মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৩, ২৮ আষাঢ় ১৪২০
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে রাজপুরুষ ও সাধারণ মানুষ
আশরাফ জামান
॥এক ॥
বাংলাদেশে ইলিয়াসশাহী বাদশাহেরা প্রথম উপলব্ধি করলেন যে, সুশাসন রক্ষার্থে অগণিত হিন্দু প্রজাদের প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ করা উচিত। যার জন্য তাঁরা এদেশীয় সাহিত্য রচনায় উৎসাহ প্রদান ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। বাঙালি কবি চ-ীদাস এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন। হিন্দুদের সাহিত্যকর্ম দেখে বাঙালি মসুলমানের মধ্যেও সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা জন্মে। হিন্দু-মসুলিম উভয়ের মধ্যে সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে মিলনের যাত্রা শুরু হয়। এ সময় হতেই বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের সূত্রপাত ঘটে।
চ-ীদাস সম্ভবত: রাজা সিকান্দরের অনুগৃহিত ছিলেন। ১৪১৮ সালে বাংলাদেশের রাজা হন জালালুদ্দীন যদু। তিনি ছিলেন একজন বিদ্যোৎসাহী ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। সম্ভবত তাঁর উৎসাহে ও সহযোগিতায় কৃত্তিবাস বিখ্যাত হিন্দু পুরাণ মহাকাব্য রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করেন। যা মহাকবি বাল্মীকি সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেছিলেন। কবি কৃত্তিবাসের ভাষায় : ‘পঞ্ঝ গৌড় চাপিয়া গৌড়েশ্বর রাজা গৌড়েশ্বর পূজা কৈলে গুণের হয় পূজা।’
শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে কবি যয়নুদ্দীন ‘রসুল বিজয়’ রচনা করেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণ বিজয়ের কবি মালাধর বসুকে গুণরাজ খান উপাধিতে ভূষিত করেন।
আলাউদ্দীন হুসেন শাহ ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান হন। তাঁর রাজত্বকালে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রী চৈতন্যদেব জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সেনাপতি পরাগল খাঁ কবীন্দ্র পরমেশ্বর শ্রীকর নন্দীকে বাংলা মহাভারতের অনুবাদ করতে উৎসাহিত করেন। তাঁর গুণ কীর্তন করে কবি লিখেছেন :
‘নৃপতি হুসেন শাহ হন মহামতি।
পঞ্চম গৌড়েতে যার পরম সুখ্যাতি॥
অস্ত্রশস্ত্রে সুপ-িত মহিমা অপার।
কলিকালে হৈল যেন কৃষ্ণ অবতার॥’
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গৌড়ের সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও বাংলার সীমান্তরেখার পার্শবর্তী রাজা আরাকানের রাজাও রাজদরবারের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করলো। এ সময় বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য সৃষ্টি করলেন মুসলমান কবিরা। তাঁরা আরাকান রাজের সহযোগিতায় পারস্য সাহিত্যের অনুকরণে ইউসুফ জুলেখা, লাইলী মজুন, সয়ফল মুলক বদিউজ্জামাল প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন। কেউবা লোকগাথা অবলম্বনে অথবা কাল্পনিক কাব্যও রচনা করলেন। কিছু কিছু লেখক তাঁদের অনুসরণ করে লৌকিক কাব্য লিখলেন। আলাওল, দৌলত কাজী, দৌলত উজীর বাহরাম খান এ সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি। আলাওলের অমর কাব্য পদ্মাবতী হিন্দী কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পাদুমারৎ’ কাব্যের অনুবাদ। মহাকবি আলাওল ‘পদ্মাবতী কাব্যে পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছন :
‘দেখিয়া বদনচন্দ্র মনে ধন্ধ বাসি।
দিনে দিনে ক্ষীণ হন পূর্ণিমার শশী॥
কনক মকুর, জিনি মুখ জ্যোতি সাজে।
লজ্জা পাই নলিনী প্রবেশ জলমাঝে॥
প্রকৃত পক্ষে রাজপরুষদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাধারণ হিন্দু-মসুলমানগণ মধ্যযুগে সাহিত্য অনুশীলনে আত্মনিয়োগ করেছিলন।
॥ দুই ॥
হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন দেবতা হলেন শিব। শিব কৃষকের দেবতা অষ্টাদশ শতকে রচিত রামেশ্বরের শিবায়ণ বা বিশমঙ্গলে পৌরাণিক দেবতা শিবের ত্রিশূল থেকে কৃষিকার্যের সহায়কস্বরূপ কোদাল-ফাল প্রভৃতি তৈরি করা হয়েছিল।
ক্রমে ব্রাহ্মণ্য চাপে নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুরা শিবের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে শক্তি দেবতা প্রতিষ্ঠা করে। এ ভাবে শক্তি নিয়ে মঙ্গলকাব্য লেখা শুরু হয়।
সমাজের নীচু শ্রেণীর পূজ্য দেবতা হলো ধর্মঠাকুর। এছাড়া মঙ্গলচ-ী বা চ-ী, মনসা বা বিষহরী, ষষ্ঠী প্রভৃতি দেবতাও প্রধানত নিম্ন শ্রেণীর মধ্যেই পূজিত হতো। এসব লৌকিক দেবতা বাঙালির নিজস্ব সৃষ্টি। বাঙালির ছড়া, পাঁচালিতে এঁরা যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে। লৌকিক দেবতাদের মধ্যে ধর্মঠাকুর ও দক্ষিণা রায় ছাড়া আর সবাই স্ত্রী দেবতা। বাংলার দেবতারা বিভিন্ন নিমিত্তির সাথে বিজড়িত। যেমন সাপের ভয় দূর করার জন্য মনসা, বাঘের ভয় দূর করার জন্য কালুরায়, বসন্ত-ওলাওঠার জন্য শীতলাবিবি ও ওলাবিবি প্রভৃতি দেবীর পূজা চালু করে। এরা সকলের ব্যাধি নিবারণের দেবতা হিসেবে পূজা পেয়ে আসছে। তুর্কী আগমনের পর জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্মের শেষ চিহ্নটুকুও বিধ্বস্ত হয়। অপরদিকে অভিজাত হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে।
“উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে বাঙালি সাধারণের মধ্যে পারস্পরিক মিলন সংহতির আকাক্সক্ষা হয়ে উঠেছে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর। ফলে একদিকে ব্রহ্মণ্য সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যকে প-িতেরা লোকজীবনের সন্নিকটস্থ করেছেন। অন্যদিকে লোক সংস্কার ও লোকধর্মের আবহমান ধারাকে স্বীকার করে নিয়েছেন নবজাগ্রত স্মার্ত পৌরাণিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে।”
॥ তিন ॥
জয়দেব গোস্বামীর গীতগোবিন্দে হিন্দু উচ্চশ্রেণীর পূজিত বিষ্ণুর সাথে রাধা বল্লভ কৃষ্ণের একাত্মতা বিধানের ফলে ধর্ম-সংস্কৃতিগত এক অপূর্ব ভাব সম্মিলনের সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে মেথিল রাজসভার কবি বিদ্যাপতি ও বাংলার গ্রামীণ কবি বড়ু চ-ীদাস জীবনধর্মের ঐতিহ্যকে রাধাকৃষ্ণের লীলায় প্রমূর্ত করে তুলেছেন। উচ্চ-নীচ সর্বশ্রেণীর মুক্তিদাতা হিসেবে এসেছিলেন শ্রী-চৈতন্যদেব। “চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫০৩) আবির্ভাবের ফলে তাই লাভ করল সুপরিবদ্ধ এক সুষ্ঠু পরিণাম।”
এযুগে বৈষ্ণব পদাবলিই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। কবির ভাষায় :
‘সখি হমারি দুখক (দুঃখের) নাহিওর (সীমা)
ই ভরা বাদর মাহ (মাস) ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।’
রাধার কেবল ভয় কখন না যেন কৃষ্ণের প্রেম টুটে যায়।
কবি লিখেছেন :
এই ভয় উঠে মনে এই ভয় উঠে
না জানি কানুর প্রেম তিলে জানি টুটে।
বৈষ্ণব পদাবলির কবি লিখেছেন :
‘আজু রজনী হম ভাগে গমওল
পেখল পিয়ামুখ চন্দা।
জীবন যৌবন সফরি করি মানল
দশদিশ ভেল নিরদন্দা।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব সাহিত্যকাশে সূর্যরশ্মির মত। চৈতন্যদেবের অলৌকিকতা আরোপন করে বৃন্দাবন দাস, জয়ানন্দ, লোচনদাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ প্রমুখ কবিগণ কাব্যরচনা করেছেন।
পদকর্তাদের মধ্যে বড়ু চ-ীদাস, দ্বিজ চ-ীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস, কবিশেখর, শাহ আকবর, নসীর, ফকীর হবীব, সৈয়দ মর্তুযা, সালবেগ, ফকীর লাল, আলাওল, শেখ ভিষন উল্লেখযোগ্য পদকর্তা। মুসলমান কবিগণ বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত না হয়েও বৈষ্ণব পদাবলি রচনা করেছিলেন। আধুনিক যুগে কবি কাজী নজরুল ইসলামও রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে গান রচনা করেছেন।
॥ চার ॥
অনেক মুসলমান কবি এ সময় ইসলামী ভাবধারায়ও কবিতা রচনা করেছেন।
সত্যপীরের মাহাত্ম্যসূচক কাব্য মধ্যযুগের শেষের দিকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় শ্রেণীর কবির হাতেই রচিত হয়েছিল। এ পর্যন্ত ৫২জন কবির রচিত সত্যপীরের পাঁচালি পাওয়া গেছে।
মধ্যযুগের শেষদিকের কবি মুকুন্দরামের ‘চ-ীমঙ্গলে’ সমাজের সাধারণ চিত্র চিত্রিত হয়েছে। কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে নগর জীবনের ছবি পরিস্ফুটিত হয়েছে। কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর অন্নদামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন :
না রবে প্রসাদগুণ না হবে রসাল
অতএব কহি ভাষা যাবনী মেশাল।
প্রাচীন পন্ডিতগণ গিয়াছেন কয়ে
যে হৌক সে হৌক ভাষা কাব্যরস লয়ে॥
মধ্যযুগের সাহিত্য প্রধানত: ধর্মকেন্দ্রিক ছিল। তবে কিছু লেখা ধর্মনিরপেক্ষ এবং কিছু অনুবাদ সাহিত্যও পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারত এ যুগের শ্রেষ্ঠ অনুবাদ সাহিত্য।
মধ্যযুগের সমাজব্যবস্থা ধর্মগত, গোষ্ঠী গত বা সম্প্রদায়গত নয়। সে যুগে হিন্দু-মসুলমান, বৌদ্ধ সবারই নির্দিষ্ট আসন ছিল। ধর্ম নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ হতো না। সাহিত্য আস্বাদনের ব্যাপারে গ্রাম ও নগরের মধ্যে মূল্যমান যাচাই করা হতো না। নগরবাসী তার সাহিত্য আস্বাদন করত আর গ্রামবাসীও তার গ্রামীণ অস্তিত্বের গর্ব নিয়ে সাহিত্য অনুশীলন করত। বৈষ্ণব, শাক্ত, অনুবাদ, লৌকিক সাহিত্য প্রভৃতি জাতিধর্ম নির্বিশেষে বাঙালি সাধারণ হিন্দু-মসুলমান সকলের সমর্থন লাভ করেই তবে রসোত্তীর্ণ হতে পেরেছে।
মধ্যযুগের, বৈষব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ কাব্য, আরবী-ফারসী-বাংলা শব্দের মিশ্ররূপে লেখা রোমান্টিক প্রণয় উপখ্যান সুলতান, নবাবদের প্রশংসা সূচক দরবারি সাহিত্য, পাঁচালি প্রভৃতি বিভিন্ন শাখায় বাংলা কাব্য সমৃদ্ধ হয়। মধ্যযুগে আরবী-ফারসী শব্দের কাব্যিক প্রয়োগে বাংলাভাষা বিশেষ বৈচিত্র্যও লাভ করে।