মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
সন্ত্রাসের হিংস্রতায় ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তান
এক আত্মঘাতী বিনাশের পথে চলেছে পাকিস্তান। একদিকে তালেবানী সন্ত্রাস, অন্যদিকে শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক হত্যাকা-, গোষ্ঠীগত সহিংসতা, লণ্ড ভণ্ড অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন স্ফীতি, জ্বালানি সঙ্কট- সবকিছু মিলে চারদিক থেকে এক নিকষ কালো অন্ধকার গ্রাস করতে চলেছে দেশটিকে। বোমাবাজি আর রক্তক্ষয়ী হানাহানিতে পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র করাচীর জীবনযাত্রা স্থবির। সর্বশেষ সহিংসতায় সেখানকার শিয়া-অধ্যুষিত এলাকায় গাড়িবোমা বিস্ফোরণে ৪৫ জন নিহত হয়েছে।
পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত সহিংসতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সহিংসতা শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে হলেও সুন্নিদের উপশাখা বেরেলভী ও দেওবন্দীদের মধ্যেও বাড়ছে। শিয়া-সুন্নি সংঘাত যেরূপ ঘন ঘন হচ্ছে এবং এর নিষ্ঠুরতা যেভাবে বাড়ছে তাতে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে একটি গবেষণাপত্রে মন্তব্য করা হয়েছে। ইরানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর দেশ পাকিস্তান। এই সংঘাত সৌদি আরব ও ইরানকেও এক বৃহত্তর আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে টেনে আনতে পারে।
বর্তমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নতুন করে বিস্ফোরণের কারণ হচ্ছে ২০০১-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে পাকিস্তানী তালেবানদের উত্থান এবং লস্কর-ই-জাঙ্গভির মতো জঙ্গী সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক। এর পরিণতিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে এবং উত্তরোত্তর এর টার্গেট হচ্ছে বেলুচিস্তানের সংখ্যালঘু হাজারা এবং করাচীর শিয়ারা। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিয়েছে সরকারের নানা ব্যর্থতার কারণে। সরকার জঙ্গী গ্রুপগুলোকে দমন করতে, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হিংসার বিষবাষ্প ছড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে, বিচার ব্যবস্থা উন্নত করে তুলতে এবং মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটেছে। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটেছে যে, পাকিস্তানের নাজুক নিরাপত্তা আরও বেশি বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের রাজনীতিও আজ সাম্প্রদায়িক লাইনে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক বিভাজনটা এমন যে, সহিংসতার যৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। সাম্প্রদায়িক দলগুলো এমন মনগড়াভাবে ধর্মীয় ব্যাখ্যা হাজির করে যে, একই ধর্মের ভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা সমর্থিত হয়। ইতোমধ্যে তা করাচী, লাহোর, কোয়েটা, গিলগিট, ডেরাইসমাইল খানের রাজপথে ঘোষিত হতে দেখা গেছে।
এদিকে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের উপজাতীয় এলাকার তালেবানদের দিক থেকে শান্তি আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রদর্শিত হলেও বাস্তবে সে আলোচনা কয়েক বছরের সংঘাত অবসানের কতটুকু সহায়ক হবে সে ব্যাপারে সন্দিহান পর্যবেক্ষক মহল। গত ১২ বছরে ৩০ হাজার বেসামরিক ব্যক্তি ও ৪ হাজার সৈন্য পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। এসব হামলার অধিকাংশই ছিল তালেবানদের। নিহতদের স্বজনরা এবং আহতদের অনেকেই এই শান্তি আলোচনার সম্ভাবনায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তালেবানী বোমা হামলায় একটি পা হারিয়েও প্রাণে বেঁচে যাওয়া ১৪ বছরের কিশোর হযরতউল্লাহ খানকে তাই সক্রোধে বলতে শোনা গেছে, ওদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা উচিত। ওরা আমাদের শরীরের মাংস নিয়ে টুকরে টুকরো করে কাটছে। পেশোয়ার, লাহোর, করাচী, কোয়েটা ও উপজাতীয় এলাকায় তালেবানী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এই শান্তি আলোচনার ব্যাপারে একই রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা গেছে।
ওদিকে জমিয়তে উলেমায়ে ইসলাম (এফ) আহূত সর্বদলীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো পাকিস্তানী তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার জন্য গ্রান্ড উপজাতীয় জিরগাকে প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারে একমত হয়েছে। তথাপি তালেবানরা সত্যি সত্যি শান্তি চায় কিনা, নাকি তারা নতুন করে সংগঠিত হবার জন্য এভাবে সময় নিচ্ছে সে ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দিহান। তাছাড়া পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এমন আলোচনার সমর্থন করে কিনা সেটাও পরিষ্কার নয়।
চলমান ডেস্ক