মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১০, ৩ পৌষ ১৪১৭
রংপুরে নীল চাষ
চাষীরা রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবেও নিজ উদ্যোগে নীল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে
ইংরেজ শাসনকালে নির্যাতন করে নীল চাষে বাধ্য করা হতো এ অঞ্চলের চাষীদের। তাদের ওপর নীলকরদের সেই অত্যাচারের কাহিনী এদেশের প্রায় সকলের জানা। আজ এই স্বাধীন দেশে নীল চাষের জন্য চাষীর ওপর কোন জুলুম নেই, নেই অত্যাচারী নীলকর সাহেব। কিন্তু রংপুরে এখনও হচ্ছে নীলচাষ, আছে নিখিলের মতো নীল চাষী। নীল লাভজনক পণ্য হওয়ায় দিনে দিনে এর চাষ বাড়ছে। এ এলাকার অনেক চাষী এখন নীলচাষ করে লাভবান হচ্ছেন। রংপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর ও গঙ্গাচড়া উপজেলার পাগলাপীর হরকলী ঠাকুরপাড়া এলাকায় প্রায় ৩ হাজার কৃষক ৯শ' একর জমিতে নীলচাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এখানে নীল গাছের পাতা থেকে তৈরি করা হচ্ছে নীল। পাতা থেকে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের সবুজ সার। তাই চাষীরা রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবেও নিজ উদ্যোগে নীল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। রংপুরের তৈরি নীল এখন রাজধানী ঢাকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। প্রতি কেজি নীল ১ হাজার ২শ' টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি একর জমিতে উৎপাদন হচ্ছে ২ হাজার ৬শ' টাকার নীল পাতা । গত ৩ বছর ধরে রংপুরের তৈরি নীল ঢাকার বিভিন্ন সুতাকল ও কাপড়ের মিলে বিক্রি হচ্ছে। নীল চাষীরা জানায়, এ অঞ্চলে পরিত্যক্ত জমিতে এক ধরনের গাছ জন্মে যা জ্বালানির জন্য খড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। স্থানীয় ভাষায় এসব গাছকে বলা হতো মালগাছ। এই গাছ যে আসলে মূল্যবান নীল গাছ সে বিষয়ে কোন ধারণাই ছিল না তাদের। আলু তোলার পর পড়ে থাকা জমিতে মালবীজ ছিটিয়ে রাখা হতো এবং মালগাছ জ্বালানি খড়ি হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল তারা।
২০০৮ সালের দিকে বিদেশী একটি এনজিও'র মাধ্যমে তারা জানতে পারে এটি মালগাছ নয়, নীলগাছ যার পাতা দিয়ে তৈরি হয় মূল্যবান নীল । গঙ্গাচড়া উপজেলার হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামের অনিল কুমার রায়ের পুত্র নিখিল চন্দ সর্বপ্রথম এখানে নীলের চাষ শুরম্নু করে। নিখিল জানায়, এইচএসসি পাস করার পর সে ২০০২ সালে পলস্নী চিকিৎসকের কোর্স করার পর গ্রামে ঘুরে ঘুরে স্বাস্থ্যসেবা দিতে থাকে। এর মধ্যে সে লক্ষ্য করে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারে অভাব-অনটন নিত্য সঙ্গী। বছরের বেশিরভাগ সময় গ্রামটির লোকজনের কাজ থাকে না। কাজ না থাকায় উপার্জনও থাকে না। ফলে পরিবারের লোকজনের দিন কাটে অনাহারে-অর্ধঅহারে। তখন থেকেই নিখিল তার গ্রামের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ খুঁজতে থাকে।
২০০৩ সালে সে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন জুট ডাইভারসিফিকেশন এ্যান্ড প্রমোশন সেন্টার রংপুরের অধীনে পাটপণ্যের বিভিন্ন ব্যাগ তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়। এর পর দরিদ্র লোকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে হাত দেয়। এজন্য ২০০৩ সালে ফেব্রম্নয়ারি মাসে নিজের জমির ওপর ঘর তুলে সেখানে হসত্ম ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ কেন্দ্র চালু করেন। এর পর সেখানে গ্রামের অসহায় বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন জুট ডাইভারসিফিকেশন এ্যান্ড প্রমোশন সেন্টার রংপুর সহযোগিতায় হসত্ম ও কুটির শিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ দেন। এর পর নিজের টাকায় যন্ত্রপাতি কিনে এনে এ সকল নারীকে পাটপণ্যের মার্কেটিং ব্যাগ, মানি ব্যাগ, কলেজ ব্যাগ, ফাইলসহ নানান জিনিস তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন। গ্রামের প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের জন্য তিনি চালু করেন প্রতিবন্ধী আবাসন প্রকল্প। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি মোমবাতি, আগরবাতি তৈরির কাজে নিয়োগ করেন। এতে নিখিল যেমন লাভবান হন, তেমনি গ্রামের প্রতিবন্ধী ও অসহায় নারীদেরও কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়। এতটুকু সাফল্যের পর নিখিলের মাথায় চিনত্মা আসে আরও অনেক কিছু করার। এজন্য ২০০৬ সালে তিনি এম.সি.সি বাংলাদেশ নামে একটি দাতা সংস্থার অধীনে হসত্মকুঠির শিল্পের ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ নিজেসহ গ্রামের অন্য নারীরা মিলে নেন। এর পর সংস্থাটির আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় শুরম্নু করেন নীলগাছের পাতা থেকে নীল তৈরির কাজ। তেরিকৃত নীল তিনি বিক্রি করেন ঢাকার বিভিন্ন সুতা ও কাপড় তৈরির মিলে। প্রতি কেজি নীল তৈরি করতে নীলের পাতা ক্রয়, শ্রমিকের মজুরিসহ খরচ হয় ৯শ' থেকে ১ হাজার টাকা আর উৎপাদিত নীল বিক্রি হয় ১ হাজার ৪শ' থেকে ১ হাজার ৫শ' টাকা। প্রতিবছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যনত্ম ৫ মাসে ১০ থেকে ১১লাখ টাকার নীল তৈরি করে বিক্রি করা হয়। এতে লাভ হয় ৩ লাখ টাকার মতো। শ্রমিকদের মজুরী দিয়ে যে লাভ থাকে তা জমা হয় হসত্মকুঠির শিল্প প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ কেন্দ্রের নামে। বিপদ-আপদে শ্রমিকদের দেয়া হয় এ টাকা।
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের হরকলি ঠাকুরপাড়া গ্রামে গড়ে উঠেছে এ হসত্মকুটির শিল্প প্রশিক্ষণ কল্যাণ কেন্দ্র। নীল তৈরির জন্য সড়কের দু'পাশে নীলচাষ করছে এলাকার কৃষক। নিখিলের নিজস্ব জমিতে গড়ে তোলা এ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নীল তৈরির কারখানা; সব একই জায়গায়। নীল তৈরির কাজে কর্মরত কয়েক দুস্থ নারী এবং মোম তৈরির কাজে নিয়োজিত কয়েক প্রতিবন্ধী জানান, হসত্মকুঠির প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ কেন্দ্রের কল্যাণেই তারা এখন ভালভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছেন ।
ঠাকুরপাড়া গ্রামের মরিয়ম বেগম, রোকেয়া বেগম, আরজিনা বেগম, আলবেদা বেওয়া, সাবিত্রী রানী, মহাদেবপুর গ্রামের আয়শা খাতুনসহ অনেকেই হরকলি ঠাকুরপাড়া হসত্মকুটির শিল্প প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে নীল তৈরির কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছে।
যেভাবে নীল তৈরি করা হয়: নিখিল জানায়, প্রথমে নীল উৎপাদনের জন্য নীলগাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করতে হয়। এর পর পাতাগুলো বোঝা বা অাঁটি বেঁধে ড্রামে পানি দিয়ে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হয়। ১২ ঘণ্টা পর ড্রামের এ পানি হালকা সবুজ রং ধারণ করলে অন্য একটি ড্রামে নিতে হয়। এর পর স্টিয়ারিং করা হয় এক ধরনের বাঁশের খোঁচা বা ঝাকুনির সাহায্যে। ৩০ মিনিট ঝাকুনির পর ড্রামের পানিতে প্রচুর ফেনা হয়। ফেনাসহ পানি ড্রাম হতে পাইপ অথবা বালতির সাহায্যে বাঁশের ঝুড়িতে মার্কিন কাপড়ের নেট দিয়ে সেখানে ঢেলে দিতে হয়। ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে আসত্মে আসত্মে পানি মার্কিন কাপড় ভেদ করে বের হয়ে যায়। পানি বের হয়ে যাওয়ার পর মার্কিন কাপড়ের মধ্যে এক ধরনের তরল তলানি পড়ে। তরল তলানিই চামচের সাহায্যে সংগ্রহ করে রোদে শুকাতে হয়। ২-৩ দিন রোদে শুকালে কঠিন এক আবরণ পড়ে। এটি গ্রাইন্ডিং মেশিনের সাহায্যে বা শিলপাটায় জাতিয়ে কাৰিত সেই নীল তৈরি করা হয়। এই নীলের সঙ্গে হরীতকীর গুঁড়ো মেশালে গোল্ডেন কালার ও কলার মোচা মেশালে কালচে নীল রং তৈরি হয়।
_আব্দুর রউফ সরকার, রংপুর