মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১ অক্টোবর ২০১১, ১৬ আশ্বিন ১৪১৮
করটিয়ার জমিদার বাড়ি
ভূমিদস্যুদের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য, রক্ষার দাবিতে আন্দোলন
ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়ার স্মৃতিবিজড়িত টাঙ্গাইলের করটিয়ার জমিদার কীর্তিমান পাঠান পন্নী পরিবারের ঐতিহাসিক ভদ্রাসন ওয়াক্ফকৃত বসতবাড়ি, স্থাপনা ও জায়গাজমি আজ বেহাত হওয়ার পথে। করটিয়া জমিদার বাড়িটি টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় এর পরিবেশ অত্যন্ত প্রাকৃতিক এবং নিরিবিলি। জমিদারদের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের অভিপ্রায়ে সচেতন এলাকাবাসী ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি নামে একটি সংগঠন গড়ে আন্দোলন করেছেন। এই ওয়াক্ফ এস্টেট এবং ভদ্রাসন জমিদার বাড়িসহ চার শ' বছরের পাঠান জমিদারদের ঐতিহ্য আজ স্থানীয় ভূমিদসু্য, প্রভাবশালী গডফাদার এবং জামায়াত-শিবিরের হাত থেকে রক্ষার জন্য ওয়াক্ফ প্রশাসক, সরকার এবং সর্বসত্মরের জনগণের সহায়তা কামনা করা হয়েছে।
আটিয়ার চাঁদ নামে ইতিহাসের বই থেকে জানা যায়, আফগান অধিপতি সোলায়মান খান পন্নী কররানির ছেলে বায়েজিদ খান পন্নী ভারতে আগমন করেন। তাঁর পুত্র সাইদ খান পন্নী আটিয়ায় বসতি স্থাপন এবং ১৬০৮ খ্রিঃ সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে আটিয়ার বিখ্যাত মসজিদ নির্মাণ করেন। এই বংশেরই ১১তম পুরম্নষ সা'দত আলী খান পন্নী টাঙ্গাইলের করটিয়ায় এসে পন্নী বংশের ভিত প্রতিষ্ঠা করেন। এ পরিবারের ১৩তম পুরম্নষ দানবীর জমিদার আটিয়ার চাঁদ হিসেবে খ্যাত ওয়াজেদ আলী খান পন্নী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে ১৯২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর কারারম্নদ্ধ হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অনমনীয় মনোভাব ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আজও লন্ডন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর তৈলচিত্রের নিচে লেখা রয়েছে 'ওয়ান হু ডিফাইড দি ব্রিটিশ।' ১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং বাংলার আলীগড় নামে খ্যাত ১৯২৬ সালে করটিয়ায় সা'দত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজের পাশাপাশি তিনি স্থাপন করেন রোকেয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, এইচএম ইনস্টিটিউশন (স্কুল এ্যান্ড কলেজ) এবং দাতব্য চিকিৎসালয়সহ জনকল্যাণকর বহু প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল প্রকার ব্যয় নির্বাহের অভিপ্রায়ে তিনি তাঁর সমসত্ম সম্পত্তি, বসতবাড়িসহ এলাহীর উদ্দেশে ১৯২৬ সালের ৯ এপ্রিল এক ওয়াক্ফ দলিলের সৃষ্টি করেন; যার নম্বর ৩৩৪৯।
ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়া সাহেবের মৃতু্যর পর তাঁর পুত্র মাসুদ আলী খান পন্নী এস্টেটের মোতোয়ালি নিযুক্ত হন। এস্টেটের অব্যবস্থাপনার জন্য ওয়াক্ফ প্রশাসক ১৯৪০ সালের ১০ নবেম্বর ১৩৬৭৮নং পত্রে মাসুদ আলী খান পন্নীকে শর্তহীনভাবে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের প্রেক্ষিতে মাসুদ আলী খান পন্নী পদত্যাগ করেন এবং ওয়াক্ফ দলিল অনুসরণে খুররম খান পন্নী মোতোয়ালি নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালে তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলে ১৯৬৩ সালে তাঁর পুত্র ওয়াজিদ আলী খান পন্নী (২য়) ওরফে বান্টিং ভারপ্রাপ্ত মোতোয়ালি নিযুক্ত হন। সেই থেকে বান্টিং পন্নী জমিদারবাড়ির ওয়াক্ফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৯৭১ সালে জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইল-১ আসন থেকে এমপিএ নির্বাচিত হন। যার ফলে স্বাধীনতার পর তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হয়। এস্টেটের দায়িত্ব প্রাপ্তির পর থেকে মন্ত্রিত্ব, দলবদল, হাইকমিশনার এবং হাইকমিশনারের পদ থেকে পাকিসত্মানী এক মহিলাকে দ্বিতীয় স্ত্রী এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করে বিতর্কিত হলে তৎকালীন সরকার তাঁকে তাঁর পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশে ফিরতে বলেন। ইতোমধ্যে বান্টিং বাংলাদেশের নাগরিকত্বের পাশাপাশি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন যা কিনা ওয়াক্ফ দলিলের ১৯নং শর্তের সুস্পষ্ট লংঘন। ওয়াক্ফ দলিলের শর্ত অনুসরণে মোতোয়ালিকে সর্বদাই মোতোয়ালির জন্য নির্ধারিত ভদ্রাসন বাড়িতে বসবাসের শর্ত থাকলেও তিনি বিলাসবহল জীবনযাপনের অভিপ্রায়ে ঢাকার গুলশানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। ফলে এস্টেটটি পরিচালনার ব্যাপারে দৈনন্দিন কাজ বিঘি্নত হচ্ছে। মোতোয়ালির অনুপস্থিতি ও উদাসীনতার কারণে সীমানাপ্রাচীর বেষ্টিত সম্পূর্ণ আঙ্গিনা জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে।
এদিকে স্থানীয় ভূমিদসু্যদের সহযোগিতায় ভাড়ার ছদ্মাবরণে নামমাত্র মূল্যে জমিদারদের এসব সম্পত্তি বিক্রির পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে এই পরিবারেরই সদস্য ওয়াজিদ আলী খান পন্নী (২য়) ওরফে বান্টিংয়ের বিরম্নদ্ধে। তিনি ওয়াক্ফকৃত এই সম্পত্তির বর্তমান মোতোয়ালি। ভদ্রাসন জমিদারবাড়ির মোতোয়ালি এবং এই এস্টেটের অধিকারভোগী ও সুবিধাভোগীদের বসতবাড়ি যা ওয়াক্ফ দলিলের ১৯নং শর্ত অনুসরণে স্বীকৃত।
ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন প্রজাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ওয়াক্ফ করা দাতব্য চিকিৎসালয়। এছাড়া ভদ্রাসন জমিদারবাড়ির সীমানাপ্রাচীরের ভেতরের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে অবস্থিত মোগল স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন রোকেয়া মহল; যা প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শনের মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে। রোকেয়া মহলটি ওয়াক্ফ প্রশাসনের নিকট থেকে কোন প্রকার অনুমতি না নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির দলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে রোকেয়া মহলেই জামায়াত-শিবির পরিচালিত লাইটহাউস স্কুল এ্যান্ড কলেজ পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্বসত্ম সূত্রে জানা যায়, জামায়াত-শিবিরের অনেক গোপন মিটিং শহর থেকে দূরে এবং নিরাপদ স্থানের কারণে এই রোকেয়া মহলেই অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াত-শিবির চক্র ও স্থানীয় ভূমিদসু্যদের সহায়তায় রাতের বেলায় অন্দর মহল থেকে দুর্লভ প্রজাতির শতাধিক ফলদ ও বনজ বৃক্ষ কেটে নিয়ে যায়; যার বাজারমূল্য দশ লাখ টাকা।
জমিদারবাড়িটি রক্ষার জন্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি এর আগে কয়েকবার সংবাদ সম্মেলন করেছে। এ ব্যাপারে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শামছুল আলম চৌধুরী কায়েস বলেন, ওয়াক্ফ সম্পত্তি বিক্রি করার কোন অধিকার বর্তমান মোতোয়ালি বান্টিং সাহেবের নেই। প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন হিসেবে জমিদারবাড়ির সীমানাপ্রাচীর, রোকেয়া মহল ও লোহার ঘর; যা কিনা মোগল ও চৈনিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের দাবি রাখে। ওয়াক্ফকৃত এসব প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এই এস্টেটের ৩ অধিকারভোগী ও সুবিধাভোগী। এর একজন মোতোয়ালির সহোদর সাবেক সংসদ সদস্য মোরশেদ আলী খান পন্নী এবং তাঁর সহধর্মিণী সাবিনা খান পন্নী, অপরজন চাচাত বোন সাবেক ডেপুটি স্পীকার হুমায়ুন খান পন্নীর মেয়ে সোনিয়া খান পন্নী। তাঁরা ওয়াক্ফ এস্টেটটি তথা ভদ্রাসন রাজবাড়িটি রক্ষার জন্য বাদী হয়ে ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল সদর সিনিয়র সহকারী জজকোর্টে একটি মোকদ্দমা রম্নজু করেন।

_ইফতেখারুল অনুপম টাঙ্গাইল