মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৪, ১৭ অগ্রহায়ন ১৪২১
শিশুর বেড়ে ওঠায় বাবা-মার অবদান
শামিমা আক্তার রিমা
জন্মের পর ধীরে ধীরে মা এবং বাবা বাচ্চার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। সব না জানা প্রশ্নের উত্তর, সমস্যার সমাধান বা উৎসাহে ঘাটতি দেখা দিলে সন্তান ছুটে আসে মা-বাবার কাছেই। ফলে সন্তানকে সঠিকভাবে বড় করে তোলার জন্য প্রথমে তৈরি হতে হবে বড়দেরই। মা-বাবার মধ্যে পজিটিভ রোল মডেল খুঁজে পেলে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়বোধ গড়ে ওঠে সহজেই। এত অবধি তো শুনতে বেশ সহজই লাগল কিন্তু সন্তানের সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আপনি কতটা কনফিডেন্ট এবং স্বচ্ছন্দ? সব সন্দেহ, দ্বিধা কাটাবার জন্য রইল কয়েকটি টিপস :
* শত ব্যস্ততার মধ্যেও বাচ্চার সঙ্গে কথা বলুন। বাচ্চারা বাবা-মায়ের গলার স্বর শুনলে আশ্বস্ত বোধ করে। বাড়িতে থাকার সময় রান্না করতে করতে বা টিভি দেখার সময় ওর সঙ্গে গল্প করুন। আপনি কী করছেন, কেন করছেন ওকে বুঝিয়ে বলুন। ও খুব ছোট হলেও ওর সাহায্য চান। কাজের শেষে বড়দের যেম করে ঞযধহশ ুড়ঁ, বলেন ওকেও সেভাবে কলুন। অফিসে কাজ করতে করতেও বাচ্চার সঙ্গে ৫ মিনিট গল্প করতে পারেন। শুধু পড়াশোনা, বা সেফটি সম্পর্কে ইন্সট্রাকশন না দিয়ে ওর স্কুল, টিচার বা বন্ধুদের নিয়ে একটু গল্প করুন। নিজের অফিসের কথাও বলুন। এইভাবে আপনি ওর মনের কাছাকাছি পৌঁছতে পারবেন। ফলে আপনাকে বোঝা এবং আপনার ব্যবহার অনুসরণ করা ওর পক্ষে অনেক সহজ হবে।
* দাঁত মাজা, ব্যাগ গোছানো, জামা-কাপড় ভাঁজ করে রাখার মতো ছোট ছোট কাজ একসঙ্গে করুন। কাজগুলো একটু মজার করে তুললে বাচ্চাও উৎসাহ পাবে। মিউজিকের তালে তালে দু’বেলা দাঁত মাজা বা কে কত ভাল জামা ভাঁজ করার প্রতিযোগিতা শুরু করে দিল দেখবেন বাচ্চারা নিজেদের অপছন্দের কাজও হাসিমুখে করে ফেলছে। এইভাবেই বাচ্চার মধ্যে সুঅভ্যেস গড়ে তুলুন।
নিজের মন ও শরীরের যত্ন নিন। হেলদি ফুড খাওয়া এড়িয়ে চলা, নিয়মিত হাঁটতে যাওয়া, বই পড়া, শিক্ষামূলক ব্যাপারে উৎসাহ দেখালে, বাচ্চাও আপনার দেখাদেখি এই সব ব্যাপারে কৌতূহলী হবে। বাইরে বেড়াতে গেলে চেষ্টা করুন সফট ড্রিঙ্কের বদলে ফ্রেশ ফ্রুট জুস খেতে। অবসরে টিভি না দেখে ওয়ার্ড মেকিং বা ম্যাথম্যাটিক পাজল সলভ করুন দু’জনে মিলে। ছুটির দিনে সবাই মিলে ছবির প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছোটদের নাটক বা সিনেমা দেখতে যেতে পারেন। এই ছোট ছোট আচরণের মধ্য দিয়েই ওর সুঅভ্যেস এবং সুন্দর রুচি গড়ে উঠবে।
* ছোট থেকেই সন্তানের একটা নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। কথায় কথায় ওর সমবয়সীদের সঙ্গে তুলনা না করে ওকে নিজের মতো বেড়ে উঠতে দিন। পড়াশোনা, খেলাধুলা, হবি সব ব্যাপারেই উৎসাহ দিন। কিন্তু খেয়াল রাখুন ও কোনটা সবচেয়ে বেশি এনজয় করে নিজের পুরনো ধ্যান ধারণা বদলে ফেলে সন্তানকে এর নিজস্বতা গড়ে তুলতে সাহায্য করাই সুস্থ পেরেন্টিংয়ের প্রথম ধাপ। জীবনের নানা জটিলতার কারণে কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল বড়দের পক্ষেও বুঝে ওঠা দুষ্কর। ছোটরা তো কোন ছাড় ডিসিশন মেকিংয়ের সময় দুর্বল ভ্যালু সিস্টেম সব সময়ই ছোটদের ভুল দিকেই ঠেলে দেয়। ছোটবেলা থেকেই ভাল এবং মন্দের বোধ সন্তানের মধ্যে গেঁথে দিন। এর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি অবশ্য নিজেই নিজের শেখানো কথাগুলো মোটামুটি বজায় রাখা, নিজের সাধ্যের মধ্যে খরচ করা ইত্যাদি শিক্ষা আপনি মেনে চললে বাচ্চাও আপনার কথা শুনে চলতে দ্বিধা করবে না। পেরেন্টিংয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বাচ্চাকে সঠিক ডিসিপ্লিন শেখানো। তবে শাসন করা মানেই কিন্তু, শুধুমাত্র বকা বা মারা নয় বা ঠিক ভুল শেখানো নয়।
রাদিয়ার বয়স এখন সবেমাত্র ৫ বছর, তখন থেকেই ওর বাবা-মা ওকে নিয়ে রীতিমতো নাজেহাল। আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা শুরু করেছে? মোটামুটি সব বাবা মায়েরাই এই প্রশ্নের উত্তরে নাই বলবেন আসলে বাচ্চাকে মেরে, বকে বা অন্য কোন রকম শাস্তি দিয়ে ভাল মন্দ শেখানো যায় না। বাচ্চার কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয় জানানোই যথেষ্ট নয়। বাচ্চাকে ডিসিপ্লিনড করতে হলে প্রথমে তার টেম্পারামেন্ট বুঝতে হবে। সব বাচ্চাকে একই উপায়ে শাসন করা যায় না। আর সব থেকে বড় কথা হলো আপনি যদি বাচ্চাকে শুধুই শাসন করতে যান, বাচ্চার কিন্তু আপনার প্রতি নেগেটিভ মনোভাব তৈরি হয়ে যেতে পারে। শাসন নিশ্চয় করবেন তবে তার থেকেও জরুরী হলো বাচ্চাকে আদর করা। সে যেন কখনও মনে না করে যে, বাবা-মা তাকে ভালোবাসেন না। তবে মনে রাখবেন, কোন কিছু অতিরিক্ত ভাল নয়, না আদর, না শাসন। বাচ্চাকে ডিসিপ্লিনড করার মূল মন্ত্রই হলো আদর এবং শাসনের সঠিক ব্যালেন্স। বাচ্চার মধ্যে ভাল অভ্যেস গড়ে তোলার জন্য ডিসিপ্লিনড করে তোলার জন্য মৌখিক নির্দেশের থেকেও বেশি জরুরী বড়দের নিজেদের আচরণ। বাচ্চারা সাধারণত বাড়ির বড়দেন দেখেই কিছু শেখে। সে ক্ষেত্রে বাচ্চাদের কিছু শেখানোর আগে দেখে নিতে হবে যে- নিজেদের ব্যবহারে কোন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন কিনা। ছোট ছোট আচরণ যেমন সময়ের কাজ সময়ে করা, জামাকাপড় ছেড়ে ভাঁজ করে রাখা, ঘর থেকে বেরানোর আগে আলো, পাখা বন্ধ করা, খাবার নষ্ট না করা ইত্যাদি বাচ্চার সুঅভ্যেস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। বাচ্চাকে ডিসিপ্লিন শেখানোর বা শাসন করার কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতি হয় না। আপনাকে প্রথমে বাচ্চার সঙ্গ্ েবন্ধুর মতো মিশতে হবে। ওর সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। তবেই আপনি বাচ্চাকে পুরোপুরি বুঝতে পারবেন। আসর কথাটা হলো, বাচ্চাকে ভালমন্দ শেখানো। বাচ্চাকে তার দায়িত্ব বুঝতে দিন। অনেক সময় এরকম হয় যে, আপনি রেগে গিয়ে হয়ত বাচ্চাকে মেরে দেবেন বা নিজের ঘরে যেতে বলবেন। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, এতে বাচ্চার কি কোন উপকার হবে। পরিবর্তে আপনি যদি বাচ্চাকে আপনার কাজে সাহায্য করতে বলেন তা হলে বাচ্চার প্রতি মনোযোগ দেয়াও হবে আর আপনার কাজ করতেও সুবিধে হবে। বাচ্চাকে বাড়ির বিভিন্ন কাজকর্মে ইনভলব করুন। ওর মতামত নিন। এতে ও নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে এবং আপনার কথা শুনতে আপত্তি করবে না। বাচ্চাকে শাসন করার সময় মোটিভেট করা খুব জরুরী। যেমন ধরুন আপনার বাচ্চা হোমওয়ার্ক করতে চাইছে না। আপনি হয়ত অনেক বুঝিয়েও ওর সঙ্গে পেরে উঠছেন না। না বকে আপনি বলতেই পারেন, যে হোমওয়ার্ক না করলে ও কার্টুন দেখতে পারবে না বা বাইরে খেলতে যেতে পারবে না। ওর কাছে এটা মোটিভেশনের মতো কাজ করবে। দেখবেন এতে প্রথম দিকে কাজ না হলেও পরে ও নিজেই হোমওয়ার্ক করার জন্যে আগ্রহ দেখাবে। বাচ্চাকে এই সময় উৎসাহ দিন। আপনি হোমাওয়ার্ক শুরু করতে সাহায্য করুন। মাঝে মধ্যে গিয়ে দেখুন বাচ্চার কোন অসুবিধে হচ্ছে কিনা। ও যা কাজ করছে তার প্রশংসা করুন। এইভাবে ওর নিজের কাজের প্রতি সচেতনতা গড়ে তুলুন। বাচ্চারা অনেক সময় এমন সব কথা বলে ফেলে, যা একদমই বলা উচিত নয়। আপনার খারাপ লাগা স্বাভাবিক কিন্তু এই সময় বকে কোও কাজ হবে না। শাসন করার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাচ্চার নেগেটিভ ব্যবহারকে উপেক্ষা করা। আপনি হয়ত ওর জন্য চকোলেট ওকে পুরোটাই দিতে হবে। আপনি অশান্তি এড়াতে হয়ত ওর জেদ মেনেও নেবেন। এতে কিন্তু আপনার বাচ্চারই ক্ষতি হবে। ও কোন দিনও কিছু শেয়ার করতে শিখবে না। বাচ্চা হয়ত চিৎকার করবে হাত-পা ছুড়বে, প্রবল কান্নাকাটি জুড়ে দেবে। একদম বিচলিত হবেন ন্ াআপনি যদি মনোযোগ দেন, তা হলে কিন্তু ও উৎসাহ পেয়ে যাবে। বাচ্চার দিকে না তাকিয়ে নিজের কাজকর্মে মন দিন। বাচ্চা যদি দেখে যে আপনি ওর ব্যবহারে কোনও তাপ-উত্তাপ দেখাচ্ছেন না, তা হলে নিজেই থেমে যাবে এবং পরবর্তীকালে এই রকম ব্যবহার করার আগে অন্তত ২ বার ভাববে। ঠিক তেমনই বাচ্চা যদি একেবারে আপনার কথা শুনে নেয়, কোন আপত্তি না করে, তাহলে পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট দিন। তার মানে এই নয় যে, আপনাকে বাচ্চাকে কোন উপহার দিতে হবে। ১০ মিনিট বেশি টিভি দেখার অনুমতি দিতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন বাচ্চা কোন কিছুর লোভে পড়ে যেন আপনার কথা না শোনে। তা হলে কিন্তু এটা ওর অভ্যেসে পরিণত হয়ে যাবে। এরকম হলে বাচ্চা হয়ত ধরে নেবে যে, আপনি ওর কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করেন না এবং ভবিষ্যতেও আপনার সঙ্গে কোন কথা শেয়ার করতে চাইবে না। মনে রাখুন, যে সমালোচনা কাউকে সাহায্যে করেন না। বাচ্চাকে কখনওই বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এতে বাচ্চা অসহায় মনে করে নিজেকে। সেক্ষেত্রে কোন কাজই বাচ্চা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতে পারবে না। বদলে বাচ্চার অ্যাচিভমেন্টকে স্বীকৃতি দিন। তাদের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করুন। নিদির্ষ্ট লিমিট সেট করুন তবে সে খানেই শেষ নয়। বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলুন। কেন এই নিয়মগুলো মানা প্রয়োজন। না হলে নিয়ম বানানোর কোন মানেই হয় না। বাচ্চাকে নিয়ম মানতে বাধ্য করবেন না । ওকে নিজেকে নিয়মের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে দিন। না হলে ও ভিতর থেকে নিয়মগুলো মানতে পারবে না আর বাচ্চার নিজের উন্নতির জন্য নিয়মগুরোকে আত্মস্থ করা খুব জরুরী। ডিসিপ্লিনের ধরন নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে মতবিরোধ থাকলে চলবে না। বাবা যদি একরম ভাবে এবং মা যদি আরেকরকমভাবে শাসন করতে চান তা হলে বাচ্চা কনফিউশড হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ওর ওপর কোন ভাল প্রভাব পড়বে না।
ছবি : আজিম এলাহি, মডেল : পৃথা ও নাফি