মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
কেনিয়া আজ কোন্ পথে
গত ৪ মার্চ আফ্রিকান রাষ্ট্র কেনিয়ায় নির্বাচন হয়েছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট, সিনেটর, কাউন্টি গবর্নর এবং ২৯০টি নির্বাচনী এলাকার পার্লামেন্ট সদস্যকে বেছে নেয়া হয়েছে। নয়া সংবিধানের অধীনে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত এটাই প্রথম নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে দেশটি নতুন প্রজন্মের নেতাদের নির্বাচিত করল। সর্বশেষ ভোট গণনা অনুযায়ী উপপ্রধানমন্ত্রী উহুরু কেনিয়াত্তা দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
কেনিয়ায় নতুন ‘প্রজন্মের নেতা’ নির্বাচন কথাটা এ জন্য বলা হলো যে, এই প্রার্থীদের কারোরই উপনিবেশবাদ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোন অভিজ্ঞতা নেই। এমন নেতৃবৃন্দই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশ চালাবে। তবে এতে কিছু ঝুঁকিও আছে। ঔপনিবেশিক শাসনের জোয়াল কাকে বলে এবং সাম্রাজ্যবাদ সূক্ষ্ম ফাঁদ পেতে কিভাবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে সেই বিষয়গুলো নয়া নেতৃবৃন্দ তেমন আমলে নাও নিতে পারেন এবং সে কারণেই এর পরিণতি হতে পারে বিপর্যয়কর।
বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মওয়াই কিবাকি হচ্ছেন সেই প্রজন্মের শেষ মানুষটি যারা দেশের স্বাধীনতা এনেছিলেন এবং যাদের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রাম নিহায়ত সেøাগান ছিল না, তার চেয়ে বেশি কিছু ছিল। তাঁরা রাজপথে রক্ত ঝরতে দেখেছেন। ব্যাপক হারে গ্রেফতার হতে দেখেছেন, নির্বিচার হত্যাকা- দেখেছেন। ফার্স্টলেডি কিবাকি নিজেও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। নিজেদের যা-ই সীমাবদ্ধতা থাক না কেন এখনও তাঁরা কেনিয়ার সাধারণ মানুষের বীরত্বপূর্ণ কর্মকা- ও আত্মত্যাগের স্মৃতি ধারণ করে আছেন। তাঁরা মর্মে মর্মে জানেন যে, জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্যই কেনিয়ার স্বাধীনতা সম্ভব করে তুলেছিল।
নতুন প্রজন্মের নেতারা ঔপনিবেশিক শাসনের দুঃসহ স্মৃতির দ্বারা ভারাক্রান্ত নন। প্রতিরোধ-যুদ্ধের বিজয়ানন্দও তাদের রোমাঞ্চিত করে না। এর ফলে তারা পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিতে পারেন; তবে সেই সঙ্গে ঝুঁকিও কিছুমাত্র কম নয়। কারণ তারা সহজেই পাশ্চাত্যের কর্পোরেট জগতের ফাঁদে পা দিতে পারেন। মনে রাখা দরকার কেনিয়া, এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতে তেল উৎপাদন করার পর্যায়ে এসেছে এবং পাশ্চাত্যের তেল কোম্পানিগুলো এই ব্যবসায়ে ভাগ বসানোর জন্য লাইন ধরে আছে।
সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করলেও কেনিয়ার সমাজে হানাহানি ও সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েছে। এর একটা বড় কারণ হলো, সমস্যা মোকাবিলার বাহন হিসাবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকশিত হতে দেয়া হয়নি বা বিকশিত হয়নি। ফলে সমাজে উত্তেজনা বা টানাপোড়েন নিরসন হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। সামাজিক উত্তেজনার প্রকটতম প্রতিফলন হয় নির্বাচনের সময়। তখন সহিংসতায় বহুলোক মারা যায়। দৃষ্টান্ত হিসেবে ২০০৭ সালের নির্বাচনী সহিংসতার কথা বলা যেতে পারে। আজ যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন সেই উহুরু কেনিয়াত্তার নামে হেগের আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে মামলা আছে যে, ২০০৭ সালের নির্বাচনী দাঙ্গায় সহস্রাধিক লোকের মৃত্যুর জন্য তিনিও কম দায়ী নন।
কেনিয়ার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার জন্য রাজনৈতিক শ্রেণীই দায়ী। এখানে সুষ্ঠুভিত্তিক কোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটেনি। যেগুলো আছে সেগুলো সবই কাগুজে রাজনৈতিক দল- দল না বলে এগুলোকে অঞ্চলভিত্তিক মাফিয়া গোষ্ঠীই বলা যেতে পারে, যেগুলো গডফাদারের অধীনে চলে। কেনিয়া এদের কাছে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। পাশ্চাত্যের কর্পোরেট জগতের ঘুষ সংস্কৃতির তারা যে সহজ শিকার হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

চলমান ডেস্ক