রাকশন কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। পান, সুপারি তেজপাতা, কমলালেবুর পাশাপাশি রয়েছে একাধিক চা বাগান। গোয়াইনঘাট সীমান্ত এলাকায় খাসিয়াদের জীবনযাত্রা ও অবস্থান এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্বতন্ত্র অবস্থায় বসবাসকারী খাসিয়া সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোকেরা পান-সুপারি চাষাবাদ করেই জীবিকানির্বাহ করে থাকে। খাসিয়ারা যেখানে বসবাস করে সেই স্থানটিকে খাসিয়াপুঞ্জি বলা হয়ে থাকে। গোয়াইনঘাট সীমান্তে একই সঙ্গে পাশাপাশি পাঁচটি খাসিয়াপুঞ্জি। এগুলো হচ্ছে প্রতাপপুরপুঞ্জি, নকশিয়াপুঞ্জি, লামাপুঞ্জি, সংগ্রামপুঞ্জি, বল্লাপুঞ্জি। বিশাল এলাকাজুড়ে পুঞ্জির ভেতরে রয়েছে পানের বরজ। সে সঙ্গে সারি সারি সুপারি গাছ। পুঞ্জিগুলোর পান-সুপারি সিলেটসহ সারাদেশে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। খাসিয়াদের বাসস্থান সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের তৈরি। তাদের মধ্যে বিত্তশালীরাই পানের বরজের মালিক। তাদের জমিদার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
এছাড়া তারা সামাজিকভাবে রাজা-মন্ত্রী প্রথা মেনে চলে থাকে। খাসিয়াপুঞ্জিতে এখনও মন্ত্রী ও রানী আছেন। অন্যদের তুলনায় তারা বিত্তশালী ও অধিক সম্মানের পাত্র। মাটি থেকে ৪-৫ হাত উপরে খুঁটি বা পিলার দ্বারা তাদের ঘর তৈরি হয়। বন্যপশুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য এক সময় পাহাড়ী এলাকায় তাদের বাসস্থান তৈরির নিয়মটি আজও প্রচলিত আছে। কাঁচা-আধাপাকা, পাকা ধরনের ঘরগুরো দেখতে অনেক সুন্দর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাসিয়াদের বসবাস দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়ার মতো। খাসিয়াপুঞ্জিগুলোর উত্তর পাশেই বয়ে গেছে নদী। নদীর এপার বাংলাদেশ ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত নদীটি সীমানাচিহ্ন হিসেবে কাজ করছে। পাহাড়ী এই নদীটি এখন উজান থেকে নেমে আসা বালুতে ভরাট হয়ে গেছে। এখন এটা শুধু নামেই নদী।
সিলেট শহর থেকে দুটি রাস্তা দিয়ে গোয়াইনঘাট যাওয়া যায়। শহর থেকে সালুটিকর বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরে যাওয়া যায়। আবার তামাবিল-জৈন্তাপুর সড়কের সারিঘাট হয়ে উপজেলা সদরে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলা সদর থেকে ৮-৯ কিলোমিটার পূর্বদিকে এগিয়ে গেলেই জাফলং চা-বাগান। চা-বাগানের ভেতর দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর গেলে পরেই লামাপুঞ্জির অবস্থান। শহর থেকে বাস মাইক্রবাসযোগে গোয়াইঘাট উপজেলা সদরে যাওয়া যায়। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে চা-বাগান পর্যন্ত যেতে হয়। এরপর হেঁটে কিছুপথ গিয়ে পুঞ্জিতে প্রবেশ করলে সেখানে এক ধরনের ডিজেল ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে চড়ে পুঞ্জির শেষ প্রান্তের জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত যাওয়া যাবে। গোয়াইনঘাটের লামা-নকশিয়াপুঞ্জি এলাকায় যাওয়ার ভাল যাতায়াত ব্যবস্থা নেই।
এরপরও প্রকৃতিপ্রেমীরা খুঁজে খুঁজে কষ্ট স্বীকার করেই সেই এলাকায় গিয়ে থাকেন। গোয়াইনঘাট থেকে পুঞ্জির সীমান্ত পর্যন্ত ভাল যাতায়াত ব্যবস্থা এবং সেখানে হোটেল-মোটেল স্থাপন করে সরকারীভাবে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হলে সরকার রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে লাভবান হতো। গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের একটি এলাকা রাতারগুল, চেঙ্গেরখাল নদীর তীর ঘেঁষে বন বিভাগের বিশাল বনাঞ্চল। সম্প্রতি রাতারগুলের বনাঞ্চল প্রকৃতি প্রেমীদের টানতে শুরু“করেছে। সুন্দরী গজারিসহ নানা প্রজাতির গাছ-গাছালির ফাঁকে বয়ে গেছে দীর্ঘ একটি খাল।
রাতারগুলের এই বনভূমিকে ‘সিলেটের সুন্দরবন’ নামে আখ্যায়িত করে প্রতিদিন সৌন্দর্য পিপাসুরা ছুটে যাচ্ছেন সেখানে। রাস্তাঘাটের অসুবিধার কারণে তাদের কষ্টভোগ করতে হয়। রাতারগুলের নব্য আবিষ্কৃত সুন্দরবনকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারের উদ্যোগ নেয়া দরকার।
গোয়াইনঘাট থানার আদি ইতিহাস এখনও অজ্ঞাত। তবে ভারত উপমহাদেশের সুলতানী ও মোগল শাসনামলে এটি উপজাতি শাসনে শাসিত হয়। বর্তমান আয়তন ২৫২ বর্গমাইল। সে যুগে লোকসংখ্যা কম থাকায় এলাকার পর এলাকা অনাবাদি থাকত। গাছপালায় অধিকাংশ ভূ-ভাগ আচ্ছাদিতও ছিল।
গরু-মহিষ ছিল প্রচুর। দুধের কোন অভাব ছিল না। মাছের নিরাপদ আশ্রয় জলাভূমি থাকাতে কেউ কখনো মাছের অভাববোধ করেনি। এখানকার মানুষ অনেকদিন যাবত ধর্মপরায়ণ। সিলেটে হযরত শাহ জালালের (র.) আগমনের পর পরই দলে দলে লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই থেকে গড়ে ওঠে মসজিদ-মাদ্রাসা। আর সেখানে ইসলামী শিক্ষা আরম্ভ হয়, যা আজও অব্যাহত আছে। অধিকাংশ এলাকাজুড়ে হাওড় থাকায় এখানে কোন স্থাপত্য-শিল্প গড়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর গোয়াইনঘাটকে পর্যটকদের আনন্দভুবনে পরিণত করতে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।