মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ আগষ্ট ২০১১, ২৮ শ্রাবণ ১৪১৮
আধুনিক ইস্তাম্বুল
সাজেদ রহমান
(পুর্ব প্রকাশের পর)
পরদিন ৯ মে যথারীতি সকালে মাইক্রোবাস চালক ইয়াসিন আলী এসে হাজির। যাব হায়া সোফিয়া দেখতে। রাসত্মার পাশে গাড়ি রেখে ভেতরে গেলাম। এর ইতিহাস দেশে থাকতে অল্প পড়েছি। এসে যথারীতি এক গাইড নিতে হলো। দরদামে মেলে না। সে ২০ লিরা চান। আমরা দিতে চাই ১০ লিরা। শেষ পর্যন্ত ১৫ লিরায় ঠিক হলো। ওর নাম ইউসুফ। এখানকার বাসিন্দা। ইংরেজীতে তিনি বর্ণনা দিয়ে গেলেন। হায়া সোফিয়া বাংলা মানে হয় পবিত্র জ্ঞান। ১৫-১৬শ' বছরের পুরনো এই ভবন এর আগে দুই বার তৈরি করা হয়েছে। তৃতীয়বার তৈরি ভবনটি টিকে আছে। প্রথমে এটা চার্চ ছিল। অটোমান সম্রাটরা ইসত্মাম্বুল দখলের পর এটাকে মসজিদ বানিয়ে ফেলা হয়। বাইরে তৈরি করা হয় দুইটি মিনার। কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতা গ্রহণ করার পর এটাকে মিউজিয়াম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমান এটা একটি মিউজিয়াম। এটা যে চার্চ ছিল, তা মিউজিয়াম ঘোষণার পর বের হয়ে আসছে। ভেতরে একটি সত্মম্ভে অাঁকা আছে কিছু ভেড়া এবং খেজুর গাছ। গাইড ইউসুফ জানালেন, খেজুর গাছ মানে স্বর্গ, আর যিশুকে তো শেফার্ড বা মেষ পালক মনে করা হয়। আর একটি দেয়ালে অাঁকা আছে এক যুবক যিশুকে সোনা উপহার দিচ্ছেন। এই সোনা উপহার দেয়ার মাধ্যমে সে যিশুর কাছ থেকে ৪র্থ বিয়ে অনুমতি চাচ্ছে। মিউজিয়াম ঘোষণার পর সেখানে খনন চালানোর পর এভাবে অনেক কিছু বের হয়ে আসছে।
সেখান থেকে বের হয়ে গেলাম গ্রান্ড বাজার। ইসত্মাম্বুলের সবচেয়ে বড় বাজার। সব ধরনের জিনিস পাওয়া যায় এখানে। বিদেশীরা ইসত্মাম্বুলে এলে অনত্মত একবার ঢুঁ মারবেন এই বাজারে। ১৪৬১ সালে বাজারটি তৈরি। ছাদের নিচে এত বড় বাজার ইসত্মাম্বুলে আর নেই। একটু দেখে শুনে, বেশ মজা করে শপিং করব এমন মনমানসিকতা নিয়ে বাজারে ঢোকা। শুনেছিলাম টার্কিস জুয়েলারি নাকি নানা ডিজাইনের পাওয়া যায় এই মার্কেটে। কিন্তু ঘুরে তা মনে হলো না, এর চেয়ে বরং ভারতের কলকাতা কিংবা দিলস্নীতে ভাল জুয়েলারি জিনিস পাওয়া যায়। যেগুলো জিনিস দেখে পছন্দ হলো, তার দাম শুনে আর কেনার ইচ্ছায় থাকল না। দোকানিরা দেখলাম একটু পর পর চা পান করছে। সিগারেটও টানছে বাজারের ভেতর দোকানে বসে। তাই দেখে ওমর ফারম্নক ভাই সিগারেট ধরালেন। এক দোকান থেকে তরবারি কিনবেন তিনি। কিন্তু দরদামে হচ্ছে না। তাই প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে তিনি দোকানিকে দিলেন এক শলাকা। এত খাতির করার পরও তিনি কিনতে পারলেন না, দাম বেশি চায় দোকানি। বার বার দাম কম বলায় ওই দোকানি বুকের বাম পাশে হাত রেখে বললেন, তুমি কম দাম বলে আমার হৃদয় ভেঙ্গে দিচ্ছ। শেষমেশ তরবারি হাতে তিনি একটি ছবি তুললেন। এত ওমর ফারম্নক ভাই দারম্নণ খুশি। বললেন, কিনি না কিনি একটা ছবি তো তুলেছি। ইসত্মাম্বুল শহরে রাসত্মাঘাটে নারী-পুরম্নষ নির্বিশেষে সিগারেট টানছে দেখলাম। কোন নির্ধারিত স্থান নেই সিগারেট টানার। যাই হোক শেষমেশ কয়েকটি সিরামিকের শোপিস, টার্কিস সাবান এবং অন্যান্য জিনিস কিনলাম। এখানকার বাজারে ঘুরে দেখলাম ভারতের কাশ্মীরের শাল চাদরসহ গরম পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। জানি না এগুলো কাশ্মীর না অন্য দেশের, কারণ কাশ্মীর বানানটা দেখে সন্দেহ হলো। এক দোকানিকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি ওগুলো কাশ্মীরের বলে জানালেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর বাজার থেকে বের হবার পর মাইক্রোবাসের কাছে এলাম। চালক জানালেন পার্কিং চার্জ দিতে হবে ২৫ লিরা। টাকা দিয়ে বের হয়ে এলাম। এখানে সব দর্শনীয় স্থানে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা আছে। তবে পার্কিং চার্জ দিতে হয়।
বিকেলে হোটেল থেকে বের হলাম একা। ম্যাপ দেখে ঠিক করলাম যাবো বসফরাস প্রণালীর পাড়ে। বসার খুব সুন্দর জায়গা। শহরে ঘোরার সময় তা দেখেছি। তখনি যাবার ইচ্ছা ছিল। প্রণালীর সামনে দিগনত্ম জোড়া নীল জল আর হরেক রকম পাখি। ঠা-া হাওয়া তো আছেই। তবে সুবিধা প্রণালী থেকে মাছ ধরে তা ভেজে বিক্রি হয়। দূতাবাসের ভাড়া করা মাইক্রোবাসের চালক জানান, আমার আসতে দুই ঘণ্টা মতো দেরি হবে। আমার তর সইল না। একা বের হয়ে একটি ট্যাঙ্ িচালককে ম্যাপ দেখিয়ে বললাম যাবে এখানে। তিনি ২০ লিরা চাইলেন। সামান্য পথ জানি, কিন্তু চিনি না, তাই ট্যাঙ্চিালককে ডাকা। ২০ লিরার কথা শুনে যাবো না বললাম। ট্যাঙ্চিালক জানালেন, ঠিক আছে যাবেন না, ভাল কথা, এক কাজ করম্নন-ট্রামে যান আপনি ৪ লিরায় যেতে পারবেন। শুনে বেশ অবাক হলাম। ঢাকার ট্যাঙ্চিালক হলে কি হতো তা ভাবতে থাকলাম। ট্যাঙ্চিালককে থ্যাঙ্কস বলে চলে গেলাম। ট্রাম থেকে নেমে একটি বেঞ্চ দেখে বসলাম। জুতা পালিশ করা এক ব্যক্তি এসে বললেন, আপনার জুতা পালিশ করেই দেই। দাম শুনলাম ২ লিরা। তারপরও অনেক সময় ধরে বসে থাকব ভেবে পালিশ করলাম। ২ লিরা মানে বাংলাদেশের একশ' টাকার বেশি। বসফরাস প্রণালীর বাতাসে গা হিম হয়ে যায়। এই প্রণালীর বৈশিষ্ট্য এর পানি কখনও বৃদ্ধি পায় না। সারা বছর এক রকমই থাকে। ঘণ্টা দেড় বসে থাকার পর যেভাবে যাওয়া সেভাবে ফেরা।
এদিন রাতে আমাদের হোটেলের পাশেই এক রেস্টুরেন্টে পেলাম ভাত। মনটা জুড়িয়ে গেল। অনেক ধরনের খাবার। ভাত ছাড়াও দেখলাম রয়েছে বেগুন দিয়ে গরম্নর মাংস ভুনা, গরম্নর মাংসের কোপ্তা, মুরগি, ডোনার কাবাব ছাড়াও নানা ধরনের সবজি। আছে ডাল ভর্তা। ছোট পরিসরের এই হোটেলে দেখলাম এলডিসি সম্মেলনে যোগ দিতে আসা আফ্রিকার অনেক ব্যক্তি খাওয়া-দাওয়া করছেন। এই কয়দিন পর আজ তৃপ্তি সহকারে খেলাম। সামান্য এক চামস ভাত খাবার পর মনে হলো দেশেই আছি। এর পাশের ফাস্টফুডের দোকানে বিয়ার থেকে বিদেশী নানা ব্যান্ডের মদ পাওয়া যায়। দেখলাম নারী-পুরম্নষ নির্বিশেষ সবাই ওই দোকানে ঢুকে এবং খেয়ে বের হচ্ছে। এটা সেখানে সাধারণ ব্যাপার। আর এত ঠা-ার কারণে প্রতি দোকানিই দেখলাম বিয়ার খাচ্ছে। খাবার পানির চেয়ে এখানে বলা যায় বিয়ারের দাম কম।
যেদিন ফিরব (১০ মে) সেদিন দুপুরের আগে গেলাম ইসত্মাম্বুলের এশিয়া অংশে। বসফরাস প্রণালীতে দুটি ব্রিজ এশিয়া অংশে যাবার জন্য। একটি ব্রিজ পার হয়ে ওপারের সবচেয়ে বড় পাহাড়ে উঠলাম। এখান থেকে দেখা যায় ইসত্মাম্বুল শহর ও এশিয়ার অংশ। পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে বসতবাড়ি মানে উচু-নিচু বি্লডিং। আর পাহাড়ের উপরে রয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট এবং নানা জাতের ফুল তার সামনে লাগানো। বহু মানুষ প্রতিদিন এই পাহাড়ের আসেন এবং দু'পাশে নয়নজুড়ে তাকান। রেস্টুরেন্টে নানা স্বাদের খাবার পাওয়া যায়। এখানে এক ধরনের মাছ খেলাম। অনেকটা আমাদের দেশের সমোসার মতো তৈরি। ভেতরে মাছ দিয়ে তৈরি করা এ খবার খুব সুস্বাদু। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি নজরম্নল ইসলাম ভাই সঙ্গে ছিলেন। আমরা অনেক ছবি তুললাম পাহাড়ে। রেস্টুরেন্টের বাইরে বেঞ্চ আছে বসার জন্য। সেখানে নানা দেশের মানুষ বসা আছেন। তারা এসেছেন ঘুরতে। পরে সেখান থেকে ফিরলাম। বিকেলে হোটেল থেকে সোজা কামাল আতাতুর্ক অনত্মর্জাতিক বিমানবন্দরে। পাশেই মার্মার সাগরের নীল জল। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বসে কামাল আতাতুর্কের ছবির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। ইসত্মাম্বুলে যাবার আগে-ইচ্ছা ছিল কামাল আতাতুর্কের ভাস্কর্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলব। কিন্তু আশ্বর্যের বিষয় ইসত্মাম্বুুলে তাঁর তেমন কোন ভাস্কর্য চোখে পড়েনি। যদিও তিনি তুর্কিদের জাতীয় নেতা এবং বীর। পরে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিমানে উঠলাম। উপর থেকে ইসত্মাম্বুল শহর আরও সুন্দর মনে হলো। বাই ইস্তানবুল। (শেষ)