মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১১, ২৮ অগ্রহায়ন ১৪১৮
মুক্তিযোদ্ধাদের গানের মাধ্যমে উজ্জীবিত করতাম ॥ ডালিয়া নওশিন
আ লা প ন
কার অনুপ্রেরণায় আপনার কণ্ঠ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন?
আমার বাবা ও মায়ের ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণায় এমন সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পরিবারের সবাই অংশগ্রহণ করেছিল। আমার ভাই তানভীর মাজহার তান্না সরাসরি অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করে। আমি আমার কণ্ঠ নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গানের মাধ্যমে উজ্জীবিত করতাম। মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবা মাজহারম্নল ইসলামের অবদানও অনেক।
কিভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানের দলের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
আমি ছায়ানটে গান শিখতাম। আমার বয়স তখন ১২ বছর। গান সম্পর্কে ভাল ধারণা তখনও হয়নি। ১৯৭১ সালের মে মাসে আগরতলায় ২ রাত থেকে কলকাতায় পেঁৗছাই। বাবার ইচ্ছাতে কলকাতার ১৪৪ নম্বর লেনিন সরণীর ধর্মতলায় 'বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা' নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। এই সংগঠনের কর্ণধার ছিলেন সাহিত্যিক দ্বীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে গিয়ে দেখলাম শ্রদ্ধেয় সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনসহ আরও অনেক গুণীজনকে। আমার ভেতর তখন অনেক সাহস সঞ্চারিত হয়। সেখান থেকে আমরা গান রেকর্ড করতাম, সেগুলো স্টুলের মাধ্যমে পাঠানো হতো।
আপনাদের সঙ্গে আর কারা ছিলেন?
সবার নাম এই মুহূর্তে বলা কঠিন। শিল্পী শাহীন সামাদ, রফিকুল আলম, সারওয়ার জাহান, কল্যাণী ঘোষ, উমা খান, প্রবাল চৌধুরী, মিলিয়া আলীসহ আরও অনেকে। অভিনেতা হাসান ইমামের প্রচেষ্টায় 'রূপানত্মরের গান' নামে একটা স্ক্রিপ্ট হয়েছিল। আমার মনে আছে আমাদের মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন মুসত্মাফা মনোয়ার।
* কখনো কি কোন ভয়াবহ মুহূর্তের সম্মুখীন হয়েছেন?
সেই সময়ের প্রতিটা মুহূর্তই খুব ভয়াবহ ছিল। আমাদের চারদিকে সব সময়ে গুলির আওয়াজ হতো। আমরা গাড়িতে করে গানের দল নিয়ে প্রত্যনত্ম ও মুক্তাঞ্চলে চলে যেতাম, পরে আমরা জানতে পারতাম যেখানে গিয়েছিলাম পাশেই পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী ছিল এবং আমাদের আশপাশে অনেক মাইন পাতা ছিল। কোন কোন সময়ে আমাদের জানতে দেয়া হতো না আমরা এখন কোথায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গভীরভাবে অনুভব করতে না পারলেও মনের মধ্যে এক অদম্য সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল। যখন বিভিন্ন ক্যাম্পে যেতাম মুক্তিযোদ্ধাদের গানের মাধ্যমে সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগাতে, তখন বারো তেরো বছরের মুক্তিযোদ্ধারা এসে বলত গান করেন। সে সময়ে রক্ত যেন গরম হয়ে যেত। দৃঢ়প্রত্যয় ছিল, আমাদের বিজয় ছিনিয়ে আনতেই হবে।
সে সময়ে আপনারা কোন ধরনের গান বেশি করতেন?
সেময়ে সাধারণত রবীন্দ্রনাথ, নজরম্নল, সলীল চৌধুরীসহ অনেকের গান বেশি করা হতো। পরে আরও অনেক গান তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল। এর মধ্যে 'কারার ওই লৌহ কপাট', 'জয় বাংলা বাংলার জয়', 'জনতার সংগ্রাম চলবেই', 'তারাই দেশের সবুজ ধানের শীষে', 'সালাম সালাম হাজার সালাম', 'একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি' সহ অনেক গান করা হতো। তবে বেশিরভাগ গান কোরাস পরিবেশিত হতো।
বিজয়ের এই মাসে আপনার মনের অভিব্যক্তি কি?
অনেক গভীরের ব্যাপার এটা। এর মধ্যে আনন্দের অংশটুকুর চেয়ে বর্তমান প্রেৰাপটে কষ্টের ব্যাপার ও কম নয়। এর জন্য আমরা যারা অগ্রজ তারাই দায়ী বেশি। এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজ চলিস্নশ বছর পরেও সঠিকভাবে মূল্যায়ন হলো না। সঠিক ইতিহাসকে করা হয়েছে বিকৃত। আমরা যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যসত্ম। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছি এবং হচ্ছি। এর কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এদের ভ্রানত্ম কিছু ধারণা জন্মাচ্ছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তাদের ব্যর্থতাই বেশি দায়ী।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা সঙ্গীতে কতটুকু নিবেদিত বলে আপনি মনে করেন?
শিল্পীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এদের কণ্ঠ খুব ভাল। কিন্তু গানকে হৃদয়ে ধারণ করার ৰমতা কম। এদের এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গানকে কি এরা আসলে শ্রদ্ধা দিতে পারছে? এ প্রশ্নটা বার বার আমাকে পীড়া দেয়। কেন এরা সঙ্গীতের সুন্দর ৰেত্র গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলা সঙ্গীতের মান যে খুব উপরে উঠে এসেছে এটা বলতে পারছি না।