মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
আরব বসন্ত ॥ বিপ্লব না বিদ্রোহ
মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তল্লাটজুড়ে চলমান আরব বসন্তের শুরু থেকে একটা বিতর্ক চলছে সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে। তা হলো এই সমাজিক আন্দোলনকে কি বিদ্রোহ বলা যাবে, নাকি বিপ্লব। ইতোমধ্যে গণআন্দোলনের উত্তাল জোয়ারে তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়ায় উৎখাত হয়েছে স্বৈরাচারী শাসকরা। সিরিয়ার সঙ্কট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। উপসাগরের ছোট দেশগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা চলছে। এ অবস্থায় চলমান আরব বসন্তকে কি বলে আখ্যায়িত করা যাবে, তা নিয়ে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিপ্লব হলো ছোটখাট পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলন, এর স্থায়িত্বকাল অল্প এবং ফল বয়ে আনে সীমিত। অন্যদিকে বিপ্লব হলো বৃহত্তর পরিসরের সামাজিক গণআন্দোলন। এটা এমন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় যা প্রচলিত সমাজ বাস্তবতায় একটা মৌলিক পরিবর্তন বা সংস্কার নিয়ে আসে। তবে বিদ্রোহ ও বিপ্লব দুটো ক্ষেত্রেই সহিংসতা বা উগ্র বলপ্রয়োগের ব্যাপারটা কমবেশি জড়িত থাকে।
এই আলোকে এখন আরব দেশগুলোর বসন্ত আন্দোলনকে দেখা যাক। বিশেষ করে দৃষ্টিনিক্ষেপ করা যাক তিউনিয়া, মিসর ও লিবিয়ায়- যেখানে কিছু না কিছু হলেও পরিবর্তন এসেছে। যেমন সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে; স্বৈরাচারী শাসনের বিদায় ঘটেছে এবং সে জায়গায় এসেছে বা আসার পথে আছে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিউনিসিয়া ও মিসরে ক্ষমতায় এসেছে ইসলামপন্থী মৌলবাদী দল; যাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শরিয়তী সমাজ কায়েম।
তিউনিসিয়ায় ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সবজি বিক্রেতার শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর দু’সপ্তাহ পর মিসর গণবিদ্রোহে প্রকম্পিত হয়। সেখানে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন শুরু হয়েছিল অন্ন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের সেøাগান তুলে। তবে কালক্রমে এর সঙ্গে সব ধরনের ঐতিহাসিক, আদর্শিক ও ধর্মীয় উপাদান এসে যুক্ত হয়েছিল। একই ব্যাপার ঘটে তিউনিসিয়ায়। অচিরেই এই গণবিদ্রোহের জোয়ার গোটা আরব জাহানে ছড়িয়ে পড়ে। লিবিয়ায় গণঅভ্যুত্থানে ন্যাটো সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সিরিয়ায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে শেষের দুটো দেশে তিউনিসিয়া ও লিবিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।
অর্থাৎ আরব বসন্ত এসব দেশে অভিন্ন চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারেনি। কেউ এর মধ্যে নব্য সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি খুঁজে পেয়েছেন; কেউ পেয়েছেন প্যান-আরব ও প্যান-ইসলামী ভাবধারার উত্থান। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শিবিরে বিভক্ত হয়েছে আরব বসন্ত। আরব দেশগুলো যে যার পথে অগ্রসর হয়েছে। কেউ বিশেষ এক ধরনের গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। কেউ বেছে নিয়েছে অন্য ধরনের গণতন্ত্রের পথ। আবার অন্যরা সবাই সবার বিরুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যুদ্ধ হিসাবে দেখেছে একে। এমনও হয়েছে যে, আরব বসন্ত আঞ্চলিক ব্যাপারে নাক গলানোর ও বৈদেশিক হস্তক্ষেপের আরব মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং বিপ্লবের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে আরব বসন্ত পুরনো ব্যবস্থায় নতুন কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। অতীতের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছেদ ঘটাতে পারেনি। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, তিউনিসিয়া ও মিসরে সত্যিকারের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এই দু’দেশে শাসকদের উৎখাত করা হয়েছে বটে। কিন্তু শাসন বা সমাজ ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে আন্দোলনকারীরা যেসব সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল সেগুলো কোথাও চোখে পড়ছে না। সহিংসতা ব্যবহারের ব্যাপারে তিউনিসিয়ায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল কিন্তু মিসরের মতো অত হিংসাশ্রয়ী ছিল না। মিসরের সবকিছু বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত। লিবিয়ার পরিস্থিতি প্রথমদিকে মিসরের মতো ছিল। পরে বদলে যায়। গাদ্দাফি ক্ষমতা ছাড়েননি বরং বিক্ষোভ দমনে হিংসাত্মক পথে দমন অভিযান শুরু করেন এবং দেশে প্রচ- গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। অর্থাৎ লিবিয়ায় সামাজিক আন্দোলন ও সহিংসতা দুটোই ঘটেছে। বাহরাইনেও ব্যাপক বিক্ষোভ-আন্দোলন হয়েছে। সিরিয়ায় তো রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে।
কিন্তু কোথাও শক্তিশালী আদর্শ ও শ্রেণীচেতনা আন্দোলনের চালিকাশক্তি হতে পারেনি। সবখানেই জনগণ শাসকদের বিশেষত স্বৈরাচারী শাসক ও তার সরকারের বিরুদ্ধে লড়েছে- রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সমাজ কাঠামোর বিরুদ্ধে নয়। সব জায়গায় প্রচলিত ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রয়ে গেছে। এর গায়ে সামান্যতম আঁচড় লাগেনি।
সুতরাং আরব বসন্ত বিপ্লব নয়, কয়েকদফা গণবিদ্রোহ মাত্র। আরব বসন্ত একটা জাগরণের নাম। সেই জাগরণ চেতনার রাজ্যে। এটাই আরব বসন্তের এক মস্ত ইতিবাচক দিক। সেই চেতনা রাজনীতিগতভাবে যত শাণিত হবে এবং সুগঠিত রূপ নেবে ততই তা বিপ্লবের সম্ভাবনায় অগ্নিগর্ভ হবে।