মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৮ জুলাই ২০১১, ২৪ আষাঢ় ১৪১৮
গুড মর্নিং অস্ট্রেলিয়া গুড মর্নিং পার্থ
মাহফুজুর রহমান
(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাতে অফিসিয়াল ডিনার। আমাদের অন্য কোথাও একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া হবে। সন্ধ্যা সাতটায় হোটেলের লবিতে থাকতে হবে আমাদের। আমরা ঠিক সাতটায় পৌঁছে দেখি, কেউ নেই। অর্থাৎ পুরো দল আমাদের রেখে চলে গেছে। এরও পাঁচ মিনিট পর মিয়ানমার থেকে আসা দু'জন লবিতে এলেন। তাঁরা কাউকে না দেখে হতাশ। এ ব্যাপারে রব উদ্যোগী ভূমিকা নিল। সে আবারও রম্নমে গিয়ে অফিসিয়াল ডিনারের দাওয়াতপত্রটি এনে দেখাল হোটেলের হেল্প ডেস্কের লোকজনকে। তারা আঙুল উঁচিয়ে মাঠের ওপাশের একটি রেস্টুরেন্ট দেখিয়ে দিল। মিনিট পাঁচেক হেঁটে আমরা পেঁৗছে গেলাম সেখানে। আয়েজকরা আমাদের আসতে দেখে একটু লজ্জা পেলেন এবং অনেকটা সময় আমাদের ঘিরে হৈচৈ করলেন যাতে আমাদের ফেলে আসার দুঃখটুকু আমরা ভুলে যাই।
ডিনারে নরম-গরম পানীয়ের পাশাপাশি নানা রকম খাবার নিয়ে ঘুর ঘুর করছিলেন ভদ্র মহিলারা। গরম্নর গোশতের সমুচা এলো প্রথমেই। অস্ট্রেলিয়ার সর্বত্রই এটি জনপ্রিয় খাবার এবং সমুচা নামেই পরিচিত বলে জানাল কাইলী। শূকরের মাংস, ক্যাঙ্গারম্নর মাংস, নানারকম সামুদ্রিক মাছ, ডেম_ ইত্যাদি দিয়ে বানানো চমৎকারসব খাবার পরিবেশিত হলো। ক্যাঙ্গারম্ন খাবার খুব শখ হয়েছিল আমার। পরিবেশনকারী ভদ্র মহিলার কাছে জানতে চাইলাম, ক্যাঙ্গারম্ন হালাল নাকি হারাম ? তিনি হাসতে হাসতে জানালেন যে সম্ভবত ক্যাঙ্গারম্ন হারাম। কারণ, মুসলমান কাউকে তিনি খেতে দেখেননি। অগত্যা আমার আর ক্যাঙ্গারম্ন খাওয়া হলো না।
একদিন বিকেলে পার্থ সিটি ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। আমরা দলবেঁধে দুটো বিলাসবহুল মিনিবাসে যাচ্ছি পার্থ। আমার পাশের সিটে আছে ব্রম্ননাই থেকে আসা লাবাও। আর সামনের সিটে আছে ফিলিপিন্সের সদা হাস্যোজ্জ্বল উইনী।
জম্পেস আড্ডা দিতে দিতে আমরা যাচ্ছি। আমাদের বাসে ড্রাইভার ছাড়া আর সবাই অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে আগত। আমি ইতোমধ্যে কিছুটা ঘোরাঘুরি করেছি বলে শহরের বেশ কিছু স্থাপনা চিনে ফেলেছি। বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি গাইডের দায়িত্ব পালন শুরম্ন করে দিলাম। লেডিস এ্যান্ড জেন্টেলম্যান, গুড আফটারনুন। ওয়েলকাম টু আওয়ার টু্যর টুয়ার্ডস পার্থ সিটি। ইটস এ বিউটিফুল সিটি এ্যান্ড ইউ লাইক ইট।
আমার গাইডগিরি দেখে সবাই হাসছে। প্রথমেই বর্ণনা দিলাম আমাদের ছেড়ে আসা হোটেল এসপস্নানেডের। রম্নমে রেখে দেয়া হোটেল বিষয়ক মুদ্রিত পুসত্মিকা থেকে অর্জিত জ্ঞান অবলীলায় আওড়ে গেলাম। এরমধ্যে ফ্রিম্যান্টাল প্রিজন এসে গেল। এবার শুরম্ন করলাম ঐতিহাসিক এ জেলখানা সম্পর্কে বক্তব্য। একদম তথ্য বহুল, ঝরঝরে। এটি পার হবার পর আর কিছু চিনি না এতে আর কী এসে যায়। রাসত্মার পাশের সাইনবোর্ড দেখে অনুমানে এসবের বর্ণনা দিয়ে গেলাম। সবাই আমার দুষ্টুিম বুঝতে পারলেও তারা তা এনজয় করল।
পার্থ শহরের বিভিন্ন স্থাপনা, সোয়ান নদীর সৌন্দর্য এবং সারি সারি উঁচু দালানের শহর প্রদর্শনের পর একটি মাঠের পাশে আমাদের গাড়ি থামল। উল্টোদিকের রাসত্মা দেখিয়ে ওরা বলল, এখানে অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা যেন পছন্দমতো খাবার খেয়ে সাড়ে ৯টার মধ্যে বাসের কাছে আসি।
আমরা দলবেঁধে খাদ্যের খোঁজে হাঁটছি, পছন্দমতো খাবার পাচ্ছি না। অনেকটা রাসত্মা যাওয়ার পর একটা ফুড কোর্টের দেখা মিলল। এখানে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের খাবার দিয়ে পসরা সাজিয়েছে দোকানিরা। ফুড কোর্টের শেষ প্রানত্মে একটি ভারতীয় খাদ্যের দোকান। আমি খুশি হয়ে ভাবলাম, এবার হয়ত কিছুটা পরিচিত খাবার পাওয়া যাবে। কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম, এর সেলস গার্লও ভারতীয়। আমি অত্যনত্ম খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আর ইউ ইন্ডিয়ান ? মেয়েটি সুন্দর করে হেসে জবাব দিল, নো স্যার। আই অ্যাম বাংলাদেশী।
খুশিতে আমরা আত্মহারা। আমি রীতিমতো লম্ফঝম্প শুরম্ন করে দিলাম। বললাম, ধুর মেয়ে, চার-পাঁচদিন ধরে পেট ভরে খেতে পাচ্ছি না, আর তুমি দোকান খুলে বসছ এতদূরে। মেয়েটিও অবাক। ওর নাম কার্জিন। পার্থ শহরে মোট ১৫৫ বাংলাদেশী থাকে, ও তাদের একজন। বাড়ি ঠাকুরগাঁও শহরে। কার্টিন ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ করছে মেয়েটি। আর পার্ট টাইম করছে এখানে। (চলবে)