মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বুধবার, ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৯ ফাল্গুন ১৪১৯
অবিচারের বিরুদ্ধে আজীবন যাঁর সংগ্রাম ছিল আপোসহীন
এনামুল হক
‘রাজপথ দখল’ বিক্ষোভ-আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন ধারণা। এই ধারণার উৎপত্তি ও প্রয়োগ প্রথম হয় স্পেনের মাদ্রিদে ২০১০ সালে। অচিরেই সেই আন্দোলন মাদ্রিদ থেকে সিডনি, জেরুজালেম থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াল স্ট্রিট দখলের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রায় এক হাজার নগরী ও ৮২টি দেশে এমন আন্দোলন গড়ে ওঠে। অনেকেই, এমনকি আন্দোলনকারীদেরও সিংহভাগ হয়ত জানে না যে, রাজপথ দখল আন্দোলনের উৎপত্তির পেছনে প্রেরণা যুগিয়েছিল একটি পুস্তিকা- ‘ইনডিগনেস ভউস’। এর রচয়িতা স্টিফেন হেসেল, যিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাৎসিবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই স্টিফেন হেসেল গত ২৬ এপ্রিল প্যারিসে লোকান্তরিত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ জীবনের অধিকারী ছিলেন হেসেল। জন্ম ১৯১৭ সালে জার্মানির বার্লিনে। ৭ বছর বয়সে প্যারিসে যান। সেখানে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক হন। ১৯৩৭ সালে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পান। চার বছর পর জেনারেল দ্য গলের সঙ্গে যোগ দেন এবং ফরাসী প্রতিরোধ আন্দোলনে নাম লেখান। ১৯৪৪ সালে গেস্টাপোর হাতে ধরা পড়ে ঠাঁই হয় বন্দীশিবিরে। সেখানে যে ৬ ব্যক্তি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান হেসেল ছিলেন তাদের অন্যতম।
যুদ্ধোত্তর ফ্রান্সকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় প্রতিরোধ কাউন্সিলের সদস্য হিসাবে হেসেল জাতিসংঘে পেশাদার কূটনীতিকের দায়িত্বে নিয়োজিত হন। সেখানে তিনি সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার খসড়া প্রণয়নে অংশ নেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি পিয়ের মেন্দেস ফ্রান্সের পক্ষে কাজ করেন, যিনি আজও ফরাসী বামপন্থীদের কাছে নৈতিক প্রেরণার প্রোজ্বল উৎস। হেসেলকে সায়গনে পাঠানো হয়। তারপর আলজিয়ার্সে। সত্তর ও আশির দশকের পুরো অধ্যায়ে তিনি বেশ ক’জন মন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অনুশীলনের ওপর তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন। তবে ২০১০ সালে তাঁর ‘ইনডিগনেস ভউস’ পুস্তিকাটি ছাপা হলে তার রাজনৈতিক রচনাবলীর প্রতি বিশ্বজুড়ে প্রবল আগ্রহের সঞ্চার হয়। পুস্তিকাটির ইংরেজী অনুবাদের নামটি হলো ‘টাইম ফর আউটরেজ’। ৩৪টি ভাষায় অনূদিত এ বইটির ৪০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। স্পেনে এই বইটি বাজারে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে ‘ইনডিগনাডোস’ নামে এক আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা নগরীর কেন্দ্রস্থলে মাদ্রিদ স্কয়ার দখল করে নেয়। ঐ ছিল শুরু। সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটানোর জন্য হেসেলের আহ্বান শেষ পর্যন্ত বিশ্বজনীন পরিসরে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
২০০৬ সালে ফরাসী পত্রিকা লিবারেশনের সঙ্গে সাক্ষাতকারের এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ‘আপনার শোনা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপদেশটি কি?’ হেসেলের জবাব ছিল : ‘মা একবার আমাকে বলেছিলেন ‘তোমাকে সুখী হওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। এটাই হলো সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ যা তুমি অন্যদের প্রতি করতে পার।’ তাঁকে আরেক প্রশ্ন করা হয়েছিল: ‘আপনি কী হারাচ্ছেন?’ হেসেল জবাব দিয়েছিলেন : ‘আমি সৌভাগ্যবান। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো আমি হারাইনি। যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তাদের সবার চেহারা এবং যত কবিতা পড়েছি সবই মনে আছে। বিভিন্ন ভাষায় এক শ’টি কবিতা আমার কণ্ঠস্থ এবং আমি আপনমনে সেগুলো আবৃত্তি করে শুনি।’
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইউরোপ একজন অসাধারণ ইউরোপীয়কে এবং ফ্রান্স এক অতি প্রিয় সন্তান, কবি এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার এক অকুতোভয় যোদ্ধাকে হারাল।
সূত্র : গার্ডিয়ান