মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ আগষ্ট ২০১১, ২৮ শ্রাবণ ১৪১৮
ক্রুজ শিপে গ্রিক দ্বীপপুঞ্জে এক সপ্তাহ
নূরজাহান বোস
(পুর্ব প্রকাশের পর)
আমাদের জাহাজের সব ক'টি বাসই এখানে থামল। হুড়মুড় করে সকলে ভেতরে ঢুকলাম। ঘুরলাম, বেড়ালাম, অনেকে সুভ্যেনির কিনলাম। আমি ও নেলী হাঁটতে হাঁটতেই একটি ক্যানাডিয়ান ভারতীয় দম্পতির সঙ্গে আলাপেরত হলাম। ওদের সঙ্গে দুটো ছোট ছোট ছেলে ছিল। তাদের সঙ্গে মিলে আমরাও আইক্রিম খেলাম। ঘণ্টাখানেক পরে সকলেই যার যার নির্দিষ্ট বাসে উঠলাম। কিছুৰণ পর আমাদের নিয়ে গেল একটা বাড়িতে কমিউনিটি সেন্টার হতে পারে, মনে করতে পারছি না। ওখানে আমাদের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা ছিল। একটি মিউজিক্যাল গ্রম্নপ নানাকরম বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে গান-বাজনা করছিল। স্যামপেইন খোলা হলো ও নানারকম স্যান্ডউইচ ও ছোট ছোট এক ধরনের কেকও সাজানো ছিল। বুঝতে পারলাম আমাদের ভ্রমণের শেষদিন তাই আমাদের জন্য এই বিশেষ অভ্যর্থনার আয়োজন। খুব ভাল লাগল।
একটু পরে আমাদের ঘাটে নিয়ে এল। অদূরে আমাদের 'স্পেস্নন্ডার অব দি সী' দেখতে পাচ্ছি। সকলে জাহাজে ওঠার পরে জাহাজ ছেড়ে দিল। শেষ বিদায়ের বিকেল। কেমন জানি আনন্দ-বেদনার এক মিশ্রণ। এক সপ্তাহের সমুদ্র ভ্রমণ আজ রাতেই শেষ হবে। এই জাহাজ সারারাত চলবে। খুব সকালে আবার আমাদের ভেনিসে নিয়ে যাবে। সেখান থেকে প্যারিস। তারপর ওয়াশিংটন যাচ্ছি আমরা সকলে মিলে। মিনি, তুলি, কলি ও আমাদের সঙ্গে ওদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। আমি থাকব একটা ভাড়া করা এ্যাপার্টমেন্টে। মিনি তার মেয়েদের নিয়ে থাকবে শ্বশুরালয়ে।
নেলী ও আমি স্নান সেরে শেষদিনের ডিনার খেয়ে এলাম। ওয়েটারদের বকশিশ দিলাম। ঘরে এসে কাপড় চোপড় গুছিয়ে সু্যটকেস বন্দী করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল হতেই তৈরি হয়ে লাগেজ দরজায় রেখে, ব্রেকফাস্ট খেতে গেলাম। দরজার বাইরে রেখে নিশ্চিনত্মে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন খুব ভোরে চোখ খুলতেই জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম ভেনিসের পটভূমি এবং আরও অনেক 'ক্রুজশিপ' যারা আমাদের মতো ভ্রমণ শেষ করে ভেনিসে নোঙ্গর করেছে। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে তৈরি হয়ে খাবার ঘরে ক্যাফেতে খেতে এলাম। চারদিকে যাত্রীদের ভিড়। আনন্দ কোলাহল। মাইকে ঘোষণা করছে নিচে নেমে কোথায় কার, লাগেজ পাবে এবং কে কোন্ বাসে উঠবে বিমানবন্দরে যাবার জন্য। এত সকালে তড়িঘড়ি করে আমাদের নামিয়ে দেবে এটা আমরা ভাবিনি, কারণ আমাদের প্যারিসগামী ফ্লাইট বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ। এখন মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে। কেমন যেন একটা আশাভঙ্গের বেদনা অনুভব করলাম। তারপরই মন মেজাজ চাঙ্গা হয়ে উঠল। যখন ভাবলাম আমাদের হাতে অনেক সময়, অনায়াসেই আমরা লাগেজ নিরাপদ জায়গায় রেখে আবার রূপসী ভেনিস নগরীতে ফিরে যেতে পারব। আমাদের তো ঝাড়া হাত-পা।
নিচে নেমে দেখি এক বিশাল পার্কিং লটে সারি সারি লাগে সাজিয়ে রেখেছে। প্রত্যেকটি সারিতে নম্বর দেয়া। আমাদের লাগেজ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট বাসে উঠলাম। এখান থেকেই জাহাজে উঠে ছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা ভেনিস বিমানবন্দরে পেঁৗছে গেলাম। তখন সকাল আটটা বাজে। ভেতরে দেখি মহা হট্টগোল। ছোট্ট বিমানবন্দর। অসংখ্য মানুষের ভিড়। সকলেই ক্রুজশিপের ভ্রমণকারী। যার যার দেশে ফেরার জন্য উদগ্রিব। যে যার নির্দিষ্ট বিমান ও সময়সূচী জানার জন্য ছুটোছুটি করছে। দিনটি সম্ভবত ১ অথবা দুই আগস্ট। প্রচ- গরম। এসি নেই। বেশ কিছু বছর আগে চীন ভ্রমণে গিয়ে সাংহাই বিমানবন্দরে নেমেও এ রকম দৃশ্যের সম্মুখে পড়েছিলাম। তখন অবশ্য আমাদের দেশের বিমানবন্দরের অবস্থাও এ রকমের ছিল। যাকগে, নেলীকে আমাদের লাগেজ নিয়ে বাইরে বসিয়ে রেখে ভেতরের অবস্থা দেখার জন্য আমি গেলাম। কোন কিছুই বোঝা বা জানা গেল না। শুধু এটুকু বুঝলাম যে বিকেলের আগে কেউই কিছু বলতে পারছে না।
পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক আমরা লাগেজ রেখে ভেনিস যাব বলে সিদ্ধানত্ম করলাম। আমার কন্যা মিনি যে আমাদের এই ভ্রমণের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাকারী, ফোন করে বলল, একই কথা, শুধু বিমানবন্দরে বসে না থেকে বাসে করে ভেনিস বন্দরে আসার কথা।
আমাদের সু্যটকেস কোথায় রাখব, এটা বের করতেই বেশ সময় লাগল। ওপর নিচ করে, সিঁড়ি ভেঙ্গে শেষ পর্যনত্ম নির্দিষ্ট কাউন্টারে লাগেজ রেখে কুপন নিয়ে বাসে করে ভেনিসে চলে এলাম। নেমেই দেখি বাংলাদেশী ছেলেদের ছোট ছোট সু্যভেনিরের দোকান, দুয়েকজন এই দোকানগুলোর মালিকও আছে। কাগজপত্র বৈধ না থাকলে দোকান করতে পারে না। এদের দোকানে কাজ করছে অবৈধ সব ছেলের দল। আমাদের দু'জনকে দেখে ওরা কাঁচুমাঁচু মুখ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। আমরা খুব খুশি হলাম এদের দেখে। এর মধ্যে একটি দোকানের মালিক, নাম জাহাঙ্গীর কামাল। এগিয়ে এসে আমাদের সালাম করে জিজ্ঞেস করল যে আমরা কলকাতার কি না। না বলায়, খুব খুশি হয়ে নিজের কথা বলা শুরম্ন করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছে। বাবা, ভাইরাও লেখাপড়া জানা। সরকারী চাকরিরত। এক ভাই বাংলাদেশ আর্মিতে আছে। তার স্ত্রী বরিশালের মেয়ে, ডাক্তারি পাস করেছে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে। ওরা এখন ইতালির নাগরিক। দু'টি ছেলে আছে ওদের। এ দেশে থাকাই ওরা সিদ্ধানত্ম করেছে। এ দেশের নানা সুবিধার কথা বলল, যেমন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, চিকিৎসা সব অবৈতনিক, মানে ফ্রি। ওদের আয় কম বলে ওরা সরকারী সসত্মা বাড়িতে থাকে। খুব গর্ব করে আমাদের জানাল যে, ওর দ্বিতীয় ছেলের জন্মের সময় ও বাড়িতে ছিল না, কিন্তু প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় সরকারী হেলিকপ্টার এসে ওর স্ত্রীকে ভাল হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং নিরাপদে বাচ্চাটি প্রসব করে।
যাই হোক, ওকে বললাম, আমরা একটি সুপার মার্কেটে যাব এবং আমরা পানি ও কিছু শুকনো খাবার কিনব আমাদের লাঞ্চের জন্য। খুব খুশি হয়ে নিকটবতর্ী মার্কেটে নিয়ে গেল। আমরা ঘুরে ঘুরে ভাল দেখে প্যাকেটজাত খাবার ও পানির বোতল নিয়ে টাকা দিতে কাউন্টারে এলাম। জাহাঙ্গীর কিছুতেই আমাদের দাম দিতে দিল না। কি আর করি! ওকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা হলো না। দশ, পনেরো ডলারের খাবার ছিল। জাহাঙ্গীর বলল, আপনারা আমার মায়ের মতো। সময় থাকলে আপনাদের আমার বাড়ি নিয়ে যেতাম। আমার স্ত্রী ও ছেলেরা খুব খুশি হতো। আমার মনটা কেমন আবেগ-আপস্নুত হয়ে পড়ল। ওর ফোন নাম্বার নিয়ে এলাম। আমার ফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিলাম ঢাকা এলে যেন যোগাযোগ করে। পৃথিবীর যেখানেই যাই, পথে পথে বাঙালী ছেলেমেয়েদের এই আদর আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
একবার নিউইয়র্কে একটি আফগান রেস্টুরেন্টে আমার ছোট মেয়ে অনিতা আমাকে ডিনারে নিয়ে যায়। আমাদের বাংলা কথা শুনে, ওই রেস্টুরেন্টে কাজ করা সব ক'টি ওয়েটার ও রাঁধুনি_যারা সকলেই বাংলাদেশী। আমাদের চারপাশে ভিড় করে। খাবার শেষে মিষ্টি (পানত্মোয়া) ও পান ওদের উপহার হিসেবে খেতেই হলো। প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পড়ে আছে, পরিবার-পরিজনদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল করার জন্য।
সেদিন ভেনিস আর কিছু দেখা হলো না। ঘরছাড়া, প্রিয়জন হারা এই ছেলেগুলোর সঙ্গেই সময় কাটালাম। ওরা বলল, বাংলাদেশে কোন গ্রাম একেবারে পুরম্নষশূন্য। কোন এলাকা বা গ্রাম থেকে একজন আসতে পারলে, তার সাহায্য-সহযোগিতায় একে একে অনেকেই এখানে চলে আসে। দুপুর দুটোর সময় জাহাঙ্গীর আমাদের বাসে তুলে দিল। বেশ কয়েকজন ছেলেও এল আমাদের বিদায় দিতে। মনে হলো আপনজনদের বিদায় দিচ্ছে অশ্রম্ন ভারাক্রানত্ম হৃদয়ে। আমাদের অবস্থাও তাই।
বিমানবন্দরে এসে কফি খেলাম। নিজেদের লাগেজ তুলে নিয়ে নিজেদের 'ইজি জেট' বিমান কাউন্টারে ঘুমুতে শুরম্ন করলাম। অবস্থা সকালের চেয়ে আরও বিভ্রানত্মিকর। আমরা কাউন্টারের উপরের সাইন দেখে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখলাম উপরের লেখাগুলো পাল্টে গেছে। ও হরি এখন কি করি! শুধু আমরা নই, সকল যাত্রীর একই অবস্থা। তাছাড়া দাঁড়াতে দাঁড়াতে পায়ে ব্যথা ধরে গেছে। এ লাইন থেকে ও লাইনে আবার ও লাইন থেকে এ লাইনে। শেষ পর্যনত্ম যেটাকে নির্ঘাৎ আমাদের কাউন্টার মনে করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম, শেষ দম্পতিটির মালপত্র অনেক বেশি, সুতরাং কাস্টমসের লোকজনদের ডাকাডাকি শুরু হলো। না আসা পর্যনত্ম আমাদের মুক্তি নেই। পুরো ব্যাপারটা আমাদের অনুন্নত দেশের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। যাক, শেষ পর্যনত্ম বিমানে উঠলাম এবং মাত্র এক ঘণ্টায় ঝকঝকে, তকতকে প্যারিস বিমানবন্দরে অবতরণ। কোন ঝক্কি নেই। হুট করে লাগেজ নিয়ে দেখি কন্যা আমার সহাস্য বদনে দাঁড়িয়ে। বাড়ি এসে তুলি, কলির আনন্দ-কলরবে আমরাও যোগ দিলাম।

(শেষ)