মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৩, ২৮ আষাঢ় ১৪২০
পিতি পুরুষ
আব্দুল মান্নান সরকার
(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাধুয়ার বিয়েতেও সে শাড়ী পাবে। আর হ্যাঁ, ছেলে হবার সময় পাবে আরও একখানা। মাধী বুড়ির চোখ দুটি চকচক করে। আর সে খুশিতে নাচতে ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু একটা চক্কর দিয়েই সে থেমে যায়। না, বাতের ব্যথাটা যেন বেশি মনে হচ্ছে। রাঁধা কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলে, মেলাই বকবক কর গো তুমি। আমার বিয়ে হোবে, বাচ্চা হোবে, সিতো অনেক দিন লাগবে গো! তার আগে তু মরিয়া যাবি না!
হা! আমার কপাল!
বুড়ি কপাল চাপড়ায়। এই রাধুয়াকেই সে কি না আঁতুড় ঘরে রসবার পেট থেকে খালাস করেছিল, আজ সেই কিনা মরণের কথা বলল তাকে, তাও আবার পরবের দিন। ‘হ্যাঁ, মানুষতো মরবেক। কে আর মরবেক লাই! মৃত্যুর কথা মনে করেই, না কি বাপ মায়ের স্মরণে সে কাঁদতে বসে। ধাই মাকে কাঁদতে দেখে অনুতপ্ত হয় রাধা। না, আজকের দিনে এভাবে বলা ঠিক হয়নি। রাধা কি আর ভাল মেয়ে? না, তার মা রসবাই ভাল! দেখ কেমন অকৃতজ্ঞ রসবা। এখন হলে সে না কি হাসপাতালে যেতো। কেন, সন্তান খালাসের ব্যাপারে তার হাতযশ কম না কি! ধাঙড়দের কোন বউ ঝি একথা বলবে যে, সে তাদের আঁতুড় ঘরে খালাস করায় নাই। তারপরেও গল্প করার মত কথা আছে তার।
তার তিন কি সাড়ে তিন কুড়ি বছর বয়সে কম করে হলেও দুই কুড়ি পোয়াতিকে খালাস করেছে সে, তার মধ্যে কয়টা বাচ্চা মরেছে? আঙুল গুণে হিসেব করে বুড়ি, লছমনের এক মেয়ে, হাসুয়ার ছেলে এবং দুর্গার ছেলে না মেয়ে তা ঠিক করে উঠতে পারে না। আর কার যেন যমজ দুটো শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। সাকুল্যে কয়টা হল? মোটে পাঁচটা তো! একি আর খুব বেশি না কি গো! সবাইকে ডেকে সে কথা বলতে ইচ্ছে করে বুড়ির। কিন্তু সে মরায় তার আর দোষ কি! অশুভ আত্মারা তো কচি বাচ্চাদের রক্তই চায়! তার ওপর আছে কুপিত বায়ু। ধাইয়ের কাজে এক সময় তার খুব নামডাক হয়েছিল। মিলগুলো ছাড়াও দূর দূর থেকে ডাক আসতো। তবে হ্যাঁ, এখন তার হাত কাঁপে, সে তো ঐ বয়সের দোষ! কিন্তু সুঁচের ছিদ্রে এখনো সে সুতো পরাতে পারে। জওহরীলালের বাপের মৃত্যুর কথা সব কিছুই মনে আছে। সে ছিল তাগড়া জোয়ান। ডেরেন না কি একটা পরিষ্কার করতে গিয়েছিল, আর নেমে পড়েছিল গর্তের মধ্যে। সেখানে বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে মারা যায় সে। গর্তের ভেতরেই মরে পড়েছিল। সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল দেড়শ’ টাকা, ধাঙড়ের জীবনের মূল্য! স্বামীর সে করুণ মৃত্যু ভুলতেই বেশি বেশি মদ গিলতে শুরু করেছিল। জওহরীলাল সবে তখন তার পেটে এসেছে। তারপর সে ভূমিষ্ঠ হলো। একা একা ছেলে মানুষ করতে কত কষ্ট হয়েছিল তার। মায়ের সে কষ্ট ছেলে আর কতটা বোঝে!
হা কপাল!
জওহরীলালের বউ পেট চেপে বসে পড়েছে। মেয়েগুলো নেচেই চলেছে। তবে বউ থামল কেন? হাসপাতালে গিয়ে পেট কাটিয়েছে বউ, কাটা জায়গায় ব্যথা হচ্ছে নিশ্চয়। বুড়ি আপন মনে বলে, যা গরমেন্টের হাসপাতালে যা না কেনে। গরমেন্টের হাসপাতালে সিখানে বড় পাশের ডাকতর বাবুরা আছে। কত বড়াই করেছিল জওহরীলাল। এখন দুকথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় ছেলেকে। খুবতো পেট কেটে বাচ্চা বের করলি, বউতো তুর বুড়ি হয়ে গেল আধেক বয়সেই।
বকুল গাছের নিচে জুয়োর ফর পেতেছে বুনিয়া। আসর বেশ জমে উঠেছে, দান শেষে উল্লাস করছে পুরুষগুলো। বুনিয়াকে বাধা দিবে কে? সে ইউনিয়ন লিডার রওশনের লোক। ধাঙড়দের পয়সা হাতিয়ে নেবার বুদ্ধি সেই হয়তো বুনিয়াকে দিয়েছে। মেনেজারকে এসব বলে লাভ নেই, রওশনকে পেয়ার করে সে। ভূতোর শুয়োর নিয়ে হল্লা করছে ছোট ছোট বাচ্চারা, তাদের হয়তো তর সইছে না, ওটাকে কখন কাটা হবে।
জওহরীলালের বাপকে এবার যেন স্বপ্নে দেখল না। এবার সে মিঠাই খেতে চায়নি তার কাছে। কথাটা মনে হলে মাধী বুড়ির দুটো চোখ জলে ভরে ওঠে। কেন, বউ ব্যাটার সংসার দেখার ইচ্ছেও কি হয় না!
অপঘাতে যে মারা যায় তার আত্মা তো অতৃপ্তই থাকে। সে অতৃপ্তি নিয়েই তো ঘুরে ঘুরে আসে আপনজনের কাছে। কে জানে, আজও হয়তো সে এসেছে, সেই শুধু দেখতে পাচ্ছে না। মাধী বুড়ি এদিক ওদিক তাকায়, একবার ভাবে বনমালীকে কথাটা বলে। সে ছাড়া কে আর বুঝবে তার দুঃখ। পরবের মিঠাই কেনার পয়সা মেনেজোর বাবুর দেওয়ার কথা। জওহরীলালকে সাথে নিয়ে জমাদার গেছে মেনেজারের বাংলোয়। বনমালীকে কথাটা জানানো দরকার। বনমালীকে আসতে দেখে খুশি হয় বুড়ি।
বনমালীকে আরও একটা কথা জিগ্যেস করতে হবে, সে পিতি পুরুষের কথা। এ বিষয়ে তার চাইতে কে আর ভাল জানে। আর একটা কথা ভেবে লজ্জা হয় তার। প্রতিবছর সবার আগে সেইতো বনমালীকে হোলির আবির মেখে দেয়, এবার দেয়নি কেন? তবে হ্যাঁ, আজকাল অনেক কিছু আর মনে থাকে না। মেনেজোর বাবু মিঠাই খাওয়াবে মিলের পয়সায় সে কথা শুনে হাসে বনমালী।
তু হাসছিস কেনে? মিঠাই দিবেক লাই মেনেজার বাবু?
তুর কথা ঠিক আছে, একদম ঠিক। কিন্তুক সে পয়সা তো কেটে লিবে, হ্যাঁ।
কেটে লিবে! কেনে?
লিবে, হ্যাঁ।
বনমালী নিজের কথার নিশ্চয়তা বোঝাতে মাথা দোলায়। বাবুদের চিনতে কি আর বাকি আছে তার!
তুর যে কথা বুনো, পরবের দিনে মিঠাই খাওয়াবে, পুণ্যি হোবে না!
বনমালীর কথা বুঝি বিশ্বাস হতে চায় না বুড়ির। পাপ পুণ্যের ধারণা যে সবার এক নয় এ কথা বনমালী তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে, সে আরও জানে এই শিক্ষিত বাবুদের মানসিক জটিলতা আরও বেশি, তাদের মত সরল, সহজভাবে কোন কিছু গ্রহণ করতে জানে না। বাবুদের ধরম বিশ্বাস সেও খুব জটিল। কথাগুলো বলে না বনমালী, মাধু এ সবের কি বুঝবে!
কুলো থেকে কিছুটা আবির নিয়ে বনমালীর মুখে মেখে দেয় বুড়ি। তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। জওহরীলালের বাপ সেই কবে মরেছে, কিন্তু মাধুর অন্তরের ক্ষত আর শুকালো কই। বনমালী মুঠো মুঠো আবির মাধী বুড়ির মাথায় ছড়িয়ে দিলে কৈশোরিক চপলতায় হেসে ওঠে দুজন।
তুর মনে লাই, সি চা বাগানে!
বাক্যটা মাধু শেষ করতে পারে না, তার আগেই কি এক লজ্জা ঘিরে ধরে তাকে। ঘাড় নাড়ে বনমালী,
হ্যাঁ, সব তার মনে আছে। আসামের কোন এক চা বাগানে জন্ম হয়েছিল তাদের। শৈশবকাল সেখানেই কেটেছিল। বাপ-মায়েরা সৈয়দপুর রেল কলনিতে চাকরি নিলে একদিন সমস্ত লটবহর নিয়ে ট্রেনে গাদাগাদি করে চলে এসেছিল। তারপর মানুষ বাড়ে, আয় রোজগার কমে, আবার নতুন করে কর্মের খোঁজে শুরু হয়। টঙ্গীতে তখন নতুন নতুন মিল কারখানা হচ্ছে। এ সবই পাকিস্তানের প্রথম দিকের কথা। মিলগুলোতে বাধা মাইনে, বাসের জন্য পাকা ঘর, রেশনে চাল, ডাল, নুন চিনি দিবে, আর কি চাই; দলে দলে ছুটে এসেছিল ধাঙড়েরা। ঠিকানা বদল ধাঙড়দের জীবনে এ কি আর নতুন কিছু! দাদা, পর দাদারা উন্মুল, উদ্বাস্তু হয়ে কবে কোনকালে নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করেছিল? না, বনমালী তার সব কিছু জানে না। চোখ বুজলেই বনমালী শুধু দেখতে পায় এক দল উদ্বাস্তু মানুষ চলেছে নতুন করে বাঁচার আশায়, নতুন ঠিকানার সন্ধানে, কিন্তু কোথাও তাদের আর শেকড় গাড়া হয়নি! টঙ্গীর মিলগুলোতে বিহারীরা সংখ্যায় ছিল অনেক, পঁয়ষট্টির ভারত-পাক যুদ্ধের সময় তারা রায়ট করেছিল।
সে সময় বনমালীরাও পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারিরা এদেশের মানুষের সাথে বেইমানি করেছিল। না, ধাঙড়েরা কেউ এমন কাজ করেনি, বরং জীবনবাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু এত কিছু করেও তাদের জন্য একটুখানি মাটির ব্যবস্থা করেনি কেউ। দেশের মানুষ বলে কেউ কি আর তাদের ডেকে কাছে বসায়! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বনমালী কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
অ-বুনো, কথা কহিছিস না কেনে?
বনমালী কিছু বলে না। কৃষ্ণচূড়ার ডাল ভরে লাল লাল ফুল ফুটেছে। সে দিকে তন্ময় চোখে তাকিয়ে থাকে বনমালী। মনে হয় গাছে বুঝি কেউ হোলির আবির ছিটিয়ে দিয়েছে। ডালগুলো দুলছে না! বনমালীর মনে হয় পিতি পুরুষদের আত্মা নাচ জুড়ে দিয়েছে।
চমকে ওঠে বনমালী। মাধী বুড়ির কানে ফিসফিস করে বলে, মাধুয়ারে দেখ না কেনে পিতি পুরুষÑ
বাক্য শেষ করতে পারে না বনমালী।
পিতি পুরুষ! কুথা!
বাকরুদ্ধ হয়ে আসে মাধী বুড়ির।
পিতি পুরুষ, হ্যাঁ!
বনমালী মাথা নাড়ে।
কুথাকে! বোল না কেনে?
সহসা বনমালীর মুখেও আর কোন উত্তর যোগায় না। স্বর্গে, পাতালে, না কি উন্মূল, উদ্বাস্তু হয়ে একদল মানুষের সেই ক্রমাগত ছোটাছুটি, ঠিকানা বদল! বনমালীর চোখে কেবলই ভাসতে থাকে সেই এক দৃশ্য! পোটলা-পুটলি নিয়ে একদল মানুষের বিরামহীনভাবে চলা।
২য় অধ্যায় :
বনমালী বুড়ো দিন-রাত দাওয়ায় বসে থাকে আর নিজের মন্দ কপাল নিয়ে আক্ষেপ করে। ব্যাটা-ব্যাটার বউয়ের ঘাড়ে বসে সে আর কতকাল খাবে? সমবয়সী আর কেউ বেঁচে নেই, তারা যেন নিজেদের আড়াল করে ফেলেছে সংসারের এই জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, এমনটাই মনে হয় বনমালীর। বুড়ো বয়সের কষ্ট বড় কম নয়, নানা ব্যামো লেগেই আছে; এই দাঁত ব্যথা হলো তো পরদিনই পা ফুলে ঢোল। মুখে রুচি নেই, পেটে বায়ু জমে; আর বায়ুর প্রকোপে সারারাত কষ্ট পেতে হয়। আলু আর মসুরের ডাল খেলে পেটে বায়ু জমে বলে ডাক্তার ও-দুটো বাদ দিতে বলেছে, করলার ঝোল খেতে বলেছে; কিন্তু নিত্য তাকে কে আর করলার ঝোল খাওয়াবে। করলার দাম বেশি বলে সুখেন তা কেনে না। ছেলেকে বলতে গেলে উল্টো দু’ কথা শুনতে হবে, বনমালীকে তাই নীরবে কষ্ট সহ্য করতে হয়। একেক সময় আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয় তার। কেন সে বেঁচে আছে, আর কী করতে? মাঝে মধ্যে ভগবানকেও গালমন্দ করে সে, তার তো আর বুড়ো হওয়া নাই, বুড়ো বয়সের কষ্টও নাই ভগবানের! তবে সে কেন মানুষকে বুড়ো বানিয়ে এত কষ্ট দেয়Ñএ কথা কিছুতেই বুঝে আসে না বনমালীর। ব্যাটার বউ শুনলে আরে ছিঃ ছিঃ রাম! রাম! বলে আর্তনাদ করে ওঠে। সুখেন বলে, ‘কেনে তুই ভগমানের সাথে ঝগড়া করিস, আমরা কি তুকে ভাত কাপড় দেই না?’
আবার ভয়ও হয়, তার এই কথায় ভগবান আবার অসন্তুষ্ট হয় কিনা! মন ভাল থাকলে উল্টোটাও ভাবে, সঙ্গী, সাথীরা মরে গেল, সে তো এখনো বেঁচে আছে ভগবানের কৃপায়। তখন আবার দু’ হাত কপালে ঠেকিয়ে দশবার ক্ষমা ভিক্ষা চায়।
ব্যাটার বউ তার খারাপ নয়, বউয়ের মনটা বড় ভাল বনমালী মনে মনে তা স্বীকার করে। বনমালীর বউ মারা যাবার পর থেকে ব্যাটার বউটাই তো তার দেখাশোনা করছে। কত সময় সবিতার মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেছে বনমালী, ব্যাটার বউয়ের মাঝে মায়ের ছায়া দেখতে পেয়ে।
এখন আবার কি এক ব্যামোতে ধরেছে, রাতে হাত পায়ের পাতা জ্বালা করে, বারবার পেচ্ছাব হয়। সুখেনের বউ এ-পাড়া, ও-পাড়া ঘুরে জগডুমুর আর তেলাকুচার পাতা এনে রস করে খাওয়ায়। (চলবে)