মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০১৪, ২৩ কার্তিক ১৪২১
দু শ’ বছরে প্যারীচাঁদ মিত্র
মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল
বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের পথ প্রদর্শক প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই কলকাতার এক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাম নারায়ণ মিত্র ছিলেন সেকালে কলকাতার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। প্যারীচাঁদের মানস গঠনে পরিবারের বেশ কিছুটা প্রভাব ছিল। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় তাদের পরিবারের সে সময় যথেষ্ট সুনাম ছিল। তাঁর মাতা আনন্দময়ী দেবী নারী শিক্ষার সেই অন্ধকার যুগেও ছিলেন যথেষ্ট শিক্ষা প্রাপ্ত। পারিবারিক শিক্ষা ছাড়াও প্যারীচাঁদ মিত্র শৈশবে এক গুরু মশাইয়ের কাছে সংস্কৃতি ও মুন্সীর কাছে ফার্সীতে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে প্যারীচাঁদ মিত্র হিন্দু কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে কলেজ শিক্ষা সমাপ্ত করে যখন তিনি বেরিয়ে আসেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। তিনি ছিলেন সে সময়ে হিন্দু কলেজের বৃত্তি পাওয়া কৃতী ছাত্র। তাঁর মনস্তত্ত্ব ও নীতি দর্শনে ছিল অসাধারণ জ্ঞান। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ তিনি কলকাতার পাবলিক লাইব্রেরিতে সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এখানেই তাঁর প্রথম কর্মজীবন শুরু। বাঙালী সমাজে তিনি টেকচাঁদ ঠাকুর নামে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ডিরোজিও কোম্পানি প্রেসে ছাপা হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস (১৮১ পৃষ্ঠার একটা বাংলা বই) প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল।’ যদিও এই গ্রন্থটি ছাড়াও তিনি ‘মদ খাওয়া বড় দায়’ (১৮৫৯ খ্রিঃ), ‘জাত থাকার কি উপায়’ (১৮৫৯ খ্রিঃ), ‘রামার রঞ্জিকা’ (১৮৬১ খ্রিঃ), ‘অভেদ’ (১৮৬১ খ্রিঃ) এবং ‘আধ্যাত্মিকা’(১৮৮০ খ্রিঃ) ছাড়াও আরও গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তবে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮ খ্রিঃ) প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে গিয়েছিল তৎকালীন সাহিত্য পিপাসু মহলে। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ্ঔপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও বইটির বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করেছিলেন। প্যারীচাঁদ মিত্রই প্রথম সাহিত্যিক যিনি কথ্য ও সাধু ভাষার মধ্যে দূরত্ব দূর করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাহিত্যের যোগাযোগ স্থাপন করেন। প্যারীচাঁদ মিত্রের অসাধারণত্ব বিশ্লেষণ করে বঙ্কিম চন্দ্র লিখেছিলেন “উহার অপেক্ষা উৎকৃষ্ট গ্রন্থ তৎপর কেহ প্রণীত করিয়া থাকিতে পারেন অথবা ভবিষ্যতে কেহ করিতে পারিবেন কিন্তু ‘আলালের ঘরের দুলাল’ দ্বারা বাংলা সাহিত্যের যে অশেষ কল্যাণ সাধিত হইয়াছে তাহা আর কোন গ্রন্থে সেইরূপ হয় নাই।”
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্যারীচাঁদ মিত্রের বাল্যবন্ধু রাধানাথ শিকদারের (‘তৎকালীন গণিতের মেধাবী ছাত্র ও এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়কারী) সম্পাদনায় একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সেই পত্রিকায় প্যারীচাঁদ মিত্র ‘টেকচাঁদা ঠাকুর’ এই ছদ্ম নামে তাঁর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ পুস্তাকারে মুদ্রিত হয়ে প্রচারিত হয়।
এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে জানা যায় ‘আলালের ঘরের দুলাল’ হচ্ছে, বাঙালী লিখিত প্রথম উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিকের মর্যাদা যদি কাউকে দিতে হয় তা হলে সেই সম্মান প্যারীচাঁদ মিত্রেরই প্রাপ্য।
‘আলালের ঘরের দুলাল’ প্রকাশিত হওয়ার আগে হ্যানা ক্যাথরিন মুনেন্স নামে এক বিদেশিনী খ্রীস্টানের লেখা ‘ফুল মনি ও করুণার বিবরণ’ (১৮৫২ খ্রিঃ) একটি উপন্যাসের সন্ধান আমরা পাই। এই গ্রন্থটিতে একটি খ্রীস্টান পরিবারের ঘটনাকে তুলে ধরা হয়েছিল। শ্রীমতী মুনেন্স অতি চমৎকার বাংলা ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। তবে উপন্যাস হিসেবে এটাকে সার্থক বলা চলে না। তা ছাড়া ‘ফুলমনি ও করুণার বিবরণ’ গ্রন্থটি মূলত ঞযব ষধংঃ ফধু ড়ভ ঃযব ডববশ নামক একটি ইংরেজী গল্পের ছায়া অবলম্বনে রচিত। তা ছাড়া গ্রন্থটির কাহিনী নির্জীব, নীরস। সেই জন্য এটি সে সময় চিত্তাকর্ষক হতে পারেনি। এর তুলনায় ‘আলালের ঘরের দুলাল’ কাহিনী সৃষ্টিতে অনেক বেশি স্বার্থক। তাই ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থটিকেই সেই সময় বাংলা সাহিত্যের সর্ব প্রথম উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
একাধারে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় সমাজকর্মী, সফল ব্যবসায়ী ও প্রথিতযশা সাংবাদিক। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নবেম্বর ৬৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নানা প্রতিষ্ঠানে বহু কল্যাণকর ও গঠনমূলক সেবা কার্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে বিশেষত অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কলকাতা ও তার নগরকেন্দ্রিক সামাজিক চিত্র আশ্চর্য নিপুণতার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ প্যারীচাঁদ মিত্রকে দান করেছে অমরতা ও বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক যুগান্তকারী স্বর্ণ শিখরের স্বার্থক রূপায়ণ।
আজ তাঁর ১৩১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে (১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নবেম্বর মৃত্যু) তাঁকে জানাই হৃদয়ের অফুরন্ত ভালবাসা। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।