মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী ২০১২, ১৪ মাঘ ১৪১৮
কাকন বিবির গল্প
এসএম নাজমুল হক ইমন
কাকন বিবি মুক্তিযুদ্ধ জয়ী আটপ্রৌঢ়ে এক গ্রাম্য পাহাড়ী খাসিয়া নারী। নিভৃত জীবনযাপন শেষে মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পর তিনি অন্ধকার ভেদ করে প্রচারণার আলোয় আসেন। আদিবাসী গ্রাম্য এই নারী সরাসরি অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন বাজি রেখে বীরোচিত ভ‚মিকা রেখেছেন ¯^াধীনতাযুদ্ধে। যুদ্ধকালীন তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদান এখনও সহযোদ্ধাদের মুখে শোনা যায়। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী এই নারী যুদ্ধকালীন অনেক ত্যাগ স্বীকার করলেও এখন তিনি জীবনযুদ্ধে পরাজিত। সরকার কর্তৃক বীরপ্রতীক ঘোষিত এই বাঙালী নারী সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন।
খাসিয়া কাকন থেকে নূরজাহান
বাঙালী জাতির যুদ্ধজয়ী এই মাতা সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার লীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে বসবাস করছেন। এক সময়ের চঞ্চল পাহাড়ী এই মেয়েটির যৌবনের সেই জৌলুস নেই। নেই চঞ্চলতা। সর্বত্র অভাবের চাবুকে তাড়া খেয়ে এখন নিশ্চল বসে আছেন নিজের শূন্য ভিটায়। কাকন বিবি মূলত খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোক। তাঁর মূল বাড়ি ছিল ভারতের খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশের এক গ্রামে। ১৯৭০ সালে তাঁর বিয়ে হয় দিরাই উজেলার জনৈক শহীদ আলীর সঙ্গে। বিয়ের পর তাঁর নাম হয় নুরজাহান বেগম। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ তাঁর এক কন্যাসন্তান জন্ম হয়। কন্যাসন্তান জন্ম দেবার কারণে ¯^ামী শহীদ আলীর সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তাঁদের মৌখিক ছাড়াছাড়ি হয়। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে ইপিআর সৈনিক মজিদ খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ওই সৈনিক তখন সিলেট ইপিআর ক্যাম্পে চাকরিরত ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে দুই মাস সিলেটে বসবাসের পর কাকন বিবি তাঁর পূর্বের স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়ে সখিনাকে আনতে যান। মেয়েকে নিয়ে সিলেট আসার পর স্বামী মজিদ খানকে আর খুঁজে পাননি। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকার কোন এক ক্যাম্পে বদলি করা হয়েছে।
¯^ামীকে খুঁজতে এসে নির্যাতনের মুখে
¯^ামীর খোঁজে ক্লান্ত কাকন বিবি লোকমুখে তাঁর ¯^ামীর খবর শুনে সিলেট থেকে দোয়ারাবাজার সীমান্তে আসেন। তখন ছিল জুন মাস। পাক বাহিনীর সঙ্গে ওই সীমান্ত অঞ্চলে তখন তুমুল যুদ্ধ চলছিল। শিশুকন্যা সখিনাকে সীমান্তবর্তী ঝিরাগাঁও গ্রামে জনৈক শহীদ আলীর আশ্রয়ে রেখে দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা ক্যাম্পে ¯^ামীর খোঁজে বের হন। তখন তাঁর ছিল টগবগে যৌবন। আর এই যৌবনই কাল হয়ে দাঁড়ায়। পাক বাহিনীর নজর পড়ে তাঁর ওপর। নরপিশাচ পাক বাহিনী তাঁকে আটক করে নিয়ে যায় বাঙ্কারে। বাঙ্কারে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। পাক বাহিনী ও স্থানীয় রাজাকাররা অমানুষিক নির্যাতনের পর তাঁকে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনার পরই বদলে যান কাকন বিবি। প্রতিশোধের নেশায় বিধ্বস্ত মনকে পাথর করে ¯^ামীর আশা বাদ দেন । যৌবনের রক্তে আগুন নিয়ে বিভিন্ন বেশে এ্যাকশনে নেমে পড়েন এক নিরীহ বাঙালী গিন্নি কাকন। শুরু হয় এই নারীর যুদ্ধজীবন। জুলাই মাসে তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর সঙ্গে। রহমত আলী তাঁকে সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর শওকতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মীর শওকত তাঁর সঙ্গে কথা বলে তাঁকে বিশ্বস্ত গুপ্তচরের দায়িত্ব দেন। কাকন বিবি সাহসিকতার সঙ্গে গুপ্তচরের কাজ করে সকলের আস্থা অর্জন করেন। তিনি বিভিন্ন বেশে ঘুরে ঘুরে পাক বাহিনীর খবর পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। আর সেই খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এ্যাকশনে নামতেন। এভাবে অনেক সফল অপারেশনের নায়ক এই কাকন বিবি।
অতঃপর বিবস্ত্র ৭ দিন...
গুপ্তচরের কাজ করতে গিয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজারে পাক বাহিনীর হাতে আবার ধরা পড়েন কাকন। তাঁকে ধরে নিয়ে একনাগাড়ে ৭ দিন বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন চালায় পাক হানাদার-রাজাকার, আল বদররা। লোহার রড গরম করে তাঁর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছ্যাঁক দেয়। তার ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়ে পাক বাহিনী অজ্ঞান অবস্থায় মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়। কয়েকদিন পর তাঁর জ্ঞান ফিরে এলে মুমুর্ষু অবস্থায় তাঁকে বালাট সাবসেক্টরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা করানোর পর কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার বাংলাবাজার ফিরে আসেন। তাঁর চোখে তখন সব হারানোর আগুন। আর এই প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন। রহমত আলীর দলে সদস্য হয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। সমান তালে চলে তাঁর সম্মুখ যুদ্ধ আর গুপ্তচরের কাজ। ১৯৭১ সালের নবেম্বর মাসে টেংরাটিলায় পাক সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন। সেই যুদ্ধে কয়েকটি গুলি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয়। উড়ুতে কয়েকটি গুলির দাগ এখনও আছে। এখনও অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ব্যথা জাগিয়ে তোলে। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে চোখের জলে স্মরণ করেন সেই বিধ্বস্ত দিন। টেংরাটিলা যুদ্ধের পর আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দুর্বিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় ৯টি সম্মুখযুদ্ধে তিনি অস্ত্রসহকারে যুদ্ধ করেন। নবেম্বর মাসের শেষদিকে তিনি রহমত আলীসহ কয়েক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জাউয়া ব্রিজ অপারেশনে যান। ব্রিজ অপারেশনে তাঁরা সফল হন। এভাবে অনেক অপারেশনে তিনি সফল হন। আমবাড়িবাজার যুদ্ধে তাঁর পায়ে গুলি লাগে। সেই গুলির চিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। উড়ুতে সেই চিহ্ন নিয়ে এখন অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটান।

এখন যেমন আছেন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাকন বিবি দোয়ারাবাজার উপজেলার লীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে জনৈক এক ব্যক্তির কুঁড়েঘরের বারান্দায় মেয়ে সখিনাসহ আশ্রয় নেন। ’৭১-এর এই যোদ্ধা ¯^াধীনতার পর লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন প্রায় দুই যুগ। ১৯৯৬ সালে স্থানীয় এক সাংবাদিকের দৃষ্টিতে পড়লে তাঁকে নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা শুরু হয়। কাকন বিবির দুরবস্থা সংবাদপত্রে আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাকন বিবিকে এক একর খাস ভ‚মি প্রদান করেন এবং তাঁকে বীরপ্রতীক উপাধি দেন। এরপর সিলেটের মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান কাকন বিবিকে ঐ জায়গার ওপর একটি ছোট কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেন। পরবর্তীতে দৈনিক জনকণ্ঠ কাকন বিবিকে প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়। কয়েক বছর ভালই কেটে ছিল তাঁর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ কাকন জানান, রোগেশোকে ভুগে এখন তিনি কাতর। প্রায়ই বিছানায় পড়ে থাকেন। টাকার অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে পারছেন না।