মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৮ জুলাই ২০১১, ২৪ আষাঢ় ১৪১৮
ক্রুজ শিপে গ্রিক দ্বীপপুঞ্জে এক সপ্তাহ
নূরজাহান বোস
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আশ্চর্য_সেদিন খুব সকালে আমাদের জাহাজ নিউইয়র্কে নোঙ্গর করেছিল। সেদিন সব ঝড়, বৃষ্টি থেমে গিয়ে অপূর্ব এক সুর্যোজ্জ্বল দিন বেরিয়ে এলো। আমাদের মন ও সূর্যের আলোর মতোই ঝকঝক করে উঠল। যাক সে পুরনো কথা। এখনি আমাদের ডিনারে যাবার কথা। যাবার আগে স্নান সেরে একটু সেজে-গুজে, আমাদের নির্দিষ্ট টেবিলে গিয়ে বসলাম। টেবিলের অন্য অতিথিদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করলাম, কারণ ইচ্ছা করলে প্রতিদিন ডিনারে আমরা এখানেই খেতে পারি। আসলে এটাই ওদের পছন্দ। আমরা ইচ্ছা করলে অন্য টেবিলেও বসতে পারি যদি জায়গা থাকে। কি অর্ডার দিলাম এখন আর মনে নেই তবে আমরা দু'জনেই 'বেশি ভাজা' তৈলাক্ত খাবারের দিকে গেলাম না।
সারা দিনের ক্লানত্মিতে বিছানায় শোওয়া মাত্র ঘুম। সাতাশ তারিখ ঘুম ভেঙ্গে বারান্দায় গিয়ে চারদিকে তাকাতেই মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। আজ দুপুর বারোটার মধ্যে আমরা আমাদের প্রথম গ্রীক দ্বীপ আমাদের জাহাজ নোঙ্গর করবে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আবার যাত্রা। অঃযবহং ধহফ অপৎড়ঢ়ড়ঃরং-এর জন্য আমরা একটা ৪ ঘণ্টার টু্যর নিলাম। ঊনসত্তর ডলার করে জনপ্রতি। আমাদের টু্যর বাসে করে সিনাগগ এ্যাভিনিউ ধরে ড্রাইভ করে গ্রীসের সবচেয়ে বিখ্যাত অলিম্পিয়ান টেম্পল অব জুস, এই কারনথিয়ান স্টাইলের মন্দিরটি তৈরি করতে সাত শ' বছর লেগেছিল বলে কথিত আছে। পথে পথে দেখলাম ন্যাশনাল গার্ডেনস, ন্যাশনাল লাইব্রেরী, পার্লিয়ামেন্ট ভবন। এক সময় এটা রাজ প্রাসাদ ছিল। তারপর আরও দেখলাম ১৮৯৫ সালের তৈরি প্যানাথিনিয়ান স্টেডিয়াম (চধহধঃযবহরধহ ংঃধফরঁস) যেখানে ১৮৯৬ সালে সর্বপ্রথম আধুনিক অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে আমাদের নামতে দিয়েছিল। এরপর গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ পারথেনন ট্যাম্পল, যা দেবী এথেনাকে উৎসর্গ করেছিল। চারদিকে ভাঙ্গা পাহাড় ও পাথরের ওপর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হচ্ছে। শত শত টু্যরিস্ট এর মধ্যেই উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। অসম্ভব গরম। আমি কয়েক শ' ফুট উঠে ক্লানত্ম হয়ে একটা পাথরে বসে পড়লাম। নেলী আর একটু ওপরে উঠতে চেষ্টা করল। পরে সেও ক্লানত্ম হয়ে আমার কাছেই এলো। এই সময় আমরা আমাদের গ্রম্নপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। বেশ কিছুৰণ বসে অপেৰা করে নিচে নেমে আসি। আমরা কোন প্রকারেই আমাদের বাস মিস করতে চাই না। চারদিকে অসংখ্য টু্যরিস্টদের মধ্যে আমাদের গ্রম্নপকে চিনতে পারছিলাম না। একেবারে নিচে নেমে আসতেই দেখি অনেক বাংলা দেশী ছেলেরা ছাতা ও পানির বোতল বিক্রি করছে। আমাদের দেখে সকলে ছুটে এলো। পানির বোতল কিনলাম। পয়সা নেবে না ওরা ও বিশ্বাস করতে চায় না যে আমরা বাংলাদেশী। নেলীর একটা ক্যামেরা ছিল। ওদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলাম_ লজ্জায় রাজি হলো না। সারাৰণই চারদিকে তাকাচ্ছে পুলিশের ভয়ে। মনে পড়ল মামাত বোন মেরীর ছেলেটাও তো এই রকম কোন এক গ্রীক দ্বীপে পড়ে আছে। মামার ছেলে আছে রোমে। কে জানে ওরা কেমন আছে। ওরা এখানে বসে থাকতে থাকতেই আমাদের দলের সবাইকে পেলাম। সকলেই আইসক্রিম খেলাম। এখানে শপিং-এর জন্য কিছু সময় দিল। দুয়েকটা দোকানে ঘুরে হতাশ হলাম। সবই টু্যরিস্টদের জন্য নানা ধরনের সু্যভেনির। যার প্রায় বেশিরভাগ চীন অথবা ভারতের তৈরি। আমি তখন ভয়ানক ক্লানত্ম। বাসে এসে বসলাম।
ফিরতে পথে ড্রাইভার অনর্গল পথের নানা বিখ্যাত জিনিসের বর্ণনা দিচ্ছিল। আমি প্রাণভরে দেখছিলাম জলপাই গাছের অপূর্ব সুন্দর দেহ বলস্নবী। জলপাইয়ের ভারে ডালগুলো নুয়ে পড়েছে। বাতাসে কেমন এক মাদকতা ভরা সুগন্ধ। এ আমার মনের কল্পনাও হতে পারে। অদূরে আমাদের ঝঢ়ষধহফবৎ ড়ভ ঃযব ংবধ দেখা যাচ্ছে। আনন্দে মন-প্রাণ ভরে গেল। সারা রাত নিশ্ছিদ্র বিশ্রাম ও তৃপ্তিভরে খাওয়া। বাস আর কি চাই এই বয়সে। আগামীকাল আমাদের নিয়ে যাবে মিকোনোস দ্বীপে (সুড়শড়হড়ং) । সকাল সাতটায় শাওয়ার নিয়ে কাপড় পরে বাইরে বেরিয়ে দেখি আমাদের জাহাজ মিকোনোসে নোঙ্গর করে আছে। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে সারাদিনের জন্য তৈরি হয়ে ছোট বোটে আধঘণ্টায় তীরে নেমে এলাম। মিকোনোস মাত্র তেত্রিশ স্কোয়ার ফিট আয়তন, তার মানে গ্রীক দ্বীপপুঞ্জগুলোর মধ্যে সকলের চেয়ে ছোট। লোকসংখ্যা পাঁচ হাজার, কিন্তু প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ ভ্রমণকারী এই দ্বীপটিতে পদার্পণ করে। এর নাইট ক্লাব অসম্ভব সুন্দর সমুদ্র সৈকত, চমৎকার রেস্টুরেন্ট এবং এর ছোট ছোট অলিগলিতে নানারকম হাতের কাজের কাপড় চোপড় ও সু্যভেনির জাতীয় জিনিসপত্র প্রতিদিন এত ভ্রমণকারী দেশ-বিদেশ থেকে এখানে টেনে আনে।
আমরা দুজন নিজেরাই ঘুরেফিরে শহরটি দেখলাম। হোয়াইট ওয়াশ (সাদা রং করা চার্চ, সাবানের বাঙ্রে মতো বাড়িগুলো ও উইন্ডমিলগুলো সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে। একটু লৰ্য না করলে সহজে এই শহরের অলিগলিতে হারিয়ে যাওয়া সহজ। জলদসু্যদের হাত থেকে রৰার জন্যই এ ধরনের রাসত্মা-ঘাট। ভূমধ্যসাগরীয় প্রায় সব দ্বীপ বা শহরগুলোই এ ধরনের রাসত্মাঘাট। হারাবার ভয় নেই। কারণ ঘুরে ফিরে সুমদ্র পেয়ে যাবেই । আমরা পায়ে হেঁটে শহরের মাঝখানে এসে স্থানীয় বাসে চেপে একটি বীচে চলে এলাম। ঐ বাসে আমাদের জাহাজের অনেক তরম্নণ-তরম্নণী বীচে এলো। নেলী ও আমি বীচে গিয়ে একটু হাঁটলাম। তারপর একটি গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসে বিসত্মৃত নীল জলরাশি দেখলাম। আরও দেখলাম_উদ্যাম তারম্নণ্যের প্রাণ মাতানো উলস্নাস। কম বয়সী ছেলেমেয়েরা ঝাঁপিয়ে পড়লো সমুদ্রে। যতোটুকু পারা যায় ভোগ করবে ওরা। মন পড়ছিল আমার ও ঐ বয়সের কথা। বঙ্গোপসাগর পারের মেয়ে। সমুদ্র দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম। একদিকে আনন্দ আর একদিকে মনে পড়তো আমার ছোট বেলার কথা, কোথায় হাড়িয়ে গেল। মাঝে মাঝে বিষণ্নতায় মন ছেয়ে যেত। স্বদেশ সমুদ্র, জল ভালবাসা তো না, তবে বাধা দিত না। আমার পছন্দ মতোই প্রতিবছর কোন না কোন বীচে আমরা বেড়াতে যেতাম। বড় মেয়ে মিনি আমারই মতো সমুদ্র ও জল প্রেমিক। অনিদের বাবার মতো বীচে হেঁটে বা জলের দিকে তাকায়, বসে থাকতে ভালবাসতো। পিছনের অনেক কথাই মনে পড়ছে। পড়াই তো স্বাভাবিক। কয়েক ঘণ্টা পরে আমরা বাসে করে শহরে ফিরে এলাম। তখন বিকেল। চারদিকে ডিনার ও চায়ের ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টগুলোর সম্মুখে বাইরে সারি সারি টেবিল-চেয়ার, ন্যাপকিন ও কাঁটা চামক সাজাচ্ছে ওয়েটাররা। আমরা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে সেই ছোট নৌকায় আমাদের জন্য অপেৰা করা ংঢ়ষবহফড়ঁৎ ড়ভ ঃযব ংবধং-এ এসে স্নান করে চা খেয়ে নিজেদের ঘরে বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে নিলাম। এরপরে ডিনার ও নানা রকম আনন্দের আয়োজনে যোগ দিতে হবে। আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় দিন শেষ হলো।
পরের দিন আমাদের ভ্রমণ তালিকায় আছে সেই বিখ্যাত "ক্যাটাকোলোন" বা অলিম্পিয়া। যেখানে প্রাচীনকাল থেকে গ্রীকবাসী প্রতি চার বছর অনত্মর গ্রীক দেবতা জিউস (তবঁং) এর উদ্দেশ্যে খেলা ধরার অংশ নিত। পুরো এলাকাটা এখন ধ্বংশসত্মূ্তুপে পরিণত হয়েছে। তবে এর বিশালত্ব এখনও বিস্ময়কর। এই অলিম্পিয়া থেকেই বর্তমানের অলিম্পিক এর সৃষ্টি।
আমরা দু'জন জাহাজ থেকে নেমে ট্রেন স্টেশনে এসে অপেৰা করছিলাম পরবতর্ী ট্রেনের জন্য কিন্তু বিধি বাম। ট্রেনের চিহ্নও দেখলাম না। অনেকেই হতাশ হয়ে ট্যাঙ্ িভাড়া করে চলে যাচ্ছে। আমরা দু'জন মহিলা সাহস করছিলাম না এইভাবে অচেনা পরিবেশে ট্যাঙ্ িভাড়া করতে চারদিকে নজর করলাম। হঠাৎ দেখলাম দৰিণ আমেরিকা থেকে আগত একটি কমবয়সী দম্পতি ও আমাদের মতো ভাবছিল এই গনত্মব্যে যাবার জন্য। ওদের সঙ্গে কথা বলে আমরা চারজনে একটা ট্যাঙ্ িভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম তামিম পিয়ার উদ্দেশ্যে। চারজনে যাওয়াটা অনেক সসত্মায় ও নিরাপদ। প্রায় দুপুর। পর্যনত্ম রোদ। চারদিক আলোয় আলোয় ভরা। আমরা ঐ তরম্নণ দম্পতির সঙ্গে গল্প করতে করতে অলিম্পিয়াতে চলে এলাম। শত শত ভ্রমণকারী ট্যাঙ্,ি বাস ভাড়াতে এসে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরাও তাই করলাম। আরকোলজিস্টর মতে, খ্রীস্ট জন্মের সাত শ' ছিয়াত্তর বছর আগে এখানে প্রথম এই খেলা শুরম্ন হয়। পাঁচ দিনব্যাপী এই খেলাধুলার সারা গ্রীসের খেলোয়াড়রা এখানে এসে নানারকম প্রতিযোগিতায় যোগ দিত। প্রথম দিকে শুধু গ্রীসের পুরম্নষরা এতে যোগ দিতে পারে। পরে রোমানদেরও অংশ নিতে দিত। এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে দৌড়ানো, কুসত্মি, ঘোরদৌড়, লাফ দেয়া। ডিসকাস নিৰেপ এবং আরও নানারকম খেলা এর অংশ ছিল। (চলবে)