মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১৪ মে ২০১০, ৩১ বৈশাখ ১৪১৭
অটো রেল কন্ট্রোলার জানিয়ে দেবে ট্রেনের অবস্থান, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্কেত
তরুণ বিজ্ঞানী শাহাবুদ্দিন সামীর উদ্ভাবন
ন'টার ট্রেন ক'টায় আসবে_তা জানতে আর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে না। স্টেশনের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা 'অটো রেল কন্ট্রোলার' সিস্টেমই বলে দেবে ট্রেনের অবস্থান। জলপথে চলতে গিয়ে আর নিতে হবে না জীবনের ঝুঁকি। কিনতে হবে না দু'তিন হাজার টাকার লাইফ জ্যাকেট। পরিত্যক্ত পস্নাস্টিক বোতল দিয়েই বানানো যাবে ঝুঁকিমুক্ত লাইফ জ্যাকেট। জলোচ্ছ্বাসের আগেই জানা যাবে আগাম সঙ্কেত। নৌদুর্ঘটনার পর খুঁজতে হবে না পানির গহীন তলদেশের কোথায় লুকিয়ে আছে নিমজ্জিত নৌযান। এ রকম আরও অসংখ্য অদ্ভুত যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করে চলেছে নেত্রকোনার এক অদম্য তরম্নণ। পুরো নাম শাহাবুদ্দিন ভূঁইয়া সামী। এখন 'দেশ সেরা' তরম্নণ বিজ্ঞানী। জেলা শহরের বারহাট্টা রোডের মরহুম সিরাজুল হক ভুঁইয়ার ছেলে। সামীর ঝুড়িতে এখন অনেক খ্যাতি, পুরস্কার ও যশ। সামীর শৈশবের কথা। গভীর রাতে ঘরে টিম টিম করে জ্বলছে কুপি বাতির আলো। খট খট শব্দে ঘুম ভাঙছে মায়ের। পরম মমতায় কাছে এসে দেখছেন, কিছু একটা বানাতে চেষ্টা করছে সে। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিত্যক্ত ব্যাটারি, বাল্ব, তার, বাতিল বোতল, ম্যাগনেট, কর্ক ইত্যাদি। ছেলের এই উদ্ভট(!) কা-কীর্তি দেখে দুশ্চিনত্মায় প্রায়ই ঘুমাতে পারতেন না স্বল্প শিক্ষিত সুফিয়া ভুঁইয়া। সংসারের দারিদ্র্য ঘোচাতে ছেলেকে একজন উচ্চ শিক্ষিত চাকুরে হিসেবে দেখতে চান তিনি। এ জন্য অনেক বকেছেন। পড়ায় মনোযোগ ফিরিয়ে নিতে ফেলে দিয়েছেন অনেক জিনিস। কিন্তু চেষ্টা যার অদম্য, মননে যার আবিষ্কারের নেশা_ সে কি আর পারে থেমে যেতে?
সামীর বিজয়ের গল্প শুরম্ন ২০০০ সালে। তখন সবে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। নেত্রকোনা শিশু একাডেমীর উদ্যোগে ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত প্রকল্প নিয়ে এক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাত্র ২০-২৫ টাকার তুলা, কাঠের ভুসি আর কর্ক দিয়ে তৈরি 'বিকল্প থার্মোফ্লাস্ক' প্রদর্শন করে পায় জেলা পর্যায়ের তৃতীয় পুরস্কার। বাবা তখনও জীবিত ছিলেন। খুশিতে তিনি এক জোড়া জুতো উপহার দেন ছেলেকে। বিভিন্ন উদ্ভাবনের জন্য এরপর জেলা পর্যায়ে আরও চারবার প্রথম পুরস্কার পায় সামী। ২০০৭ সালে সামী আবিষ্কার করে 'অটো রেল কন্ট্রোলার' নামে একটি যন্ত্র। এই স্বয়ংক্রিয় কন্ট্রোলার সিস্টেমের সাহায্যে স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা সহজেই জানতে পারবে ট্রেন কোথায় আছে এবং আসতে কত দেরি। এ প্রকল্পের জন্য ময়মনসিংহ অঞ্চল ও ঢাকা বিভাগে প্রথম এবং জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় পুরস্কার পায় সে।
জনকণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় সে বছর 'ক্ষুদে বিজ্ঞানী সামীর উদ্ভাবন' শিরোনামে একটি প্যানেল রিপোর্ট প্রকাশিত হলে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি চিঠি পাঠিয়ে অথবা কাছে ডেকে নিয়ে তাকে অভিনন্দন ও উৎসাহ যোগান। আমন্ত্রণ আসে জাপান যাওয়ারও। কিন্তু পড়ালেখার কারণে যাওয়া সম্ভব হয়নি তার। সামী এখনও অকপটে স্বীকার করে, জনকণ্ঠে প্রকাশিত রিপোর্টটির পর অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছিল সে । ২০০৮-এ বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ তাকে দেশের 'শ্রেষ্ঠ তরম্নণ বিজ্ঞানী' হিসেবে পুরস্কৃত করে। ২০০৯-এ গ্রামীণফোন দেশব্যাপী বিজয়ের গল্প আহ্বান করলে সামী দারিদ্র্যের সঙ্গে কঠিন সংগ্রাম করে বেড়ে ওঠার গল্প নিজেই লিখে পাঠায়। দেড় হাজার গল্পের মধ্যে নির্বাচিত ২৫টিতে স্থান পায় তার গল্পটিও। দেয়া হয় ক্রেস্ট ও পুরস্কার। মিডিয়ায় তাকে নিয়ে প্রচার হয় অনেক বিজ্ঞাপন ও প্রতিবেদন।
ক্ষুদে বিজ্ঞানী সামী এখন পুরোদস্তুর তরম্নণ বিজ্ঞানী। এরই মধ্যে সে উদ্ভাবন করেছে জ্বলোচ্ছাসের আগাম সঙ্কেত, নৌদুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার ব্যবস্থা, বাতাসের গতি নির্ণয়, অটো ব্রিজ সিগন্যাল, গ্রামাঞ্চলের খাবার পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য স্বল্প খরচে গ্রামীণ ফিল্টার, বিদু্যতবিহীন লেমিনেটিং মেশিনসহ অনেক যন্ত্র।
লেখাপড়ায়ও সামীর সাফল্য কম নয়। ২০০৭ সালে নেত্রকোনা টেকনিক্যাল স্কুল থেকে বিদু্যত কৌশল বিভাগে জিপিএ-৪.২৭ পেয়ে এসএসসি পাস করে সে। এখন পড়ছে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। অবসর পেলেই নেত্রকোনায় চলে আসে সামী। নতুন নতুন আবিষ্কারের নেশায় নিরলস সাধনা চালিয়ে যায়। বারহাট্টা রোডে খুপরির মতো ছোট্ট বাসায় তার থাকার ঘরটিকে বলা যায় একটি বিজ্ঞানাগার। ঘরের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে যন্ত্রপাতি। এক পাশের ছোট্ট টেবিলে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন পুরস্কার, ক্রেস্ট ও মেডেল।
সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা