মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১০, ৩ পৌষ ১৪১৭
কালের সাক্ষী কালে খাঁ মসজিদ অরক্ষিত
পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এক অখ্যাত পল্লীর নাম শ্রীরামপুর। দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত কালের সাৰী শ্রীরামপুর মিঞা বাড়ির কালে খাঁ মসজিদ। প্রায় সাড়ে ৪শ' বছর আগে নির্মিত এ ঐতিহাসিক নিদর্শন সাক্ষ্য বহন করছে এতদ্বাঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫৯০ সালে চন্দ্রদ্বীপের রাজা ছিলেন কন্দর্প নারায়ণ। এ সময় যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য বৈবাহিককে পতর্ুগিজ দসু্য দমনে চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী কচুয়াতে এলেন। সঙ্গে এলেন তার প্রধান সেনাপতি ভবানন্দ মজুমদারে পুত্র হরনান্দ মজুমদারকে। পতর্ুগিজ দসু্য দমনে খুশি হয়ে রাজা কন্দর্প নারায়ণ হরনন্দ মজুমদারকে কিছু ভূমি উপঢৌকন দিলেন। ভূমি অধিকার পেয়ে তিনি থেকে যান এখানে। বসতি স্থাপন করেন কচুয়ার দৰিণে বগা নদীর অপরপারে। এ সময় রাজপুত্র শ্রীরাম গেলেন হরনন্দের ওখানে বেড়াতে। তার নামানুসারে ওই এলাকার নামকরণ করা হয় শ্রীরামপুর। চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্প নারায়ণের পৌত্র কীর্তি নারায়ণ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন হিন্দু সমাজে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। দৰিণাঞ্চলে গ্রামের পর গ্রামের মানুষ তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। ইতোমধ্যে মুর্শিদকুলি খানের খাজাঞ্চী খ্যাতিমান পুরম্নষ হিসেবে হরনন্দ ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেন। হরনন্দের পৌত্র শিব নারায়ণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে শিবন খাঁ নাম ধারণ করেন। বর্তমানে শ্রীরামপুরের মিঞারা শিবন খাঁর বংশধর। বংশানুক্রমে পদবি ও তাদের আগমন নিয়ে মিঞাদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। ঐ বাড়ির প্রবীণ ব্যক্তি লতিফ খান বলেন, শিব প্রসাদ মুখোপাধ্যায় কালে খাঁ নাম ধারণ করেন। তবে তারা যে শিবন খাঁর বংশধর এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই।
১৭৩১ সালে কালে খাঁ চন্দ্রদ্বীপের তৎকালীন রাজা উদয় নারায়ণের কাছ থেকে বর্তমান পটুয়াখালীর কিয়ংদশ বন্দোবসত্ম নেন। তার নামানুসারে মৌজার নামকরণ করা হয় কালিকাপুর। এ সময় তিনি নিজ গ্রামের মুসলমানদের নামাজ আদায়ের জন্য নির্মাণ করেন একটি মসজিদ, যা কালে খাঁ মসজিদ নামে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত। মসজিদটি নির্মাণের সঠিক কোন দিন-তারিখ সম্পর্কে কেউ কোন তথ্য দিতে পারেনি। কালের স্রোতে মসজিদটি এক সময় জরাজীর্ণ হয়ে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। এক গম্বুজ বিশিষ্ট মস্জিদটি দেখতে দ্বিতল মনে হলেও আসলে তা দ্বিতল নয়। মসজিদটির দৈঘর্্য, প্রস্থ সমান ১৫ হাত, উচ্চতা আনুমানিক ২০ হাত। চারদিকে ৪ টি দরজা এবং ৮ টি জানালা রয়েছে। এক সময় এটিতে মনোরম কারম্নকার্য খচিত ছিল। সংস্কারকালে এ কারম্নকার্য লোপ পায় বলে বাড়ির লোকজন জানায়। কালে খাঁর পৌত্র বুরম্নম খাঁ এলাকাবাসীর যাতায়াতের সুবিধার্থে বাড়িসংলগ্ন খালের ওপর ১৮১০ সালে একটি পুল নির্মাণ করেন, যা বুরম্নম খাঁর পুল নামে পরিচিত। সম্ভবত এটিই ছিল এ অঞ্চলের প্রথম পুল। বর্তমানে সেখানে কোন খালের চিহ্ন নেই। বাড়ির পাশে খোলা জায়গায় পুলটি দাঁড়িয়ে আছে। পুলটির গায়ে লেখা ছিল বরহান খাঁ-১২১৭ বঙ্গাব্দ। বর্তমানে লেখা প্রসত্মরখ-টি কে বা কারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে এর প্রামাণ্য চিত্র রয়েছে।
এককালে জমিদারদের অত্যাচারের কাহিনী স্মরণ করিয়ে দেয় ওই বাড়ির আন্ধারকিলস্নার স্মৃতিচিহ্ন; যার চারদিকে সুউচ্চ দেয়ালঘেরা বাড়ির জীর্ণ আন্ধারকিলস্নার মাঝে ছোট ছোট বহু কোঠা এবং কূপের অসত্মিত্ব আজও বর্তমান। কথিত আছে জমিদার আমলে কেউ তাদের কথা অমান্য করলে কিংবা কোন অপরাধ করলে তাকে ধরে এনে আন্ধার কোঠায় রাখা হতো এবং বিচার শেষে তাকে ঐ কূপে নিৰেপ করা হতো। ওই বংশের বক্তার খান তার পিতা- মাতার প্রেমের অমর কাহিনী ধরে রাখতে তাদের সমাধির ওপর নির্মাণ করেন জোড়াকবর; যা কালে খাঁ-জুলেখার প্রেমসমাধি বা জোড়াকবর নামে পরিচিত। কেউ কেউ আবার এটাকে কালে খাঁ-মালেকার জোড়াকবরও বলছেন।
কালের বিবর্তনে তাদের জমিদারি-তালুকদারি এক সময় নিলাম হয়ে যায়। বিলুপ্ত হতে থাকে তাদের সব স্মৃতিচিহ্ন। যেটুকু আছে তা অতীত ইতিহাস মাত্র। বাড়ির লোকজন জানায়, প্রায় দেড়যুগ আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ঐতিহাসিক এসব স্মৃতি রৰণাবেৰণের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই সুবাদে প্রায় ১০ বছর আগে কালে খাঁ মস্জিদ ও বরহান খাঁর পুলটি সংস্কার করা হয়। এ সময় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন মাঝে মাঝে তদারকি করতে আসতেন। কিন্তু বিগত ৪/৫ বছর যাবত তাদের কোন খোঁজখবর নেই। বর্তমানে অরৰিত অবস্থায় রয়েছে এ ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন।
_মোঃ মোখলেছুর রহমান, পটুয়াখালী